নিষিদ্ধ জেনেও চলছিল প্যারাসেইলিং; এক বছরে একাধিক দুর্ঘটনা, এবার প্রাণ গেল খুলনার পর্যটক শৌভিক রায়ের।

কক্সবাজারে আরেকটি প্রাণ ঝরল। এবার আকাশে নয়, আসলে সমুদ্রে নয়, মৃত্যু হয়েছে অবহেলার। দরিয়ানগর সৈকতে প্যারাসেইলিং করতে গিয়ে নিরাপত্তা হারনেস থেকে ছিটকে পড়ে মারা গেছেন খুলনার পর্যটক শৌভিক রায় (৩১)। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি আকাশে ওঠার কিছুক্ষণ পরই নিরাপত্তা ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গভীর পানিতে পড়ে যান। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
কিন্তু সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য হলো— এই ঘটনা কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়; এটি পূর্বঘোষিত বিপর্যয়।
নিষিদ্ধ জেনেও চলছিলো ব্যবসা
জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্যারাসেইলিং কার্যক্রম নিয়ে আগেই নিষেধাজ্ঞা ও কড়াকড়ির নির্দেশ ছিলো। প্রশ্ন হচ্ছে, যদি কার্যক্রম অবৈধ বা অননুমোদিত হয়ে থাকে, তাহলে দিনের পর দিন তা চলল কীভাবে? কার ছত্রচ্ছায়ায়? কারা টাকা তুলছিলো? আর কারা চোখ বন্ধ করে ছিলো?
আগেও ঘটেছে, বারবার ঘটেছে
এই প্রথম নয়। ২০ মে ২০২৫ দরিয়ানগরে প্যারাসেইলিং করতে গিয়ে এক পর্যটক দম্পতি ছিটকে পড়ে আহত হন। তাদের কোমর ও পায়ে গুরুতর আঘাত লাগে। ঘটনার পর প্রশাসন সাময়িকভাবে কার্যক্রম বন্ধ করেছিলো।
এরপর আগস্ট ২০২৫-এ আরেক পর্যটক প্যারাসেইলিং করতে গিয়ে ঝাউগাছে আটকে দীর্ঘ সময় ঝুলে ছিলেন। সেই ঘটনার পরও প্রশাসন কার্যক্রম স্থগিত করে আইনি ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি দিয়েছিলো।
আরও পেছনে গেলে দেখা যায়, সেপ্টেম্বর ২০২১-এ এক নারী পর্যটক অবতরণের সময় গুরুতর আহত হন। ঘটনাস্থল ছিলো একই দরিয়ানগর এলাকা।
অর্থাৎ, একই এলাকা, একই ধরনের ঝুঁকি, একই অবহেলা, একই প্রশাসনিক নাটক।
এটি দুর্ঘটনা নয়, ধারাবাহিক অবহেলা
একটি প্রশ্নের উত্তর প্রশাসনকে দিতেই হবেঃ
-
নিরাপত্তা হারনেস কে পরীক্ষা করে?
-
দড়ি, উইঞ্চ, বোট, সংযোগ ব্যবস্থা— কোন সংস্থা সার্টিফাই করে?
-
অপারেটরদের প্রশিক্ষণের প্রমাণ কোথায়?
-
জরুরি উদ্ধার নৌযান কোথায় ছিলো?
-
লাইফগার্ড ও মেডিকেল টিম কেন ছিলো না?
যদি এসবের কোনো নির্ভরযোগ্য উত্তর না থাকে, তাহলে এটি কেবল ব্যবসায়িক গাফিলতি নয়; মানবজীবনের সঙ্গে বাণিজ্য।
সাময়িক বন্ধ, তারপর আবার চালু— এ কোন তামাশা?
কক্সবাজারে প্রশাসনের পরিচিত চিত্র এখন এমনঃ
দুর্ঘটনা ঘটে, প্রশাসন অভিযান চালায়। সাময়িক বন্ধ ঘোষণা, কিছুদিন পর আবার চালু। আবার দুর্ঘটনা! এই চক্র ভাঙছে না। কারণ, জবাবদিহি নেই।
পর্যটন নাকি নিয়ন্ত্রণহীন অর্থের খেলা?
কক্সবাজার বাংলাদেশের পর্যটনের প্রাণকেন্দ্র। বছরে লাখো মানুষ সেখানে যান। কিন্তু পর্যটনের নামে যদি অননুমোদিত, অরক্ষিত, অদক্ষ অপারেটররা সমুদ্র ও আকাশে মানুষের জীবন নিয়ে খেলা করে, তাহলে সেটি পর্যটন নয়— নিয়ন্ত্রণহীন অর্থের খেলা।
একটি উন্নত পর্যটন শহরে প্যারাসেইলিং পরিচালনার জন্য আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা প্রটোকল, আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ, সরঞ্জাম পরীক্ষণ, বীমা, উদ্ধার ব্যবস্থা এবং লাইসেন্স বাধ্যতামূলক থাকে। কক্সবাজারে সেসবের কতটুকু কার্যকর আছে, সেটিই এখন তদন্তের মূল প্রশ্ন হওয়া উচিৎ।
শৌভিক রায়ের মৃত্যুর দায় কার?
শুধু অপারেটরের? নাকি—
-
যারা অনুমতি ছাড়া ব্যবসা চালাতে দিল;
-
যারা আগের দুর্ঘটনার পর স্থায়ী ব্যবস্থা নেয়নি;
-
যারা পর্যটনকে রাজস্ব হিসেবে দেখে, নিরাপত্তা হিসেবে নয়;
-
যারা প্রতিবার ঘটনার পর “তদন্ত হবে” বলে দায় এড়িয়ে যায়?
এখন যা করা জরুরি
-
দরিয়ানগরসহ সব প্যারাসেইলিং পয়েন্ট অবিলম্বে সিলগালা;
-
সব অপারেটরের লাইসেন্স, মালিকানা ও আর্থিক লেনদেন প্রকাশ;
-
স্বাধীন বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন;
-
গত পাঁচ বছরের সব দুর্ঘটনার পূর্ণ তালিকা প্রকাশ;
-
নিহত শৌভিক রায়ের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ ও ফৌজদারি মামলা।
শৌভিক রায় কক্সবাজারে ঘুরতে গিয়েছিলেন, মরতে নয়।
একটি রাষ্ট্রের ব্যর্থতা তখনই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যখন একই ধরনের দুর্ঘটনা বারবার ঘটে, সতর্কবার্তা উপেক্ষিত হয়, নিষেধাজ্ঞা অকার্যকর থাকে, আর শেষ পর্যন্ত একজন তরুণ পর্যটকের মৃত্যু সংবাদকে “দুর্ঘটনা” বলে ফাইলবন্দী করার চেষ্টা হয়।
কক্সবাজারে প্যারাসেইলিং এখন শুধু রোমাঞ্চের প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্রীয় তদারকি, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং মানুষের জীবনের মূল্যের প্রশ্ন।
