Headlines

আপনারও আছে একই ২৪ ঘণ্টা

Same 24 hours

মানুষের জীবনে সবচেয়ে অদ্ভুত সমীকরণগুলোর একটি হলো— সবার জীবন এক নয়, কিন্তু প্রত্যেকের একটি দিন ২৪ ঘণ্টার। কারও হাতে কোটি টাকা, কারও পকেটে এক টাকাও নেই। কেউ নিজের বাড়িতে ঘুমায়, কেউ হয়তো রাত কাটানোর জায়গাটুকুও খুঁজে পায় না। কেউ গাড়িতে চড়ে অফিসে যায়, কেউ হেঁটে যায়। কারও হাতে সর্বশেষ মডেলের স্মার্টফোন, কারও হাতে ফোনই নেই। সুযোগের এই বিশাল বৈষম্যের মধ্যেও একটি জায়গায় মানুষ আশ্চর্যজনকভাবে একই— আজকের দিনটিতে তার কাছেও ২৪ ঘণ্টা আছে।


Same 24 hours
জীবন সবার এক নয়, সুযোগও নয়— তবু আজকের ২৪ ঘণ্টা আপনারও আছে। আপনি এই ২৪ ঘণ্টা দিয়ে কী তৈরি করবেন?

FollowUpNews

আমরা সাধারণত “সবার ২৪ ঘণ্টা সমান”—এই কথাটিকে সময় ব্যবস্থাপনার একটি সূত্র হিসেবে ব্যবহার করি। অর্থাৎ যার কাছে সময় আছে, সে সময়কে কাজে লাগালে সফল হতে পারবে। কিন্তু বিষয়টি হয়তো আরও গভীর। এই ২৪ ঘণ্টা শুধু কাজ করার সময় নয়; এটি বেঁচে থাকার সময়, আনন্দ পাওয়ার সময়, সম্পর্ক তৈরি করার সময়, কিছু শেখার সময় এবং পৃথিবীতে নিজের সামান্য কোনো চিহ্ন রেখে যাওয়ার সময়। মানুষের সম্পদ সমান নয়, কিন্তু নিজের পাওয়া সময়টুকুকে কীভাবে ব্যবহার করবে— সেই প্রশ্নটি প্রায় প্রত্যেক মানুষের সামনে কোনো না কোনোভাবে থাকে।

ধরুন, একজন মানুষ সিঙ্গাপুর বেড়াতে গেলেন। বিমান, হোটেল, সুন্দর শহর, পর্যটনকেন্দ্র— সব মিলিয়ে তার একটি চমৎকার দিন কাটল। একই সময়ে আরেকজন মানুষ হয়তো নিজের পাড়ার কয়েকজন ছেলের সঙ্গে একটি টেনিস বলের গায়ে টেপ পেঁচিয়ে ক্রিকেট খেলল। একজনের অভিজ্ঞতার পেছনে হয়তো কয়েক লাখ টাকা খরচ হয়েছে, আর অন্যজনের খরচ প্রায় শূন্য। কিন্তু শুধু খরচের অঙ্ক দিয়ে কি আনন্দের পরিমাণ নির্ধারণ করা যায়? পাড়ার সেই খেলায় হয়তো হাসি আছে, বন্ধুত্ব আছে, শরীরের ঘাম আছে, হার-জিতের উত্তেজনা আছে, শৈশবের স্মৃতি আছে। সিঙ্গাপুরের মানুষটি তার আনন্দ পেয়েছেন একভাবে, অন্যজন পেয়েছেন সম্পূর্ণ অন্যভাবে। কোন আনন্দকে বড় বলা হবে, তার কোনো সার্বজনীন মাপকাঠি নেই।

কেউ হয়তো বিশাল জাহাজে উঠে সমুদ্রে সি-ফিশিং করতে গেলেন। দামী সরঞ্জাম, বিশাল সমুদ্র, বড় আয়োজন— সবই সেখানে আছে। আর একই সময়ে আরেকজন মানুষ বাড়ির পাশের ছোট্ট নদীতে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে নিজের একটি ছিপ বানিয়ে বসে আছে। তার হাতে দামি ফিশিং রড নেই, বড় নৌকা নেই, সমুদ্র নেই। আছে শুধু নদী, একটি বাঁশের কঞ্চি, সামান্য টোপ এবং অপেক্ষা। হয়তো ঘণ্টার পর ঘণ্টা কোনো মাছ ধরা পড়ল না। তারপর হঠাৎ ছিপে টান পড়ল। সেই মুহূর্তে তার যে আনন্দ, তার দাম কোনো দোকানের মেনুতে লেখা নেই। জাহাজে মাছ ধরা নিঃসন্দেহে অন্যরকম অভিজ্ঞতা; কিন্তু বাঁশের ছিপে মাছ ধরার আনন্দকে শুধু সস্তা বলে ছোট করে দেখা যায় না।

খাবারের ক্ষেত্রেও একই কথা। একজন মহাসমারোহে বিরিয়ানি খেলেন, আরেকজন গরম ভাতের সঙ্গে আলুভর্তা, ডাল আর কাঁচামরিচ দিয়ে খেলেন। বিরিয়ানির দাম বেশি হতে পারে, আয়োজন বড় হতে পারে, কিন্তু দাম বেশি হলেই তৃপ্তি বেশি হবে— এমন কোনো নিয়ম নেই। কারও কাছে মায়ের হাতের আলুভর্তা পৃথিবীর সবচেয়ে দামী খাবারের চেয়েও মূল্যবান হতে পারে। কারণ খাবারের স্বাদ শুধু উপকরণে নয়; স্মৃতি, সম্পর্ক, পরিবেশ এবং মানুষের নিজের অনুভূতিতেও তৈরি হয়।

জীবনের একটি মৌলিক সীমাবদ্ধতা হলো— আমরা একই সময়ে দুটি জীবন বাঁচতে পারি না। একজন মানুষ একই সঙ্গে ব্যাংকার এবং ডাক্তার হতে পারেন না। একই বিকেলে তিনি সিঙ্গাপুরের রাস্তায় হাঁটতে এবং নিজের গ্রামের মাঠে বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে পারবেন না। একই দুপুরে তিনি পাঁচ তারকা রেস্টুরেন্টে বিরিয়ানি এবং বাড়িতে আলুভর্তা-ডাল— দুটোই খেতে পারবেন না। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে আমরা কিছু একটা বেছে নিই এবং অন্য কোনো সম্ভাবনাকে সেই মুহূর্তের জন্য ছেড়ে দিই। তাই অন্যের জীবন দেখে নিজের জীবনকে ক্রমাগত ছোট মনে করার কোনো যুক্তি নেই। আপনি অন্যের জীবনটি একই সঙ্গে বাঁচতেই পারবেন না।

এখানেই “আপনারও আছে একই ২৪ ঘণ্টা” —এই কথাটির আসল অর্থ খুঁজে পাওয়া যায়। এটি ধনী-দরিদ্রের পার্থক্য অস্বীকার করে না। টাকা যে সুযোগ তৈরি করে, তা অস্বীকার করারও কোনো কারণ নেই। একজন অর্থবান মানুষের সামনে এমন অনেক দরজা খোলা থাকে, যা একজন দরিদ্র মানুষের সামনে থাকে না। কিন্তু দরজা কম থাকার অর্থ এই নয় যে তার সামনে কোনো পথ নেই। বরং প্রশ্নটি হতে পারে— যে পথটি এখন খোলা আছে, সেটি দিয়ে সে কোথায় যেতে পারে?

ধরুন, কোনো মানুষের কাছে সত্যিই কিছু নেই। টাকা নেই, স্মার্টফোন নেই, নিজের জায়গা নেই। তার জীবন হয়তো প্রতিদিন বেঁচে থাকার সংগ্রামে আটকে আছে। তারপরও সে যদি তার সামর্থ্যের মধ্যে কিছু একটা করার সিদ্ধান্ত নেয়, সেই সিদ্ধান্তের মূল্য কম নয়। সে হয়তো কোনো কারিগরের পাশে গিয়ে কাজ শিখতে পারে, কোনো দোকানে কয়েক ঘণ্টা কাজ করতে পারে, কৃষকের সঙ্গে মাঠে যেতে পারে, কোনো শিশুকে পড়াতে পারে, কোনো বৃদ্ধ মানুষের কাজে সাহায্য করতে পারে। এসব কাজ তাকে একদিনে ধনী করবে না। কিন্তু তার ২৪ ঘণ্টাকে সম্পূর্ণ অর্থহীন হয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে পারে।

আর কখনো কখনো প্রভাব তৈরি করতে টাকাও লাগে না। গ্রামের কোনো মানুষ যদি সরকারি রাস্তার পাশে, আইনগতভাবে অনুমোদিত জায়গায়, দুইশো কৃষ্ণচূড়ার চারা লাগানোর সিদ্ধান্ত নেন এবং বছরের পর বছর সেগুলো বাঁচিয়ে রাখেন, সেটি ছোট কোনো কাজ নয়। চারা হয়তো তিনি চেয়ে নিয়েছেন, কারও কাছ থেকে পেয়েছেন কিংবা নিজের শ্রমে সংগ্রহ করেছেন। গাছ লাগানোর জন্য কোটি টাকা প্রয়োজন হয়নি। প্রয়োজন হয়েছে সদিচ্ছা, শ্রম এবং সময়।

একবার ভাবুন, দশ বা পনেরো বছর পর সেই রাস্তার দুই পাশে গাছগুলো বড় হয়ে গেছে। কৃষ্ণচূড়া ফুলে রাস্তা লাল হয়ে উঠেছে। মানুষ সেখানে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছে। পথচারীরা ছায়া পাচ্ছে। শিশুরা গাছের নিচ দিয়ে স্কুলে যাচ্ছে। অথচ তাদের অধিকাংশই হয়তো জানে না, এই গাছগুলো কে লাগিয়েছিল। সেই মানুষটি হয়তো কোনো পুরস্কার পাননি, কোনো সংবাদপত্রে তার নাম আসেনি, কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার ছবি ভাইরাল হয়নি। তবুও তার কয়েক বছরের নীরব শ্রম বহু মানুষের জীবনে সৌন্দর্য তৈরি করেছে। এবং একসময় মানুষ সেটি স্বীকারও করে নেয়।

এই ধরনের কাজের জন্য একটি বিশেষ মানসিকতা দরকার— কিছুটা একা হয়ে কাজ করার ক্ষমতা। এখানে একা মানে নিঃসঙ্গ হওয়া নয়; বরং অন্যের করতালি, স্বীকৃতি কিংবা অনুমোদনের ওপর নির্ভর না করা। কেউ দেখছে কি না, ছবি তুলছে কি না, প্রশংসা করছে কি না— এসবের বাইরে গিয়ে কোনো কাজ করে যেতে পারা। আপনি যদি জানেন একটি গাছ একদিন বড় হবে, তাহলে আজ কেউ আপনাকে বাহবা না দিলেও আপনি গাছটি লাগাতে পারেন। আপনি যদি জানেন কোনো শিশুকে পড়ালে তার ভবিষ্যৎ একটু বদলাতে পারে, তাহলে ছবি না তুলেও তাকে পড়াতে পারেন। পৃথিবীর অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ এমনভাবেই হয়েছে— নীরবে, ছোট পরিসরে, মানুষের অগোচরে।

আমরা প্রায়ই ধরে নিই, বেশি টাকা খরচ করা যায় এমন কাজই বুঝি বেশি আনন্দের কাজ। কিন্তু জীবন এমন সরল নয়। টাকা মানুষের সুযোগ বাড়ায়, অভিজ্ঞতার পরিধি বাড়ায়, অনেক আনন্দের দরজা খুলে দেয়— এটি সত্য। কিন্তু আনন্দের একমাত্র মুদ্রা টাকা নয়। কেউ পাহাড়ে গিয়ে আনন্দ পান, কেউ বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখে। কেউ সমুদ্রে যেতে চান, কেউ পুকুরের ঘাটে বসেই শান্তি পান। কেউ দামি রেস্টুরেন্টে খাবার উপভোগ করেন, কেউ আলুভর্তা আর ডাল দিয়ে ভাত খেয়ে তৃপ্ত হন। মানুষের আনন্দের কোনো একক মাপযন্ত্র নেই। বিকল্প আছে, এবং সেই বিকল্পেও সুন্দর জীবন খোঁজা যায়। এবং সংকল্প থাকলে নিজের কাজটিও একটু একটু করে এগিয়ে নেওয়া যায়। দেরী হয়, কিন্তু নিখুঁত এবং পরিমার্জিত হয়।

একইভাবে সময়ের মূল্যও শুধু অর্থ দিয়ে হিসাব করা যায় না। এক ঘণ্টা কাজ করে কেউ টাকা আয় করতে পারে। আবার এক ঘণ্টা সন্তানকে সময় দিতে পারে। কেউ এক ঘণ্টা বই পড়তে পারে, কেউ বন্ধুর বিপদে পাশে দাঁড়াতে পারে, কেউ একটি গাছের যত্ন নিতে পারে। এগুলোর অনেকগুলোর সরাসরি আর্থিক মূল্য নেই, কিন্তু তাই বলে এগুলো মূল্যহীন নয়। মানুষের জীবন শুধু আয় দিয়ে তৈরি হয় না; সম্পর্ক, স্মৃতি, আনন্দ, সেবা, সৌন্দর্য এবং অর্থপূর্ণ কাজও জীবন তৈরি করে।

তাই “আপনারও আছে একই ২৪ ঘণ্টা” —এই কথাটি কাউকে এই শিক্ষা দেওয়ার জন্য নয় যে, সবাই সমান সুযোগ নিয়ে জন্মায়। বরং এর অর্থ অনেক বেশি মানবিক। আপনার কাছে অন্যের মতো টাকা না থাকতে পারে, অন্যের মতো বাড়ি না থাকতে পারে, অন্যের মতো ভ্রমণের সুযোগ না থাকতে পারে। কিন্তু আপনার জীবনের প্রতিটি দিন পুরোপুরি অন্যের হাতে তুলে দেওয়ারও প্রয়োজন নেই। আপনার সামর্থ্যের মধ্যে কিছু সময় আপনি নিজের জন্য, কিছু সময় অন্যের জন্য এবং কিছু সময় এমন কোনো কাজের জন্য রাখতে পারেন, যার ফল হয়তো আজ দেখা যাবে না। কিন্তু একটু একটু করে জমে জমে একদিন অনেক বড় হবে, হবেই।

কেউ তার ২৪ ঘণ্টা দিয়ে ব্যবসা করবে, কেউ চাকরি করবে, কেউ পরিবারকে সময় দেবে, কেউ খেলবে, কেউ নদীতে মাছ ধরবে, কেউ সিঙ্গাপুর ঘুরবে, কেউ আবার রাস্তার পাশে কৃষ্ণচূড়া লাগাবে। এগুলো একে অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার বিষয় নয়। কারণ জীবন কোনো একক রেস নয়, যেখানে সবাইকে একই জায়গায় পৌঁছাতে হবে। বরং এটি অসংখ্য ভিন্ন পথের সমষ্টি।

আপনার কাছে হয়তো অন্যের মতো টাকা নেই। অন্যের মতো সুযোগ নেই। অন্যের মতো জীবনও নেই। কিন্তু আপনার নিজের জীবনটি আপনার মতো করে বাঁচার জন্য আজকের দিনটিতে আপনার কাছে এখনও ২৪ ঘণ্টা আছে। সেই ২৪ ঘণ্টার কিছুটা হয়তো আপনাকে বেঁচে থাকার জন্য ব্যয় করতে হবে, কিছুটা জীবিকা অর্জনের জন্য, কিছুটা বিশ্রামের জন্য। কিন্তু তার মধ্যেও যদি সামান্য কিছু সময় আপনি এমন কাজে দিতে পারেন যা আপনাকে আনন্দ দেয়, কাউকে উপকার করে, কোনো সৌন্দর্য তৈরি করে কিংবা ভবিষ্যতের জন্য কিছু রেখে যায়— তাহলে সেই সময়টুকু আপনার জীবনের অর্থ বদলে দিতে পারে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি হয়তো এই নয় যে, অন্য মানুষের কাছে কী ছিল আর আপনার কাছে কী ছিল। প্রশ্নটি হতে পারে আরও সহজ— আজ আপনার হাতে যে ২৪ ঘণ্টা ছিল, তার কতটুকু আপনি নিজের মতো করে বাঁচলেন?

কারও ২৪ ঘণ্টা কেটেছে সিঙ্গাপুরে। কারও ২৪ ঘণ্টা কেটেছে জাহাজে। কারও ২৪ ঘণ্টা কেটেছে দামী রেস্টুরেন্টে। আর কারও ২৪ ঘণ্টা কেটেছে পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে টেপ লাগানো টেনিস বল খেলতে খেলতে, কিংবা বাড়ির পাশের ছোট নদীতে বাঁশের ছিপ ফেলে।

আর কোনো একজন হয়তো সেই ২৪ ঘণ্টার সামান্য অংশ দিয়ে একটি কৃষ্ণচূড়ার চারা মাটিতে পুঁতে দিয়েছেন।

বছর কয়েক পর সেই গাছটির নিচে দাঁড়িয়ে হয়তো কেউ জানবেই না, কে এটি লাগিয়েছিল। কিন্তু পৃথিবী, সময় এবং সমষ্টি ভুলে যায় না, কোথায় যেনো লিখে রাখে সব।

গাছটি ফুল দেবে।

ছায়া দেবে।

সৌন্দর্য দেবে।

তখন হয়তো বোঝা যাবে— একটি মানুষের হাতে সবকিছু না থাকলেও, তার হাতে থাকা ২৪ ঘণ্টা কখনোই সামান্য নয়।

আপনারও আছে একই ২৪ ঘণ্টা। কী করছেন তা দিয়ে?