Headlines

যে শিশুর পাশে কেউ নেই, তার হারিয়ে যাওয়া বা মৃত্যুর খবরটাও জানা যায় না!

রামিসা। আয়ুশ। অপ্রতিম।

নামগুলো আলাদা, পরিবার আলাদা, ঘটনাগুলো আলাদা। কিন্তু প্রতিটি নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একই নির্মম প্রশ্ন— একটি শিশুকে হত্যা, ধর্ষণ কিংবা নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার পর তার নিরাপত্তার দায় শেষ পর্যন্ত কার?

পল্লবীর শিশু রামিসা আক্তারের নির্মম হত্যাকাণ্ড দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু এ দেশ নড়েচড়ে আবার একই থাকে! একইরূপে বর্বরতা এবং সহিংসতা ঘটতেই থাকে।

২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে বিভিন্ন ধরনের সহিংসতায় অন্তত ১৯৫ শিশু নিহত হয়েছে। এর মধ্যে ২১ শিশু ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছে। একই সময়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছে আরও বহু শিশু।

তারপর এসেছে একের পর এক শিশু হত্যার ঘটনা। গণপতি চক্রবর্তীর ১২ বছরের সন্তান আয়ুশ চক্রবর্তীর হত্যাকাণ্ড, সর্বশেষ অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ড—প্রতিটি ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে আমরা আসলে কতটা অসহায় অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছি।

কিন্তু এই তালিকার বাইরেও আছে আরও বড় একটি অদৃশ্য পৃথিবী।

পথশিশুর পৃথিবী।

তাদের কেউ স্কুলে যায় না। কারও জন্মনিবন্ধন নেই। কারও স্থায়ী ঠিকানা নেই। কারও বাবা-মা কোথায়, সেটিও জানা নেই। কেউ রেলস্টেশনে ঘুমায়, কেউ ফুটপাতে, কেউ বাজারে, কেউ বাস টার্মিনালে, কেউ সমুদ্রসৈকতে মানুষের কাছে হাত পাতে, কেউ ফুল বিক্রি করে, কেউ বোতল কুড়ায়।

তাদের হারিয়ে গেলে অনেক সময় হারিয়ে যায় একটি নামহীন শিশু। কেউ জানে না, কেউ খবর রাখে না।

পথশিশু নিখোঁজ হলে হিসাবটা কোথায়?

এই প্রশ্নের সবচেয়ে অস্বস্তিকর উত্তর হলো— এর পূর্ণাঙ্গ জাতীয় হিসাব আমাদের হাতে নেই। আসলে কোনো হিসাবই নেই।

UNICEF-এর ২০২৪ সালের গবেষণায় বাংলাদেশে street situations-এ থাকা শিশুর সংখ্যা ৩৪ লাখের বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষণাটি একই সঙ্গে তাদেরকে নথিভুক্ত ও সেবাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

বাংলাদেশের ২০২২ সালের Street Children Survey-ও বলেছে, এই শিশুদের সঠিক মোট সংখ্যা সম্পর্কে নির্ভুল জাতীয় হিসাব নেই। জরিপটি বিভিন্ন শহর ও বিভাগের হটস্পটে ৭,২০০ শিশুর তথ্য সংগ্রহ করেছিল।

অর্থাৎ যে জনগোষ্ঠীর সংখ্যা নিয়েই পূর্ণাঙ্গ হিসাব নেই, তাদের মধ্য থেকে কত শিশু নিখোঁজ হচ্ছে—তার নির্ভরযোগ্য জাতীয় হিসাব থাকবে কীভাবে?

এটাই আমাদের শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় অন্ধকার জায়গাগুলোর একটি।

পুলিশের সামগ্রিক পরিসংখ্যান অবশ্য ভয়াবহ চিত্র দেখাচ্ছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ১৫,৭১৭ শিশু নিখোঁজ হওয়ার রিপোর্ট হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৩,৬৭৯ জনকে উদ্ধার বা পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে; ২,০৩৮ শিশু তখনও অমীমাংসিত ছিল। কিন্তু পুলিশের এই হিসাবেও পথশিশুদের আলাদা শ্রেণি হিসেবে দেখানো হয়নি।

তাহলে যে শিশু প্রতিদিন রাস্তায় থাকে, তার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা কি অন্য শিশুর মতোই রাষ্ট্রীয় ডাটাবেসে দৃশ্যমান?

প্রশ্নটি এখানেই।

অপ্রতিম
আইফোনসহ হারিয়ে গিয়েছিল ছোট্ট সন্তানটি—মা-বাবা ভেবেছিলেন, নিশ্চয়ই ফিরে আসবে। কিন্তু ফিরে এলো না সেই প্রাণের সন্তান; মিলল তার নিথর লাশ। একটি পরিবারের অপেক্ষা এভাবেই পরিণত হলো আজীবনের কান্নায়। ছবিঃ অনলাইন মিডিয়া

একজন পথশিশু হারিয়ে গেলে কে খোঁজে?

২০২৬ সালের একটি ঘটনা খুব সাধারণ অথচ গভীর বাস্তবতা সামনে এনেছে।

সাইদুল নামে এক শিশু ছয় বছর বয়সে চট্টগ্রাম থেকে নিখোঁজ হয়েছিল। পাঁচ বছর পর তাকে ঢাকার রাস্তায় পথশিশুদের সঙ্গে পাওয়া যায় এবং শেষ পর্যন্ত সে পরিবারের কাছে ফিরে যায়। তার পরিবার নিখোঁজের পর জিডি করেছিল, সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দিয়েছিল, বিভিন্নভাবে খুঁজেছিল।

আরেক শিশু জাকির প্রায় তিন বছর নিখোঁজ থাকার পর ঢাকায় পথশিশু হিসেবে উদ্ধার হয়েছিল। পরে তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ হয়।

এগুলো শুধু বিচ্ছিন্ন মানবিক গল্প নয়।

এগুলো দেখায়—একজন শিশু পরিবারের কাছ থেকে হারিয়ে গিয়ে অন্য একটি শহরের পথশিশু হয়ে যেতে পারে।

কিন্তু সেই রূপান্তরের মাঝখানে কোথায় থাকে রাষ্ট্রের child-tracing system?

একটি শিশু চট্টগ্রাম থেকে নিখোঁজ হলো। কয়েক বছর পর তাকে ঢাকায় পাওয়া গেল। এর মধ্যে তার পরিচয়, অবস্থান, নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নির্যাতনের ঝুঁকি—এসবের কোনো কেন্দ্রীয় ট্র্যাকিং ব্যবস্থা কি তাকে অনুসরণ করেছে?

এই প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত শিশু সুরক্ষা নিয়ে আমাদের আত্মতুষ্ট হওয়ার সুযোগ নেই।

জিনিয়ার মতো শিশুরা আমাদের চোখের সামনে থেকেও অদৃশ্য

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় ফুল বিক্রি করা শিশু জিনিয়া নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটিও এই বাস্তবতার আরেকটি উদাহরণ। সে তার পরিবারের সঙ্গে টিএসসির বারান্দায় থাকত, ফুল বিক্রি করত। নিখোঁজ হওয়ার পর তার মা থানায় জিডি করেছিলেন। স্থানীয় মানুষ ও শিক্ষার্থীরাও তাকে খুঁজেছিল। কিন্তু কয়েক দিন পরও তার সন্ধান পাওয়া যায়নি।

ভাবুন, শিশুটি যদি কোনো অভিজাত আবাসিক এলাকার স্কুলপড়ুয়া হতো—তার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় কি একই মাত্রায় অনুসন্ধান শুরু হতো? এভাবে বিনাপ্রশ্নে ভুলে যাওয়া সম্ভব হতো।

এই প্রশ্ন কাউকে অভিযুক্ত করার জন্য নয়।

এটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার একটি কাঠামোগত প্রশ্ন।

দরিদ্রের শিশু কি কম রাষ্ট্রীয় সম্পদ পাওয়ার যোগ্য?

একটি শিশুর নিরাপত্তা তার বাবার পেশা দিয়ে নির্ধারিত হতে পারে না।

তার পরিবারের আয় দিয়ে নয়।

তার ধর্ম দিয়ে নয়।

তার ঠিকানা দিয়ে নয়।

তার স্কুলের নাম দিয়ে নয়।

তার পরিচিতি দিয়ে নয়।

অথচ বাস্তবে যে শিশুর বাবা-মা প্রভাবশালী, তার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা দ্রুত আলোচনায় আসে। আর যে শিশুর বাবা রিকশা চালান, মা গার্মেন্টসে কাজ করেন, অথবা যে শিশু নিজেই ফুটপাতে ফুল বিক্রি করে—তার সন্ধানে অনেক সময় পরিবারকেই মানুষের দরজায় দরজায় ঘুরতে হয়।

এখানেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব আরও বেশি হওয়ার কথা।

কারণ যে শিশুর নিজের হয়ে কথা বলার ক্ষমতা সবচেয়ে কম, রাষ্ট্রের তার হয়ে কথা বলার দায়িত্বই সবচেয়ে বেশি।

৩৪ লাখ শিশুর মধ্যে কতজন নিরাপদ?

UNICEF-এর গবেষণায় পথপরিস্থিতিতে থাকা শিশুদের জীবনে দারিদ্র্য, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা, নির্যাতন, শোষণ ও নিরাপত্তাহীনতার চিত্র উঠে এসেছে। ২০২২ সালের জরিপে প্রায় ১৩ শতাংশ শিশু পরিবারের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন বলে জানিয়েছিল; প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শিশু খোলা বা জনসমাগমস্থলে ঘুমানোর কথা জানিয়েছিল।

আরেকটি UNICEF বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই শিশুরা আনুষ্ঠানিক সুরক্ষা ব্যবস্থার অনেকটাই বাইরে থাকে এবং পাচার ও শোষণের ঝুঁকিও তাদের ক্ষেত্রে বেশি।

তাহলে প্রশ্ন হলো—

এই শিশুদের মধ্যে কতজন নিখোঁজ হয়?

কতজনকে কেউ খোঁজে না?

কতজন অন্য শহরে গিয়ে নতুন নামে, নতুন পরিচয়ে বেঁচে থাকে?

কতজন পাচারের শিকার হয়?

কতজন যৌন নির্যাতনের শিকার হয়?

কতজনের মৃত্যু অজ্ঞাতনামা হিসেবে মর্গে পড়ে থাকে?

কতজনের পরিবার জানতেই পারে না তার সন্তান কোথায়?

এসব প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ উত্তর আমাদের কাছে নেই।

আর এই ‘না-জানা’টাই সবচেয়ে বড় সমস্যা।

শিশুর পরিচয় নয়, শিশুর জীবন গুরুত্বপূর্ণ

রামিসার জীবন গুরুত্বপূর্ণ।

আয়ুশের জীবন গুরুত্বপূর্ণ।

অপ্রতিমের জীবন গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ সেই শিশুটিও, যে কক্সবাজারের সৈকতে মানুষের কাছে হাত পাতে।

ঢাকার ফুটপাতে ঘুমায়।

চট্টগ্রামের রেলস্টেশনে রাত কাটায়।

খুলনার ঘাটে বোতল কুড়ায়।

রাজশাহীর বাজারে ফুল বিক্রি করে।

অথবা কোনো অচেনা শহরের ফুটপাতে দাঁড়িয়ে শুধু মানুষের চলাচল দেখে।

কারণ রাষ্ট্রের কাছে শিশুর মূল্য নির্ধারিত হওয়ার কথা নয় তার সামাজিক অবস্থান দিয়ে।

একজন শিশুর জীবন কোনো শ্রেণিবিন্যাসের বিষয় নয়।

রাজনৈতিক ব্যাখ্যার বাইরে গিয়ে বর্বরতাকে দেখতে হবে

শিশু হত্যা বা ধর্ষণের প্রতিটি ঘটনা রাজনৈতিক ব্যাখ্যার মধ্যে ঢুকিয়ে দিলে অনেক সময় মূল অপরাধটি আড়ালে চলে যায়।

এগুলো প্রথমত বর্বরতা

একটি শিশুর ওপর যৌন সহিংসতা বর্বরতা।

একটি শিশুকে হত্যা করা বর্বরতা।

একটি শিশুকে অপহরণ করা বর্বরতা।

একটি শিশুকে রাস্তায় ফেলে রাখা বর্বরতা।

আর একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর তাকে খুঁজে বের করার রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা দুর্বল থাকা—সেটিও একটি গভীর সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার প্রশ্ন।

রাষ্ট্রের কাছে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন

রাষ্ট্র যদি ১৫,৭১৭ নিখোঁজ শিশুর হিসাব রাখতে পারে, তাহলে পথশিশুদের আলাদা করে শনাক্ত ও ট্র্যাক করা যাবে না কেন?

রাষ্ট্র যদি জানে দেশে লাখ লাখ শিশু সুরক্ষাহীন অবস্থায় রাস্তায় বাস করে, তাহলে তাদের জন্য একটি জাতীয় Child Identification, Missing Child Tracking and Family Tracing System থাকবে না কেন?

কোনো পথশিশু নিখোঁজ হলে তার ছবি, বয়স, শারীরিক বর্ণনা, শেষ অবস্থান, সম্ভাব্য চলাচলের এলাকা—এসব তথ্য কি তাৎক্ষণিকভাবে দেশের সব থানায়, আশ্রয়কেন্দ্রে, রেলস্টেশনে, বাস টার্মিনালে, হাসপাতাল ও শিশু সুরক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছাবে?

এগুলো কোনো বিলাসী দাবি নয়।

এগুলো শিশুর বেঁচে থাকার অধিকার।

শিশু হত্যা
রামিসা, আয়ুশ, অপ্রতিম, জিনিয়া—কয়েকটি নাম, অসংখ্য প্রশ্ন। হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ, নিখোঁজ—আর তাদের মধ্যে সবচেয়ে অসহায় সেই শিশুরা, যাদের হয়ে কথা বলার মতো কেউ নেই।

একদিন হয়তো রামিসার নাম আমরা ভুলে যাব।

আয়ুশের নামও হয়তো সংবাদপত্রের পুরোনো পাতায় চলে যাবে।

অপ্রতিমের ছবিও হয়তো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের টাইমলাইন থেকে হারিয়ে যাবে।

কিন্তু ফুটপাতে যে শিশুটি আজও ঘুমাচ্ছে, তার নাম আমরা হয়তো জানিই না।

সে যদি কাল না থাকে?

কে তার জন্য কথা বলবে?

তার মা হয়তো জানেন না সে কোথায়।

তার বাবা হয়তো থানায় যাওয়ার সামর্থ্য হারিয়েছেন।

তার কোনো স্কুল নেই।

তার কোনো পরিচিত শিক্ষক নেই।

তার কোনো প্রভাবশালী প্রতিবেশী নেই।

তার হয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজার মানুষ পোস্ট করবে—এমন নিশ্চয়তাও নেই।

তাহলে তার রাষ্ট্র কে?

যে শিশুর হয়ে কেউ কথা বলে না, রাষ্ট্রের দায়িত্ব তার ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বেশি।

কারণ রাষ্ট্রের শক্তি প্রমাণ হয় সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে নয়—বরং যে শিশুটির পাশে দাঁড়ানোর মতো আর কেউ নেই, তার পাশে দাঁড়াতে পারার মধ্যে।

আর সেখানেই আমাদের সামনে সবচেয়ে নির্মম প্রশ্নটি থেকে যায়—

শিশুর জীবন কি পরিবারের সামর্থ্য অনুযায়ী মূল্যবান, নাকি প্রতিটি শিশুই সমানভাবে রাষ্ট্রের সন্তান?