Headlines

আমানা টেক্সটাইলের বন্ড রেকর্ডে দুই অঙ্কের রাজস্ব দাবি, লাইসেন্স Active—হিসাবের ব্যাখ্যা কী?

দক্ষিণ বন্ড কমিশনারেট

চার বছরে মাত্র ৪.৭৮ মিলিয়ন ডলারের রপ্তানি, ৩২৫ কর্মীর তথ্য; পুরোনো দাবির বর্তমান অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন

ফলোআপ নিউজ | অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় অবস্থিত আমানা টেক্সটাইলের বন্ড-সংক্রান্ত সরকারি রেকর্ডে রাজস্ব দাবির অঙ্ক নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, ঢাকা (দক্ষিণ)-এর পুরোনো একটি Demand তালিকায় প্রতিষ্ঠানটির নামে ৬৫ হাজার ২৫০ টাকার দাবি উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে, কমিশনারেটের বর্তমান অনলাইন কোম্পানি অনুসন্ধান তালিকায় একই বন্ড লাইসেন্সের বিপরীতে ২ লাখ ৬৩ হাজার ৩৬৭ টাকা ৭৮ পয়সা অঙ্ক প্রদর্শিত হচ্ছে। তালিকায় লাইসেন্সের অবস্থা ‘Active’।

অন্যদিকে, বেসরকারি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যতথ্যভান্ডার Trademo-এর হিসাবে, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আমানা টেক্সটাইলের নামে ১৩৪টি আমদানি চালান এবং ১৭৪টি রপ্তানি চালানের তথ্য রয়েছে। এসব চালানের ঘোষিত বাণিজ্যমূল্য যথাক্রমে ৪.৪৩ মিলিয়ন ও ৪.৭৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (BGMEA)-এর সদস্যতথ্যে প্রতিষ্ঠানটির ৩২৫ জন কর্মী, ১১৩টি মেশিন এবং বার্ষিক ১ লাখ ৮৮ হাজার ৭৫০ ডজন উৎপাদন সক্ষমতার উল্লেখ রয়েছে।

ব্যবসার এই পরিধির বিপরীতে বন্ড-সংক্রান্ত রাজস্ব দাবির প্রকৃত অবস্থা কী, পুরোনো দাবির অঙ্ক কেন বর্তমান তালিকার অঙ্কের সঙ্গে মিলছে না এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নিয়েছে— এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে নথিভিত্তিক অনুসন্ধান প্রয়োজন।

দক্ষিণ বন্ড কমিশনারেট
কাল্পনিক ফাইল।

আমদানি ৪.৪৩ মিলিয়ন, রপ্তানি ৪.৭৮ মিলিয়ন ডলার

Trademo-এর প্রকাশিত বাণিজ্যতথ্য অনুযায়ী, আলোচিত সময়কালে আমানা টেক্সটাইলের নামে ১৩৪টি আমদানি চালানের বিপরীতে ৪.৪৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাণিজ্যমূল্য দেখানো হয়েছে। একই সময়ে ১৭৪টি রপ্তানি চালানের বিপরীতে প্রদর্শিত মূল্য ৪.৭৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

সূচক প্রকাশিত তথ্য
তথ্যের সময়কাল জানুয়ারি ২০২২–সেপ্টেম্বর ২০২৫
আমদানি চালান ১৩৪টি
আমদানির বাণিজ্যমূল্য ৪.৪৩ মিলিয়ন ডলার
রপ্তানি চালান ১৭৪টি
রপ্তানির বাণিজ্যমূল্য ৪.৭৮ মিলিয়ন ডলার

উৎস: Trademo—M/S Amana Textile।

Trademo-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির আমদানির মধ্যে বোনা কাপড়ের উল্লেখ রয়েছে। চীনসহ কয়েকটি দেশ থেকে পণ্য সংগ্রহ এবং স্পেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইতালি ও নিউজিল্যান্ডসহ বিভিন্ন বাজারে রপ্তানির তথ্যও প্ল্যাটফর্মটিতে দেখা যায়।

তবে এসব তথ্য বেসরকারি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যতথ্যভান্ডারের সমন্বিত হিসাব। এগুলো বাংলাদেশের কাস্টমসের প্রত্যয়িত চালানভিত্তিক বিবরণী নয়। ফলে প্রকৃত আমদানি-রপ্তানি, শুল্কমুক্ত বন্ড সুবিধায় আমদানির পরিমাণ এবং রপ্তানি-সংক্রান্ত দায় যাচাই করতে সরকারি নথি প্রয়োজন।

৩২৫ কর্মী, ১১৩টি মেশিন: উৎপাদন সক্ষমতার তথ্য

BGMEA-এর সদস্যতথ্যে আমানা টেক্সটাইলের নিবন্ধন নম্বর ৫৯৩৬। সেখানে প্রতিষ্ঠানের প্রোপ্রাইটর হিসেবে খন্দকার শাইফুল ইসলামের নাম উল্লেখ রয়েছে। ঠিকানা আমানা কমপ্লেক্স, মাসদাইর, গোরস্থান মোড়, ফতুল্লা, নারায়ণগঞ্জ।

সংগঠনটির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির কর্মীসংখ্যা ৩২৫, মেশিন ১১৩টি এবং বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ১ লাখ ৮৮ হাজার ৭৫০ ডজন। প্রধান রপ্তানিযোগ্য পণ্য হিসেবে টি-শার্ট ও পোলো শার্টের উল্লেখ রয়েছে।

উৎস: BGMEA—Amana Textile Member Details।

তবে ৩২৫ জন কর্মীর তথ্যটি বর্তমান শ্রমিকসংখ্যা কিনা, তা নিশ্চিত নয়। কারখানার হালনাগাদ শ্রমিক তালিকা, শ্রম অধিদপ্তরের নথি এবং উৎপাদনসংক্রান্ত রেকর্ডের সঙ্গে তা মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

২০১৫ সালের তালিকায় ৬৫,২৫০ টাকা

কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, ঢাকা (দক্ষিণ)-এর ২০১৫ সালের Demand-সংক্রান্ত একটি তালিকায় আমানা টেক্সটাইলের নামে ৬৫ হাজার ২৫০ টাকার দাবি উল্লেখ রয়েছে। সেখানে লাইসেন্স নম্বর 507/CUS-PBW/97 এবং সার্কেল ১১-এর তথ্যও রয়েছে।

অন্যদিকে, কমিশনারেটের বর্তমান অনলাইন কোম্পানি অনুসন্ধান তালিকায় একই লাইসেন্স নম্বরের বিপরীতে ২৬৩,৩৬৭.৭৮ টাকা অঙ্ক প্রদর্শিত হচ্ছে। একই রেকর্ডে লাইসেন্সের অবস্থা ‘Active’ এবং লাইসেন্স-সংক্রান্ত তারিখ হিসেবে ৮ এপ্রিল ২০২৪ ও ১১ ডিসেম্বর ২০২৭-ও দেখানো হয়েছে।

উৎস:

দুটি তালিকার অঙ্কের পার্থক্য ১ লাখ ৯৮ হাজার ১১৭ টাকা ৭৮ পয়সা। কিন্তু এই পার্থক্য নতুন করে দাবি আরোপ, হিসাব সংশোধন, পৃথক কোনো দাবি কিংবা অন্য কোনো কারণে হয়েছে কি না, তা প্রকাশিত তথ্য থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যও রয়েছে: কোনো তালিকায় দাবি উল্লেখ থাকা মানেই সেই অর্থ বর্তমানে অনাদায়ি— এমন নয়। একইভাবে, লাইসেন্স Active থাকা মানেই সব রাজস্ব দায় নিষ্পত্তি হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যায় না। কিন্তু ছোট ছোট অঙ্কের এ দাবীগুলো প্রতিষ্ঠানের সাথে অফিসারদের সমঝোতা কিনা সেটিই বড় প্রশ্ন।

নতুন বন্ড সুবিধা পেয়েছে কি?

লাইসেন্স Active দেখানো হলেও প্রতিষ্ঠানটি সাম্প্রতিক সময়ে নতুন কোনো বন্ড সুবিধা, লাইসেন্স নবায়ন, আমদানি অনুমোদন কিংবা অন্য কোনো প্রশাসনিক সুবিধা পেয়েছে কিনা, তার সুনির্দিষ্ট অনুমোদনপত্র এখনো পাওয়া যায়নি।

লাইসেন্সের রেকর্ডে ২০২৪ ও ২০২৭ সালের তারিখ থাকলেও সেগুলোর সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক অর্থ এবং বর্তমান লাইসেন্স-স্থিতির সঙ্গে সম্পর্ক সংশ্লিষ্ট নথি দেখে নিশ্চিত করতে হবে।

তাই অনুসন্ধানের পরবর্তী ধাপে লাইসেন্স নবায়নের আদেশ, সর্বশেষ বন্ড অডিট, Demand Register, রাজস্ব আদায়ের রেকর্ড এবং নতুন কোনো সুবিধা দেওয়া হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট অনুমোদনপত্র সংগ্রহ করা জরুরি।

বন্ড কমিশনারেটের কাছে যেসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন

১. ২০১৫ সালের তালিকায় থাকা ৬৫,২৫০ টাকার দাবির বর্তমান অবস্থা কী?

২. বর্তমান কোম্পানি অনুসন্ধান তালিকায় ২,৬৩,৩৬৭.৭৮ টাকা প্রদর্শনের ভিত্তি কী? এটি কি পুরোনো দাবির সংশোধিত অঙ্ক, নাকি পৃথক কোনো দাবি?

৩. আমানা টেক্সটাইলের নামে বর্তমানে মোট কত টাকা রাজস্ব দাবি অনিষ্পন্ন রয়েছে?

৪. সর্বশেষ বন্ড অডিটে কোনো আপত্তি, ঘাটতি বা রাজস্ব-সংক্রান্ত অনিয়ম শনাক্ত হয়েছে কি? হয়ে থাকলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?

৫. প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স Active রাখার ক্ষেত্রে কোনো অনিষ্পন্ন দাবি, আপিল বা স্থগিতাদেশ বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে কি?

৬. ২০২৪ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি নতুন কোনো বন্ড সুবিধা বা লাইসেন্স-সংক্রান্ত অনুমোদন পেয়ে থাকলে, তার তারিখ ও আইনগত ভিত্তি কী?

৭. প্রতিষ্ঠানটির সরকারি আমদানি-রপ্তানি বিবরণী, বন্ড সুবিধায় আমদানির পরিমাণ এবং হালনাগাদ শ্রমিকসংখ্যা কত?

উল্লেখ্য, প্রশ্নের প্রাথমিক উত্তরদাতা হিসেবে ফাইল সংশ্লিষ্ট সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মোঃ আফজাল হোসেনের সন্ধান পাওয়া গেছে।

নথির ব্যাখ্যা চায় ফলোআপ নিউজ

আমানা টেক্সটাইলের বাণিজ্যতথ্য, উৎপাদন সক্ষমতা এবং বন্ড-সংক্রান্ত সরকারি রেকর্ড মিলিয়ে দেখার ক্ষেত্রে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। বিশেষ করে, পুরোনো Demand তালিকার অঙ্ক ও বর্তমান কোম্পানি অনুসন্ধান তালিকার অঙ্কের সম্পর্ক এবং লাইসেন্সের বর্তমান অবস্থার ব্যাখ্যা প্রয়োজন।

ফলোআপ নিউজের অনুসন্ধানের লক্ষ্য হলো, রাজস্ব দাবির প্রকৃত অবস্থা, বন্ড সুবিধার শর্ত এবং লাইসেন্স পরিচালনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা সরকারি নথির ভিত্তিতে যাচাই করা। এ বিষয়ে বন্ড কমিশনারেট ও প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।