নিজস্ব প্রতিবেদক
চামড়া শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিকের বড় চালান আমদানি করছে হেমায়েতপুরের আইয়ুব ব্রাদার্স ট্যানারি লিমিটেড। ২০১১ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি ঢাকা দক্ষিণ কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের বন্ড সুবিধার আওতায়। অথচ প্রশ্ন উঠছে— বন্ড সুবিধায় আমদানি করা এসব রাসায়নিকের শেষ গন্তব্য কোথায়?
প্রতিষ্ঠানটির বন্ড লাইসেন্স নম্বর 736/CUS-PBW/2011, ইস্যুর তারিখ ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১১। ঢাকা দক্ষিণ কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের বর্তমান অনলাইন তথ্য অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি এখনো Active। সেখানে SCN demand শূন্য দেখানো হয়েছে। একই রেকর্ডে ২০২৫ সালের ২৮ আগস্টের একটি তারিখ এবং ২০২৬ সালের ২৮ আগস্টের আরেকটি তারিখও রয়েছে, যা বন্ড-সংক্রান্ত পরবর্তী যাচাই/নবায়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত।
অর্থাৎ প্রায় দেড় দশক ধরে প্রতিষ্ঠানটি বন্ড ব্যবস্থার আওতায় ব্যবসা করছে। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ে কত পরিমাণ কাঁচামাল বন্ড সুবিধায় ঢুকেছে, কতটা উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়েছে, কতটা রপ্তানির সঙ্গে সমন্বয় হয়েছে এবং কতটা অবশিষ্ট থাকার কথা— এই পূর্ণ হিসাব প্রকাশ্য নথিতে স্পষ্ট নয়।
আর এখানেই অনুসন্ধানের মূল প্রশ্ন।
এক চালানেই ৪০ টন Chromosal B
প্রকাশ্য আন্তর্জাতিক শিপমেন্ট ডাটায় দেখা যায়, ২০২৪ সালের ১ জুলাই দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আইয়ুব ব্রাদার্সের নামে Chromosal B-এর দুই কনটেইনার আসে। প্রতিটি কনটেইনারে ৮০০টি করে ২৫ কেজির ব্যাগ— অর্থাৎ মোট প্রায় ৪০ মেট্রিক টন। পণ্যটি Durban থেকে Chattogram বন্দরে এসেছে।
এর আগে ও পরেও প্রতিষ্ঠানটির নামে leather-processing chemicals আমদানির তথ্য রয়েছে।
২০২৪ সালের ১৬ মার্চের একটি চালানে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ২৮ মেট্রিক টন Wattle Extract—Mimosa-SD Powder, Osprey Brand আমদানি করা হয়। একই ডাটায় ২০২৩ সালের ডিসেম্বরেও Wattle Extract-এর চালান দেখা যায়।
ভারত থেকেও প্রতিষ্ঠানটি LIPIDOL UC 111 এবং LIPIDOL DA 112-এর মতো leather-treatment chemicals আমদানি করেছে। ২০২১ ও ২০২২ সালেও LIPIDOL UC 111-এর চালানের তথ্য রয়েছে।
অর্থাৎ এটি এককালীন আমদানির ঘটনা নয়; leather-processing chemical-এর নিয়মিত আমদানি-চক্রের প্রমাণ রয়েছে।
প্রশ্ন হলো— এসব রাসায়নিক যায় কোথায়?
ট্যানারিতে রাসায়নিকের ব্যবহার অস্বাভাবিক কিছু নয়। চামড়া প্রক্রিয়াজাত করতে chromium sulphate, syntans, surfactants, degreasers, lime, sodium sulphide, formic acidসহ বহু ধরনের chemical ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশের ট্যানারি শিল্পে ২০০টিরও বেশি ধরনের রাসায়নিক ব্যবহারের কথা শিল্পসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
কিন্তু বন্ড সুবিধার ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন।
বন্ড সুবিধায় আমদানি করা কাঁচামাল সাধারণ বাজারের পণ্য নয়। এগুলো নির্দিষ্ট শর্ত ও হিসাবের আওতায় আমদানি করা হয়। ফলে আমদানির পর পণ্যের ব্যবহার, মজুত, উৎপাদনে খরচ, wastage এবং রপ্তানির সঙ্গে সমন্বয়— প্রতিটি ধাপের হিসাব গুরুত্বপূর্ণ।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে:
৪০ টন Chromosal B কোথায় গেল?
২৮ টন Wattle Extract-এর কতটা উৎপাদনে ব্যবহার হলো?
LIPIDOL-এর আমদানিকৃত চালানগুলোর কতটা consumption দেখানো হয়েছে?
কতটা stock থাকার কথা?
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—
আইয়ুব ব্রাদার্সের নিজস্ব উৎপাদনের বাইরে এসব chemical অন্য কোনো ট্যানারি বা স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের কাছে সরবরাহ করা হয়েছে কিনা?
শত শত ট্যানারিতে রাসায়নিকের জোগান আসে কোথা থেকে?
এই প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে বাজারের বাস্তবতা বিবেচনায়।
বাংলাদেশের ট্যানারি শিল্পে রাসায়নিকের সরবরাহ একটি বড় বাণিজ্যিক চেইন। ২০২২ সালে বন্দরে chemical আটকে যাওয়ায় দেশের একাধিক ট্যানারি উৎপাদন সংকটে পড়েছিল বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। সেই প্রতিবেদনে Ayub Brothers-সহ কয়েকটি ট্যানারির chemical চালান বন্দরে আটকে থাকার কথাও উল্লেখ করা হয়।
অর্থাৎ রাসায়নিকের চাহিদা রয়েছে এবং এর একটি সক্রিয় স্থানীয় বাজারও রয়েছে।
তাহলে অনুসন্ধানের প্রশ্ন দাঁড়ায়—
আইয়ুব ব্রাদার্স নিজের উৎপাদনের প্রয়োজনের তুলনায় কতটা chemical আমদানি করে?
আমদানি করা chemical-এর consumption statement কী বলে?
তাদের production capacity কত?
বন্ডের stock register-এ কতটা আছে?
এবং অন্য ট্যানারি যদি আইয়ুব ব্রাদার্সের কাছ থেকে chemical পেয়ে থাকে, সেই সরবরাহের আইনি ভিত্তি কী?
এখানে কোনো প্রতিষ্ঠানকে অবৈধ সরবরাহকারী বা কোনো ট্যানারিকে অবৈধ ক্রেতা হিসেবে চিহ্নিত করার আগে কাস্টমসের UD/UP, stock register, consumption statement, delivery challan, transfer permission এবং audit file দেখা জরুরি।
অডিট হয়েছে— কিন্তু ফলাফল কোথায়?
ঢাকা দক্ষিণ কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের ওয়েবসাইটে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক তথ্যের মধ্যে SCN Demand, Audit, GB ও Renewal-এর মতো ঘর রাখা হয়েছে। আইয়ুব ব্রাদার্সের বর্তমান রেকর্ডে প্রতিষ্ঠানটি Active এবং SCN Demand শূন্য দেখাচ্ছে।
কিন্তু একটি বন্ড প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে শুধু “অডিট হয়েছে” বা একটি তারিখ থাকা যথেষ্ট নয়।
অডিটের আসল প্রশ্ন হওয়া উচিৎ:
অডিটে কী পাওয়া গেছে?
কত টাকার কাঁচামাল যাচাই হয়েছে?
কত টাকার ঘাটতি পাওয়া গেছে?
কোনো wastage excess পাওয়া গেছে কিনা?
কোনো স্থানীয় বিক্রয় বা অননুমোদিত transfer ধরা পড়েছে কিনা?
কোনো duty-tax demand তৈরি হয়েছে কিনা?
কোনো audit objection নিষ্পত্তি হয়েছে কিনা?
কোনো SCN জারি হয়েছে কি না?
আর যদি সবকিছু ঠিকঠাকই থাকে, তাহলে সেই অডিটের ফলাফল ও reconciliation report কোথায়?
প্রকাশ্য অনলাইন ডাটাবেজে প্রতিষ্ঠানটির Active status ও SCN demand শূন্য থাকার তথ্য পাওয়া যায়; কিন্তু সেখান থেকে অডিটে কী কী যাচাই হয়েছে বা কী ফলাফল এসেছে, তা জানা যায় না।
ফলে “অডিটের নামে কিছুই হয় না”— এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার আগে অডিট ফাইল বের করা জরুরি। বরং প্রশ্নটি আরও ধারালো:
বছরের পর বছর অডিট যদি হয়ে থাকে, তাহলে সেই অডিটে আমদানি করা chemical-এর প্রতিটি কেজির হিসাব কতটা দৃশ্যমান?
৪১ শ্রমিকের ট্যানারি, বিপুল chemical আমদানি
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের LIMA ডাটাবেজে Ayub Brothers Tannery Ltd.-কে নিবন্ধিত ট্যানারি হিসেবে দেখানো হয়েছে। ঠিকানা YS-28+ZS-17, চামড়া শিল্প নগরী, হেমায়েতপুর। নিবন্ধনের মেয়াদ ৩ জুলাই ২০২৭ পর্যন্ত এবং নিবন্ধিত শ্রমিকসংখ্যা ৪১ জন।
৪১ জন শ্রমিকের তথ্য দিয়ে অবশ্যই প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত উৎপাদনক্ষমতা নির্ধারণ করা যায় না। কিন্তু এখানেও একটি যাচাইযোগ্য প্রশ্ন তৈরি হয়ঃ
প্রতিষ্ঠানটির ঘোষিত উৎপাদনক্ষমতা, বার্ষিক leather production এবং chemical consumption-এর সঙ্গে আমদানির পরিমাণ কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ?
এই তিনটি তথ্য পাশাপাশি না রাখলে বন্ড ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র বোঝা সম্ভব নয়।
রপ্তানিও আছে
আইয়ুব ব্রাদার্স যে leather উৎপাদন ও রপ্তানি করে, তার নথিও রয়েছে।
EPB-এর exporter database-এ প্রতিষ্ঠানটি Leather exporter হিসেবে নিবন্ধিত এবং HS Code 4107-এর leather export-এর তথ্য রয়েছে। EPB-এর রেকর্ডটি ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ আপডেট করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক trade-data platform Volza-তে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির ৩২টি export shipment এবং ৯ জন buyer-এর তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
২০২৩ সালের সরকারি Department of Livestock Services-এর veterinary health certificate-এ Ayub Brothers-কে consignor এবং ভিয়েতনামের Nguyen Hong Trade Production Leather Joint Stock Company-কে consignee হিসেবে দেখানো হয়েছে।
অর্থাৎ প্রশ্নটি রপ্তানি হয় কিনা— সেখানে নয়।
প্রশ্ন হলোঃ
রপ্তানির পরিমাণের সঙ্গে বন্ড সুবিধায় আনা chemical-এর consumption কতটা মেলে?
ব্যাংকের lien-ও রয়েছে
ঢাকা দক্ষিণ কাস্টমসের lien-bank database-এ Ayub Brothers Tannery Ltd.-এর নামে একাধিক ব্যাংকের lien entry রয়েছে।
২৮ আগস্ট ২০২৫ তারিখের এন্ট্রিতে Al-Arafah Islami Bank Ltd., Hazaribagh Branch এবং Bangladesh Krishi Bank, Chak Bazar Branch-এর নাম পাওয়া যায়। একই লাইসেন্স নম্বর 736/CUS-PBW/2011 ব্যবহার করা হয়েছে।
পরিচালনা নিয়ে তথ্যেও পার্থক্য
আরেকটি বিষয়ও যাচাইয়ের দাবি রাখে।
Bangladesh Tanners Association-এর সদস্য তালিকায় Ayub Brothers Tannery Ltd.-এর Managing Director হিসেবে Md. Monir Hossan-এর নাম রয়েছে।
অন্যদিকে EPB-এর exporter database-এ বর্তমানে Managing Director হিসেবে Nasima Akhter-এর নাম দেখানো হয়েছে। EPB-এর রেকর্ড ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ আপডেট হয়েছে।
এটি মালিকানা বা অনিয়মের প্রমাণ নয়। তবে RJSC নথির মাধ্যমে জানতে হবে— পরিচালনা পরিবর্তন হয়েছে কিনা এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার ডাটাবেজে তথ্য হালনাগাদে এমন পার্থক্য কেন রয়েছে।
আসল হিসাবটি তাহলে কোথায়?
আইয়ুব ব্রাদার্সের ক্ষেত্রে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নথি কোনো সংবাদ প্রতিবেদন নয়— কাস্টমসের bond file।
সেখানে খুঁজতে হবে:
১. ২০১১ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত বন্ডে অনুমোদিত entitlement;
২. পণ্যভিত্তিক UD/UP;
৩. Wattle Extract, Chromosal B, Chromium Sulphate, Lipidol ইত্যাদির আমদানি পরিমাণ;
৪. প্রতিটি চালানের CIF value ও duty-free সুবিধার পরিমাণ;
৫. Production/consumption statement;
৬. Wastage allowance বনাম actual wastage;
৭. Stock register;
৮. Export declaration ও export quantity;
৯. স্থানীয় বাজারে কোনো sale/transfer permission নেওয়া হয়েছে কিনা;
১০. অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে chemical transfer হয়ে থাকলে কোন আইনি ব্যবস্থায় হয়েছে;
১১. সর্বশেষ bond audit report;
১২. audit objection, SCN, demand বা recovery থাকলে তার পরিমাণ ও নিষ্পত্তির অবস্থা।
এই ১২টি নথি পাশাপাশি বসানো গেলেই বোঝা যাবে— বন্ড সুবিধায় আনা chemical আসলে কোথায় গেছে।
আইয়ুব ব্রাদার্সকে নিয়ে অনুসন্ধানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তাই শুধু “তারা কী আমদানি করে” নয়।
মূল প্রশ্ন:
বন্ড সুবিধায় আমদানি করা রাসায়নিকের হিসাব কি কাগজে-কলমে শেষ হয়ে যায়, নাকি প্রতিটি কেজির বাস্তব ব্যবহার ও গন্তব্যও অনুসরণ করা হয়?
কারণ একটি বন্ড প্রতিষ্ঠানের অডিটের সাফল্য শুধু একটি “Audit” তারিখ দিয়ে মাপা যায় না। অডিটের ফলাফল যদি আমদানি → stock → production → wastage → export—এই পুরো চেইনকে পরিষ্কার না করে, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়।
আর সেই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ:
আইয়ুব ব্রাদার্সের নামে বন্ড সুবিধায় আসা chemical যদি তাদের নিজস্ব production-এই ব্যবহৃত হয়ে থাকে, তাহলে তার consumption ও export-এর পূর্ণ হিসাব কোথায়? আর যদি অন্য ট্যানারিতে গিয়ে থাকে— কোন অনুমতিতে, কার কাছে, কত পরিমাণে?
এই উত্তরগুলোই নির্ধারণ করবে বন্ড সুবিধা শুধু রপ্তানিমুখী উৎপাদনকে সহায়তা করছে, নাকি তার বাইরে আরেকটি স্থানীয় chemical supply chain-ও তৈরি হয়েছে।
