Headlines

ডিসি অফিস নিয়ে সাংবাদিকতাঃ আলংকারিক কাজের প্রশংসা হয়, মূল কাজের জবাবদিহি কোথায়?

ঢাকা জেলা

ডিসিদের নিয়ে প্রশংসার বন্যা, প্রশাসনের জবাবদিহি কোথায়?

গণশুনানি, মানবিকতা আর ব্যতিক্রমী উদ্যোগের সংবাদ আছে; ভূমি, রাজস্ব, সরকারি সম্পত্তি ও নাগরিক ভোগান্তির হিসাব কোথায়?

জেলা প্রশাসন নিয়ে সংবাদ
ডিসিদের প্রশংসাসূচক সংবাদে সরব গণমাধ্যম, কিন্তু ভূমি প্রশাসন, রাজস্ব আদায়, সরকারি সম্পত্তি রক্ষা ও নাগরিক হয়রানি নিরসনে জবাবদিহির হিসাব কোথায়? — অনুসন্ধানে ফলোআপ নিউজ।
বিশেষ অনুসন্ধান | ফলোআপ নিউজ

একজন জেলা প্রশাসক অসহায় মানুষের কথা শুনছেন। আরেকজন অসুস্থ ব্যক্তিকে আর্থিক সহায়তা দিচ্ছেন। কেউ গণশুনানিতে শিশুকে কোলে নিয়ে স্নেহ প্রকাশ করছেন। কেউ পরিবেশ রক্ষায় উদ্যোগ নিচ্ছেন, কেউ সামাজিক পরিবর্তনের আহ্বান জানাচ্ছেন। এসব ঘটনা নিয়ে সংবাদ হচ্ছে— কখনো ‘মানবিক প্রশাসনের দৃষ্টান্ত’, কখনো ‘সেবার নতুন অধ্যায়’, কখনো ‘ব্যতিক্রমী উদ্যোগ’, আবার কখনো কোনো কর্মকর্তাকে ‘সংস্কারক’ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।

কিন্তু এই সংবাদগুলোর আড়ালে একটি মৌলিক প্রশ্ন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে: একজন জেলা প্রশাসকের ব্যক্তিগত মানবিক আচরণকে সংবাদমাধ্যম কতটা প্রশাসনিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে, আর তার কার্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব পালনের হিসাব কতটা চাইছে?

২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে অক্টোবরের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত বিভিন্ন জেলার জেলা প্রশাসকদের নিয়ে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মানবিক উদ্যোগ, গণশুনানি, কর্মকর্তার বক্তব্য ও ব্যক্তিগত ভূমিকা সংবাদ-আকর্ষণের উল্লেখযোগ্য অংশজুড়ে রয়েছে। এসব উদ্যোগের জনস্বার্থমূল্য থাকতে পারে। কিন্তু কোনো উদ্যোগের প্রশংসা করা এবং তার কার্যকারিতা যাচাই করা এক বিষয় নয়।

ফলোআপ নিউজের প্রশ্ন, সংবাদমাধ্যম কি জেলা প্রশাসনকে জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখছে, নাকি কখনো কখনো একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত উদ্যোগের প্রচারমাধ্যমে পরিণত হচ্ছে?

আট বিভাগীয় জেলা।
আট বিভাগীয় জেলায় কর্মরত আটজন ডিসি। বাম থেকে যথাক্রমে ঢাকা জেলার ডিসি মিজ্ ফরিদা খানম, চট্টগ্রাম জেলার ডিসি মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা, রাজশাহী জেলার ডিসি কাজী শহীদুল ইসলাম, খুলনা জেলার ডিসি হুরে জান্নাত, রংপুর জেলার ডিসি ইসরাত জাহান, সিলেট জেলার ডিসি আব্দুল্লাহ আল মামুন, বরিশাল জেলার ডিসি মোঃ মামুন খন্দকার, ময়মনসিংহ জেলার ডিসি মোঃ সাইফুর রহমান।

প্রশংসাসূচক সংবাদগুলোর কয়েকটি উদাহরণ

নিচের সংবাদগুলো বিভিন্ন জেলার ডিসিদের মানবিক উদ্যোগ, গণশুনানি, বক্তব্য ও প্রশাসনিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত হয়েছে। এগুলোকে সমালোচনার বাইরে রাখা নয়; বরং প্রতিটি প্রতিবেদনের বিপরীতে যে অনুসন্ধানী প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন, সেটিই এখানে সামনে আনা হচ্ছে।

১. ‘মানবিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়: গাজীপুর জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে সেবার নতুন অধ্যায়’

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | সংবাদবেলা

গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়ার সাপ্তাহিক গণশুনানি এবং অসহায় মানুষের অভিযোগ শোনার উদ্যোগকে ‘অনন্য দৃষ্টান্ত’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। <Cite refs={[“turn886601search0”]}/>

কিন্তু প্রশ্ন হলো, গণশুনানি কতটা কার্যকর? কতজনের অভিযোগ শোনা হয়েছে, কতটি নিষ্পত্তি হয়েছে, কতটি অন্য দপ্তরে পাঠানো হয়েছে এবং কতটি এখনো ঝুলে আছে? শুধু মানুষের কথা শোনার দৃশ্য দিয়ে কি প্রশাসনিক সেবার কার্যকারিতা প্রমাণ করা যায়?

২. ‘সেবামুখী ও মানবিক প্রশাসনের নতুন ধারা সৃষ্টি করাই আমাদের লক্ষ্য’

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)

গাজীপুরের ডিসির সাক্ষাৎকারে মানবিক, সমন্বিত ও সেবামুখী প্রশাসন গড়ে তোলার লক্ষ্য তুলে ধরা হয়। <Cite refs={[“turn886601search1”]}/>

কিন্তু একটি প্রশাসন নিজেকে কতটা মানবিক বলে ঘোষণা করল, সেটি সাফল্যের মাপকাঠি নয়। ভূমিসেবায় দুর্নীতি, নাগরিক হয়রানি, অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং সেবার সময়সীমার ক্ষেত্রে কী পরিবর্তন এসেছে— সেই পরিসংখ্যান কোথায়?

৩. ‘গণশুনানিতে উপচে পড়া ভিড়, মানবিক প্রশাসনের দৃষ্টান্ত ডিসি জাহিদের’

প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | চট্টগ্রাম নিউজ

চট্টগ্রামের ডিসি মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার গণশুনানিতে অসুস্থ মানুষ, আর্থিক সংকটে থাকা পরিবার এবং ভূমিসংক্রান্ত অভিযোগ নিয়ে আসা নাগরিকদের উপস্থিতি তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে দুই শতাধিক মানুষের সরাসরি অংশগ্রহণের কথাও বলা হয়। <Cite refs={[“turn886601search5”]}/>

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে: এত মানুষকে কেন ব্যক্তিগতভাবে ডিসির কাছে আসতে হচ্ছে? সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে নিয়মিত সেবা পেলে কি তাদের এভাবে দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হতো? গণশুনানি কি কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থার পরিপূরক, নাকি নিয়মিত সেবাব্যবস্থার দুর্বলতার একটি লক্ষণ?

৪. ‘DC Zahid, Who Listens: Chattogram’s Quiet Reformer’

প্রকাশ: ৫ অক্টোবর ২০২৬ | The Bangladesh Today

চট্টগ্রামের ডিসির গণশুনানি, ভূমিসেবা, পরিবেশ, পাহাড় রক্ষা, হালদা নদী এবং নাগরিক সহায়তার উদ্যোগ নিয়ে একটি বিস্তৃত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। <Cite refs={[“turn886601search8”]}/>

প্রতিবেদনটির মধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন রয়েছে: ব্যক্তিগত উদ্যোগগুলো কি কর্মকর্তা বদলির পরও টিকে থাকবে? পাহাড় কাটা ও নদীদূষণ প্রতিরোধে কতটি অভিযান হয়েছে, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন— অবৈধ কর্মকাণ্ড কমেছে কিনা, পরিবেশের অবস্থা উন্নত হয়েছে কি না এবং নিয়মিত আইন প্রয়োগ নিশ্চিত হয়েছে কি না।

৫. ‘মুন্সীগঞ্জে জেলা প্রশাসনের গণশুনানি: সরাসরি নাগরিকদের সমস্যা শুনলেন ডিসি’

প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ই-মাত্রা

মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক সৈয়দা নুরমহল আশরাফীর গণশুনানিতে নাগরিকদের অভিযোগ শোনা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। <Cite refs={[“turn886601search3”]}/>

কিন্তু নির্দেশ দেওয়া আর সমস্যার সমাধান এক নয়। কতটি নির্দেশ বাস্তবায়িত হয়েছে, কতজন নাগরিক প্রতিকার পেয়েছেন এবং কোন অভিযোগগুলো দীর্ঘদিন ধরে নিষ্পত্তিহীন— এসব তথ্য ছাড়া উদ্যোগের প্রকৃত ফলাফল বোঝা যায় না।

৬. ‘ডিসির কোলে মায়ের পরশ পেল এতিম শিশু’

প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬ | দীপ্ত নিউজ

শেরপুরের জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিনের গণশুনানিতে মাতৃহারা একটি শিশুকে স্নেহ করার দৃশ্যকে কেন্দ্র করে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। <Cite refs={[“turn286327search13”]}/>

একজন শিশুকে স্নেহ করা মানবিক আচরণ। কিন্তু একটি শিশুকে কোলে নেওয়ার দৃশ্য প্রশাসনের সামগ্রিক মানবিকতার প্রমাণ হতে পারে না। জেলার সকল বঞ্চিত এবং ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা, প্রয়োজনীয় সহায়তা এবং একই ধরনের পরিস্থিতিতে নিয়মিত সরকারি ব্যবস্থা কী— এসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।

৭. ‘Sherpur DC Farida Yasmin being praised for humanitarian, administrative initiatives’

প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬ | Daily Country Today

দরিদ্র রোগীদের সহায়তা, আশ্রয়, সামাজিক সুরক্ষা এবং গণশুনানিসহ বিভিন্ন উদ্যোগের ভিত্তিতে শেরপুরের ডিসির প্রশংসা করা হয়। <Cite refs={[“turn993372search2”]}/>

কিন্তু কতজন সহায়তা পেয়েছেন, মোট বরাদ্দ কত, কারা নির্বাচিত হয়েছেন এবং যোগ্য হয়েও কতজন বাদ পড়েছেন— এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া মানবিক উদ্যোগের ন্যায্যতা ও ব্যাপ্তি যাচাই করা সম্ভব নয়।

৮. ‘তীব্র তাপদাহে ডিসি-এসপির যৌথ মানবিক উদ্যোগে পানি ও স্যালাইন বিতরণ’

প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬ | BD News Eye

নারায়ণগঞ্জে তাপদাহের মধ্যে শ্রমজীবী মানুষ ও পথচারীদের পানি ও খাবার স্যালাইন বিতরণের উদ্যোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়। <Cite refs={[“turn286327search6”]}/>

পানি ও স্যালাইন বিতরণ তাৎক্ষণিক সহায়তা দিতে পারে। কিন্তু তাপদাহে শ্রমিকদের সুরক্ষা, কর্মঘণ্টা, নিরাপদ পানির স্থায়ী ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও সংস্থাগুলোর পরিকল্পনা কী— এসব বিষয়ও অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।

৯. ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে হাতহীন শিক্ষক দুখু মিয়ার পাশে জেলা প্রশাসন’

প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬ | বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

নরসিংদীর শিক্ষক আলতাফ হোসেন দুখু মিয়ার পাশে জেলা প্রশাসনের দাঁড়ানোর ঘটনা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। <Cite refs={[“turn286327search8”]}/>

একজন প্রতিবন্ধী শিক্ষকের পাশে দাঁড়ানো অবশ্যই সংবাদযোগ্য। কিন্তু প্রতিবন্ধী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য জেলায় কী ধরনের নিয়মিত সহায়তা, প্রবেশগম্যতা, সামাজিক সুরক্ষা ও শিক্ষা-সহায়ক ব্যবস্থা রয়েছে? ব্যক্তিগত সহায়তার বাইরে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার হিসাব কোথায়?

১০. ‘ধর্মের শিক্ষা প্রতিফলিত হোক কর্মেও: ডিসি জাহিদ’

প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬ | দেশ রূপান্তর

চট্টগ্রামের ডিসির বক্তব্যে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সামাজিক আচরণের প্রসঙ্গ উঠে আসে। <Cite refs={[“turn170757search12”]}/>

এ ধরনের বক্তব্য জনপরিসরে আলোচনার বিষয় হতে পারে। কিন্তু জেলা প্রশাসনের মূল্যায়ন হওয়া উচিৎ আইনসম্মত সিদ্ধান্ত, নাগরিক অধিকার রক্ষা, অভিযোগ নিষ্পত্তি ও সরকারি দায়িত্ব পালনের রেকর্ড দিয়ে— শুধু বক্তব্যের আবেদন দিয়ে নয়।

১১. ‘শুধু প্রশাসনকে দোষ দিলে সমাজ বদলাবে না: ডিসি জাহিদ’

প্রকাশ: ২ অক্টোবর ২০২৬ | ঢাকা পোস্ট

চট্টগ্রামের ডিসির বক্তব্যে সামাজিক পরিবর্তন, নাগরিক দায়িত্ব এবং উৎপাদনশীলতার বিষয় তুলে ধরা হয়। <Cite refs={[“turn170757search9”]}/>

নাগরিকের দায়িত্ব নিয়ে আলোচনা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সরকারি প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির আওতায় রাখাও সমান জরুরি। প্রশাসনিক ব্যর্থতার দায় নাগরিকের আচরণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যাবে না; আবার প্রমাণ ছাড়া সব সমস্যার জন্য প্রশাসনকেও দায়ী করা যায় না। প্রয়োজন তথ্য ও নথিভিত্তিক মূল্যায়ন।

প্রশংসাসূচক সাংবাদিকতার সমস্যা কোথায়?

উপরের সংবাদগুলোকে একসঙ্গে রাখলে তিনটি প্রবণতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়।

প্রথমত, ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা। সরকারি সেবার সাফল্যকে অনেক সময় একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সহমর্মিতা, উপস্থিতি বা উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। এতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ভূমিকা সামনে এলেও প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত সক্ষমতা আড়ালে থেকে যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, দৃশ্যমান কর্মকাণ্ডের প্রাধান্য। গণশুনানি, পরিদর্শন, সহায়তা বিতরণ, বক্তব্য এবং প্রতীকী উদ্যোগ সহজে ছবি ও শিরোনামে রূপ নেয়। বিপরীতে অনিষ্পন্ন আবেদন, বকেয়া রাজস্ব, প্রকল্পের ব্যর্থতা, সরকারি জমি উদ্ধার এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির হিসাব সংগ্রহে বেশি পরিশ্রম লাগে। সংবাদমাধ্যম সেই কঠিন অনুসন্ধান এড়িয়ে গেলে জনস্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ অংশ অনালোচিত থেকে যায়।

তৃতীয়ত, ফলাফলের বদলে উদ্যোগের প্রচার। কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে— এটি একটি তথ্য। উদ্যোগে কী পরিবর্তন এসেছে— এটি আরেকটি তথ্য, যার জন্য প্রমাণ প্রয়োজন। প্রথমটিকে দ্বিতীয়টির সমতুল্য ধরে নিলে সংবাদ অজান্তেই প্রশাসনের আত্মপ্রচারের ভাষ্য হয়ে উঠতে পারে।

গণশুনানির ভিড় কি ভালো প্রশাসনের প্রমাণ, নাকি ব্যর্থতার সংকেতও হতে পারে?

একটি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে শত শত মানুষ অভিযোগ নিয়ে উপস্থিত হচ্ছেন— এ দৃশ্যকে একভাবে দেখা যায় প্রশাসনের সঙ্গে নাগরিকের সরাসরি যোগাযোগ হিসেবে। অন্যভাবে দেখলে এটি সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরে নিয়মিত সেবা পেতে নাগরিকের বাধা, বিলম্ব কিংবা অকার্যকারিতার সম্ভাব্য সংকেতও হতে পারে।

শুধু ভিড় দেখে কোনো সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত করা যায় না। জানতে হবে, মানুষ কী কারণে এসেছেন, কতজনের সমস্যা আগে থেকেই সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আটকে ছিল, কতটি অভিযোগ একই ধরনের, কতটি তাৎক্ষণিকভাবে সমাধানযোগ্য এবং কতটি দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন ছাড়া সমাধান করা সম্ভব নয়।

একজন ডিসি যদি প্রতিদিন ব্যক্তিগতভাবে কিছু অসহায় মানুষের সমস্যা সমাধান করেন, তা প্রশংসনীয় হতে পারে। কিন্তু হাজার হাজার নাগরিকের সেবার দায়িত্ব একটি ব্যক্তিগত গণশুনানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়লে সেটি টেকসই প্রশাসনিক সমাধান নয়।

মানবিক প্রশাসনের প্রকৃত পরীক্ষা হলো, নাগরিককে প্রতিকার পেতে কতবার ব্যক্তিগতভাবে ক্ষমতাবান কর্মকর্তার দরজায় যেতে হয়।

মূল কাজের হিসাব কোথায়?

জেলা প্রশাসনের কার্যক্রম মূল্যায়নে সংবাদমাধ্যমের নিয়মিতভাবে অন্তত ছয়টি ক্ষেত্র অনুসরণ করা প্রয়োজন।

ভূমিসেবা: নামজারি, ভূমি উন্নয়ন কর, খাসজমি ও জলমহাল ব্যবস্থাপনায় আবেদন, নিষ্পত্তি, অপেক্ষার সময় এবং অভিযোগের হিসাব।

রাজস্ব ও সরকারি সম্পত্তি: নির্ধারিত রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা, প্রকৃত আদায়, বকেয়া, সরকারি জমি উদ্ধারের পরিমাণ এবং পুনর্দখলের তথ্য।

প্রকল্প ও সরকারি ব্যয়: বরাদ্দ, ব্যয়, দরপত্র, বাস্তব অগ্রগতি, নিরীক্ষার পর্যবেক্ষণ এবং অসমাপ্ত প্রকল্পের কারণ।

অভিযোগ ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা: মোট অভিযোগ, তদন্ত, প্রমাণিত অনিয়ম, বিভাগীয় ব্যবস্থা এবং অভিযোগকারীর প্রতিকার পাওয়ার তথ্য।

নাগরিক সেবা: নির্ধারিত সময়ে সেবা প্রদানের হার, অনিষ্পন্ন আবেদন, সেবাগ্রহীতার অভিজ্ঞতা এবং একই অভিযোগ পুনরাবৃত্তির হার।

দুর্যোগ ও সামাজিক সুরক্ষা: ত্রাণ বিতরণের স্বচ্ছতা, উপকারভোগী নির্বাচন, পুনর্বাসনের অগ্রগতি এবং ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের জন্য স্থায়ী ব্যবস্থা।

এসব তথ্য প্রকাশিত হলে সাংবাদিকতা একজন কর্মকর্তার দৃশ্যমান কর্মকাণ্ডের বাইরে গিয়ে প্রশাসনিক ব্যবস্থার বাস্তব কার্যকারিতা যাচাই করতে পারবে।

সংবাদমাধ্যম কি সরকারি জনসংযোগের সম্প্রসারণ হয়ে উঠছে?

এ প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ, তবে এর উত্তর অনুমান দিয়ে দেওয়া যাবে না। কোনো সংবাদ সরকারি বিজ্ঞপ্তি থেকে তৈরি হয়েছে কিনা, প্রতিবেদক স্বাধীনভাবে তথ্য যাচাই করেছেন কিনা, নাগরিকের বক্তব্য রয়েছে কি না এবং দাবির পক্ষে নথি দেওয়া হয়েছে কিনা— এসব পরীক্ষা করতে হবে।

যে প্রতিবেদনে শুধু কর্মকর্তার বক্তব্য, তার উদ্যোগের বর্ণনা এবং প্রশংসাসূচক বিশেষণ রয়েছে, কিন্তু ফলাফল যাচাইয়ের তথ্য নেই, সেটিকে প্রশ্ন করা যায়: এটি কি পূর্ণাঙ্গ জনস্বার্থমূলক প্রতিবেদন, নাকি মূলত একটি উদ্যোগের প্রচার?

সাংবাদিকতার দায়িত্ব কর্মকর্তার প্রশংসা বন্ধ করা নয়। দায়িত্ব হলো প্রশংসার দাবিকেও যাচাইয়ের আওতায় আনা।

ফলোআপ নিউজের অবস্থান

ফলোআপ নিউজ মনে করে, জেলা প্রশাসকদের নিয়ে সংবাদে মানবিকতা, উদ্যোগ ও ইতিবাচক পরিবর্তনের খবর থাকবে। কিন্তু একই সঙ্গে থাকবে প্রশাসনিক ব্যর্থতা, নাগরিক হয়রানি, সরকারি অর্থের ব্যবহার, ভূমিসেবার সমস্যা, অনিষ্পন্ন অভিযোগ এবং আইন প্রয়োগের বাস্তব হিসাব।

কোনো ডিসি একজন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ালে সেই সংবাদ প্রকাশিত হোক। পাশাপাশি অনুসন্ধান করা হোক, সেই মানুষটির যে সহায়তা প্রয়োজন ছিল, তা পাওয়ার জন্য নিয়মিত সরকারি ব্যবস্থা কেন যথেষ্ট ছিল বা ছিল না। কোনো কর্মকর্তা গণশুনানি করলে সেটি সংবাদ হোক। পাশাপাশি প্রকাশিত হোক অভিযোগ নিষ্পত্তির হার। কোনো প্রকল্প উদ্বোধন হলে তার সংবাদ হোক। পাশাপাশি প্রকাশিত হোক ব্যয়, বাস্তব অগ্রগতি ও ফলাফলের হিসাব।

ডিসির মানবিকতা ব্যক্তিগত গুণ হতে পারে; কিন্তু নাগরিকের অধিকার ব্যক্তিগত অনুগ্রহ নয়।

সরকারি সেবা কোনো কর্মকর্তার দয়া নয়— এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তাই জেলা প্রশাসকের কাজের মূল্যায়ন হওয়া উচিত তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, বক্তব্য কিংবা ছবি দিয়ে নয়; বরং আইনসম্মত সিদ্ধান্ত, কার্যকর সেবা, স্বচ্ছ ব্যয়, অভিযোগের প্রতিকার এবং নাগরিক অধিকারের বাস্তব রেকর্ড দিয়ে।

প্রশ্নটি তাই শুধু এই নয়, কোন ডিসি কত ভালো উদ্যোগ নিয়েছেন। প্রশ্ন হলো, জেলা প্রশাসনের প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ কতটা ভালো হচ্ছে, তার প্রমাণ কোথায়?

প্রশংসার সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। এবার জবাবদিহির সংবাদ কোথায়?