Headlines

সাংবাদিক লাঞ্ছনাকারী বেনাপোলের আরও হারাধন পালের খুঁটির জোর কোথায়ঃ অতীতেও ছিল ঘুষ-দুর্নীতির পাহাড়, নেপথ্যে প্রজ্ঞাপন-বদলির খেলা

রাজস্ব কর্মকর্তা
নিজস্ব প্রতিবেদক, বেনাপোল

কয়েক মাস আগে বেনাপোল স্থলবন্দরের ইমিগ্রেশনে সংবাদ সংগ্রহের সময় এক পেশাদার সাংবাদিককে প্রকাশ্য দিবালোকে লাঞ্ছিত ও অপদস্থ করার ঘটনায় তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন কাস্টমসের বিতর্কিত রাজস্ব কর্মকর্তা (আরও) হারাধন চন্দ্র পাল। গত ২৫ মার্চ বেনাপোল চেকপোস্ট ইমিগ্রেশন চত্বরে ঘটে যাওয়া সেই ন্যাক্কারজনক ঘটনার পর কয়েকমাস পার হয়ে গেলেও তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো কঠোর ব্যবস্থা না হওয়ায় স্থানীয় সংবাদকর্মী ও সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভ দিন দিন বাড়ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাংবাদিক লাঞ্ছনার এই ঘটনা হারাধন পালের ঔদ্ধত্যের কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। এটি ছিল তার দীর্ঘদিনের খামখেয়ালি ও প্রশাসনিক দাপটেরই ধারাবাহিকতা। এর আগেও বিভিন্ন কর্মস্থলে তার বিরুদ্ধে ব্যাপক ঘুষ, অনিয়ম ও আর্থিক দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ উঠেছিল। কাস্টমস ও ভ্যাটের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনে দায়িত্ব পালনকালে শুল্ক ফাঁকিতে সরাসরি সহায়তা এবং সাধারণ ব্যবসায়ী ও অংশীজনদের জিম্মি করে অনৈতিক সুবিধা (ঘুষ) আদায়ের বহু অভিযোগের রেকর্ড রয়েছে তার বিরুদ্ধে। দুদক তদন্ত করলে অভিযোগের সত্যতা পাবে। মূলত এইসব ধারাবাহিক বিতর্ক ও দুর্নীতির কারণেই তাকে বিভিন্ন সময়ে এক স্টেশন থেকে অন্য স্টেশনে জরুরি বা শাস্তিমূলক বদলি হতেও হয়েছে।

সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা থেকে বিভিন্ন ভ্যাট কমিশনারেটে যাত্রা

দাপ্তরিক নথি অনুযায়ী, অনাথ বন্ধু পালের পুত্র হারাধন চন্দ্র পাল তার চাকরিজীবনের শুরুর দিকে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, রংপুরে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (ARO) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সেখান থেকে পরবর্তীতে তিনি পদোন্নতি পেয়ে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, ঢাকা (পশ্চিম)-এর সদর দপ্তরে রাজস্ব কর্মকর্তা (RO) হিসেবে পদায়িত হন। ঢাকা (পশ্চিম) কমিশনারেটে থাকাকালীন ২০২৩ সালে তার পাসপোর্ট নবায়নের জন্য বিভাগীয় অনাপত্তি সনদ (NOC) ইস্যু করা হয়েছিল।

২০২৪ সালে এনবিআর-এর বিশেষ টেকনিক্যাল বদলি

ঢাকা (পশ্চিম) কমিশনারেটে বিভিন্ন অনিয়ম ও বিতর্কের পর ২০২৪ সালের ২ জুন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) এক বিশেষ অফিস আদেশে (স্মারক নং-০৮.০১.০০০০.০৬৮.১৬.০১১.২৪/৮৪) তাকে সাময়িকভাবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আইটি ও কারিগরি শাখায় পদস্থ করে। সেখানে তাকে কাস্টমসের অত্যন্ত সংবেদনশীল ‘অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড’ (Asycuda World) সিস্টেমে ট্যারিফ আপডেট সংক্রান্ত বিশেষ কারিগরি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এই গুরুত্বপূর্ণ টেকনিক্যাল পদে বসার পর তার বিরুদ্ধে ব্যাকডেটেড ট্যারিফ সুবিধা দিয়ে বড় ধরণের শুল্ক ফাঁকিতে সহায়তার গোপন গুঞ্জন ওঠে।
এনবিআর-এর কারিগরি শাখা ও এনবিআরের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব প্রশাসনের বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে পরবর্তীতে তাকে দেশের অন্যতম বৃহত্তম স্থলবন্দর কাস্টম হাউস, বেনাপোলে রাজস্ব কর্মকর্তা (RO) হিসেবে পোস্টিং দেওয়া হয়। বেনাপোলে যোগদানের পর থেকেই তার বিরুদ্ধে সাধারণ যাত্রী ও অংশীজনদের সাথে খিটখিটে আচরণের পাশাপাশি প্রকাশ্য ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে। সেই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও অসদাচরণের ধারাবাহিকতাতেই গত মার্চ মাসে সংবাদ সংগ্রহের সময় কর্তব্যরত সাংবাদিককে সরাসরি লাঞ্ছিত করার মধ্য দিয়ে তা প্রকাশ্যে রূপ নেয়।
ভুক্তভোগী সাংবাদিক ও স্থানীয় সংবাদকর্মীদের দাবি, বেনাপোলের মতো একটি সংবেদনশীল শুল্ক স্টেশনে এমন দুর্নীতিগ্রস্ত ও উগ্র মেজাজের কর্মকর্তা কাস্টমসের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছেন। ঘটনাটি কয়েক মাস আগের হলেও এখনও তার বিরুদ্ধে সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে অনড় রয়েছে স্থানীয় সাংবাদিক সমাজ।

পাসপোর্ট আছে, নেই কোনো বহিঃবাংলাদেশ ছুটির আদেশ

ঢাকা (পশ্চিম) কমিশনারেটে থাকাকালীন ২০২৩ সালে তার পাসপোর্ট নবায়নের জন্য বিভাগীয় অনাপত্তি সনদ (NOC) ইস্যু করা হয়েছিল (স্মারক নং-২-২(৮১৪) জনপ্রশাঃ/ব্যক্তিগত/২০২৩/৩৯৫১)। তবে কাস্টমসের রেকর্ড ও জনপ্রশাসন উইংয়ের নথি ঘেঁটে জানা গেছে, পাসপোর্ট সচল থাকলেও সরকারিভাবে তার নামে কোনো বহিঃবাংলাদেশ ছুটির (Ex-Bangladesh Leave) আদেশ নেই। কোনো বৈধ ছুটির আদেশ বা অনুমতি ছাড়া সীমান্ত কিংবা আন্তর্জাতিক রুটে তার যেকোনো ধরনের গতিবিধি দাপ্তরিক শৃঙ্খলার পরিপন্থী হলেও বেনাপোল চেকপোস্টের মতো স্পর্শকাতর ইমিগ্রেশন পয়েন্টে তার এই দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান নানা রহস্যের জন্ম দিয়েছে। দাবী উঠেছে— তার পাসপোর্ট এবং গমনাগমনের রেকর্ড যেনো খতিয়ে দেখা হয়, একইসাথে সাংবাদিক মহলের ধারণা তার অতিরিক্ত একটি অবৈধ পাসপোর্ট থাকতে পারে।