আমাদের সমাজে একটি অদ্ভুত বৈপরীত্য দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। একদিকে রয়েছে প্রশাসনিক ক্ষমতার চূড়ায় থাকা মানুষ— ডিসি, এসপি বা এ ধরনের নির্বাহী কর্মকর্তারা; অন্যদিকে রয়েছে চিন্তাশীল, সমাজমনস্ক, লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত মানুষ— যাদের হাতে নেই অর্থনৈতিক শক্তি, নেই কাঠামোগত ক্ষমতা। এই দুই শ্রেণির মধ্যে সম্পর্ক প্রায়ই সম্মানের নয়, বরং অবমূল্যায়ন ও দূরত্বের।
প্রশ্ন হলো— কেন?
প্রথমত, রাষ্ট্রীয় কাঠামো এমনভাবে গড়ে উঠেছে যেখানে ক্ষমতার দৃশ্যমানতা সবচেয়ে বড় মূল্যবোধ হিসেবে বিবেচিত হয়। ডিসি বা এসপি সরাসরি সিদ্ধান্ত নেন, প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করেন, আইন প্রয়োগ করেন। ফলে তাদের অবস্থান সামাজিকভাবে “উচ্চ” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। এই অবস্থান শুধু পদমর্যাদা নয়, এটি একটি মানসিক কাঠামো তৈরি করে— যেখানে ক্ষমতাই মর্যাদার প্রধান উৎস।
অন্যদিকে, যারা সমাজ নিয়ে ভাবেন, লেখেন, সমালোচনা করেন— তাদের কাজ ধীর, গভীর, এবং প্রায়শই অদৃশ্য। তাদের কাছে সত্য বলার সাহস থাকতে পারে, বিশ্লেষণের ক্ষমতা থাকতে পারে, কিন্তু তাদের হাতে থাকে না প্রশাসনিক ক্ষমতা বা অর্থনৈতিক প্রভাব। ফলে তারা সামাজিকভাবে প্রান্তিক হয়ে পড়েন, এমনকি অনেক সময় অবহেলার শিকার হন।
এই অবমূল্যায়নের জায়গাটা আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন আমরা প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরের বাস্তবতা দেখি। দুর্নীতি, দায়িত্বহীনতা বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ নতুন কিছু নয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, যে কাঠামো ন্যায়বিচার ও সুশাসন নিশ্চিত করার কথা, সেই কাঠামোর ভেতরেই অনিয়ম বাসা বাঁধে। এতে করে একটি নৈতিক সংকট তৈরি হয়— যেখানে ক্ষমতাবান ব্যক্তি নিজেই প্রশ্নবিদ্ধ, অথচ তিনি সমাজের চিন্তাশীল মানুষদের তুচ্ছজ্ঞান করেন।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা প্রয়োজন— সব প্রশাসনিক কর্মকর্তা একই রকম নন। অনেক ডিসি, এসপি আছেন যারা সততার সঙ্গে কাজ করেন, সমাজের উন্নয়নে ভূমিকা রাখেন, এমনকি লেখালেখি ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাকেও সম্মান করেন। কিন্তু সমস্যা হলো, কাঠামোগত দুর্বলতা এমন যে, ভালো মানুষরাও অনেক সময় সেই কাঠামোর সীমাবদ্ধতায় আটকে যান।
এই প্রেক্ষাপটে মূল প্রশ্নটি ব্যক্তিগত নয়, কাঠামোগত: কেন আমাদের সমাজে চিন্তা ও সৃজনশীলতার চেয়ে ক্ষমতা বেশি মূল্য পায়?
এর উত্তর খুঁজতে গেলে দেখতে হয়— আমাদের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিকীকরণের প্রক্রিয়া। আমরা ছোটবেলা থেকেই শিখি “বড় অফিসার” হওয়াই সাফল্য। কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই শেখানো হয় যে একজন চিন্তাবিদ, লেখক বা সমালোচক হওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ— বরং সমাজের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।
ফলে একটি বিপজ্জনক সংস্কৃতি তৈরি হয়— যেখানে ক্ষমতাবান ব্যক্তি মনে করেন তিনি সবকিছুর ঊর্ধ্বে, আর চিন্তাশীল মানুষকে মনে করা হয় “অপ্রয়োজনীয়” বা “অপ্রাসঙ্গিক”। অথচ বাস্তবতা হলো, একটি সমাজ টিকে থাকে চিন্তার ওপর, প্রশ্নের ওপর, সমালোচনার ওপর। প্রশাসনিক ক্ষমতা সেই কাঠামোকে চালায়, কিন্তু চিন্তাশীল মানুষ সেই কাঠামোকে পথ দেখায়।
এই বিভাজন দূর করতে হলে প্রয়োজন পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং জবাবদিহিতার সংস্কৃতি। প্রশাসনিক কাঠামোকে হতে হবে আরও স্বচ্ছ, আরও দায়িত্বশীল। আর সমাজকে শিখতে হবে ক্ষমতার পাশাপাশি চিন্তার মূল্য দিতে।
শেষ পর্যন্ত, যে সমাজে লেখক অপমানিত হন এবং ক্ষমতাবান ব্যক্তি প্রশ্নের ঊর্ধ্বে থাকেন সেই সমাজ দীর্ঘমেয়াদে সংকটে পড়ে। আর যে সমাজে ক্ষমতা ও চিন্তা একসঙ্গে কাজ করে, একে অপরকে সম্মান করে, সেই সমাজই এগিয়ে যায়।
