নিজস্ব প্রতিবেদক | FollowUpNews
কুমিল্লায় মাদকবিরোধী অভিযান হচ্ছে। মামলা হচ্ছে, আসামি গ্রেপ্তার হচ্ছে, ইয়াবা-গাঁজা-টাপেন্টাডলসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক উদ্ধারও হচ্ছে। কিন্তু এসব অভিযানের পরও সীমান্ত থেকে মাদক ঢোকা এবং জেলার বিভিন্ন এলাকায় তা ছড়িয়ে পড়া থামছে না। ফলে প্রশ্ন উঠছে— অভিযান হচ্ছে, কিন্তু মাদক নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে কতটা?
সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে কুমিল্লার সীমান্তবর্তী পাঁচ উপজেলার ৪৭টি পয়েন্টকে মাদক পাচারের করিডর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব পথ দিয়ে ইয়াবা, গাঁজা, টাপেন্টাডল, ফেনসিডিল, মদ ও বিয়ারসহ বিভিন্ন মাদক প্রবেশ করছে।
আরও উদ্বেগজনক তথ্য এসেছে চলতি বছরের হিসাবেও। কুমিল্লা জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. বজলুর রহমান নিজেই জানিয়েছেন, জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত ডিএনসির অভিযানে ২৫৬টি মামলা হয়েছে এবং এসব মামলায় ২৮৪ জনকে আসামি করা হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি জনবল ও পরিবহন সংকটের কথাও বলেছেন।
কিন্তু এত মামলা ও গ্রেপ্তারের পরও মাদকের সরবরাহব্যবস্থা কেন অক্ষত থাকছে— সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

সীমান্তে কোটি কোটি টাকার মাদক, ডিএনসির অভিযানে মূলত খুচরা পর্যায়?
কুমিল্লা যে মাদকের গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট রুটে পরিণত হয়েছে, তার প্রমাণ শুধু স্থানীয় অভিযোগে নয়, সীমান্তরক্ষী বাহিনীর উদ্ধারেও মিলছে।
বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, কুমিল্লা সীমান্তে বিভিন্ন সময়ে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় মাদক জব্দ হয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ধ্বংস করা মাদকের মধ্যে ছিল ৩৪ হাজার ২৩৫ বোতল ফেনসিডিল, ৩৪ হাজার ১৭২ বোতল স্কাফ সিরাপ, ১৮ হাজার ৪৯ বোতল ভারতীয় বিয়ার, ৮৪ হাজার ৯৫৮ বোতল হুইস্কি, ২৪ হাজার ৯৮১ কেজি গাঁজা এবং ৩ লাখ ১০ হাজার ৫৪৮ পিস ইয়াবা।
অন্যদিকে ১৮ জুন কুমিল্লার পদুয়ারবাজার এলাকায় জেলা গোয়েন্দা পুলিশ ১ লাখ ৬০ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করে। ইয়াবাগুলোর আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা বলে জানানো হয়।
এখানেই প্রশ্ন— এত বড় চালান কুমিল্লার ভেতর দিয়ে চলাচল করলেও ডিএনসির গোয়েন্দা কার্যক্রম কতটা কার্যকর?
কর্মকর্তাদের কর্মস্থল ও দায়িত্বের খতিয়ান
| কর্মকর্তা | বর্তমান দায়িত্ব | আগের যাচাইযোগ্য কর্মস্থল/পদ | প্রাপ্ত তথ্য |
|---|---|---|---|
| মো. বজলুর রহমান | উপপরিচালক, ডিএনসি কুমিল্লা | ডিএনসি প্রধান কার্যালয়, ঢাকা—উপপরিচালক (অপারেশনস) | কুমিল্লায় যোগদান ২২ জুলাই ২০২৫; এর আগে প্রধান কার্যালয়ের অপারেশনস শাখায় দায়িত্ব পালন করেছেন |
| তুন্ত মনি চাকমা | উপপরিদর্শক, ডিএনসি কুমিল্লা | টেকনাফ বিশেষ জোন, কক্সবাজার—উপপরিদর্শক | ২০২৩ সালে টেকনাফে দায়িত্ব পালনের একাধিক নথি/প্রতিবেদন রয়েছে; একটি মাদক মামলায় তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্বও পালন করেছেন |
তুন্ত মনি চাকমাকে ঘিরে পুরোনো প্রশ্ন
বর্তমান কুমিল্লা ডিএনসির অভিযানে তুন্ত মনি চাকমার নাম পাওয়া যাচ্ছে। ২০২৬ সালের জুনে তার নেতৃত্বে চৌদ্দগ্রামের একটি ট্রাক হোটেলে অভিযান চালিয়ে ২ কেজি গাঁজা উদ্ধারের খবর প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, অভিযানটি উপপরিচালক মো. বজলুর রহমানের নির্দেশনায় পরিচালিত হয়েছিল।
এর আগে ২০২৩ সালে টেকনাফ বিশেষ জোনে দায়িত্ব পালনকালে তুন্ত মনি চাকমা একটি বড় মাদক মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন। ওই মামলায় অভিযানের সময় ৭০০ গ্রাম হেরোইন, ৫৩ হাজার ইয়াবা, আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলি উদ্ধারের কথা এজাহারে উল্লেখ ছিল। পরে মামলার সাত আসামির মধ্যে প্রথম দুই আসামিকে বাদ দিয়ে চার্জশিট দেওয়ায় প্রশ্ন ওঠে। বিষয়টি নিয়ে কক্সবাজার জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভাতেও আলোচনা হয়েছিল বলে সংবাদে উল্লেখ করা হয়।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— তুন্ত মনি চাকমা ওই দুই আসামিকে আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে বাদ দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন। তার বক্তব্য ছিল, তদন্তে তিনি জানতে পারেন অভিযুক্ত দুজন ঘটনার সময় ঢাকায় অবস্থান করছিলেন।
অর্থাৎ ঘটনাটি অভিযোগ ও পাল্টা বক্তব্যের পর্যায়ে রয়েছে; আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছাড়া এটিকে দুর্নীতি বা যোগসাজশের প্রমাণ বলা যাবে না।

বজলুর রহমানের তদারকি নিয়ে প্রশ্ন কেন?
বর্তমান ডিএনসি কুমিল্লা কার্যালয়ের প্রধান হিসেবে মো. বজলুর রহমানের দায়িত্ব শুধু অভিযান পরিচালনার খবর প্রকাশ করা নয়। মাঠপর্যায়ের অভিযান কতটা গোয়েন্দা তথ্যনির্ভর, বড় চালানের উৎস ও গন্তব্য কতটা অনুসরণ করা হচ্ছে, একই কারবারি বারবার কীভাবে সক্রিয় হচ্ছে এবং সীমান্তের চিহ্নিত রুটগুলোতে ডিএনসির নিজস্ব গোয়েন্দা নজরদারি কতটা কার্যকর— এসবেরও জবাবদিহি তার দপ্তরের ওপর বর্তায়।
ডিএনসির সরকারি ওয়েবসাইটে বর্তমানে কুমিল্লা কার্যালয়ের সর্বশেষ খবর হিসেবে ৩০ কেজি গাঁজা, ৮ হাজার ২৫টি ইয়াবা এবং ১ কেজি গাঁজা উদ্ধারের অভিযানসহ বিভিন্ন অভিযানের তথ্য রয়েছে।
কিন্তু উদ্ধারকৃত মাদকের তালিকা যত দীর্ঘ হচ্ছে, একই সঙ্গে যদি জেলার বাজারে মাদক সহজলভ্য থাকে, তাহলে সাফল্যের মাপকাঠি কী— উদ্ধারের পরিমাণ, নাকি মাদক সরবরাহের চেইন ভেঙে দেওয়া?
‘অফিসের সঙ্গে কারবারিদের যোগসাজশ’— অভিযোগের ভিত্তি কোথায়?
কুমিল্লায় মাদক কারবারিদের সঙ্গে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কিছু সদস্যের যোগসাজশ রয়েছে— এমন অভিযোগ স্থানীয় পর্যায়ে আলোচিত হলেও, বর্তমান উপপরিচালক বজলুর রহমান বা তার অধীন কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এমন যোগসাজশ আদালত বা সরকারি তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে— এমন নথি এই অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি।
তবে তুন্ত মনি চাকমাকে ঘিরে ২০২৩ সালের চার্জশিট-সংক্রান্ত বিতর্ক এবং বর্তমানে তারই নেতৃত্বে কুমিল্লায় অভিযান পরিচালনার বিষয়টি অবশ্যই জনস্বার্থে পুনরায় খতিয়ে দেখার দাবি রাখে।
একইভাবে, বজলুর রহমানের সঙ্গে তুন্ত মনি চাকমার ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক ‘মূল সহযোগী’ সম্পর্ক রয়েছে— এমন দাবির স্বাধীন প্রমাণও এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে ডিএনসির বদলি আদেশ, দায়িত্ব বণ্টন, অভিযান-রেজিস্টার, মামলা-তদন্তের নথি এবং কর্মকর্তাদের পারস্পরিক দায়িত্বের নথি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

FollowUpNews-এর প্রশ্ন
১. জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত ২৫৬টি মামলার মধ্যে কতটি মামলায় মূল সরবরাহকারী বা হোলসেলার শনাক্ত হয়েছে?
২. কতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যারা আগে থেকেই ডিএনসির নজরদারি তালিকায় ছিল?
৩. কুমিল্লা সীমান্তের চিহ্নিত ৪৭টি মাদক প্রবেশপথের মধ্যে ডিএনসির নিজস্ব গোয়েন্দা তালিকায় কয়টি ‘হটস্পট’ রয়েছে?
৪. বড় চালান উদ্ধারের পর উৎস, অর্থের লেনদেন ও গন্তব্য অনুসন্ধানে কয়টি পৃথক তদন্ত হয়েছে?
৫. ১ লাখ ৬০ হাজার ইয়াবার মতো বড় চালান জেলা পুলিশের হাতে ধরা পড়লেও ডিএনসির গোয়েন্দা ইউনিট আগে থেকে কী তথ্য পেয়েছিল?
৬. ডিএনসির মামলায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে কতজন পরে জামিনে বেরিয়ে আবার একই ব্যবসায় ফিরেছে?
৭. তুন্ত মনি চাকমার টেকনাফের ২০২৩ সালের বিতর্কিত চার্জশিট নিয়ে ডিএনসির অভ্যন্তরে কোনো তদন্ত, বিভাগীয় অনুসন্ধান বা পর্যালোচনা হয়েছিল কিনা?
৮. বজলুর রহমান কুমিল্লায় যোগ দেওয়ার পর তার অধীন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো লিখিত অভিযোগ এসেছে কিনা?
৯. এ ধরনের অভিযোগ এলে তদন্তের দায়িত্ব কার ওপর দেওয়া হয়?
১০. মাদক উদ্ধার হচ্ছে— কিন্তু মাদক সরবরাহের নেটওয়ার্ক ভাঙছে কি?
উপপরিচালকের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে— এমন দাবি এই প্রতিবেদনে করা হচ্ছে না। বরং প্রশ্নটি আরও সরল: এক বছরের বেশি সময় ধরে জেলা ডিএনসির নেতৃত্বে থাকার পরও যদি সীমান্ত দিয়ে বিপুল মাদক ঢোকে, শহর ও গ্রামে তা সহজলভ্য থাকে এবং বড় চালান একের পর এক ধরা পড়ে— তাহলে মাদক নিয়ন্ত্রণের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করবে কে?
