Headlines

উগ্রবাদের মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি কি বদলাচ্ছে?

একসময় এদেশে ধর্মীয় উগ্রবাদের দৃশ্যমান চেহারা ছিল বেশ স্পষ্ট— দাড়ি, টুপি, পাঞ্জাবি, ধর্মীয় বক্তৃতা, নির্দিষ্ট জীবনাচরণ এবং প্রকাশ্য ধর্মীয় অনুশাসন। ফলে সমাজে উগ্রবাদী রাজনৈতিক চিন্তাকে চেনার জন্য মানুষের কাছে কিছু প্রচলিত সাংস্কৃতিক সংকেত তৈরি হয়েছিল।

কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশ্বায়ন এবং জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা সেই পুরোনো ছবিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

প্রশ্ন হচ্ছে— উগ্রবাদ কি বদলে যাচ্ছে, নাকি উগ্রবাদের মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি বদলে যাচ্ছে?

কারণ নতুন ধরনের একটি রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক চরিত্রের উপস্থিতি চোখে পড়ছে— যার পোশাক আধুনিক, জীবনযাপন শহুরে, আন্তর্জাতিক সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ আছে, পশ্চিমা বিশ্বের জীবনযাত্রার সুযোগ গ্রহণে আপত্তি নেই; কিন্তু রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শত্রু নির্ধারণের ক্ষেত্রে তার ভাষা কখনো কখনো অত্যন্ত কঠোর ধর্মীয় বর্জনবাদী চিন্তার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে।

এখানেই তৈরি হয় একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য।

আধুনিক জীবনযাপন, কিন্তু পুরোনো ঘৃণার রাজনীতি?

আধুনিক পোশাক পরা, বিদেশে পড়তে বা বসবাস করতে চাওয়া, পশ্চিমা সংস্কৃতির বিভিন্ন সুবিধা গ্রহণ করা কিংবা ব্যক্তিগত জীবনে ধর্মীয় অনুশাসন কঠোরভাবে অনুসরণ না করা— এসব কোনোভাবেই কাউকে উগ্রবাদী বা বিপরীত কিছু করে না। এগুলো ব্যক্তিগত পছন্দ বা অপছন্দ।

কিন্তু কেউ যদি একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রচারে একটি নির্দিষ্ট ধর্ম, জাতি বা দেশের মানুষকে সমষ্টিগতভাবে ঘৃণার বস্তু হিসেবে উপস্থাপন করে; ভারতীয় বা হিন্দু জনগোষ্ঠী, খ্রিস্টান, ইহুদি কিংবা পশ্চিমা সমাজ সম্পর্কে ষড়যন্ত্রমূলক ও বর্জনবাদী ধারণা প্রচার করে— তাহলে সেখানে আলাদাভাবে রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রশ্নটি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

অর্থাৎ উগ্রবাদের পরিচয় পোশাকে নয়, চিন্তা ও রাজনৈতিক আচরণে খুঁজতে হবে।

একজন মানুষ ইউরোপ-আমেরিকার জীবনযাত্রা পছন্দ করতে পারেন এবং একই সঙ্গে পশ্চিমা সমাজের বিরুদ্ধে তীব্র রাজনৈতিক বক্তব্যও দিতে পারেন। তিনি বিদেশে যেতে চাইতে পারেন, আবার আমেরিকা বা ইউরোপীয় রাষ্ট্রের রাজনৈতিক নীতির সমালোচনাও করতে পারেন। এগুলো নিজের মধ্যে পরস্পরবিরোধী নয়।

কিন্তু যখন পশ্চিমা সমাজ, হিন্দু বা ইহুদিদের মতো বিশাল জনগোষ্ঠীকে তাদের ব্যক্তিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে ঘৃণার対象 হিসেবে নির্মাণ করা হয়, তখন সেটি একটি বর্জনবাদী রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

মার্কেটিংয়ের জায়গাটা কোথায়?

এখানেই “মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি” শব্দটি গুরুত্বপূর্ণ।

পুরোনো ধাঁচের ধর্মীয় উগ্রবাদ হয়তো নতুন প্রজন্মের শহুরে, শিক্ষিত ও ডিজিটাল-সংযুক্ত মানুষের কাছে সহজে আকর্ষণীয় নয়। তাই যদি কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শ তার মূল বর্জনবাদী অবস্থান অপরিবর্তিত রেখে ভাষা, মুখ, পোশাক, সাংস্কৃতিক উপস্থাপনা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কৌশল পরিবর্তন করে, তাহলে তার রাজনৈতিক বিপণন কৌশল বদলেছে বলা যেতে পারে।

আগে বার্তাটি হতে ছিলো—

“আমাদের মতো ধর্মীয় জীবনযাপন করো।”

নতুন প্যাকেজিংয়ে সেটি হয়ে যেতে পারে—

“আমরা আধুনিক, আমরা তরুণ, আমরা পরিবর্তনের পক্ষের— কিন্তু আমাদের শত্রু নির্ধারণের রাজনীতি একই থাকবে।”

এখানে ধর্মীয় পরিচয়ের দৃশ্যমানতা কমে যেতে পারে, কিন্তু ‘আমরা বনাম তারা’ বিভাজনটি থেকে যেতে পারে।

জুলাইয়ের পর নতুন মুখের গুরুত্ব

জুলাই আন্দোলনের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে তরুণদের একটি নতুন রাজনৈতিক উপস্থিতি তৈরি হয়েছে। এই প্রজন্মের অনেকেই প্রচলিত দলীয় রাজনীতির বাইরে নিজেদের পরিচয় নির্মাণ করতে চায়। তাদের ভাষা, পোশাক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার এবং রাজনৈতিক উপস্থাপনাও পুরোনো দলগুলোর তুলনায় ভিন্ন।

এই জায়গাটিই পুরোনো রাজনৈতিক শক্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

কারণ রাজনীতিতে শুধু সংগঠন থাকলেই হয় না— গ্রহণযোগ্যতার নতুন ভাষাও প্রয়োজন।

পুরোনো সংগঠন যদি নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছাতে চায়, তাহলে তাকে নতুন মুখ, নতুন ভাষা এবং নতুন সাংস্কৃতিক প্যাকেজ ব্যবহার করতে হতে পারে। সেটি সরাসরি ধর্মীয় ভাষায় না-ও হতে পারে।

তাই প্রশ্নটি আরও নির্দিষ্ট:

পুরোনো উগ্রবাদ কি নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছাতে নিজের দৃশ্যমান পরিচয় পরিবর্তন করছে?

“ধর্ম পালন” আর “উগ্র রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব” এক জিনিস নয়

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য করা জরুরি।

কেউ ধর্ম পালন করেন কি না, কতটা ধর্মীয় পোশাক পরেন, ব্যক্তিগত জীবনে কী করেন— এসব দিয়ে তার রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্ধারণ করা যায় না।

একজন ধর্মনিরপেক্ষ জীবনযাপনকারীও উগ্র জাতীয়তাবাদী হতে পারেন। আবার কঠোর ধর্মীয় জীবনযাপনকারী একজন মানুষ গণতান্ত্রিক ও সহনশীল রাজনৈতিক অবস্থান নিতে পারেন।

তাই অনুসন্ধানের প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়—

“কে কতটা ধার্মিক?”

প্রশ্ন হওয়া উচিত—

“কে কাকে ঘৃণার রাজনৈতিক বস্তু বানাচ্ছে?”

“কোন জনগোষ্ঠীকে সমষ্টিগতভাবে দোষী বা শত্রু হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে?”

“কোন রাজনৈতিক সংগঠন সেই বার্তা ছড়াচ্ছে?”

“কারা সেই বার্তাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় করছে?”

এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—

“নতুন মুখ ও নতুন ভাষার আড়ালে পুরোনো কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শ কি নতুন বাজার তৈরি করছে?”

ভারতবিরোধিতা কি উগ্রবাদের প্রমাণ?

এখানেও পার্থক্য জরুরি।

ভারতের কোনো সরকারের নীতি, সীমান্তনীতি, পররাষ্ট্রনীতি বা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা রাজনৈতিক মতপ্রকাশের স্বাভাবিক অংশ। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা ইসরায়েলের নীতির সমালোচনাও বৈধ রাজনৈতিক অবস্থান হতে পারে।

কিন্তু রাষ্ট্রের নীতির সমালোচনা এবং একটি ধর্মীয় বা জাতিগত জনগোষ্ঠীকে সমষ্টিগতভাবে ঘৃণা করা এক বিষয় নয়।

যখন “ভারতীয় সরকার” থেকে “সব হিন্দু”, “ইসরায়েলি সরকার” থেকে “সব ইহুদি”, অথবা “পশ্চিমা রাষ্ট্রের নীতি” থেকে “সব খ্রিস্টান”—এই ধরনের সমীকরণ তৈরি করা হয়, তখন রাজনৈতিক সমালোচনা পরিচয়ভিত্তিক বিদ্বেষে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।

এই জায়গাটিই উগ্রবাদী রাজনৈতিক প্রচারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

নতুন উগ্রবাদের সম্ভাব্য মার্কেটিং ফর্মুলা

সম্ভাব্য ফর্মুলাটি এমন হতে পারে—

**আধুনিক মুখ

  • তরুণদের ভাষা
  • সোশ্যাল মিডিয়া
  • জনপ্রিয় সংস্কৃতি
  • ব্যক্তিস্বাধীনতার দৃশ্যমানতা
  • “আমরা বনাম তারা” রাজনৈতিক বিভাজন
    = নতুন ধরনের রাজনৈতিক প্যাকেজিং**

এখানে শেষ উপাদানটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ আধুনিকতা যদি কেবল উপস্থাপনার স্তরে থাকে, কিন্তু অন্য ধর্ম, জাতি বা দেশের মানুষের প্রতি রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে সেটি প্রকৃত আদর্শগত পরিবর্তন নয়; বরং হতে পারে পুরোনো মতাদর্শের নতুন বিপণন কৌশল।

তবে এই ধারণা প্রমাণ করতে হলে ব্যক্তিগত জীবন বা পোশাকের দিকে তাকালে চলবে না। দেখতে হবে— কে কী বলছে, কী প্রচার করছে, কার সঙ্গে সংগঠিতভাবে যুক্ত, কোন কনটেন্ট বারবার ছড়াচ্ছে, অর্থ ও প্রচারের উৎস কী এবং রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে তার সম্পর্ক কী।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হতে পারে—

উগ্রবাদ কি সত্যিই আধুনিক হচ্ছে, নাকি শুধু তার মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি আধুনিক হচ্ছে?

হয়তো আগামী দিনের উগ্রবাদী প্রচারণা আর টুপি-পাঞ্জাবি পরে মঞ্চে দাঁড়াবে না। হয়তো তার ভাষা হবে তরুণদের ভাষা, তার প্রচার হবে রিলস ও ফেসবুক পোস্টে, তার মুখ হবে জনপ্রিয় ও আধুনিক, আর তার রাজনৈতিক বার্তা হবে পরিবর্তন ও নতুন বাংলাদেশের কথা।

কিন্তু সেই চকচকে প্যাকেজের ভেতরে যদি একই পুরোনো ঘৃণা, বর্জনবাদ, ষড়যন্ত্রতত্ত্ব এবং “আমরা বনাম তারা” মানসিকতা থেকে যায়, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়—

আমরা কি নতুন কোনো রাজনৈতিক আদর্শ দেখছি, নাকি পুরোনো উগ্রবাদের নতুন মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি দেখছি?