Headlines

এক তরুণের হাতে বদলে গেল দূষিত আজনার নদী

বিট্টু

তিন মাসের একার লড়াই, নিজের টাকায় পরিষ্কার করলেন নদী; প্রশ্ন উঠছে এতদিন নদীটি নোংরা হলো কীভাবে

মধ্যপ্রদেশ: একসময় যে নদীর পানি স্থানীয় মানুষ ব্যবহার করতো, যে নদীতে ছিল জলজ প্রাণের বিচরণ— সময় গড়ানোর সঙ্গে সেই নদীই পরিণত হয়েছিল অনেকটা নর্দমায়। নদীর পানিতে ভাসত প্লাস্টিক, বোতল, নানা ধরনের আবর্জনা। কোথাও জমেছিল শ্যাওলা, কোথাও আবর্জনার স্তূপ। দূষণের কারণে কমে গিয়েছিল জলজ প্রাণীর অস্তিত্বও।

মধ্যপ্রদেশের রাজগড় জেলার বিয়াওরা এলাকার আজনার নদীর এমন দুরবস্থাই চোখে পড়ে ২০ বছর বয়সী এক তরুণের। অন্যদের মতো শুধু অভিযোগ না করে তিনি নিজেই নদী পরিষ্কারের কাজে নেমে পড়েন। তরুণটির নাম সুরেন্দ্র সিং চৌধুরী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি পরিচিত ‘বিট্টু তবাহী’ নামে।

বিট্টু

কোথায় এই আজনার নদী?

আজনার নদী মধ্যপ্রদেশের রাজগড় জেলার বিয়াওরা এলাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ জলধারা। রাজগড় জেলা প্রশাসনের সরকারি ওয়েবসাইটেও বিয়াওরাকে আজনার নদীর তীরে অবস্থিত এলাকা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। জেলার নদ-নদীর তালিকাতেও ‘আজনাার’কে বিয়াওরার নদী হিসেবে দেখানো হয়েছে।

স্থানীয় প্রতিবেদন অনুযায়ী, নদীটির প্রবাহ আন্দালহেড়া গ্রামের দিক থেকে শুরু হয়ে বিয়াওরা শহরের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। শহরের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে নদীটি ক্রমেই মানুষের বর্জ্য ও আবর্জনা ফেলার জায়গায় পরিণত হতে থাকে। একসময় যে নদীকে স্থানীয়রা জীবনের অংশ হিসেবে দেখতেন, সেটিই ধীরে ধীরে হারাতে থাকে তার স্বাভাবিক রূপ।

স্থানীয় বাসিন্দাদের স্মৃতিচারণেও উঠে এসেছে নদীটির পুরোনো চেহারা। প্রবীণদের ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় আজনার নদীতে পর্যাপ্ত পানি থাকতো এবং মানুষ নদীর পানি ব্যবহার করতো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে নদীর পানির মান এতটাই খারাপ হয় যে নদীটির অনেক অংশকে নালার সঙ্গে তুলনা করা শুরু হয়।

আজনার নদীকীভাবে নদীটি এতটা দূষিত হলো?

আজনার নদীর দূষণের পেছনে একটি নয়, একাধিক কারণের কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

সবচেয়ে দৃশ্যমান সমস্যা প্লাস্টিক ও কঠিন বর্জ্য। নদীতে ফেলা হয়েছে প্লাস্টিকের প্যাকেট, বোতল ও অন্যান্য আবর্জনা। শহুরে এলাকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার কারণে নদীর বিভিন্ন অংশে আবর্জনা জমে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

এ ছাড়া নদীর শহরসংলগ্ন অংশে নোংরা পানি ও অপরিশোধিত বর্জ্য প্রবাহের অভিযোগও রয়েছে। ২০২৫ সালের একটি স্থানীয় প্রতিবেদনে আজনারকে একসময়কার জীবনদায়ী নদী থেকে ধীরে ধীরে ‘খোলা নর্দমার’ মতো হয়ে ওঠার বর্ণনা দেওয়া হয় এবং পরিবেশগত অব্যবস্থাপনার বিষয়টি তুলে ধরা হয়।

আরেকটি প্রতিবেদনে নদীতে শিল্পকারখানার রাসায়নিক বর্জ্য ফেলার অভিযোগের কথাও বলা হয়েছে।

দূষণের ফলে শুধু নদীর পানি নষ্ট হয়নি; স্থানীয় প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নদীর জলজ প্রাণীর অস্তিত্বও প্রায় বিলীন হয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ সমস্যাটি শুধু নোংরা পানি বা দুর্গন্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না— নদীর স্বাভাবিক প্রতিবেশব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

২৬ জানুয়ারি শুরু হয় বিট্টুর লড়াই

এই পরিস্থিতির মধ্যেই ২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি আজনার নদী পরিষ্কারের উদ্যোগ নেন বিট্টু। শুরুতে কয়েকজন বন্ধু তার সঙ্গে ছিলেন। কিন্তু কিছুদিন পর তারা আর নিয়মিতভাবে কাজ চালিয়ে যেতে পারেননি। তখন বিট্টু কার্যত একাই দায়িত্বটি কাঁধে তুলে নেন।

তার হাতে ছিল না কোনো ভারী যন্ত্রপাতি। ছিল বাঁশের লাঠি, জাল, গ্লাভসসহ সাধারণ কিছু সরঞ্জাম। নদীর পানিতে নেমে তিনি একে একে প্লাস্টিক, বোতল, শ্যাওলা ও অন্যান্য বর্জ্য তুলে আনতে থাকেন। কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাদামাটি ও নোংরা পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে কাজ করতে হয়েছে তাকে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— এই কাজের জন্য তিনি নিজের অর্থ ব্যয় করেছেন। কোনো সরকারি প্রকল্প, বড় এনজিও বা প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অপেক্ষা করেননি তিনি।

‘পাগল’ বলেও থামানো যায়নি

শুরুতে তার এই উদ্যোগকে সবাই ইতিবাচকভাবে নেয়নি। স্থানীয় কিছু মানুষ তাকে ‘পাগল’ বলেও কটূক্তি করেছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন— বিট্টু কি আসলেই নদী পরিষ্কার করছেন, নাকি শুধু ভিডিও বানিয়ে জনপ্রিয় হতে চাইছেন?

এর জবাবও দিয়েছেন বিট্টু। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি তার কাজের আগে ও পরের দৃশ্য দেখিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেন, এটি শুধু ক্যামেরার সামনে করা কোনো প্রতীকী কাজ নয়। একটি ঘাট পরিষ্কার করতেই তার কয়েক মাস সময় লেগেছে বলে তিনি জানান।

নিজের শরীরের ঝুঁকি নিয়েই কাজ

দূষিত পানিতে দিনের পর দিন কাজ করাও তার জন্য ঝুঁকিমুক্ত ছিল না। দীর্ঘ সময় নদীর নোংরা পানি ও আবর্জনার সংস্পর্শে থাকার কারণে তার ত্বকে সংক্রমণ ও অন্যান্য শারীরিক সমস্যা দেখা দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবুও তিনি কাজ বন্ধ করেননি।

অর্থাৎ নদী পরিষ্কারের এই উদ্যোগে শুধু সময় বা অর্থই নয়, নিজের স্বাস্থ্যের ঝুঁকিও নিয়েছেন এই তরুণ।

তিন মাসে বদলাতে শুরু করে নদীর চেহারা

প্রায় তিন মাসের ধারাবাহিক পরিশ্রমের পর আজনার নদীর একটি অংশের চেহারায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আসে। আগে যেখানে আবর্জনা ও প্লাস্টিকে নদীর পানি প্রায় ঢেকে থাকত, সেখানে পরিষ্কারের পর পানির প্রবাহ ও নদীর স্বাভাবিক চেহারা অনেকটাই ফিরে আসে। বিট্টুর প্রকাশ করা ‘আগে ও পরে’র ছবি এবং ভিডিওই মূলত বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেয়।

আনন্দ মাহিন্দ্রার নজরে পড়েন বিট্টু

বিট্টুর উদ্যোগ ভারতের শিল্পপতি আনন্দ মাহিন্দ্রার নজরেও আসে। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তরুণটির কাজের প্রশংসা করেন। এরপর আজনার নদী পরিষ্কারের ঘটনাটি আরও ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে।

আর এখন তার গল্প পৌঁছে গেছে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও। ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডাচ পরিবেশকর্মী ও The Ocean Cleanup-এর প্রতিষ্ঠাতা বয়ান স্লাট বিট্টুর কাজ দেখে তাকে দলে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন এবং নেদারল্যান্ডসে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

একজন তরুণের কাজ, কিন্তু প্রশ্নটা সবার জন্য

বিট্টুর গল্পের সবচেয়ে বড় দিক সম্ভবত নদী পরিষ্কার করার ঘটনা নয়; বরং তিনি যে প্রশ্নটি সামনে এনেছেন সেটি আরও গুরুত্বপূর্ণ— একটি নদী এতটা নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর সেটি পরিষ্কার করতে কেন একজন ২০ বছর বয়সী তরুণকে একা নদীতে নামতে হলো?

একটি নদী যখন শহরের মানুষের বর্জ্য বহন করতে করতে নালায় পরিণত হয়, তখন শুধু একজন তরুণের হাতে আবর্জনা তুলে নেওয়া দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন নিয়মিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নদীতে বর্জ্য ফেলা বন্ধ করা, দূষণের উৎস শনাক্ত করা, শিল্পবর্জ্য থাকলে তা নিয়ন্ত্রণ করা এবং স্থানীয় প্রশাসনের দীর্ঘমেয়াদি নজরদারি।

তবু বিট্টুর উদ্যোগের গুরুত্ব এখানেই— তিনি অপেক্ষা করেননি। অন্য কেউ এসে নদীটি পরিষ্কার করবে, সেই আশায় বসে থাকেননি। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী নদীতে নেমেছেন এবং দেখিয়েছেন, পরিবর্তনের প্রথম পদক্ষেপ কখনো কখনো একজন মানুষই নিতে পারেন।

আজনার নদীর গল্প তাই একই সঙ্গে আশার এবং সতর্কবার্তার। একজন তরুণ কয়েক মাসের শ্রমে নদীর একটি অংশের চেহারা বদলে দিতে পারেন; কিন্তু একটি নদীকে আবার দূষিত হয়ে যাওয়া থেকে বাঁচাতে প্রয়োজন পুরো সমাজের দায়িত্ববোধ।