Headlines

এক প্লেট ভাত, একটি মৃত্যু এবং আমাদের বিবেকের পতন

খুলনা
খুলনা
এক প্লেট ভাতের অভিযোগ থেকে চারতলার ছাদ—তারপর একটি প্রাণহীন শরীর। প্রশ্ন শুধু আজমুলকে কারা হত্যা করল তা নয়; প্রশ্ন হলো, আমাদের শিক্ষা, সামাজিকীকরণ ও মূল্যবোধ কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে? বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় বড়, নাকি একজন মানুষের জীবন? ‘আমি সেরা’—এই অহংকারের ভেতর থেকে কি আমরা ধীরে ধীরে মানুষটাকেই হারিয়ে ফেলছি?

এক প্লেট ভাত।

হ্যাঁ, মাত্র এক প্লেট ভাতকে কেন্দ্র করে একজন ২১ বছরের তরুণের জীবন শেষ হয়ে গেল—এমন অভিযোগই উঠেছে খুলনার একটি ছাত্রাবাসে। চুয়াডাঙ্গার দর্শনা থেকে বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে খুলনায় এসেছিলেন আজমুল হোসেন। নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রথম সেমিস্টারে ভর্তি হয়েছিলেন মাত্র ১০ দিন আগে। নতুন শহরে নতুন জীবন শুরু করার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই সেই জীবন থেমে গেল।

অভিযোগ অনুযায়ী, মেসের ম্যানেজারের রান্না করা ভাত অনুমতি ছাড়া খেয়ে ফেলেছিলেন আজমুল। এ নিয়ে তাকে কয়েকজন মেসবাসী ও বহিরাগত যুবক চারতলার ছাদে নিয়ে মারধর করেন। একপর্যায়ে তার বাবার কাছে এক লাখ টাকা দাবির অভিযোগও উঠেছে। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে নিচে পাওয়া যায়। হাসপাতালে নেওয়া হলে তার মৃত্যু হয়।

একটি প্রশ্ন বারবার মাথায় আসে—

এক প্লেট ভাতের মূল্য কি একটি মানুষের জীবন?

অবশ্যই নয়।

কিন্তু আজমুলের মৃত্যু শুধু কয়েকজন তরুণের নিষ্ঠুরতার গল্প বলে থেমে গেলে আমরা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটি এড়িয়ে যাব। কারণ একজন মানুষকে হত্যা করার মতো নিষ্ঠুরতা সাধারণত এক রাতেই তৈরি হয় না। তার পেছনে থাকে দীর্ঘদিনের সামাজিক শিক্ষা, মূল্যবোধ, অর্থনৈতিক বঞ্চনা, ক্ষমতার চর্চা, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং মানুষের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাবোধের ক্রমাগত ক্ষয়।

আমরা কি শুধু ডিগ্রি দিচ্ছি, মানুষ তৈরি করছি না?

আজ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার একটি বড় সংকট হলো— শিক্ষার সঙ্গে মানবিকতার সম্পর্ক ক্রমেই দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয় বাড়ছে। বিভাগ বাড়ছে। ডিগ্রি বাড়ছে। সেমিস্টার, ক্রেডিট, পরীক্ষা, ফলাফল— সবকিছু চলছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—

মানুষ তৈরি হচ্ছে কতটা?

একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী যদি মনে করেন, অন্যের খাবার খেয়ে ফেলার অভিযোগে একজন মানুষকে ধরে নিয়ে মারধর করা যায়, তাহলে তার হাতে থাকা শিক্ষার সনদ আমাদের সভ্যতার কতটা প্রমাণ?

শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু চাকরির বাজারে প্রবেশের যোগ্যতা তৈরি করা নয়। শিক্ষা মানুষের মধ্যে যুক্তি, সহনশীলতা, অপরের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর নৈতিক শক্তি তৈরি করার কথা।

আজমুলের ঘটনা সেই জায়গাতেই আমাদের আঘাত করেছে।

নামকাওয়াস্তে উচ্চশিক্ষার বিস্তার এবং নতুন সংকট

বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ বেড়েছে— এটি ইতিবাচক। কিন্তু উচ্চশিক্ষার বিস্তার আর উচ্চমানের শিক্ষা এক জিনিস নয়।

বিশেষ করে অনেক সরকারি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠছে— শিক্ষার্থী কি শুধু একটি ডিগ্রি অর্জন করছে, নাকি তার চিন্তা, নৈতিকতা, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং নাগরিক চরিত্রও গড়ে উঠছে?

একজন তরুণ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলো, সেমিস্টার শেষ করল, সার্টিফিকেট পেল— কিন্তু সে যদি দুর্বল মানুষের প্রতি সহানুভূতি, ভিন্নমত সহ্য করা, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা কিংবা সংঘাত শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের শিক্ষা না পায়, তাহলে শিক্ষার একটি মৌলিক উদ্দেশ্য অপূর্ণ থেকে যায়।

অবশ্য এই সংকট শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়, সকল স্তরে।

‘আমি সেরা’— পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক সংকট

আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি অংশের মধ্যেও দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের ‘আমি সেরা’ মানসিকতা তৈরি হয়েছে।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া যেন ভালো মানুষ হওয়ার সার্টিফিকেট।

নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া যেন অন্যের তুলনায় সামাজিকভাবে এক ধাপ ওপরে থাকার পরিচয়।

কেউ একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে— এই পরিচয় থেকেই কখনো কখনো সে ধরে নেয়, তার মেধা বেশি, তার সামাজিক মর্যাদা বেশি, তার মতামতের মূল্যও বেশি।

কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় ভালো করা আর জীবনের পরীক্ষায় ভালো মানুষ হওয়া— দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। এক ঘণ্টার পরীক্ষা মানুষকে মূল্যায়নের মানদণ্ড হতে পারে না।

আজমুল হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের মধ্যে কয়েকজনের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা বা সংশ্লিষ্টতার তথ্য সামনে আসছে বলে জানা যাচ্ছে। এসব তথ্য তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। তবে যদি তা সত্য হয়, তাহলে আমাদের আরও গভীর প্রশ্ন করতে হবে—

শুধু সফল চাকুরে তৈরি করাই কি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য?

কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হওয়া যেমন কাউকে অপরাধী বানায় না, তেমনি কোনো নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি কাউকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মানবিক মানুষও বানায় না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম মানুষকে বড় করে না; মানুষের আচরণই তাকে বড় করে।

পাবলিক বনাম প্রাইভেট— আমরা কি ভুল জায়গায় প্রতিযোগিতা করছি?

বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যেই এক ধরনের অদ্ভুত শ্রেণিবিন্যাস তৈরি হয়েছে।

একদিকে—

‘পাবলিকে পড়ি।’

অন্যদিকে—

‘প্রাইভেটে পড়ি।’

তারপর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মেধা, মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের সামাজিক ধারণা। অন্যদিকে অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে দেখা হয় তুলনামূলকভাবে কম মেধাবী কিংবা শুধু অর্থের বিনিময়ে পড়াশোনা করা মানুষ হিসেবে।

এই ধারণা যেমন অন্যায্য, তেমনি বিপজ্জনক।

কারণ একজন মানুষ কোথায় পড়েছে— এটি তার শিক্ষাগত পরিচয়। কিন্তু সে কেমন মানুষ— তার উত্তর পাওয়া যায় সে দুর্বল মানুষের সঙ্গে কেমন আচরণ করে, ভুল করা মানুষের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করে এবং ক্ষমতা হাতে পেলে কী করে, তার মধ্যে।

একজন শিক্ষার্থী গণিতে অসাধারণ হতে পারেন, ইংরেজিতে দক্ষ হতে পারেন, বিসিএসে ভালো করতে পারেন, নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি অর্জন করতে পারেন— কিন্তু তার চেয়ে দুর্বল একজন মানুষের প্রতি আচরণ যদি নিষ্ঠুর হয়, তাহলে তার শিক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটিই অনুপস্থিত।

দরিদ্রতা মানুষকে নিষ্ঠুর করে না, কিন্তু অসমতা সমাজকে বিকৃত করতে পারে

আজমুলের বাবার কান্নার কথাটি সবচেয়ে বেশি নাড়া দেয়—

“আমি কার কাছে এ বিচার দিব? … আমরা গরিব মানুষ… আল্লাহর কাছে বিচার দিলাম।”

একজন বাবা তার সন্তানকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে পাঠিয়েছেন। ছেলে নতুন শহরে এসেছে। তার সামনে ছিল ভবিষ্যৎ।

কিন্তু সন্তানের মৃত্যুর পর সেই বাবা রাষ্ট্রের কাছে দাঁড়িয়ে দৃঢ়ভাবে বলতে পারছেন না— ‘আমি বিচার চাই।’

বরং তার মুখে অসহায়তা।

এটি শুধু একজন বাবার অসহায়তা নয়। এটি সমাজের প্রান্তিক মানুষের রাষ্ট্র, আইন ও বিচারব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কের একটি গভীর প্রশ্ন।

আর দরিদ্র পরিবারের সন্তানকে যদি শহরের একটি মেসে কয়েকজন অপেক্ষাকৃত ক্ষমতাবান তরুণ ঘিরে ধরে, নিজেরাই অভিযোগ তোলে, নিজেরাই বিচার করে, নিজেরাই শাস্তি দেয়— তাহলে সেখানে রাষ্ট্রের আইনের জায়গাটি কোথায়?

সামাজিক শিক্ষার জায়গাটি কোথায়?

আমাদের সন্তানরা কী শিখছে?

তারা শিখছে কীভাবে পরীক্ষায় ভালো করতে হয়।

কীভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হয়।

কীভাবে চাকরি পেতে হয়।

কীভাবে টাকা উপার্জন করতে হয়।

কিন্তু তারা কি যথেষ্ট শিখছে—

কেউ ভুল করলে তাকে কীভাবে সংশোধন করতে হয়?

অপরের খাবার খেয়ে ফেললে কীভাবে কথা বলতে হয়?

কেউ চুরি করেছে মনে হলে কীভাবে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হয়?

কেউ অন্যায় করলে তাকে মারধর করার অধিকার কারও নেই— এই মৌলিক কথাটি?

মানুষের জীবন যে সম্পত্তির চেয়েও মূল্যবান— এই বোধটি?

সমস্যা এখানেই।

আমরা হয়তো শিক্ষিত মানুষ তৈরি করছি; কিন্তু শিক্ষিত নাগরিক তৈরি করছি না।

‘জেনজি’ প্রজন্মকে একা দায়ী করলে হবে না

আজকের তরুণ প্রজন্মকে এক কথায় ‘বিবেকহীন’ বলে দায়ী করা সহজ। কিন্তু তাতেও পুরো সত্য ধরা পড়ে না।

প্রতিটি প্রজন্ম তার আগের প্রজন্মের কাছ থেকেই অনেক কিছু শেখে।

শিশু দেখে বড়রা কীভাবে দুর্বল মানুষের সঙ্গে আচরণ করে।

দেখে অপরাধী কীভাবে পার পেয়ে যায়।

দেখে ক্ষমতাবান কীভাবে আইনকে নিজের সুবিধামতো ব্যবহার করে।

দেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষকে অপমান করা কতটা সহজ।

দেখে রাজনৈতিক, সামাজিক কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধে যুক্তির বদলে হুমকি, হামলা ও শক্তির ব্যবহার কীভাবে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে।

তারপর সেই শিশুই একদিন তরুণ হয়।

তাই আজমুলের মৃত্যু শুধু কয়েকজন অভিযুক্ত তরুণের চরিত্রের প্রশ্ন নয়। এটি আমাদের সামাজিকীকরণ ব্যবস্থারও আয়না।

‘ফ্যান্টাস্টিক পড়াশোনা’, কিন্তু কোথায় মানুষ?

আমাদের শিক্ষা নিয়ে আত্মতুষ্টিরও শেষ নেই।

কেউ ইংরেজিতে সাবলীল।

কেউ প্রযুক্তিতে দক্ষ।

কেউ বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্ন দেখছে।

কেউ বিসিএসের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

কেউ নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় দিয়ে গর্ব করছে।

কেউ আবার কম খরচে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নিয়ে কর্মজীবনে প্রবেশ করছে।

কিন্তু এই সবকিছুর নিচে যদি মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ না থাকে, তাহলে শিক্ষার ভেতরে বড় একটি শূন্যতা থেকে যায়।

ফ্যান্টাস্টিক পড়াশোনা, কিন্তু দুর্বল সামাজিক শিক্ষা— এই বৈপরীত্য একটি ভয়ংকর প্রজন্ম তৈরি করতে পারে।

কারণ জ্ঞান মানুষকে শক্তিশালী করে।

কিন্তু নৈতিকতা না থাকলে সেই শক্তি অন্যের ওপর প্রয়োগ করার প্রবণতাও তৈরি হতে পারে।

মানুষের জীবনের মূল্য কমে যাচ্ছে

ভাতের দাম আছে।

মোবাইলের দাম আছে।

ল্যাপটপের দাম আছে।

একটি ঘরের ভাড়া আছে।

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিস্টার ফি আছে।

কিন্তু মানুষের জীবনের মূল্য যেন ক্রমেই অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে।

কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাকে অপমান করা যায়।

কেউ চুরি করেছে মনে হলেই তাকে মারধর করা যায়।

কেউ ভুল করেছে মনে হলেই তাকে সামাজিকভাবে ধ্বংস করা যায়।

কেউ দুর্বল হলে তার ওপর ক্ষমতা দেখানো যায়।

এই মানসিকতার শেষ পরিণতি কী হতে পারে— আজমুলের মৃত্যু তার একটি ভয়াবহ উদাহরণ।

সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয়— ব্যক্তিগত বিচার

সভ্য সমাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জনগুলোর একটি হলো— কেউ নিজে বিচারক নয়।

অভিযোগের তদন্ত হবে।

প্রমাণ সংগ্রহ হবে।

আদালত সিদ্ধান্ত দেবে।

অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী শাস্তি হবে।

কিন্তু আমরা যদি এই কাঠামো বাদ দিয়ে প্রত্যেকে নিজের হাতে বিচার তুলে নিই, তাহলে সমাজ আর রাষ্ট্রের মধ্যে পার্থক্য থাকে না।

আজ কারও বিরুদ্ধে খাবার চুরির অভিযোগে হামলা হবে।

কাল কারও বিরুদ্ধে টাকা চুরির অভিযোগে।

পরশু কারও বিরুদ্ধে অন্য কোনো অভিযোগে।

অভিযোগ সত্য কিনা— সেটি তখন আর গুরুত্বপূর্ণ থাকে না।

গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায় কে বেশি শক্তিশালী।

এটাই সভ্যতার বিপরীত পথ।

আজমুলের মৃত্যু আমাদের পাঁচটি প্রশ্ন রেখে গেছে

প্রথমত— একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে আবাসিক মেসে নিরাপদ রাখার সামাজিক ও প্রশাসনিক কাঠামো কোথায়?

দ্বিতীয়ত— তরুণদের মধ্যে বিরোধ মেটানোর সংস্কৃতি আমরা কি কখনো শেখাই?

তৃতীয়ত— বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি শুধু একাডেমিক ফলাফলের দিকে তাকাবে, নাকি শিক্ষার্থীর নাগরিক ও মানবিক বিকাশ নিয়েও ভাববে?

চতুর্থত— মেস ও ছাত্রাবাসে বহিরাগতদের প্রবেশ, অনানুষ্ঠানিক ক্ষমতার কাঠামো এবং ‘নিজেদের মতো করে বিচার’ করার সংস্কৃতি নিয়ে কোনো নজরদারি আছে কি?

পঞ্চমত— আমরা আসলে কেমন মানুষ তৈরি করছি?

আজমুলের বাবার ‘আল্লাহর কাছে বিচার’ যেন রাষ্ট্রের জন্য অজুহাত না হয়

একজন দরিদ্র বাবা বলেছেন, তিনি কার কাছে বিচার চাইবেন জানেন না।

রাষ্ট্রের জন্য এর চেয়ে বড় প্রশ্ন আর কী হতে পারে?

তার বিচার চাওয়ার সামর্থ্য আছে কি না, মামলা করার অর্থ আছে কি না, শহর থেকে তার বাড়ি কত দূরে— এসব কোনো বিষয় হওয়ার কথা নয়।

কারণ আইন সবার জন্য।

আজমুল ধনী পরিবারের সন্তান ছিলেন না।

ক্ষমতাবান ছিলেন না।

কোনো বড় রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান ছিলেন না।

তিনি ছিলেন একজন সাধারণ তরুণ— যার সামনে হয়তো আরও পঞ্চাশ-ষাট বছরের জীবন পড়ে ছিল।

তার স্বপ্ন ছিল।

তার বাবা-মায়ের আশা ছিল।

তার নিজের ভবিষ্যৎ ছিল।

এক প্লেট ভাতের চেয়েও তার জীবনের মূল্য অসীম ছিল।

তাই আজমুলের মৃত্যু নিয়ে শুধু কয়েক দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে আমরা যদি আবার সব ভুলে যাই, তাহলে এই মৃত্যু আমাদের কিছুই শেখাবে না।

প্রয়োজন শুধু হত্যার বিচার নয়।

প্রয়োজন কীভাবে এমন মানুষ তৈরি হচ্ছে, যারা একটি অভিযোগের জবাব যুক্তি দিয়ে নয়, শক্তি দিয়ে দিতে শেখে— সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অহংকার, বেসরকারি শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ, নামকাওয়াস্তে উচ্চশিক্ষা, দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য, দুর্বল পারিবারিক ও সামাজিক শিক্ষা— কোনোটিকেই একা দায়ী করা যাবে না।

সবশেষে প্রশ্নটি আমাদের সবার—

আমরা কি শুধু ডিগ্রিধারী মানুষ তৈরি করছি, নাকি মানুষও তৈরি করছি?

কারণ আজমুলকে যারা হত্যা করেছে, তাদের হাতে হয়তো অস্ত্র ছিল; কিন্তু তাদের মানসিকতার পেছনে যে সমাজ, শিক্ষা ও মূল্যবোধ কাজ করে, সেটি আমাদের সবার।

আর সেই সমাজের সবচেয়ে ভয়ংকর শিক্ষা হতে পারে—

ক্ষমতা থাকলে দুর্বলকে শাস্তি দেওয়া যায়।

এই শিক্ষাটাই বদলাতে হবে।

নইলে আগামীকাল হয়তো আবার কোনো মেসে, কোনো হলে, কোনো কর্মস্থলে, কোনো রাস্তায়— একটি সামান্য অভিযোগের মূল্য দিতে হবে আরেকটি জীবন দিয়ে।

তখনও আমরা বলব—

‘আহা, ছেলেটাকে মেরে ফেলল!’

তারপর কয়েক দিন পর সব ভুলে যাব।

কিন্তু একটি সভ্য সমাজের প্রশ্ন হওয়া উচিত—

আমরা এমন একটি সমাজ কেন তৈরি করছি, যেখানে এক প্লেট ভাতের চেয়েও একজন মানুষের জীবন সস্তা হয়ে যায়?