এজাহারে প্রথমে চালক বাবার গাড়িচালক, সিসিটিভিতে কিশোরকে চালকের আসন থেকে বের হওয়ার দাবি; নিহত নির্মাণশ্রমিক শ্রবণ ও বাক্প্রতিবন্ধী।
ঢাকা: রাজধানীর বারিধারার অভিজাত ডিপ্লোম্যাটিক জোনে ফুটপাতে বসে বিশ্রাম নেওয়ার সময় প্রাইভেটকারের চাপায় নিহত হয়েছেন ২৪ বছর বয়সী নির্মাণশ্রমিক মেহেদী হাসান মীম। ঘটনার পর গাড়িতে থাকা এক কিশোর ও তার বাবার গাড়িচালককে স্থানীয়রা পুলিশের কাছে তুলে দিলেও মামলার এজাহারে প্রথমে চালক হিসেবে নাম দেওয়া হয় বাবার গাড়িচালক আকাশ মারকের।
পরে সিসিটিভি ফুটেজ ও ঘটনাস্থলের ভিডিও বিশ্লেষণের পর গাড়ির চালকের আসনে কিশোর আজান আলী শরীফ ছিলেন— এমন তথ্য সামনে আসে। বুধবার তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বৃহস্পতিবার আদালত তাকে কিশোর সংশোধনাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
ঘটনার মধ্যেই নিহতের পরিবারের সঙ্গে ৯ লাখ টাকায় আপস হয়েছে বলে আদালতে জানিয়েছেন অভিযুক্ত কিশোরের আইনজীবী মো. আলমগীর হোসেন।
কে এই কিশোর আজান আলী শরীফ?
অভিযুক্ত আজান আলী শরীফের বয়স ১৭ বছর। তিনি গুলশানের একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের ‘O’ Level-এর শিক্ষার্থী বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তার বাবা আব্বাস আলী শরীফ বাংলাদেশ বিমানের পাইলট। আর দুর্ঘটনায় ব্যবহৃত নীল রঙের Proton S70 গাড়িটি তার মা সিগমা আব্বাসের নামে নিবন্ধিত। সিগমা আব্বাসের পেশা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য প্রকাশিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
অর্থাৎ, অভিযুক্ত কিশোরের পারিবারিক পরিচয় একজন সাধারণ নিম্নআয়ের পরিবারের নয়— তার বাবা পেশায় বাংলাদেশ বিমানের পাইলট এবং দুর্ঘটনায় ব্যবহৃত গাড়ির নিবন্ধিত মালিক তার মা।
আরেকজন আকাশ মারক— মামলার প্রথম আসামি
এই ঘটনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নাম আকাশ মারক (৪৪)।
তিনি আব্বাস আলী শরীফের গাড়িচালক হিসেবে কাজ করতেন বলে সংবাদমাধ্যমে এসেছে। দুর্ঘটনার পর গাড়ির অপর পাশ দিয়ে তাকে বের হতে দেখা যায় বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য।
মেহেদীর বড় ভাই মোক্তাদীর ইসলাম বাদী হয়ে গুলশান থানায় যে মামলা করেন, সেই এজাহারে আকাশ মারককেই গাড়ির চালক হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
এজাহার অনুযায়ী, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালিয়ে ফুটপাতে উঠে মেহেদীকে চাপা দেওয়ার অভিযোগ আকাশ মারকের বিরুদ্ধে। কিন্তু মামলার পর থেকে তিনি পলাতক রয়েছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
ফলে একই ঘটনায় এখন দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—
এজাহারে চালক আকাশ মারক, কিন্তু সিসিটিভিতে চালকের আসন থেকে বের হওয়া কিশোর আজান— তাহলে গাড়িটি চালাচ্ছিলেন কে?
ফুটপাতে বসেছিলেন মেহেদী
ঘটনাটি ঘটে গত মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর বিকেল ৫টার দিকে।
বারিধারা ডিপ্লোম্যাটিক জোনের ১ নম্বর সড়কের ফুটপাতে বসে নির্মাণকাজের ফাঁকে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন মেহেদী হাসান মীম। এ সময় একটি প্রাইভেটকার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফুটপাতে উঠে তাকে চাপা দেয়।
গাড়ির নিচে চাপা পড়ে গুরুতর আহত হন মেহেদী। পরে তাকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
মেহেদী ছিলেন নীলফামারীর ডোমার উপজেলার বাসিন্দা। ঢাকায় নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন তিনি।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাকে বাক্ ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ তিনি কথা বলতে পারতেন না এবং শুনতেও পারতেন না। তারপরও নিজের ও পরিবারের জীবিকা নির্বাহের জন্য ঢাকায় এসে নির্মাণকাজ করছিলেন।
দুর্ঘটনার পর কী হয়েছিল?
দুর্ঘটনার পর স্থানীয় লোকজন গাড়িতে থাকা দুজনকে আটক করেন। তাদের একজন আজান আলী শরীফ, অন্যজন আকাশ মারক।
আজানকে তখন পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হলেও তাকে প্রথম মামলায় আসামি করা হয়নি। জিজ্ঞাসাবাদের পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল বলেও প্রতিবেদনে এসেছে।
অন্যদিকে আকাশ মারককে আসামি করে মামলা করা হয়।
পরে ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও নিয়ে আলোচনা শুরু হলে পুলিশের তদন্তের গতিপথ বদলায়। তদন্তে আজানের গাড়ি চালানোর বিষয়টি সামনে আসে বলে পুলিশ জানায়। এরপর বুধবার তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
আইনজীবীর দাবি বনাম তদন্তের তথ্য
আজানের আইনজীবী মো. আলমগীর হোসেন অবশ্য আদালতে দাবি করেছেন, আজান গাড়ি চালাচ্ছিলেন না।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, কিশোর গাড়ির চালকের পাশে ছিলেন এবং দুর্ঘটনার পর গাড়ি উল্টে গেলে সেখান থেকে বের হন।
অন্যদিকে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য ও তদন্ত কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনার পর গাড়ির ডান পাশের চালকের আসন থেকে আজানকে বের হতে দেখা যায়।
অতএব, গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে আসলে কে ছিলেন— এই প্রশ্নটির চূড়ান্ত উত্তর তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হওয়ার কথা।
৯ লাখ টাকায় আপস
এই ঘটনার মধ্যেই বৃহস্পতিবার আদালতে নিহত মেহেদীর পরিবারের সঙ্গে ৯ লাখ টাকায় আপসের কথা জানান আজানের আইনজীবী।
আইনজীবীর বক্তব্য অনুযায়ী, দাফন-কাফন ও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার জন্য ১ লাখ টাকা এবং মেহেদীর বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ভবিষ্যৎ প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করে আরও ৮ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে।
আইনজীবী জানান, দুই পক্ষের উপস্থিতিতে শান্তা মরিয়ম নামের একটি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের অফিসে এই সমঝোতা হয়। নিহতের মামা, ভাই এবং স্বজনরাও সেখানে ছিলেন বলে তিনি জানান।
পরিবারকে কোনো ভয়ভীতি বা চাপ দেওয়া হয়েছিল কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে আইনজীবী দাবি করেন, তারা নিজেরাই আপসে সম্মত হয়েছেন।
তবে ৯ লাখ টাকার আপস তদন্তের প্রশ্নকে শেষ করে দেয়নি। তদন্ত কর্মকর্তা বলেছেন, তদন্ত নিজস্ব গতিতেই চলবে।
একজনের মৃত্যু, দুই পরিবারের দুই বাস্তবতা
একদিকে ২৪ বছর বয়সী মেহেদী হাসান মীম— শ্রবণ ও বাক্প্রতিবন্ধী একজন নির্মাণশ্রমিক। পরিবারের জন্য উপার্জন করতে ঢাকায় এসেছিলেন। কাজের ফাঁকে ফুটপাতে বসে বিশ্রাম নেওয়ার সময় একটি গাড়ি তার ওপর উঠে যায়।
অন্যদিকে অভিযুক্ত ১৭ বছর বয়সী আজান আলী শরীফ— একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের O Level-এর শিক্ষার্থী। তার বাবা বাংলাদেশ বিমানের পাইলট আব্বাস আলী শরীফ। দুর্ঘটনায় ব্যবহৃত গাড়িটি তার মা সিগমা আব্বাসের নামে নিবন্ধিত।
আর মামলার প্রথম আসামি আকাশ মারক— তার বাবার গাড়িচালক, যিনি এখন পলাতক বলে পুলিশ জানিয়েছে।
এই তিনটি পরিচয়ই ঘটনাটিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
মেহেদী কি ফুটপাতে নিরাপদ ছিলেন?
গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে কে ছিলেন?
প্রথম মামলায় কিশোরের নাম না এসে গাড়িচালকের নাম কেন এলো?
সিসিটিভি ও অন্যান্য প্রমাণ তদন্তে কী বলছে?
আর ৯ লাখ টাকার আপসের পর মামলার আইনি পরিণতিই বা কী হবে?
প্রশ্নগুলোর উত্তর এখন তদন্ত ও আদালতের প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করছে।
মেহেদী হাসান মীম আর ফিরে আসবেন না। কিন্তু তার মৃত্যুর ঘটনায় অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া জরুরি— ফুটপাতে বসে থাকা একজন নির্মাণশ্রমিকের জীবন কেড়ে নেওয়া গাড়িটির স্টিয়ারিংয়ে শেষ পর্যন্ত কে ছিলেন এবং সেই দায় কার?
নিরাপদ কর্মসংস্থান দিতে পারেনি রাষ্ট্র, জীবনের নিরাপত্তাও নয়
শেষ প্রশ্নটি আরও গভীর— মেহেদী কথা বলতে পারতেন না, শুনতেও পারতেন না। কিন্তু ক্ষুধা তো প্রতিবন্ধিতা বোঝে না। পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিতে তাকে নির্মাণশ্রমিকের কাজ করতে হয়েছে। রাষ্ট্র তার মতো একজন শ্রবণ ও বাক্প্রতিবন্ধী তরুণকে একটি নিরাপদ কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দিতে পারেনি; পারেনি তার জীবনের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে।
জীবিকার তাগিদে ঢাকায় এসে নির্মাণকাজ করতে হয়েছে মেহেদীকে। কাজের ফাঁকে ফুটপাতে একটু বিশ্রাম নিতে বসেছিলেন তিনি। সেই ফুটপাতেই উঠে আসে একটি গাড়ি। তদন্তে গাড়িটি কে চালাচ্ছিলেন, তা নিয়ে এখনো প্রশ্ন আছে; কিন্তু মেহেদী আর নেই— এ সত্য নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই।
একজন প্রতিবন্ধী তরুণকে যদি বেঁচে থাকার জন্যও এমন ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নামতে হয়, আর কাজের ফাঁকে ফুটপাতে বসেও যদি তাঁর জীবন নিরাপদ না থাকে, তাহলে প্রশ্ন শুধু একজন চালকের বিরুদ্ধে নয়— প্রশ্ন রাষ্ট্রের কাছেও।
মেহেদী কথা বলতে পারতেন না। তাই তার হয়ে রাষ্ট্রের আইনকে কথা বলতে হবে। তিনি শুনতে পারতেন না। তাই তার মৃত্যুর পর রাষ্ট্রকেই তার পরিবারের কান হয়ে তাদের প্রশ্ন শুনতে হবে।
রাষ্ট্র মেহেদীকে নিরাপদ কর্মসংস্থান দিতে পারেনি, তার জীবনের নিরাপত্তাও দিতে পারেনি। অন্তত তার মৃত্যুর পর যেন ন্যায়বিচারটুকু নিশ্চিত করতে পারে।
মেহেদীর জীবন ৯ লাখ টাকার একটি আপসনামায় শেষ হয়ে যাওয়ার মতো ছোট ছিল না। তিনি একজন শ্রমিক ছিলেন, একজন সন্তান ছিলেন, একটি পরিবারের উপার্জনক্ষম মানুষ ছিলেন।
রাষ্ট্রের কাছে শেষ প্রশ্ন তাই একটাই— মেহেদীকে বাঁচিয়ে রাখার মতো নিরাপদ জীবন আপনি দিতে পারেননি; অন্তত তার মৃত্যুর পর কি তাকে ন্যায়বিচার দিতে পারবেন?
