এদের মদের বোতল একই, চোরাচালানের মাল একই, অপহৃত নারী একই, দখলকৃত জমি একই, ধর্মের নামে কাঠামোবদ্ধ শোষণ একই, শুধু ধর্মের নাম ভিন্ন। আর এই মাফিয়া অর্থনীতির নিরাপদ ও নীরব সুবিধাভোগী হয়ে থাকে নিজেদের মেধাবী দাবি করা একদল শিক্ষিত মানুষ। তারা রাষ্ট্রের চেয়ার দখল করে, ক্ষমতা ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে, তারপর সরে যায়। চেয়ার বদলায়, মুখ বদলায়, ধর্মীয় পরিচয় বদলায়; কিন্তু শোষণের কাঠামো টিকে থাকে।
ফলোআপ নিউজ ডেস্ক
বাংলাদেশ ও ভারতের দিকে তাকালে ধর্মীয় পরিচয়ের সংঘাত, উগ্রবাদ, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা এবং রাজনৈতিক আধিপত্যের ভিন্ন ভিন্ন দৃশ্য চোখে পড়ে। দুই দেশের ইতিহাস, রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সামাজিক বাস্তবতা এক নয়। কিন্তু একটি প্রশ্ন দুই দেশেই প্রাসঙ্গিক: ধর্ম, নৈতিকতা, জাতীয়তাবাদ ও জনসেবার কথা যারা সবচেয়ে জোর দিয়ে বলেন, তাদের মধ্যকার বড় একটি অংশের ব্যক্তিগত স্বার্থ, ক্ষমতার ব্যবহার এবং রাষ্ট্রীয় সুবিধা ভোগের হিসাব কতটা স্বচ্ছ?
সমস্যাটি কেবল ধর্মান্ধ মানুষের নয়। সমস্যা সেই শিক্ষিত, ডিগ্রিধারী, উচ্চপদস্থ ও তথাকথিত মেধাবী শ্রেণিরও, যারা ব্যবস্থার ভেতরে থেকে সুবিধা গ্রহণ করেন, কিন্তু ব্যবস্থার অনিয়ম ও শোষণ দূর করার দায় নেয় না। কেউ সরাসরি সুবিধা নেয়, কেউ নীরব থেকে সুবিধা ভোগ করে, কেউ নিয়মের ফাঁককে কাজে লাগান, আবার কেউ দায়িত্ব কোনোমতে শেষ করে এমনভাবে সরে যান, যেন তার কর্মজীবনে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক দায়ই ছিল না।
মদের বোতল একই, চোরাচালানের মালও একই
ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে মানুষকে বিভক্ত করা সহজ। কিন্তু অর্থের লেনদেন, অপরাধের বাজার, অবৈধ সম্পদের প্রবাহ এবং ক্ষমতাবানদের পারস্পরিক স্বার্থের হিসাব অনেক সময় ধর্মীয় বিভাজন মানে না।
একজন অপরাধীর ধর্মীয় পরিচয় যা-ই হোক, তার অপরাধের প্রকৃতি বদলে যায় না। মাদক ও চোরাচালানের ব্যবসা, জমি দখল, নারী অপহরণ, দুর্নীতি কিংবা প্রভাব খাটিয়ে অবৈধ সুবিধা আদায়ের ক্ষেত্রে এরা সবাই আসলে একই রক্তের মানুষ।
যে ব্যক্তি জনসমক্ষে ধর্মীয় নৈতিকতার কথা বলেন, তার ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকাণ্ডের স্বচ্ছতা নিয়ে এ দুই দেশে প্রশ্ন তোলা কঠিন। এ গোষ্ঠী অন্যের চরিত্র নিয়ে উচ্চকণ্ঠ, কিন্তু তাদের নিজেদের আর্থিক লেনদেন, সম্পদের উৎস, হিংস্রতা ও ক্ষমতার ব্যবহার জবাবদিহির আওতায় আনা কঠিন।
এখানেই ধর্মীয় পরিচয়ের রাজনীতি ও মাফিয়া অর্থনীতির সম্ভাব্য সংযোগটি গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ মানুষকে ধর্মীয় পরিচয়ে বিভক্ত রাখা হলে ক্ষমতা ও অর্থের প্রকৃত সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন অনেক সময় পেছনে পড়ে যায়। মানুষ তখন প্রতিবেশীর ধর্ম নিয়ে ব্যস্ত থাকে, অথচ তার সম্পদ, শ্রম, জমি ও অধিকার কেড়ে নেওয়ার কাঠামোটি অক্ষত থেকে যায়। “ধর্ম গেলো” তাকে একটি বায়বীয় বিষয়ে ব্যস্ত রাখা হয়।
মাফিয়া অর্থনীতির সবচেয়ে নিরাপদ সহযোগী কি শিক্ষিত সুবিধাভোগী শ্রেণি?
মাফিয়াতন্ত্র বলতে শুধু অস্ত্রধারী অপরাধী, চাঁদাবাজ কিংবা গোপন অপরাধচক্রকে বোঝালে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। কোনো সমাজে অবৈধ অর্থনৈতিক স্বার্থ তখনই দীর্ঘস্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি অর্জন করতে পারে, যখন তার চারপাশে এমন একটি পরিবেশ তৈরি হয়, যেখানে প্রভাবশালীরা সুবিধা পান, নিয়ম প্রয়োগে বৈষম্য থাকে এবং জবাবদিহি দুর্বল হয়ে পড়ে।
এই পরিবেশে শিক্ষিত মানুষের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একজন অপরাধী সরাসরি ভয় দেখিয়ে জমি দখল করতে পারে। কিন্তু সেই দখলকে দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন হয় নথিপত্রের কারসাজি, প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা, আইনি প্রক্রিয়ার অপব্যবহার কিংবা প্রভাবশালী মহলের নীরবতা। এই নীরব সুবিধাভোগী শ্রেণি হচ্ছে এ দুই দেশের আমলাতন্ত্র।
এখানে প্রশ্ন শিক্ষিত হওয়া নিয়ে নয়; প্রশ্নটি শিক্ষাকে কী কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে, তা নিয়ে।
যে মেধা মানুষের অধিকার রক্ষা করতে পারত, তা যদি কেবল ব্যক্তিগত পদোন্নতি, সম্পদ বৃদ্ধি ও নিরাপদ অবসরের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তাহলে সেই মেধার সামাজিক মূল্য কী? যে যোগ্যতা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনের সুযোগ এনে দেয়, সেই যোগ্যতা যদি দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে শুধু সুবিধা নিশ্চিত করে, তাহলে রাষ্ট্রের লাভ কোথায়?
মেধা ব্যক্তিগত সাফল্যের প্রমাণ হতে পারে; কিন্তু তা নিজে থেকেই নৈতিকতা, সততা কিংবা জনস্বার্থে কাজ করার প্রমাণ নয়। এই মেধা পাস করা মেধা, সকলের ভালোর জন্য কোনো সৃজনশীল মেধা-যোগ্যতা এগুলো নয়।
সরকারি চেয়ার: দায়িত্বের আসন, নাকি ব্যক্তিগত সুবিধার সিঁড়ি?
সরকারি চেয়ার কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এটি জনগণের অর্থে পরিচালিত রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের আসন। একজন কর্মকর্তা, নীতিনির্ধারক কিংবা প্রভাবশালী সরকারি কর্মচারী যে ক্ষমতা ব্যবহার করেন, তার উৎস জনগণের অর্থ ও রাষ্ট্রের আইন।
কিন্তু যখন কোনো ব্যক্তি সরকারি পদকে কেবল নিজের ক্যারিয়ার, সুযোগ-সুবিধা, সামাজিক মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার মাধ্যম হিসেবে দেখেন, তখন জনসেবার ধারণাটি সংকুচিত হয়ে ব্যক্তিগত লাভের হিসাবে পরিণত হয়।
এই সুবিধা সব সময় সরাসরি ঘুষের আকারে আসে না। কখনো আসে ক্ষমতার কারণে পাওয়া বিশেষ প্রবেশাধিকার, কখনো আসে অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার বিনিময়ে তৈরি হওয়া পারস্পরিক সুবিধা, কখনো আসে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমে অর্জিত ভবিষ্যৎ সুযোগ।
তবে একটি কাঠামোগত প্রশ্ন থেকেই যায়: একজন কর্মকর্তা তার দায়িত্বকালে কী পরিবর্তন আনলেন, কী অনিয়ম প্রতিরোধ করলেন, কী ধরনের জবাবদিহি নিশ্চিত করলেন এবং তার বিদায়ের পর প্রতিষ্ঠানটি কতটা কার্যকর থাকল?
যদি একজনের বিদায়ের পর আরেকজন এসে একইভাবে দায়িত্ব পালন করেন, একই অনিয়মের অভিযোগ ওঠে এবং একই সুবিধাভোগী গোষ্ঠী টিকে থাকে, তাহলে সমস্যাটি শুধু ব্যক্তির নয়; সমস্যাটি প্রতিষ্ঠানেরও।
চেয়ার দখল, সুবিধা গ্রহণ, তারপর সরে যাওয়া
এই চক্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর ধারাবাহিকতা।
একজন ব্যক্তি দায়িত্বে এলেন। তিনি জানলেন প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা কোথায়, কোন নিয়ম কার্যকরভাবে প্রয়োগ হচ্ছে না, কারা প্রভাব খাটাতে পারে এবং কোন সিদ্ধান্তে কার স্বার্থ রক্ষা হয়। তার সামনে সুযোগ থাকে ব্যবস্থাটিকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার। কিন্তু তিনি যদি কেবল নিজের মেয়াদ, পদোন্নতি ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেন, তাহলে সমস্যাগুলো অমীমাংসিত থেকে যায়। অর্থাৎ, সব জেনেও তিনি একই পথে হাঁটেন।
তারপর তিনি বদলি হন, অবসরে যান কিংবা অন্য পদে যোগ দেন। নতুন ব্যক্তি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পুরোনো নথি, পুরোনো স্বার্থ, পুরোনো দুর্বলতা এবং পুরোনো সুবিধাভোগী নেটওয়ার্ক রয়ে যায়। নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিও একইভাবে ব্যক্তিগত সুবিধাকে অগ্রাধিকার দেন, পুরো প্রক্রিয়াটি আবার শুরু হয়।
এভাবে প্রতিষ্ঠান চলে, পদায়ন হয়, বদলি হয়, পদোন্নতি হয়; অথচ সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতায় পরিবর্তন আসে না।
চেয়ার বদলায়, কিন্তু চেয়ারের চারপাশে গড়ে ওঠা সুবিধাভোগী কাঠামো বদলায় না।
এ কারণেই কোনো প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন শুধু তার বর্তমান প্রধানের নাম দিয়ে করা যথেষ্ট নয়। দেখতে হবে দীর্ঘ সময় ধরে কী ঘটেছে, সিদ্ধান্তগুলো কার স্বার্থ রক্ষা করেছে, অভিযোগের নিষ্পত্তি হয়েছে কিনা, নিরীক্ষায় কী পাওয়া গেছে এবং দায়িত্ব ছেড়ে যাওয়ার পরও অনিয়মের ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে কিনা।
নীরবতা সব সময় নিরপেক্ষতা নয়
সব কর্মকর্তা দুর্নীতিগ্রস্ত নন, সব শিক্ষিত মানুষ সুবিধাভোগী নন এবং সব নীরবতার পেছনেও অসৎ উদ্দেশ্য থাকে না। কখনো ভয়, প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা, তথ্যের অভাব কিংবা প্রতিশোধের আশঙ্কাও মানুষকে নীরব করে রাখে।
কিন্তু যখন কোনো ব্যক্তি দায়িত্বশীল অবস্থানে থেকেও নিজের দায়িত্বের আওতাধীন গুরুতর অনিয়মের বিষয়ে বারবার নিষ্ক্রিয় থাকেন, তখন সেই নীরবতার প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
যে কর্মকর্তা জানেন কোনো প্রক্রিয়ায় জনস্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তার দায়িত্ব কী? যে নীতিনির্ধারক জানেন নিয়মের প্রয়োগে বৈষম্য রয়েছে, তিনি কী ব্যবস্থা নেন? যে শিক্ষিত ব্যক্তি অন্যায়কে চিহ্নিত করতে সক্ষম, তিনি কেবল নিজের নিরাপত্তার জন্য নীরব থাকলে সেই নীরবতার সামাজিক মূল্য কে বহন করে?
সুবিধাভোগী কাঠামো সব সময় সবাইকে অপরাধী বানিয়ে টিকে থাকে না। অনেক সময় কিছু মানুষ সরাসরি লাভ করেন, কিছু মানুষ লাভবানদের সুরক্ষা দেন, কিছু মানুষ প্রতিবাদ করেন না এবং কিছু মানুষ বিষয়টিকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেন। ফলে জবাবদিহির অভাব একটি নিয়মিত ব্যবস্থায় পরিণত হয়।
ধর্মীয় উগ্রবাদ ও অর্থনৈতিক স্বার্থের দ্বৈত খেলা
ধর্ম মানুষের বিশ্বাসের বিষয়। কিন্তু ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক আনুগত্য, সামাজিক আধিপত্য কিংবা অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হলে তা বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
ধর্মের নামে মানুষকে বিভক্ত করা হলে একটি সুবিধা তৈরি হয়: জনগণের মনোযোগ বাস্তব অর্থনৈতিক প্রশ্ন থেকে সরে যেতে পারে। কে সম্পদ অর্জন করছে, কারা রাষ্ট্রীয় সুবিধা পাচ্ছে, কারা শ্রমের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, কারা জমি হারাচ্ছে এবং কারা আইনের প্রয়োগে বিশেষ সুবিধা পাচ্ছে— এসব প্রশ্নের বদলে সামনে চলে আসে পরিচয় ও আনুগত্যের প্রশ্ন।
কেউ ধর্মের নামে ক্ষমতা অর্জন করতে পারে, কেউ জাতীয়তাবাদের নামে, কেউ আবার আধুনিকতা ও মেধার ভাষা ব্যবহার করে। পরিচয় ও বক্তব্য ভিন্ন হলেও যদি শেষ পর্যন্ত একই ধরনের ক্ষমতাকেন্দ্রিক সুবিধা তৈরি হয়, তাহলে সেই সম্পর্কের অনুসন্ধান জরুরি।
ধর্মীয় উগ্রবাদীকে সমালোচনা করা সহজ হতে পারে। কিন্তু তার পাশাপাশি সেই প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশকে প্রশ্ন করা প্রয়োজন, যা কোনো গোষ্ঠীকে ক্ষমতা ব্যবহার করে জবাবদিহির বাইরে থাকার সুযোগ দেয়।
এ কারণেই মাফিয়া অর্থনীতির আলোচনা শুধু অপরাধীদের নিয়ে নয়। এটি সেই প্রতিষ্ঠান, নীতি, পৃষ্ঠপোষকতা এবং সুবিধাভোগী শ্রেণির আলোচনাও, যাদের ভূমিকা ছাড়া কোনো অনিয়ম দীর্ঘদিন টিকে থাকা সম্ভব নয়।
মেধা কাকে বলে? চান্স পাওয়া, নাকি সমাজের জন্য কিছু সৃষ্টি করা?
এরা কিসের মেধাবী? পরীক্ষায় ভালো ফল করেছে, বুয়েটে কিংবা মেডিকেলে চান্স পেয়েছে, বিসিএস ক্যাডার হয়েছে, সরকারি চাকরি পেয়েছে— এগুলোই কি মেধার চূড়ান্ত প্রমাণ? একটি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া কি একজন মানুষকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সৃজনশীল, দূরদর্শী, নৈতিক কিংবা সমাজের জন্য অপরিহার্য মানুষে পরিণত করে?
আমাদের সমাজে মেধার সংজ্ঞাটি অদ্ভুতভাবে সংকুচিত। কে কত ভালো ফল করল, কে কোন প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হলো, কে কত দ্রুত সরকারি চাকরি পেল, কে কত উঁচু পদে পৌঁছাল— এসব দিয়ে মানুষের মেধার শ্রেণিবিন্যাস করা হয়। কিন্তু সেই মানুষটি নতুন কী সৃষ্টি করলেন, জ্ঞানের জগতে কী অবদান রাখলেন, সমাজের কোন সমস্যার সমাধান করলেন, মানুষের জীবনকে কতটা উন্নত করলেন কিংবা নিজের যোগ্যতাকে বৃহত্তর সামাজিক স্বার্থের সঙ্গে কতটা যুক্ত করলেন— সেই হিসাব কোথায়?
চান্স পাওয়া একটি অর্জন। চাকরি পাওয়া একটি পেশাগত সাফল্য। কিন্তু কোনোটিই নিজে থেকে সৃজনশীলতা, নৈতিকতা কিংবা সামাজিক অবদানের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়।
বুয়েট বা মেডিকেলে পড়ার পর কেউ বিসিএস কর্মকর্তা হলেই তার যোগ্যতা অস্বীকার করা যায় না। কাস্টমস, ট্যাক্স, প্রশাসন বা পুলিশও রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ পেশাগত ক্ষেত্র। একজন যোগ্য কর্মকর্তা রাজস্ব সুরক্ষা, চোরাচালান প্রতিরোধ, বাণিজ্য সহজীকরণ এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন। কিন্তু কেউ যদি কেবল অবৈধ সুবিধা, সামাজিক মর্যাদা, ক্ষমতা, নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য নিজের পেশাগত যোগ্যতা ব্যবহার করেন, আর জনস্বার্থে কোনো সৃজনশীল অবদান না রাখেন, তাহলে তার শিক্ষাগত অর্জনকে সামাজিক মেধার চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না।
এখানে প্রশ্ন পেশার নয়, প্রশ্ন পেশাগত যোগ্যতার ব্যবহারের।
বুয়েটের একজন প্রকৌশলী কিংবা মেডিকেলের একজন চিকিৎসক নিজের দক্ষতা ব্যবহার করে রাষ্ট্রের অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে অবদান রাখতে পারেন। তাতে আপত্তির কিছু নেই। আপত্তি তখনই, যখন সমাজের মেধার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও কেউ নিজের যোগ্যতাকে শুধু নিরাপদ চাকরি, ক্ষমতা, ব্যক্তিগত সুবিধা ও সামাজিক মর্যাদার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেন; নতুন কিছু সৃষ্টি, গবেষণা, উদ্ভাবন কিংবা জনস্বার্থে স্থায়ী অবদান রাখার কোনো দায় অনুভব করেন না।
প্রত্যেক মানুষকে বিজ্ঞানী, লেখক বা উদ্ভাবক হতে হবে, এমন নয়। প্রত্যেক পেশার নিজস্ব মূল্য রয়েছে। কিন্তু একটি সমাজ যদি কেবল চাকরি পাওয়া ও পদোন্নতিকেই মেধার সর্বোচ্চ প্রমাণ মনে করে, তাহলে সৃজনশীলতা ও সামাজিক অবদানের মূল্যায়ন কোথায় দাঁড়াবে?
মেধা কি শুধু অন্যদের হারিয়ে নিজের জায়গা করে নেওয়া?
প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সফল হতে স্মৃতিশক্তি, বিশ্লেষণী ক্ষমতা, অধ্যবসায়, কৌশল এবং পরিশ্রম প্রয়োজন হতে পারে। এগুলো বাস্তব দক্ষতা। কিন্তু প্রতিযোগিতায় অন্যদের পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা আর সমাজকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা এক নয়।
একজন মানুষ নিজের জীবনে সফল হতে পারেন, কিন্তু তার সাফল্যের বাইরে সমাজের জন্য কী রইল— সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি কি নতুন কোনো ধারণা সৃষ্টি করেছেন? কোনো দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার সমাধান করেছেন? নতুন প্রযুক্তি, গবেষণা, প্রতিষ্ঠান, সাহিত্য, শিল্প কিংবা জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ গড়ে তুলেছেন? নিজের দায়িত্বের জায়গায় এমন কোনো পরিবর্তন এনেছেন, যা তার অনুপস্থিতিতেও মানুষের উপকারে আসবে?
এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া কেবল পদবি, ডিগ্রি কিংবা চাকরির পরিচয় দিয়ে কাউকে অসাধারণ মেধাবী ঘোষণা করা বুদ্ধিবৃত্তিক অলসতা।
প্রকৃত মেধা: লক্ষ্য, সৃজনশীলতা ও সামাজিক দায়
প্রকৃত মেধার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ হলো নিজের লক্ষ্য সম্পর্কে স্পষ্ট থাকা, সেই লক্ষ্যে অবিচলভাবে কাজ করা এবং নিজের যোগ্যতাকে বৃহত্তর সামাজিক স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত করতে পারা।
যে মানুষ একটি সমস্যাকে নতুনভাবে দেখেন, প্রচলিত ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা শনাক্ত করেন, নতুন সমাধান তৈরি করেন এবং দীর্ঘদিন ধরে সেই সমাধান বাস্তবায়নে কাজ করেন, তার মেধা কেবল পরীক্ষার খাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না। তার কাজের মধ্যে মেধা দৃশ্যমান হয়।
একজন গবেষক নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করতে পারেন। একজন চিকিৎসক চিকিৎসাব্যবস্থার নতুন সমাধান উদ্ভাবন করতে পারেন। একজন প্রকৌশলী মানুষের জীবন সহজ করার প্রযুক্তি তৈরি করতে পারেন। একজন সরকারি কর্মকর্তা রাজস্ব ফাঁকি প্রতিরোধের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেন। একজন লেখক মানুষের চিন্তার জগৎ বদলে দিতে পারেন। একজন উদ্যোক্তা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারেন। একজন সামাজিক কর্মী অবহেলিত মানুষের জন্য এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেন, যা বহু বছর ধরে কাজ করবে।
এখানে পেশার শ্রেণিবিন্যাস নেই। আছে কাজের গুণমান, সৃজনশীলতা, দায়িত্ববোধ এবং বাস্তব অবদান।
সামাজিক স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত হওয়া মানে প্রত্যেককে বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করতে হবে, এমনও নয়। নিজের পেশায় সম্মানজনক আয় করা এবং ব্যক্তিগত জীবন গড়ে তোলা স্বাভাবিক। কিন্তু মেধাকে যখন সমাজের শ্রেষ্ঠ সম্পদ হিসেবে প্রচার করা হয়, তখন সেই মেধার সামাজিক ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন উঠানো জরুরী।
মেধাবী মানুষ, নাকি ব্যবস্থার সফল প্রতিযোগী?
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কি সৃজনশীল মানুষ তৈরি করছে, নাকি বিদ্যমান ব্যবস্থায় সফলভাবে জায়গা করে নেওয়ার প্রতিযোগী তৈরি করছে?
যদি একজন শিক্ষার্থীর প্রধান লক্ষ্য হয় ভালো ফল করা, একটি নামী প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়া, বিসিএস দেওয়া, সরকারি চাকরি পাওয়া, পদোন্নতি অর্জন করা এবং অবশেষে নিরাপদ অবসর নিশ্চিত করা— তাহলে এই লক্ষ্যগুলোকে ব্যক্তিগত সাফল্যের আকাঙ্ক্ষা হিসেবে সম্মান করা যায়। কিন্তু এগুলোকেই মেধার সর্বোচ্চ সংজ্ঞা বানিয়ে দিলে গবেষণা, উদ্ভাবন, স্বাধীন চিন্তা, সামাজিক উদ্যোগ এবং নতুন কিছু সৃষ্টি করার আকাঙ্ক্ষা গৌণ হয়ে পড়ে।
ফলে সমাজে এমন একটি ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয় যে সবচেয়ে মেধাবী মানুষটি সেই ব্যক্তি, যিনি সবচেয়ে ভালোভাবে বিদ্যমান প্রতিযোগিতায় জিততে পারেন। অথচ সমাজের সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন হতে পারে এমন মানুষ, যিনি প্রতিযোগিতার নিয়ম মুখস্থ করার পরিবর্তে প্রশ্ন করবেন— নিয়মগুলো কি আদৌ সঠিক? প্রতিষ্ঠানটি কি জনস্বার্থ রক্ষা করছে? এই ব্যবস্থাকে আরও ন্যায়সংগত ও কার্যকর করা যায় কীভাবে?
ব্যবস্থার ভেতরে নিজের জন্য জায়গা তৈরি করা এক ধরনের দক্ষতা। আর ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে মানুষের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করা আরেক ধরনের মেধা। সমাজের দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতির জন্য দ্বিতীয়টির গুরুত্ব অপরিসীম।
মেধার সামাজিক মূল্য কোথায়?
এই প্রশ্নটি বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারতের ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক। দুই দেশেই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নেন। সরকারি চাকরি, মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং নিরাপদ পেশার জন্য তীব্র প্রতিযোগিতা চলে। এসব প্রতিষ্ঠানে অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা কীভাবে গবেষণা, উদ্ভাবন, জনসেবা এবং সামাজিক সমস্যার সমাধানে ব্যবহৃত হচ্ছে, সেটিও মূল্যায়নের বিষয়।
একজন মানুষ নিজের যোগ্যতা দিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করেছেন—এটি তাঁর ব্যক্তিগত অর্জন। কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি জনগণের জন্য কী সৃষ্টি করলেন, কী পরিবর্তন আনলেন এবং নিজের দায়িত্বের প্রতি কতটা জবাবদিহি নিশ্চিত করলেন—সেটি তাঁর সামাজিক অবদানের প্রশ্ন।
কোনো কর্মকর্তা যদি দায়িত্ব পালন করে রাজস্ব সুরক্ষা করেন, দুর্নীতি প্রতিরোধ করেন, নিয়মের স্বচ্ছ প্রয়োগ নিশ্চিত করেন এবং নাগরিকের হয়রানি কমান, তাহলে তাঁর কাজের সামাজিক মূল্য আছে। বিপরীতে, কেউ যদি নিজের পদকে কেবল সুবিধা অর্জনের মাধ্যম বানান, তাহলে তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা সেই আচরণকে নৈতিক মর্যাদা দিতে পারে না।
সুতরাং মেধার মূল্যায়ন করতে হবে শুধু প্রবেশের পরীক্ষায় নয়, দায়িত্ব পালনের ফলাফলেও; শুধু অর্জিত পদে নয়, সৃষ্ট মূল্যেও; শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যে নয়, সামাজিক অবদানেও।
ভুক্তভোগী বদলায়, শোষণের কৌশল কি বদলায়?
সাম্প্রদায়িক রাজনীতির একটি বিপজ্জনক দিক হলো, মানুষকে প্রায়ই তার ব্যক্তিগত আচরণ দিয়ে নয়, তার ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে বিচার করা হয়। একজন মানুষের অপরাধের দায় চাপানো হয় পুরো সম্প্রদায়ের ওপর। আবার অন্য সম্প্রদায়ের কোনো ব্যক্তি একই ধরনের অপরাধ করলে তার অপরাধকে ব্যক্তিগত ঘটনা হিসেবে দেখানোর প্রবণতাও দেখা যেতে পারে।
এই দ্বৈত মানদণ্ডের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো জরুরি। কারণ অপরাধীর ধর্মীয় পরিচয় বদলালেও অপরাধের প্রকৃতি বদলায় না। জমি দখল জমি দখলই, চোরাচালান চোরাচালানই, অপহরণ অপহরণই, আর ক্ষমতার অপব্যবহার ক্ষমতার অপব্যবহারই।
ভুক্তভোগী সংখ্যাগরিষ্ঠ না সংখ্যালঘু, নারী না পুরুষ, দরিদ্র না বিত্তবান—এসব পরিচয় তার প্রতি ন্যায়বিচারের অধিকার নির্ধারণ করতে পারে না। রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব হলো প্রত্যেক মানুষের অধিকার রক্ষা করা এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা।
এই ব্যবস্থার খরচ দেয় কারা?
ক্ষমতাবানদের সুবিধা এবং সাধারণ মানুষের ক্ষতির সম্পর্ক বুঝতে হলে সুবিধাভোগীর পাশাপাশি ভুক্তভোগীদেরও দেখতে হবে।
রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় হলে তার খরচ বহন করে করদাতা। দুর্নীতি বা অনিয়মের কারণে সরকারি সেবা ব্যাহত হলে ভোগান্তিতে পড়ে সাধারণ মানুষ। জমি দখলের শিকার হলে পরিবার হারায় বসতভিটা ও নিরাপত্তা। চোরাচালান ও অবৈধ বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণহীন থাকলে বৈধ ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, রাজস্ব হারাতে পারে রাষ্ট্র। বিচারহীনতা চলতে থাকলে মানুষ আইন ও প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা হারায়।
অর্থাৎ সুবিধাভোগীর ব্যক্তিগত লাভের বিপরীতে সামাজিক ক্ষতি অনেক বিস্তৃত হতে পারে।
এ কারণেই সরকারি দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির মূল্যায়ন শুধু তিনি কতটা দক্ষতার সঙ্গে নিজের ক্যারিয়ার এগিয়েছেন, তা দিয়ে করা যায় না। দেখতে হবে তাঁর সিদ্ধান্তের ফলে জনগণের কী লাভ হয়েছে, কী ক্ষতি হয়েছে এবং সেই সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দেওয়ার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল।
যে ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত সুবিধার হিসাব থাকে, কিন্তু সামাজিক ক্ষতির হিসাব থাকে না, সেই ব্যবস্থায় সুবিধাভোগীরা নিরাপদ থাকেন আর সাধারণ মানুষ মূল্য দিতে থাকে।
সমাধান ব্যক্তির বদল নয়, জবাবদিহির কাঠামো
এই পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার জন্য শুধু একজন কর্মকর্তাকে বদলি করা, একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিকে সরিয়ে দেওয়া কিংবা একটি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন এমন প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা, যেখানে দায়িত্বের সঙ্গে জবাবদিহি যুক্ত থাকবে।
সরকারি কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তের নথি সংরক্ষণ ও নিরীক্ষা, স্বার্থের সংঘাত প্রকাশ, সম্পদের বিবরণ যাচাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থা, অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত, তথ্য অধিকার প্রয়োগ এবং অনিয়মের ক্ষেত্রে ধারাবাহিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। একই সঙ্গে অভিযোগ ও প্রমাণের মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখতে হবে, যাতে রাজনৈতিক বা ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে হয়রানি করা না যায়।
কোনো কর্মকর্তা দায়িত্ব ছেড়ে চলে গেলেই তাঁর দায়িত্বকালের সিদ্ধান্তের মূল্যায়ন বন্ধ হয়ে যাওয়া উচিত নয়। আবার কোনো প্রতিষ্ঠানে অনিয়মের অভিযোগ উঠলেই প্রত্যেক কর্মচারীকে দায়ী করা যাবে না। ব্যক্তিগত দায় নির্ধারণ করতে হবে প্রমাণ, দায়িত্বের সীমা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা এবং প্রযোজ্য আইনের ভিত্তিতে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, প্রতিষ্ঠানের সাফল্য পরিমাপের মানদণ্ড বদলানো। পদোন্নতি, বদলি, অবসর কিংবা ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধির বদলে জনসেবা, স্বচ্ছতা, রাজস্ব সুরক্ষা, ন্যায়বিচার ও অনিয়ম প্রতিরোধের ফলাফলকে গুরুত্ব দিতে হবে।
যত দিন একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি নিজের মেয়াদ পার করে নিরাপদে সরে যাওয়াকেই সাফল্য মনে করবেন, তত দিন প্রতিষ্ঠান বদলানোর প্রেরণা দুর্বল থাকবে। আর যত দিন প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যক্তির চেয়ে নিয়মের প্রতি বেশি দায়বদ্ধ না হবে, তত দিন একই চক্র ফিরে আসার আশঙ্কা থাকবে।
ধর্ম বদলায়, চেয়ার বদলায়, সুবিধাভোগী কাঠামো টিকে থাকে
এদের মদের বোতল একই, চোরাচালানের মাল একই, অপহৃত নারী একই, দখলকৃত জমি একই, ধর্মের নামে কাঠামোবদ্ধ শোষণ একই— এই কথার তাৎপর্য কোনো দুই দেশের সব মানুষকে একই অপরাধে অভিযুক্ত করা নয়। এর তাৎপর্য হলো, ধর্মীয় পরিচয় ও নৈতিকতার ভাষার আড়ালে অর্থ, ক্ষমতা ও সুবিধার যে সম্পর্কগুলো গড়ে উঠতে পারে, সেগুলোকে দৃশ্যমান করা।
এই ব্যবস্থার সামনে থাকে নানা পরিচয়। কেউ ধর্মের রক্ষক, কেউ জাতীয়তাবাদী, কেউ আধুনিক, কেউ প্রগতিশীল, কেউ রাষ্ট্রের দক্ষ কর্মকর্তা, কেউ মেধাবী পেশাজীবী। কিন্তু পরিচয় বা পদবির কোনোটিই নিজে থেকে সততার সনদ নয়।
যে ব্যক্তি সরকারি চেয়ার ব্যবহার করে নিজের সুবিধা নিশ্চিত করেন, অথচ তার দায়িত্বকালে জনস্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ অমীমাংসিত থেকে যায়, তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন। যে শিক্ষিত ব্যক্তি অনিয়ম দেখেও নীরব থাকেন, তার নীরবতার প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। আর যে প্রতিষ্ঠান একজনের বিদায়ের পরও একই অনিয়মের পুনরাবৃত্তি ঘটতে দেয়, তার কাঠামোগত দুর্বলতা চিহ্নিত করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে হোক কিংবা ভারতে, ধর্মের নাম আলাদা হতে পারে; কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার, অর্থনৈতিক শোষণ ও জবাবদিহির অভাবের প্রশ্ন একইভাবে সামনে আসতে পারে।
সবচেয়ে বড় বিপদ শুধু সেই মাফিয়া নয়, যে প্রকাশ্যে অপরাধ করে। বিপদ সেই ব্যবস্থাও, যেখানে অপরাধের সুবিধা কেউ ভোগ করে, কেউ তা টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে, কেউ নীরব থাকে, আর নিজেদের মেধাবী বলে পরিচয় দেওয়া কেউ কেউ দায়িত্বের চেয়ার ব্যবহার করে নিরাপদে সরে যান— যখন সাধারণ মানুষের জন্য রেখে যান একই শোষণ, একই অনিশ্চয়তা এবং একই জবাবদিহিহীনতা।
চেয়ার বদলালেই রাষ্ট্র বদলায় না। মানুষ বদলালেই ব্যবস্থা বদলায় না। ধর্মীয় পরিচয় বদলালেও শোষণের চরিত্র বদলায় না।
প্রশ্ন তাই কে কোন ধর্মের, কে কত বড় ডিগ্রিধারী, কিংবা কে কত উঁচু চেয়ারে বসেছিলেন— শুধু তা নয়। প্রশ্ন হলো: তিনি কার স্বার্থ রক্ষা করেছেন, তার ক্ষমতার জবাবদিহি কোথায়, তার দায়িত্বকালে সাধারণ মানুষের কী পরিবর্তন হয়েছে এবং তিনি সরে যাওয়ার পরও একই ব্যবস্থা কেন টিকে আছে?
চান্স পাওয়া মানে একটি প্রতিযোগিতায় সফল হওয়া। চাকরি পাওয়া মানে একটি পেশাগত অবস্থান অর্জন করা। ডিগ্রি পাওয়া মানে নির্দিষ্ট বিষয়ে শিক্ষা লাভ করা। এগুলোর প্রত্যেকটির মূল্য আছে। কিন্তু এগুলোর কোনোটি একা প্রমাণ করে না যে একজন মানুষ সৃজনশীল, দূরদর্শী, নৈতিক কিংবা সমাজের জন্য অপরিহার্য।
মেধার সনদ চাকরির নিয়োগপত্র নয়। মেধার সামাজিক প্রমাণ হলো তার সৃষ্টিশীলতা, দায়িত্ববোধ, লক্ষ্যনিষ্ঠা এবং মানুষের জীবনে রেখে যাওয়া ইতিবাচক পরিবর্তন।
যে মেধা শুধু নিজের জন্য চেয়ার খোঁজে, তা ব্যক্তিগত সাফল্য অর্জন করতে পারে। যে মেধা নিজের লক্ষ্যকে মানুষের প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করে, নতুন কিছু সৃষ্টি করে এবং নিজের কাজের দায় গ্রহণ করে, সেই মেধাই সমাজকে এগিয়ে নেওয়ার শক্তি হয়ে উঠতে পারে।
অতএব, ধর্মের নামে শোষণ যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি মেধার নামে সুবিধাভোগও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। পরিচয়, ডিগ্রি কিংবা পদমর্যাদা নয়— মানুষের কাজ, তার সামাজিক অবদান এবং ক্ষমতার জবাবদিহিই হোক মূল্যায়নের প্রকৃত মানদণ্ড।
