
ডেলিভারির ব্যথা উঠলে সাংবাদিকের কাছে যাবেন— চিকিৎসকের এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্যও কি জবাবদিহির বাইরে থাকবে?
একজন মা সন্তান জন্ম দিতে হাসপাতালে গেলেন। ফিরে এলেন না। পাঁচ মাসের একটি শিশু এখন মায়ের মুখ চিনে বড় হবে স্মৃতির ছবিতে। আর তার পরিবারের অভিযোগ— সন্তান জন্মদানের সেই অস্ত্রোপচারের সময় চিকিৎসকদের অবহেলার কারণেই ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে গেছেন বিথী আক্তার।
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের ২৫ বছর বয়সী বিথী ছিলেন একজন ডিপ্লোমা মিডওয়াইফ নার্স। গত ৬ মে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে কন্যাসন্তানের জন্ম দেন তিনি। পরিবারের অভিযোগ, অস্ত্রোপচারের সময় তার পেটের ভেতরে গজ রেখে সেলাই করে দেওয়া হয়।
অভিযোগটি সত্য কিনা, সেটি তদন্তের বিষয়। কিন্তু এরপরের ঘটনাপ্রবাহ প্রশ্নটি আরও গুরুতর করে তুলেছে।
অপারেশনের পর থেকেই বিথী তীব্র শারীরিক যন্ত্রণা ও নানা জটিলতায় ভুগছিলেন বলে জানিয়েছে তার পরিবার। প্রায় দুই মাস পর, ১৫ জুলাই তাকে আবারও বড় ধরনের অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। অবস্থার অবনতি হলে তাকে আইসিইউতেও রাখা হয়। শেষ পর্যন্ত উন্নত চিকিৎসার আশায় ৪ অক্টোবর তাকে নেওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
সেখানেই বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর সকাল সাড়ে ৮টার দিকে মৃত্যু হয় তার।
একটি নবজাতক সন্তান পৃথিবীতে এসেছে— কিন্তু সেই শিশুটির পৃথিবী থেকে তার মা হারিয়ে গেলেন মাত্র পাঁচ মাসের মাথায়।
এখন প্রশ্ন, বিথীর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী?
শুধু পরিবারের অভিযোগ দিয়ে তার উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। প্রয়োজন চিকিৎসা-নথি পর্যালোচনা, অস্ত্রোপচারের রেকর্ড, ব্যবহৃত উপকরণের হিসাব, পরবর্তী অস্ত্রোপচারের কারণ, প্যাথলজি ও অন্যান্য পরীক্ষার রিপোর্ট, ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি ও চিকিৎসার নথি এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের বক্তব্য।
প্রয়োজন একটি নিরপেক্ষ তদন্ত।
কারণ চিকিৎসার ক্ষেত্রে ভুলের অভিযোগ আর চিকিৎসাজনিত জটিলতা— দুটি এক বিষয় নয়। কিন্তু কোনো রোগীর অস্ত্রোপচারের পর যদি এমন গুরুতর জটিলতা তৈরি হয়, যার সঙ্গে অস্ত্রোপচারের সময়ের কোনো ত্রুটির অভিযোগ জড়িয়ে থাকে, তাহলে সেটি তদন্ত না করে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
বিথী একা নন— প্রশ্নটি পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে নিয়ে
বাংলাদেশে রোগী যখন হাসপাতালে যান, তখন তিনি শুধু চিকিৎসা কিনতে যান না; নিজের জীবন চিকিৎসকের দক্ষতা, সততা ও সিদ্ধান্তের ওপর অর্পণ করেন।
অস্ত্রোপচারের টেবিলে থাকা একজন রোগী জানেন না তার শরীরের ভেতরে কী হচ্ছে। পরিবারও সবসময় জানে না কোন ওষুধ কেন দেওয়া হচ্ছে, কোন পরীক্ষা কেন করা হচ্ছে কিংবা অস্ত্রোপচারের সময় কী কী ব্যবহার করা হয়েছে।
এই জায়গাটিই চিকিৎসাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় আস্থার জায়গা।
আর সেই আস্থার জায়গায় যখন অবহেলার অভিযোগ ওঠে, তখন প্রশ্নটি শুধু একজন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অভিযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রশ্ন ওঠে— হাসপাতালের তদারকি কোথায় ছিল? অপারেশন থিয়েটারের প্রটোকল মানা হয়েছিল কিনা? ব্যবহৃত গজ, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য সামগ্রীর হিসাব কীভাবে রাখা হয়? অস্ত্রোপচারের পর জটিলতা দেখা দিলে তার কারণ অনুসন্ধানে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল?
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন— অভিযোগ উঠলে রোগী বা তার পরিবার কোথায় যাবে?
‘ডেলিভারির ব্যথা উঠলে সাংবাদিকের কাছে যাবেন’— এই বক্তব্যের দায় কে নেবে?

এই প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হয় চিকিৎসকসমাজের একটি অংশের আচরণ নিয়েও বিতর্ক।
এক চিকিৎসকের বক্তব্য হিসেবে উদ্ধৃত হয়েছে— “ডেলিভারির ব্যথা উঠলে সাংবাদিকের কাছে যাবেন।”
একজন চিকিৎসক কেন এমন কথা বলবেন— সেটি আলাদা প্রশ্ন। কিন্তু বক্তব্যটির অন্তর্নিহিত বার্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা জরুরি।
রোগী চিকিৎসকের কাছে যাবেন, নাকি সাংবাদিকের কাছে— এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হওয়াটাই কি স্বাভাবিক?
একজন প্রসূতি যখন প্রসববেদনায় হাসপাতালে যান, তখন তার প্রথম অধিকার নিরাপদ ও সম্মানজনক চিকিৎসা পাওয়া। সাংবাদিকের কাছে গিয়ে চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে— এমন ধারণা কোনো সুস্থ স্বাস্থ্যব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য হতে পারে না।
আর যদি কোনো রোগী বা তার পরিবার মনে করে, চিকিৎসা পাওয়ার জন্য তাদের আগে সংবাদমাধ্যমের দ্বারস্থ হতে হবে, তাহলে সেটি শুধু একজন চিকিৎসকের বক্তব্যের সমস্যা নয়; এটি স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থার সংকটের ইঙ্গিত।
চিকিৎসকের কাছে রোগী প্রশ্ন করতে পারেন। রোগী তার চিকিৎসার ব্যাখ্যা চাইতে পারেন। চিকিৎসার নথি চাইতে পারেন। দ্বিতীয় মতামত নিতে পারেন। অভিযোগ করতে পারেন। প্রয়োজনে আইনি প্রতিকার চাইতে পারেন।
কিন্তু সাংবাদিকের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন কেন হবে?
এই প্রশ্নের উত্তর চিকিৎসকসমাজ ও হাসপাতাল প্রশাসনকেই দিতে হবে।
চিকিৎসকও মানুষ, ভুলও হতে পারে— কিন্তু জবাবদিহি কি থাকবে না?
চিকিৎসাবিজ্ঞানে সব মৃত্যু অবহেলার কারণে হয় না। সর্বোচ্চ চিকিৎসা দেওয়ার পরও রোগী মারা যেতে পারেন। অস্ত্রোপচারে জটিলতা হতে পারে। প্রসবের সময় আকস্মিক বিপদও তৈরি হতে পারে।
তাই কোনো রোগীর মৃত্যুকে দেখেই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অবহেলার রায় দিয়ে দেওয়া ঠিক নয়।
কিন্তু একইভাবে চিকিৎসার নামে কোনো ভুল, অবহেলা বা প্রটোকল ভঙ্গের অভিযোগ উঠলে সেটিকে ‘চিকিৎসার জটিলতা’ বলে এড়িয়ে যাওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়।
দুই প্রান্তের মাঝখানেই রয়েছে তদন্ত।
বিথীর পরিবারের অভিযোগের ক্ষেত্রেও তাই প্রয়োজন আবেগের বদলে প্রমাণের পরীক্ষা।
অপারেশনের দিন কী হয়েছিল?
অপারেশন নোটে কী লেখা আছে?
কতটি গজ ব্যবহার করা হয়েছিল?
অপারেশন শেষে গজের হিসাব মিলেছিল কি?
পরবর্তীতে কেন দ্বিতীয় অস্ত্রোপচার করতে হয়েছিল?
দ্বিতীয় অস্ত্রোপচারের সময় কী পাওয়া গিয়েছিল?
বিথীর শারীরিক অবনতির প্রকৃত কারণ কী ছিল?
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসকরা কী কারণ নথিভুক্ত করেছেন?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করতে পারে— এটি একটি দুর্ভাগ্যজনক চিকিৎসাজনিত জটিলতা, নাকি চিকিৎসা অবহেলার ঘটনা।
বিথীর শিশুটির জন্যও জবাব প্রয়োজন
বিথীর স্বামী রাকিবুল ইসলাম বলেছেন, চিকিৎসকসহ সংশ্লিষ্টদের অবহেলার কারণেই তার স্ত্রীর মৃত্যু হয়েছে বলে তারা মনে করছেন এবং এ ঘটনায় মামলা করবেন।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, অস্ত্রোপচারের পর শারীরিক অসুস্থতার কারণে বিথী নিজের নবজাতক সন্তানকে ঠিকমতো কোলে তুলে নেওয়ার সুযোগও পাননি।
এখন সেই শিশুটির বয়স পাঁচ মাস।
তার মায়ের মৃত্যুর দায় কার— এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো আজই পাওয়া যাবে না। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যব্যবস্থার দায়িত্ব হলো অন্তত এতটুকু নিশ্চিত করা যে, কোনো পরিবারের এমন অভিযোগ তদন্তহীন অবস্থায় পড়ে থাকবে না।
কারও বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে অভিযোগ প্রমাণ করা যেমন অনুচিত, তেমনি প্রভাবশালী পেশার আড়ালে অভিযোগ চাপা পড়ে যাওয়াও অনুচিত।

তদন্ত চাই— শাস্তির জন্য নয়, সত্যের জন্য
বিথীর পরিবার দায়ীদের শাস্তি চেয়েছে। উপজেলা প্রশাসনও বিষয়টি তদন্তের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে।
এখন প্রয়োজন কথার চেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ।
স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত হোক।
অস্ত্রোপচারের সব নথি সংরক্ষণ করা হোক।
বিথীর চিকিৎসার পুরো টাইমলাইন প্রকাশ করা হোক।
সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য নেওয়া হোক।
প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিয়ে মেডিকেল রিভিউ বোর্ড গঠন করা হোক।
অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। আর অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সেটিও স্পষ্টভাবে জানানো হোক।
কারণ একজন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অভিযোগ মানেই চিকিৎসক অপরাধী নন।
কিন্তু একজন রোগীর মৃত্যুর পর গুরুতর অভিযোগ ওঠার পরও তদন্ত না হওয়া মানে স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাকে আরও দুর্বল করা।
বিথীর মৃত্যু তাই শুধু একটি পরিবারের শোকের গল্প নয়।
এটি একটি প্রশ্ন—
হাসপাতালে জীবন বাঁচানোর জন্য যাওয়া একজন মানুষের যদি চিকিৎসা-ব্যবস্থার মধ্যেই মৃত্যুর অভিযোগ ওঠে, তাহলে সেই অভিযোগের শেষ আশ্রয় কোথায়?
আর যদি কোনো চিকিৎসক রোগীকে বলেন— “ডেলিভারির ব্যথা উঠলে সাংবাদিকের কাছে যাবেন”, তাহলে আরও বড় প্রশ্ন দাঁড়ায়—
চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার কি হাসপাতালেই নিশ্চিত হবে, নাকি বাংলাদেশের রোগীকে তার চিকিৎসার অধিকার আদায় করতেও সংবাদমাধ্যমের দ্বারস্থ হতে হবে?
বিথীর মৃত্যুর নিরপেক্ষ তদন্তের মধ্য দিয়ে অন্তত এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া জরুরি।
