ঢাকা: “অনেক ব্যবসায়ী আমার কাছে এসে কেঁদে ফেলে। তাদের কথা শুনলে বোঝা যায়, কাগজে-কলমে আইন এক জিনিস, আর বাস্তবতা অনেক সময় আরেক জিনিস।”
ফলোআপ নিউজের সঙ্গে আলাপকালে এমন মন্তব্য করেন কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, ঢাকা পশ্চিমের মোহাম্মদপুর বিভাগের ডেপুটি কমিশনার মুনমুন আক্তার দিনা। ভ্যাট আদায়ের বাস্তব চিত্র, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সংকট এবং রাজস্ব প্রশাসনের সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনার এক পর্যায়ে তিনি এ মন্তব্য করেন।

বাংলাদেশে ভ্যাট ব্যবস্থা মূলত বিক্রয়ের ওপর নির্ভরশীল। ফলে কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিক্রয় যত বেশি, তাত্ত্বিকভাবে ভ্যাটের পরিমাণও তত বেশি হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে একই আইনের প্রয়োগ সব ক্ষেত্রে সমানভাবে হচ্ছে কি না— সেই প্রশ্নই এখন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
ফলোআপ নিউজ দীর্ঘদিন ধরে মাঠপর্যায়ে বিভিন্ন ব্যবসায়ী, ভ্যাট কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে যে চিত্র পেয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে— অনেক ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরাই সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়ছেন। অন্যদিকে বড় আকারের অনেক ব্যবসা নিয়মিত ভ্যাট পরিশোধ না করেও নানা উপায়ে ব্যবস্থার ফাঁক গলে যাচ্ছে— এমন অভিযোগও এসেছে একাধিক সূত্র থেকে।
ধরা যাক, কোনো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর মাসিক প্রকৃত আয় প্রায় ৫০ হাজার টাকা। তিনি প্রতিদিন ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা শ্রম দিচ্ছেন, দোকান ভাড়া, কর্মচারীর বেতন, বিদ্যুৎ বিল, ব্যাংক ঋণের কিস্তি ও নানা ঝুঁকি সামলে মাস শেষে এই অর্থ হাতে পাচ্ছেন। যদি হিসাবের এমন একটি কাঠামো দাঁড়ায়, যেখানে বিক্রয়ের ওপর নির্ধারিত ভ্যাটের পরিমাণই মাসে ১০ হাজার টাকায় পৌঁছে যায়, তাহলে প্রশ্ন ওঠে— এই ব্যবসায়ী কীভাবে টিকে থাকবেন?
অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, কর ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য রাজস্ব সংগ্রহ হলেও সেই ব্যবস্থা যেন উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও ব্যবসার ধারাবাহিকতাকে ধ্বংস না করে। কারণ ব্যবসা টিকলেই ভবিষ্যতে রাজস্ব আসবে; ব্যবসাই যদি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে রাষ্ট্রও দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব হারাবে।
মাঠপর্যায়ে ফলোআপ নিউজের অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, নির্ধারিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণ কিংবা কিছু অসাধু কর্মকর্তার ব্যক্তিগত স্বার্থ— উভয় কারণেই কখনও কখনও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। অনেক ব্যবসায়ী দাবি করেন, আইনি প্রক্রিয়ার পরিবর্তে একপর্যায়ে তারা ‘সমঝোতার’ আলোচনায় বসতে বাধ্য হন। অভিযোগ রয়েছে, এই বাস্তবতাই দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করে।
একজন ব্যবসায়ী বলেন, “নিয়ম অনুযায়ী সব ভ্যাট পরিশোধ করলে ব্যবসা চালানোই কঠিন হয়ে যাবে। তখন অনেকেই বাধ্য হয়ে অন্য পথ খোঁজেন।”
অন্যদিকে একই সময়ে এমন বহু বড় ব্যবসা রয়েছে, যাদের মাসিক লেনদেন ও আয় কোটি টাকায় হলেও তারা বিভিন্ন কৌশলে প্রকৃত ভ্যাট পরিশোধ এড়িয়ে যেতে সক্ষম হচ্ছে— এমন অভিযোগও ব্যবসায়ী মহলে দীর্ঘদিনের।
এই বৈষম্য শুধু রাজস্ব আদায়ের ন্যায্যতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে না, বরং অন্য সকল আইন মেনে চলা ব্যবসায়ীদের মধ্যেও হতাশা তৈরি করছে।
এমন বাস্তবতার কথাই উঠে আসে ডেপুটি কমিশনার মুনমুন আক্তার দিনার সঙ্গে ফলোআপ নিউজের আলোচনায়ও। তিনি বলেন, অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ব্যক্তিগতভাবে তার সঙ্গে দেখা করে নিজেদের অসহায় অবস্থার কথা তুলে ধরেন। কেউ কেউ আবেগাপ্লুত হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
তার ভাষায়, “অনেক ব্যবসায়ী আমার কাছে এসে কেঁদে ফেলে। তাদের বাস্তব সমস্যার কথা শুনতে হয়। একজন কর্মকর্তা হিসেবে আইন বাস্তবায়ন করতে হয়, আবার একজন মানুষ হিসেবেও তাদের কষ্টকে উপেক্ষা করা যায় না।”
তিনি ইঙ্গিত দেন, রাজস্ব প্রশাসনের কার্যক্রমে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিরও প্রয়োজন রয়েছে। কারণ সব ব্যবসার আর্থিক সক্ষমতা এক নয়; একই নিয়ম প্রয়োগের ক্ষেত্রে বাস্তবতার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কর ব্যবস্থার সফলতা নির্ভর করে শুধু আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের ওপর নয়, বরং করদাতার সক্ষমতা, স্বচ্ছতা, সমতা এবং প্রশাসনের জবাবদিহিতার ওপরও। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের টিকিয়ে রেখে বড় করফাঁকিদাতাদের কার্যকরভাবে করের আওতায় আনতে না পারলে রাজস্ব ব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত ভারসাম্য আসবে না।
ফলোআপ নিউজের পর্যবেক্ষণ বলছে, রাজস্ব প্রশাসনের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কেবল রাজস্ব আদায় নয়; বরং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে আইন মানতে আগ্রহী ব্যবসায়ীরা হয়রানির শিকার হবেন না এবং প্রভাবশালী করফাঁকিদাতারাও কোনো ধরনের বিশেষ সুবিধা পাবেন না। কারণ ন্যায়সঙ্গত কর ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলেই রাষ্ট্র যেমন রাজস্ব পাবে, তেমনি ব্যবসায়ীরাও আস্থা নিয়ে বিনিয়োগ ও ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবেন। এজন্য একটি নির্দিষ্ট টার্নওভার (মোট বিক্রয়) পর্যন্ত ছাড় দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে ফলোআপ নিউজ মনে করে।
