দিনে গড়ে ৮ লিটার মদ খাওয়ার হিসাব দাঁড়ায় দেড় হাজার কূটনৈতিক পাসপোর্টধারীর বিপরীতে! সম্মিলিত হিসাবেও এই বিপুল আমদানির প্রকৃত ব্যবহার কোথায়— প্রশ্ন উঠছে কূটনৈতিক বন্ডের স্বচ্ছতা নিয়ে।
পাঁচ বছরে ছয় কূটনৈতিক বন্ডে ২ কোটি ৭ লাখ লিটার; বিপরীতে বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের আমদানি মাত্র ১১ লাখ লিটার— বিপুল পরিমাণ মদের ব্যবহার ও বিক্রির হিসাব কোথায়?
ফলোআপ নিউজ অনুসন্ধান
বাংলাদেশে বিদেশি মদ আমদানির ক্ষেত্রে কূটনীতিক ও বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জন্য রয়েছে শুল্কমুক্ত আমদানির বিশেষ ব্যবস্থা। এই সুবিধার আওতায় পরিচালিত কূটনৈতিক বন্ডেড ওয়্যারহাউসগুলোর মাধ্যমে দেশে বিপুল পরিমাণ বিদেশি মদ আমদানি হচ্ছে। অন্যদিকে, সাধারণ বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের মাধ্যমে মদ আমদানির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে অনেক কম। সীমিতসংখ্যক কূটনৈতিক পাসপোর্টধারী ও বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যক্তির বিপরীতে বিপুল পরিমাণ মদ আমদানির এই চিত্র এখন নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করছে।
২০২২ সালের ১৮ জানুয়ারি প্রকাশিত দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের এক প্রতিবেদনে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্যের বরাত দিয়ে বলা হয়, ২০১৬–১৭ থেকে ২০২০–২১ অর্থবছর পর্যন্ত পাঁচ বছরে বাংলাদেশে মোট ২ কোটি ১৮ লাখ লিটার বিদেশি মদ আমদানি করা হয়। এর মধ্যে বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের মাধ্যমে আমদানি হয় মাত্র ১১ লাখ লিটার। বাকি ২ কোটি ৭ লাখ লিটার আমদানি করা হয় ছয়টি কূটনৈতিক বন্ডেড ওয়্যারহাউসের মাধ্যমে।

এই হিসাবে পাঁচ বছরে দেশে আমদানি হওয়া মোট বিদেশি মদের প্রায় ৯৫ শতাংশই এসেছে কূটনৈতিক বন্ডের মাধ্যমে। অর্থাৎ বছরে গড়ে প্রায় ৪১ লাখ ৪০ হাজার লিটার মদ আমদানি হয়েছে এসব বন্ডেড ওয়্যারহাউসে। অথচ সাধারণ বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের মাধ্যমে পাঁচ বছরে আমদানির পরিমাণ ছিল মাত্র ১১ লাখ লিটার। এটা শুধু বৈধ আমদানির হিসাব। এর বাইরে বিপুল পরিমাণ অবৈধ আমদানি রয়েছে।
সীমিতসংখ্যক সুবিধাভোগীর বিপরীতে বিপুল আমদানি
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় দেড় হাজার কূটনৈতিক পাসপোর্টধারী ও সংশ্লিষ্ট বিশেষ সুবিধাভোগীর জন্য মদ আমদানির বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এই সংখ্যার বিপরীতে বছরে প্রায় অর্ধকোটি লিটার মদ আমদানির বিষয়টি বিশেষভাবে পর্যালোচনার দাবি রাখে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কূটনৈতিক বন্ডে আমদানি হওয়া সব মদ কূটনৈতিক পাসপোর্টধারীদের ব্যক্তিগত ব্যবহারে যায়— এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী অন্যান্য বিশেষ সুবিধাভোগী ও অনুমোদিত ব্যবহারের বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হবে। ফলে প্রকৃত সুবিধাভোগীর সংখ্যা, তাদের ক্রয়ের পরিমাণ এবং আমদানি করা মদের চূড়ান্ত ব্যবহার সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রয়োজন।
কূটনৈতিক বন্ডে কারা আমদানি করছে?
ঢাকা উত্তর কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের প্রকাশিত তালিকায় কূটনৈতিক ও বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জন্য পরিচালিত একাধিক বন্ডেড ওয়্যারহাউসের নাম রয়েছে। এর মধ্যে National Warehouse, Sabir Traders, Dhaka Warehouse, Toss Bond, H Kabir & Co., Eastern Diplomatic Services, বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের নাম উল্লেখযোগ্য।
এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কী পরিমাণ মদ আমদানি হয়, কোন দেশ থেকে আমদানি করা হয়, কী ধরনের মদ আমদানি করা হয় এবং বছর শেষে কতটুকু বিক্রি বা মজুত থাকে— এসব তথ্য একত্রে প্রকাশিত না হওয়ায় পুরো ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।
বিশেষ করে ২০১৬–১৭ থেকে ২০২০–২১ অর্থবছর পর্যন্ত ছয়টি কূটনৈতিক বন্ডের মাধ্যমে ২ কোটি ৭ লাখ লিটার মদ আমদানির যে তথ্য প্রকাশিত হয়েছে, তার প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ হিসাব জনসমক্ষে থাকা প্রয়োজন।
আমদানি হচ্ছে, কিন্তু বিক্রির হিসাব কতটা স্বচ্ছ?
কূটনৈতিক বন্ডে বিপুল পরিমাণ মদ আমদানির বিপরীতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, এসব মদের কতটুকু প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে বিক্রি হয়?
একটি বন্ডেড ওয়্যারহাউসে আমদানি করা পণ্যের হিসাব, গুদাম থেকে পণ্য ছাড়, বিক্রির পরিমাণ, অবশিষ্ট মজুত এবং পণ্য স্থানান্তরের তথ্য সংরক্ষিত থাকার কথা। ফলে আমদানি ও বিক্রির তথ্য পাশাপাশি বিশ্লেষণ করলে প্রকৃত চিত্র পাওয়া সম্ভব।
এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। কোন বন্ডেড ওয়্যারহাউস বছরে কত লিটার মদ আমদানি করেছে? কত লিটার বিক্রি করেছে? কত লিটার অবিক্রীত রয়েছে? আমদানি ও বিক্রির পরিমাণের মধ্যে কোনো অসংগতি রয়েছে কিনা? একইভাবে পণ্য ছাড়ের ক্ষেত্রে অনুমোদিত সুবিধাভোগীদের পরিচয় ও ক্রয়ের সীমা যথাযথভাবে যাচাই করা হয় কিনা?
এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে কূটনৈতিক বন্ডের মাধ্যমে পরিচালিত মদ আমদানি ব্যবস্থার প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে।
বিশেষ সুবিধার ক্ষেত্রে কী বলছে বিধিমালা?
বাংলাদেশ কাস্টমসের National Enquiry Point-এ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জন্য মদ ও তামাকজাত পণ্য আমদানি অথবা কূটনৈতিক বন্ড থেকে ক্রয়ের ক্ষেত্রে মাসিক ১০০ মার্কিন ডলার CIF মূল্যের সীমার বিধান রয়েছে। ১৮ বছরের কম বয়সীদের জন্য এ সুবিধা প্রযোজ্য নয়।
এখানে আমদানি করা পণ্যের পরিমাণ এবং ব্যক্তিপ্রতি নির্ধারিত ক্রয়সীমার মধ্যে সম্পর্ক যাচাই করা জরুরি। বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের প্রকৃত সংখ্যা, তাদের ক্রয়ক্ষমতার সীমা এবং বন্ড থেকে পণ্য ছাড়ের তথ্য একত্রে বিশ্লেষণ না করলে আমদানির বিপুল পরিমাণের ব্যাখ্যা পাওয়া কঠিন।
আন্তর্জাতিক ডেটাবেজেও যাচাই করা সম্ভব আমদানির তথ্য
বাংলাদেশে মদ আমদানির সামগ্রিক চিত্র যাচাইয়ের জন্য জাতিসংঘের UN Comtrade, বিশ্বব্যাংকের World Integrated Trade Solution (WITS) এবং UNdata গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক তথ্যভান্ডার।
এসব ডেটাবেজে HS Code অনুযায়ী বাংলাদেশে মদ আমদানির পরিমাণ, আমদানির আর্থিক মূল্য এবং উৎসদেশভিত্তিক তথ্য অনুসন্ধান করা যায়। বিশেষ করে HS Code 2203, 2204, 2205, 2206 ও 2208 ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের মদ আমদানির তথ্য বিশ্লেষণ করা সম্ভব।
তবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ডেটাবেজে সাধারণত বন্ডেড ওয়্যারহাউসভিত্তিক আমদানির পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায় না। ফলে ছয় বা আটটি কূটনৈতিক বন্ডের প্রকৃত আমদানি, বিক্রি ও মজুতের হিসাব জানতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং সংশ্লিষ্ট কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের তথ্য প্রয়োজন।
এনবিআরের কাছে যেসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন
কূটনৈতিক বন্ডের মাধ্যমে মদ আমদানি ও বিক্রির প্রকৃত চিত্র জানতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছে কয়েকটি তথ্য চাওয়া প্রয়োজন।
১. ২০১৬–১৭ থেকে ২০২৫–২৬ অর্থবছর পর্যন্ত কূটনৈতিক বন্ডের মাধ্যমে প্রতিবছর কত লিটার মদ আমদানি হয়েছে?
২. সংশ্লিষ্ট সময়ে প্রতিটি বন্ডেড ওয়্যারহাউস কত লিটার মদ আমদানি করেছে?
৩. আমদানিকৃত মদের কতটুকু অনুমোদিত সুবিধাভোগীদের কাছে বিক্রি হয়েছে?
৪. প্রতিবছর বন্ডেড ওয়্যারহাউসগুলোতে কত লিটার মদ অবিক্রীত অবস্থায় মজুত ছিল?
৫. কতজন কূটনৈতিক পাসপোর্টধারী ও অন্যান্য বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যক্তি মদ ক্রয়ের সুবিধা পেয়েছেন?
৬. তাদের জন্য ইস্যু করা Passbook এবং ব্যবহৃত কোটার হিসাব কী?
৭. বন্ডেড ওয়্যারহাউসগুলোতে নিয়মিত অডিট ও মজুত যাচাই করা হয় কিনা?
৮. গত দশ বছরে এসব বন্ডের বিরুদ্ধে কোনো অনিয়ম, শুল্ক ফাঁকি বা বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কিনা?
হিসাব প্রকাশের দাবি
কূটনৈতিক সুবিধা রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক বিধিব্যবস্থার অংশ। কিন্তু কোনো বিশেষ সুবিধার আওতায় বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানি হলে তার যথাযথ হিসাব ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
পাঁচ বছরে ছয়টি কূটনৈতিক বন্ডের মাধ্যমে ২ কোটি ৭ লাখ লিটার মদ আমদানির তথ্য সামনে আসার পর এখন প্রয়োজন প্রতিষ্ঠানভিত্তিক আমদানি, বিক্রি ও মজুতের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ করা।
প্রশ্ন হচ্ছে, সীমিতসংখ্যক বিশেষ সুবিধাভোগীর জন্য আমদানি করা বিপুল পরিমাণ মদের প্রকৃত ব্যবহার কোথায় হচ্ছে? আমদানি করা প্রতিটি লিটারের হিসাব কি যথাযথভাবে সংরক্ষিত হচ্ছে? নাকি এই বিশেষ সুবিধার আওতায় পরিচালিত বিশাল আমদানি ব্যবস্থার প্রকৃত চিত্র সাধারণ মানুষের অগোচরেই থেকে যাচ্ছে?
এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে কেবল এনবিআর ও সংশ্লিষ্ট কাস্টমস কর্তৃপক্ষের পূর্ণাঙ্গ তথ্য।
FollowUpNews-এর অনুসন্ধান অব্যাহত থাকবে।
