আহমাদুল্লাহ হুজুর যা বলেছেনঃ
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে ব্যয় হয়েছিল ২২০ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির নির্বাহী পরিচালক ডেভিড বিসলি বলেছেন, মাত্র ৪০ বিলিয়ন ডলার হলেই প্রতি বছর পৃথিবীর ৮২ কোটি ৮০ লাখ ক্ষুধার্ত মানুষের খাদ্যচাহিদা পূরণ করা সম্ভব। একদিকে কোটি কোটি ক্ষুধার্ত মানুষ, অন্যদিকে অনর্থক এক খেলার পেছনে চলছে গোটা পৃথিবীর সম্মিলিত উন্মাদনা। এই উন্মাদনা প্রমাণ করে, মনুষ্যত্বের মর্যাদা আমরা অনেক আগেই হারিয়ে ফেলেছি। পৃথিবী জুড়ে এখন কেবলই মনুষ্যত্ব-বিবর্জিত ‘খোলস-মানুষের’ বসবাস। …. বাংলাদেশের আহমাদুল্লাহ নামের একজন মুসলিম তার জনপ্রিয় পেজে এটি লিখেছেন, যেটি ভাইরাল হয়। তুমি উদাহরণ সহ বুঝুিয়ে দাও এই ওয়াজ নসিহত করা হুজুর আসলে অথর্থনীতি ঠিকমতো বোঝেননি।

প্রথমেই একটি তথ্যগত ভুল ধরা দরকার।
জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির নির্বাহী পরিচালক David Beasley ৪০ বিলিয়ন ডলার দিয়ে “বিশ্বের সব ক্ষুধা চিরতরে শেষ করা যাবে”—এমন কথা বলেননি। তিনি বলেছিলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্ব ক্ষুধা নির্মূলে প্রতি বছর প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত বিনিয়োগ প্রয়োজন। আর ২০২১ সালে তিনি ৬ থেকে ৬.৬ বিলিয়ন ডলারের এককালীন সহায়তার কথা বলেছিলেন, যা ৪২ মিলিয়ন দুর্ভিক্ষ-ঝুঁকিতে থাকা মানুষকে তাৎক্ষণিকভাবে বাঁচাতে সাহায্য করতে পারে।
এখন আসি অর্থনীতির বিষয়ে।
১. বিশ্বকাপের ২২০ বিলিয়ন ডলার “পুড়িয়ে ফেলা” হয়নি
কাতার বিশ্বকাপের ব্যয়ের বড় অংশ ব্যয় হয়েছে অবকাঠামো নির্মাণে।
- নতুন মেট্রোরেল
- বিমানবন্দর সম্প্রসারণ
- রাস্তা
- হোটেল
- নগর উন্নয়ন
এসব বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পরও কাতারের মানুষ বহু বছর ব্যবহার করবে।
ধরুণ, বাংলাদেশ পদ্মা সেতুতে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেছে। কেউ যদি বলে, “এই টাকা দিয়ে গরিবদের খাওয়ানো যেত”—কথাটি আংশিক সত্য, কিন্তু সেতুটি আবার অর্থনৈতিক উৎপাদনও বাড়ায়। একইভাবে কাতারের অবকাঠামোও ভবিষ্যতে আয় সৃষ্টি করবে।
২. ক্ষুধার প্রধান সমস্যা টাকা নয়
অনেক দেশে খাদ্য আছে, কিন্তু মানুষ না খেয়ে থাকে।
উদাহরণ:
- Yemen
- Sudan
- South Sudan
এসব জায়গায় যুদ্ধ, দুর্নীতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়াই ক্ষুধার প্রধান কারণ।
আজ যদি কেউ ৪০ বিলিয়ন ডলার দিয়ে দেয়, কাল যুদ্ধ শুরু হলে আবার মানুষ অনাহারে পড়বে।
৩. খেলাধুলা অর্থনীতির অংশ
বিশ্বকাপ শুধু ২২ জনের খেলা নয়।
এটার সঙ্গে যুক্ত থাকে:
- নির্মাণশ্রমিক
- হোটেল কর্মী
- বিমান পরিবহন
- পর্যটন
- বিজ্ঞাপন শিল্প
- টেলিভিশন সম্প্রচার
- রেস্তোরাঁ ব্যবসা
অর্থাৎ লাখ লাখ মানুষের চাকরি ও আয় হয়।
যদি পৃথিবী সব বিনোদন খাত বন্ধ করে দেওয়া, তাহলে সেই খাতের কোটি কোটি কর্মীই বেকার হয়ে যাবে। আর ফুটবলের চেয়ে স্বস্তায় গরীবদের জন্য নির্মল বিনোদন আর কী হতে পারে?
৪. একই যুক্তি অন্য ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা যায়
যদি বিশ্বকাপ বন্ধ করা উচিৎ হয় কারণ পৃথিবীতে ক্ষুধার্ত মানুষ আছে, তাহলে—
- সিনেমা বানানোও বন্ধ করা উচিত;
- মোবাইল ফোন কেনাও বন্ধ করা উচিত;
- হজ বা ওমরাহর/তীূর্থ ভ্রমণের বিশাল ব্যয়ও বন্ধ করা উচিত;
- বিলাসবহুল উপাসনালয় নির্মাণও বন্ধ করা উচিৎ।
কিন্তু আমরা জানি বাস্তব জীবন এভাবে চলে না।
মানুষ একই সঙ্গে অর্থনীতি চালায়, বিনোদন করে, দানও করে।
৫. সবচেয়ে বড় ভুল: মানুষের আনন্দকে মনুষ্যত্বহীনতা বলা
কেউ বিশ্বকাপ দেখছে মানেই সে ক্ষুধার্ত মানুষের কষ্ট নিয়ে উদাসীন—এটা প্রমাণ হয় না।
বাস্তবে দেখা যায়:
- অনেক ফুটবলপ্রেমী দানও করেন;
- অনেক খেলোয়াড় মানবিক কাজেও অর্থ দেন;
- অনেক ক্লাব ও সংস্থা ত্রাণ কার্যক্রম চালায়।
অর্থাৎ খেলা উপভোগ করা এবং মানবিক হওয়া—দুটি পরস্পরবিরোধী বিষয় নয়।
সংক্ষেপে
আহমাদুল্লাহ সাহেবের বক্তব্যের মূল সমস্যা হলো তিনি ধরে নিয়েছেন:
“বিশ্বকাপের টাকা = ক্ষুধার্তদের খাবারের টাকা”
কিন্তু অর্থনীতিতে টাকা এভাবে এক খাত থেকে তুলে অন্য খাতে সরিয়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হয় না। বিশ্ব ক্ষুধার মূল কারণ উৎপাদনের অভাব নয়; বরং যুদ্ধ, দুর্নীতি, রাজনৈতিক ব্যর্থতা, দুর্বল প্রতিষ্ঠান এবং বৈষম্য। আর বিশ্বকাপের বড় অংশের ব্যয় হলো দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো বিনিয়োগ, যা ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি করে।
তাই এই পোস্টটি নৈতিক/অনৈতিক আবেগ জাগাতে সক্ষম হলেও, অর্থনীতির দৃষ্টিতে এটি একটি “ফলস চয়েস”—যেন আমাদের সামনে শুধু দুটি পথ: বিশ্বকাপ অথবা ক্ষুধার্ত মানুষ। বাস্তবে পৃথিবী অনেক বেশি জটিল।
