১৩০ একর খাসজমিতে ৮৭ প্লট, বাতিল ৫৯— আদালতে সরকারের জয় ৫৭টিতে; গণপূর্তের ২২৪ আবাসিক প্লটের ৩৬টিতে বাণিজ্যিক ব্যবহারও ধরা পড়ে অডিটে | দখল-উচ্ছেদ চলছে, আবার রাতের আঁধারে ফিরছে দখলদার।
কক্সবাজার প্রতিনিধি
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত শুধু পর্যটনের কেন্দ্র নয়, এটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সরকারি ভূমির একটি। সৈকতের কলাতলী, সুগন্ধা ও লাবণী পয়েন্ট ঘিরে বছরের পর বছর ধরে চলছে সরকারি খাসজমি, হোটেল-মোটেল জোনের বাতিল ইজারা, গণপূর্তের আবাসিক প্লট, বাণিজ্যিক ব্যবহার, অবৈধ স্থাপনা এবং দখল-বেদখলের এক জটিল হিসাব।
কাগজপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, সৈকতসংলগ্ন জমির সবটুকু একই ধরনের সরকারি জমি নয়। কোথাও জেলা প্রশাসনের ১ নম্বর খাস খতিয়ানের জমি, কোথাও গৃহায়ন ও গণপূর্তের আবাসিক প্লট, আবার কোথাও অতীতে দেওয়া ইজারা আদালতের রায়ে বাতিল হয়ে পুনরায় সরকারের নিয়ন্ত্রণে এসেছে। এই বিভাজনই তৈরি করেছে সৈকতের জমি ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বড় জটিলতা।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বলছে, পুরোনো সেই জটিলতা এখনো কাটেনি। বরং শত শত কোটি টাকা মূল্যমানের সরকারি জমি দখলের চেষ্টা নতুন করে সামনে এসেছে।
১৩০ একর খাসজমিতে ৮৭ প্লট
জেলা প্রশাসনের তথ্য এবং আদালত-সংক্রান্ত নথির ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, সৈকতসংলগ্ন প্রায় ১৩০ একর সরকারি খাসজমি নিয়ে ২০০৩ সালে হোটেল-মোটেল জোন গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ওই জমিকে ৮৭টি প্লটে ভাগ করে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে ৯৯ বছরের জন্য ইজারা দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু ইজারার শর্ত অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ না করাসহ বিভিন্ন শর্তভঙ্গের অভিযোগ ওঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১০ সালের ১২ জানুয়ারি জেলা প্রশাসন ৫৯টি প্লটের ইজারা বাতিল করে।
ইজারা বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইজারাগ্রহীতারা আদালতে যান। প্রায় এক দশকের আইনি লড়াইয়ের পর উচ্চ আদালতের রায়ে ৫৭টি প্লটের ক্ষেত্রে সরকারের সিদ্ধান্ত বহাল থাকে। ২০১৯ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, এর মধ্যে তখন পর্যন্ত ৫০টি প্লট জেলা প্রশাসন বুঝে নিয়েছিল। প্রতিটি প্লটের আয়তন ছিল প্রায় এক একর।
অর্থাৎ, যে জমি একসময় দীর্ঘমেয়াদি ইজারায় ব্যক্তির হাতে দেওয়া হয়েছিল, আদালতের রায়ের পর তার বড় অংশ আবার সরকারের নিয়ন্ত্রণে ফিরে আসে।
বাতিল প্লটের বাজারমূল্য হাজার কোটি টাকা
২০১৯ সালে জেলা প্রশাসনের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রথম আলো জানিয়েছিল, বাতিল হওয়া ৫৭টি প্লটের বাজারমূল্য তখনই প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা ছিল। এর বড় অংশ সুগন্ধা ও কলাতলী সড়কের আশপাশে হওয়ায় এসব জমির ওপর দখলদারদের আগ্রহও ছিল প্রবল।
বর্তমানে জমির বাজারমূল্য কত— এ নিয়ে নতুন কোনো সরকারি মূল্যায়ন পাওয়া যায়নি। ফলে সাম্প্রতিক সংবাদে ৫০০ কোটি বা তার বেশি যে মূল্য উল্লেখ করা হয়েছে, সেটিকে সরকারি নির্ধারিত মূল্য না ধরে বাজারভিত্তিক অনুমান হিসেবে দেখা উচিত।
গণপূর্তের ২২৪ প্লটের আলাদা হিসাব
সৈকতের জমির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত আবাসিক এলাকা।
মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের অডিট রিপোর্টে বলা হয়েছে, ১৯৯০ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত আবাসিক এলাকায় মোট ২২৪টি আবাসিক প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু এখানেও উঠে আসে বাণিজ্যিক ব্যবহারের প্রশ্ন।
অডিটে দেখা যায়, ওই আবাসিক প্লটগুলোর মধ্যে ৩৬ জন বরাদ্দগ্রহীতা তাদের প্লট হোটেল, মোটেল ও গেস্টহাউস হিসেবে ব্যবহার করছিলেন। নিরীক্ষাদল সরেজমিন পরিদর্শন করে এর সত্যতাও পায়।
অডিটে এসব প্লটের বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য মোট ১ কোটি ৯৬ লাখ ২৬ হাজার ৪৮ টাকা কনভার্শন ফি আদায়যোগ্য বলে উল্লেখ করা হয়।
অর্থাৎ, একই সৈকত এলাকায় একদিকে জেলা প্রশাসনের খাসজমি নিয়ে দখল-বেদখল, অন্যদিকে গণপূর্তের আবাসিক প্লট বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের পুরোনো হিসাবও রয়েছে।
তাহলে সৈকতের জমি কার?
এখানেই মূল বিভ্রান্তি।
সৈকতের প্রতিটি জমিকে এক কথায় ‘ডিসির জমি’ বা ‘গণপূর্তের জমি’ বলা যায় না।
জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে থাকা ১ নম্বর খাস খতিয়ানের জমি এক ধরনের সরকারি সম্পত্তি। আবার গণপূর্তের আবাসিক এলাকার প্লট আলাদা প্রশাসনিক ব্যবস্থার আওতায়। আর ২০০৩ সালে ইজারা দেওয়া হোটেল-মোটেল জোনের যেসব প্লট পরবর্তী সময়ে বাতিল হয়েছে, সেগুলোর বড় অংশ আদালতের রায়ের পর আবার সরকারের নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
আরও জটিলতা তৈরি হয়েছে ভূমি ব্যবহারের অনুমোদন নিয়ে। ২০১৯ সালের একটি প্রতিবেদনে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত এলাকার প্লট ব্যবহারের ক্ষেত্রে বলা হয়েছিল, গণপূর্তের বরাদ্দকৃত কিছু প্লট আবাসিক হিসেবে চিহ্নিত থাকলেও ২০১৩ সালের মাস্টার প্ল্যানে কলাতলী–সুগন্ধা পয়েন্ট সড়কসংলগ্ন এলাকা পর্যটন সুবিধা জোন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ফলে প্লটের পুরোনো বরাদ্দ ও বর্তমান ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনার মধ্যে জটিলতা তৈরি হয়।
অর্থাৎ—
জমির মালিকানা এক বিষয়, জমির ব্যবস্থাপনা আরেক বিষয়, আর জমিতে কী ধরনের স্থাপনা করা যাবে— সেটি আবার আলাদা বিষয়।
দখল থামছে না
পুরোনো নথি ও সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো পাশাপাশি রাখলে দেখা যায়, সরকারি জমি দখলের প্রবণতা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়।
২০২৫ সালের জুনে কলাতলী হোটেল-মোটেল জোনের সুগন্ধা পয়েন্টে প্রায় ২ দশমিক ৩০ একর সরকারি খাসজমিতে গড়ে ওঠা শতাধিক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে জেলা প্রশাসন, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও পৌরসভা। ওই জমি নিয়ে ব্যক্তি মালিকানার দাবি তোলা হলেও সরকারি নথিতে সেটি খাসজমি হিসেবে থাকার কথা উঠে আসে।
এর আগেও ওই জমির দাবিদার হিসেবে যার নাম সামনে এসেছিল, তার নামে ৭৯০০ খতিয়ান সৃষ্টির অভিযোগ ওঠে। কউকের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, জমি ব্যবহারের অনুমতির আবেদন যাচাই করতে গিয়ে কাগজপত্রে অসঙ্গতি ও জালিয়াতির অভিযোগ ধরা পড়ে এবং কউক জেলা প্রশাসন ও ভূমি অফিসকে ব্যবস্থা নিতে চিঠি দেয়।
২০২৬: রাতের আঁধারে আবার দখল
এই ধারাবাহিকতার সর্বশেষ উদাহরণ ২০২৬ সালের আগস্ট।
সুগন্ধা পয়েন্টে সৈকতে প্রবেশের রাস্তার পাশে রাতের আঁধারে টিন ও বাঁশের বেড়া দিয়ে কয়েক একর সরকারি জমি ঘিরে ফেলার ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে দখল করা জমির পরিমাণ প্রায় পাঁচ থেকে অন্তত ১০ একর বলা হয়েছে। অর্থাৎ ঘটনাস্থলের প্রকৃত পরিমাণ সরকারি জরিপে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, রাতের মধ্যে ৩০–৪০ জন শ্রমিক দ্রুত ওই এলাকা ঘিরে ফেলেন। পরে বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে উত্তেজনা তৈরি হয় এবং বেড়ার একটি অংশ ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে।
১৬ আগস্ট জেলা প্রশাসন অভিযান চালিয়ে ওই ঘেরাও সরিয়ে জমি দখলমুক্ত করে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়, সরকারি জমিতে নতুন করে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ দেওয়া হবে না এবং দখলের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কিছু প্রতিবেদনে জমিটির বাজারমূল্য প্রায় ৫০০ কোটি টাকা বলা হয়েছে। তবে এটিও সরকারি মূল্যায়ন নয়; স্থানীয় ও সংবাদমাধ্যমের হিসাব। সরকারি মূল্যায়ন ছাড়া এই অঙ্ককে চূড়ান্ত বাজারমূল্য হিসেবে ধরা ঠিক হবে না।
বাতিল প্লট, নতুন দখল— পুরোনো সমস্যার নতুন রূপ
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, ২০২৬ সালের এই দখলচেষ্টার সঙ্গে আবারও উঠে এসেছে বাতিল হয়ে যাওয়া হোটেল-মোটেল জোনের প্লটের প্রসঙ্গ।
অর্থাৎ যে জমির ইজারা বাতিল হয়েছে, যে জমি আদালতের রায়ের মাধ্যমে সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা, সেই জমিই আবার নতুন করে দখলের লক্ষ্য হচ্ছে।
এতে প্রশ্ন উঠছে— শুধু উচ্ছেদ করলেই কি সরকারি জমি রক্ষা সম্ভব?
কারণ ২০২৫ সালে ২ দশমিক ৩০ একর জমি উদ্ধার হয়েছে, ২০২৬ সালে আবার কয়েক একর জমি রাতারাতি ঘেরাও হয়েছে। মাঝখানে বাতিল প্লট, অবৈধ দোকান, হোটেল-রেস্তোরাঁ, ঝুপড়ি স্থাপনা এবং বাণিজ্যিক ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।
সৈকতের জমির পূর্ণাঙ্গ হিসাব কোথায়?
নথিপত্রের এই দীর্ঘ ইতিহাস একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে—
লাবণী থেকে সুগন্ধা হয়ে কলাতলী পর্যন্ত সৈকতসংলগ্ন সরকারি জমির বর্তমান পূর্ণাঙ্গ হিসাব কি এক জায়গায় আছে?
কোন দাগে কত একর ১ নম্বর খাস খতিয়ানের জমি?
কোনটি গণপূর্তের?
কোনটি অতীতে ইজারা দেওয়া হয়েছিল?
কোন প্লট বাতিল হয়েছে?
কোন প্লট আদালতের রায়ে সরকারের কাছে ফিরেছে?
কোন জমি এখনো মামলাাধীন?
কোন জমিতে বৈধ স্থাপনা আছে?
কোন স্থাপনা অবৈধ?
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—
সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা জমির কতটুকু বর্তমানে অন্যের দখলে বা বাণিজ্যিক ব্যবহারে আছে?
এই প্রশ্নগুলোর পূর্ণাঙ্গ উত্তর ছাড়া সৈকতের সরকারি জমি রক্ষার উদ্যোগ বারবার উচ্ছেদ অভিযানে সীমাবদ্ধ থাকবে।
দখলদার বদলায়, জমি একই থাকে
কক্সবাজারের সৈকতসংলগ্ন সরকারি জমির ইতিহাসে রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের ছাপও স্পষ্ট। ২০০৩ সালে সরকারি খাসজমিতে হোটেল-মোটেল জোনের নামে প্লট বরাদ্দ, পরে শর্তভঙ্গের অভিযোগে বরাদ্দ বাতিল, দীর্ঘ আদালত লড়াই, সরকারের পক্ষে রায়, এরপর আবার সেই জমি দখলের চেষ্টা— ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতা দেখায়, সমস্যাটি কেবল একজন দখলদারের নয়।
সমস্যাটি হলো সরকারি জমির দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা ও নজরদারির দুর্বলতা।
একদিকে কোটি কোটি টাকা মূল্যের জমি উদ্ধার করে সাইনবোর্ড লাগানো হচ্ছে, অন্যদিকে কিছুদিন পর আবার সেখানে টিনের বেড়া উঠছে। কোথাও দোকান, কোথাও রেস্তোরাঁ, কোথাও স্থাপনা— কখনো রাজনৈতিক পরিচয়, কখনো পুরোনো ইজারা, কখনো ব্যক্তিগত কাগজপত্রের দাবি সামনে আসছে।
সৈকতের জমি রক্ষায় তাই শুধু উচ্ছেদ নয়, প্রয়োজন দাগ-খতিয়ানভিত্তিক একটি প্রকাশ্য সরকারি ভূমি-তালিকা।
সেখানে লেখা থাকবে—
দাগ নম্বর | খতিয়ান | জমির পরিমাণ | মালিকানা | ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ | ইজারা/বরাদ্দ | বর্তমান ব্যবহার | মামলা | দখলমুক্ত কি না।
তাহলেই স্পষ্ট হবে— কক্সবাজার সৈকতের কোন জমি সত্যিই খাস, কোনটি গণপূর্তের, কোনটি বাতিল বরাদ্দের এবং কোথায় সরকারি জমির ওপর বেসরকারি দখল বা বাণিজ্যিক ব্যবহার চলছে।
নইলে পৃথিবীর দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকতের পাশে সরকারি জমির এই হিসাব কাগজেই জটিল থেকে যাবে— আর মাঠে বারবার দেখা যাবে একই দৃশ্য:
রাতে দখল, দিনে উচ্ছেদ।
গণপূর্তের জমিতে অবৈধ স্থাপনার অভিযোগও কক্সবাজারে নতুন নয়। কলাতলীর গণপূর্তের কো-অপারেটিভ হাউজিং এলাকার প্রায় সাড়ে ৭ একর জমিতে আদালতের স্থিতাবস্থা আদেশের পরও স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। ২০২৬ সালের আগস্টে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ওই এলাকায় ইউরেকা গেস্ট হাউসসহ বিভিন্ন হোটেল, কটেজ, রেস্টুরেন্ট ও দোকানের অস্তিত্বের কথা উঠে আসে। এর আগে ২০২৫ সালে গণপূর্তের আবাসিক ভবন বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের অভিযোগে আল ফাতাহ রিসোর্ট, হোটেল একুশের নীড়, ওয়াটার প্যারাডাইস রিসোর্ট, ওশান ফ্রেন্ড, সমুদ্র বাড়ি ও হোটেল দ্য গ্র্যান্ড স্যান্ডির নামও প্রকাশ্যে আসে। ফলে সৈকতসংলগ্ন গণপূর্তের জমি ও স্থাপনা ব্যবহারের ক্ষেত্রে বরাদ্দের শর্ত, অনুমোদন এবং বাণিজ্যিক ব্যবহারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
সরকারি জমিতে অবৈধ বা অনুমোদনবহির্ভূত স্থাপনা রাতারাতি গড়ে ওঠে না। নির্মাণের শুরু থেকে ব্যবহার পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মাঠপর্যায়ের নজরদারি থাকার কথা। তাহলে গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলীরা এসব স্থাপনা সম্পর্কে কখন অবগত হয়েছেন, কী ব্যবস্থা নিয়েছেন এবং ব্যবস্থা নেওয়ার পরও কীভাবে সেগুলো টিকে থাকল— এই প্রশ্নগুলোর জবাব এখন জরুরি।
গণপূর্তের জমির মতো কক্সবাজারের জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণাধীন সরকারি খাস জমি নিয়েও রয়েছে গুরুতর প্রশ্ন। সমুদ্রসৈকতসংলগ্ন কলাতলী, সুগন্ধা ও লাবণী এলাকার বিভিন্ন সরকারি খাস জমিতে বছরের পর বছর ধরে হোটেল, রিসোর্ট, গেস্টহাউস, রেস্তোরাঁ, দোকানসহ নানা ধরনের বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে ওঠার অভিযোগ রয়েছে। অথচ জেলা প্রশাসনের রাজস্ব শাখার দায়িত্বের মধ্যেই রয়েছে কৃষি ও অকৃষি খাস জমির ব্যবস্থাপনা, খাস জমির বন্দোবস্ত এবং সরকারি জমি সংরক্ষণ ও উদ্ধারের কার্যক্রম।
প্রশ্ন হচ্ছে— জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণাধীন জমিতে এসব স্থাপনা কীভাবে গড়ে উঠল? জমি দখল বা সীমানা পরিবর্তনের সময় সংশ্লিষ্ট ভূমি কর্মকর্তারা কী ব্যবস্থা নিয়েছিলেন? কোনো জমি যদি অবৈধভাবে দখল হয়ে থাকে, তাহলে দখলদারদের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ বা আইনগত ব্যবস্থা নিতে এত সময় লাগল কেন? আর যেসব স্থাপনা বছরের পর বছর ধরে দৃশ্যমানভাবে বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে, সেগুলোর জমির খতিয়ান, দাগ, বন্দোবস্তের শর্ত এবং ব্যবহার অনুমোদন জেলা প্রশাসন কখনো যাচাই করেছে কিনা— এসব প্রশ্নেরও জবাব প্রয়োজন।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কক্সবাজারের সরকারি নথিতেই বিপুলসংখ্যক বেসরকারি হোটেল-মোটেল-গেস্টহাউসের তালিকা রয়েছে। ফলে সৈকত এলাকার প্রতিটি বড় স্থাপনার ক্ষেত্রে জমিটির প্রকৃত মালিকানা, খাস খতিয়ান, বন্দোবস্তের ইতিহাস এবং বর্তমান ব্যবহার— এসব তথ্য প্রকাশ করা হলে স্পষ্ট হবে কোন স্থাপনা বৈধ বন্দোবস্তের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, কোনটি ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে এবং কোনটির বিরুদ্ধে সরকারি জমি দখল বা শর্তভঙ্গের অভিযোগ রয়েছে।
অতএব প্রশ্নটি শুধু ‘কার জমিতে কে স্থাপনা করেছে’— এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রশ্ন হলো, জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণাধীন সরকারি জমিতে একটি স্থাপনা গড়ে ওঠার পর সেটি বছরের পর বছর টিকে থাকার পেছনে সংশ্লিষ্ট ভূমি প্রশাসনের নজরদারি কতটা কার্যকর ছিল এবং কোথাও দায়িত্বে অবহেলা, নীরব প্রশ্রয় বা প্রশাসনিক ব্যর্থতা ছিল কিনা।
