আর্থিক সংকট, ব্যাংক অর্থায়নের ঘাটতি ও নতুন ক্রয়াদেশের অনিশ্চয়তার কথা বলে পাঁচ কারখানা বন্ধ; অথচ বন্ধের ৫১ থেকে ৬১ দিন পরও Apparel-21-এর নামে রপ্তানি চালানের রেকর্ড— পুরোনো অর্ডারের পণ্য, নাকি অন্য কারখানায় উৎপাদন?
নিজস্ব প্রতিবেদক | FollowUpNews
আর্থিক সংকট, গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন, রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়া এবং ব্যাংক থেকে সময়মতো অর্থায়ন না পাওয়ার কথা জানিয়ে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে লিথি গ্রুপের পাঁচটি তৈরি পোশাক কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। বন্ধ হওয়া কারখানাগুলোর মধ্যে রয়েছে Apparel-21 Ltd., Famcom Fashion Ltd., Famcom Dyeing Ltd., Famcom Printing Ltd. এবং Famcom Knitting Ltd. এ ঘটনায় প্রায় ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার শ্রমিক-কর্মচারী কর্মহীন হয়ে পড়েন বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু কারখানা বন্ধের পরও Apparel-21 Ltd.-এর নামে রপ্তানি চালানের রেকর্ড পাওয়া যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য তথ্যভান্ডার 52wmb-তে ২০২৬ সালের ২১ আগস্ট থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন তারিখে প্রতিষ্ঠানটির নামে ১৫টি পণ্য-রেকর্ড পাওয়া গেছে। এসব রেকর্ডে প্রদর্শিত মোট বাণিজ্যিক মূল্য ১ কোটি ৭০ লাখ ৪১ হাজার ৯০০.৩৭ মার্কিন ডলার। প্রতি ডলার ১২২ টাকা ধরে বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ২০৭ কোটি ৯৫ লাখ টাকা, অর্থাৎ প্রায় ২০৮ কোটি টাকা।
কারখানা বন্ধের কার্যকর তারিখ ১ জুলাই ২০২৬ ধরে হিসাব করলে, প্রথম প্রদর্শিত রপ্তানি রেকর্ডটি বন্ধের ৫১ দিন পরের এবং সর্বশেষটি ৬১ দিন পরের। অর্থাৎ, উৎপাদন বন্ধের ঘোষণার প্রায় দুই মাস পরও Apparel-21-এর নামে রপ্তানি-সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক রেকর্ড পাওয়া যাচ্ছে।
যে প্রতিষ্ঠান আর্থিক সংকট ও নতুন ক্রয়াদেশের অনিশ্চয়তার কথা বলে কারখানা বন্ধ করেছে, সেই প্রতিষ্ঠানের নামে বন্ধের প্রায় দুই মাস পরও প্রায় ২০৮ কোটি টাকার রপ্তানি-সংশ্লিষ্ট রেকর্ড কীভাবে তৈরি হলো— তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এসব পণ্য কি কারখানা বন্ধের আগেই উৎপাদিত হয়েছিল, নাকি অন্য কোনো কারখানায় উৎপাদন করে Apparel-21-এর নামে রপ্তানি করা হয়েছে? আর পুরোনো অর্ডারের পণ্য রপ্তানি হয়ে থাকলে সেগুলো উৎপাদনের সময় সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ও পাওনার অবস্থা কী ছিল? অর্ডার তৈরী হয়ে গেলে শ্রমিক ছেড়ে দিতে কারখানা বন্ধ ঘোষণা, আবার সুযোগমতো কারখানা খুলে দেওয়া হয় কিনা? আড়ালে রপ্তানি, সামনে হতাশার চিত্র সৃষ্টি করে সরকারকে জিম্মি করা এবং একইসাথে বিদেশী ক্রেতাদের কাছ থেকে দয়াদাক্ষিণ্যও আদায় করা হয় কিনা? ফলোআপ নিউজ-এর প্রাথমিক অনুসন্ধান।

বন্ধের ৫১ থেকে ৬১ দিন পরও রপ্তানি চালানের তথ্য
52wmb-এর Apparel-21-সংক্রান্ত বাণিজ্যিক তথ্যভান্ডারে আগস্টের বিভিন্ন তারিখে রপ্তানি চালানের তথ্য পাওয়া যায়। প্রদর্শিত রেকর্ডগুলোর মধ্যে রয়েছে—
| তারিখ | পণ্য | গন্তব্য | প্রদর্শিত মূল্য (মার্কিন ডলার) |
|---|---|---|---|
| ২১ আগস্ট | Ladies Velour Revere PJ | আয়ারল্যান্ড | ৯,১৬৬,৮৬৩.৬০ |
| ২২ আগস্ট | Girls Velour PJ | স্পেন | ১৯১,১২১.৮৫ |
| ২২ আগস্ট | Girls Velour PJ | আয়ারল্যান্ড | ১,৮৪২,৫২৭.৭৮ |
| ২২ আগস্ট | Boys Velour PJ | আয়ারল্যান্ড | ১,৯১৭,২৭৯.৪৫ |
| ২৭ আগস্ট | T-shirt | ইংল্যান্ড | ১৮৩,৮৩০.১৮ |
| ২৭ আগস্ট | Basic Polo | সুইডেন | ২০৯,২৪৫.৩৮ |
| ২৭ আগস্ট | T-shirt, Raglan Tee ও Slub-T | সুইডেন | ৬২০,৯৮৪.৪৫ |
| ২৭ আগস্ট | Pullover | সুইডেন | ৭৫,১২৮.৫৫ |
| ২৭ আগস্ট | Raglan Tee | স্পেন | ৮৯,২৭৪.৪৭ |
| ২৭ আগস্ট | Basic Polo | ইতালি | ২৫১,৭৯৮.০৪ |
| ২৭ আগস্ট | T-shirt, Raglan Tee, Tank Top ও Fashion Top | ইতালি | ১,০২৩,৯৭৮.৭১ |
| ২৭ আগস্ট | Pullover | ইতালি | ১৪৫,৯৩৭.২২ |
| ২৭ আগস্ট | Basic Polo | ফ্রান্স | ২০৩,৯৭৪.০২ |
| ২৭ আগস্ট | Basic Polo | সুইডেন | ৮২,১৮৯.১৫ |
| ৩১ আগস্ট | Basic Polo | নেদারল্যান্ডস | ১,০৩৭,৭৬৭.৫২ |
| মোট | ১৫টি পণ্য-রেকর্ড | বিভিন্ন দেশ | ১৭,০৪১,৯০০.৩৭ |
সূত্র: 52wmb-এর Apparel-21 বাণিজ্যিক চালান-তথ্য।
উল্লেখ্য, এখানে ডেটাবেইসে প্রদর্শিত ১৫টি পণ্য-রেকর্ডের মূল্য যোগ করে মোট হিসাব করা হয়েছে। এগুলোকে ১৫টি স্বতন্ত্র জাহাজীকরণ বা Bill of Lading হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে না। একই চালান বা Bill of Lading-এর অধীনে একাধিক পণ্য-রেকর্ড থাকতে পারে। প্রকৃত রপ্তানি মূল্য ও চালানের সংখ্যা নিশ্চিত করতে কাস্টমসের Bill of Export, Bill of Lading এবং সংশ্লিষ্ট ইনভয়েস যাচাই করা প্রয়োজন।
২০৮ কোটি টাকার রপ্তানি-রেকর্ড, অথচ কারখানা বন্ধ কেন?
কারখানা বন্ধের ঘোষণায় ব্যবস্থাপনা পক্ষ থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ, ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া, ভবিষ্যতে পর্যাপ্ত অর্ডার না পাওয়ার অনিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম কমে যাওয়া এবং ব্যাংক থেকে সময়মতো অর্থায়ন না পাওয়ার কথা বলা হয়েছিল। এসব কারণে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছিল না বলে জানানো হয়।
অথচ বন্ধের ৫১ থেকে ৬১ দিন পর Apparel-21-এর নামে প্রায় ২০৮ কোটি টাকার রপ্তানি-সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক রেকর্ড পাওয়া যাচ্ছে। এ তথ্য নিজে থেকে প্রমাণ করে না যে বন্ধের পর কারখানায় উৎপাদন চলেছে। তবে কারখানা বন্ধের কারণ, অর্ডারের অবস্থা, উৎপাদনব্যবস্থা এবং শ্রমিকদের কর্মসংস্থান নিয়ে নতুন অনুসন্ধানের প্রয়োজন তৈরি করেছে।
অন্তত তিনটি সম্ভাবনা যাচাই করা জরুরি।
প্রথমত, কারখানা বন্ধের আগে Apparel-21-এর হাতে থাকা ক্রয়াদেশের বিপরীতে উৎপাদিত পণ্য পরে জাহাজীকরণ করা হয়েছেলো কিনা।
দ্বিতীয়ত, লিথি গ্রুপের অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান বা বাইরের কারখানায় পণ্য উৎপাদন করে Apparel-21-এর নামে রপ্তানি করা হয়েছে কিনা।
তৃতীয়ত, কারখানা বন্ধের পর নতুন ক্রয়াদেশ পাওয়া সত্ত্বেও নিজস্ব উৎপাদন চালু না করে অন্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্ডার পূরণ করা হয়েছে কিনা।
এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে রপ্তানি চালানের তারিখের পাশাপাশি ক্রয়াদেশ, উৎপাদন রেজিস্টার, স্টক রেজিস্টার, সাবকন্ট্রাক্টিং অনুমোদন, ইনভয়েস এবং প্রকৃত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্য যাচাই করতে হবে।

ডিমড্ বন্ড থাকা সত্ত্বেও আমদানির তুলনায় রপ্তানি মূল্য বেশি
Apparel-21-এর দীর্ঘমেয়াদি আমদানি–রপ্তানির হিসাবেও উল্লেখযোগ্য ব্যবধান দেখা যায়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য তথ্যভান্ডার Trademo-তে ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির নামে ৪ হাজার ১৫টি আমদানি চালান এবং ৬ হাজার ৮টি রপ্তানি চালানের তথ্য পাওয়া যায়।
ওই ডেটাবেইসের হিসাবে, এ সময়ে আমদানি বাণিজ্যের মূল্য প্রায় ৮ কোটি ৭৬ লাখ ৮০ হাজার মার্কিন ডলার। বিপরীতে রপ্তানি বাণিজ্যের মূল্য প্রায় ১১ কোটি ৪৪ লাখ ৬০ হাজার ডলার। অর্থাৎ, রপ্তানি মূল্য আমদানির তুলনায় প্রায় ২ কোটি ৬৭ লাখ ৮০ হাজার ডলার বা ৩০ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি।
Apparel-21-এর ক্ষেত্রে কত কাঁচামাল সরাসরি আমদানি হয়েছে, কতটা স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে এবং গ্রুপের অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে কতটা সরবরাহ নেওয়া হয়েছে— তার সমন্বিত হিসাব ছাড়া এ ব্যবধানের প্রকৃত কারণ নির্ধারণ সম্ভব নয়।
এ ছাড়া Market Inside Data-তে ২০২৫ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত Apparel-21-এর নামে ২৯৩টি আমদানি চালান ও ১ হাজার ৩৪১টি রপ্তানি চালানের তথ্য পাওয়া যায়। ওই ডেটাবেইসে আমদানি বাণিজ্যের মূল্য প্রায় ৫৭ লাখ ডলার এবং রপ্তানি বাণিজ্যের মূল্য প্রায় ৩ কোটি ৮ লাখ ৯০ হাজার ডলার দেখানো হয়েছে। তবে Trademo ও Market Inside Data-র সময়সীমা ও তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি এক নয়। তাই দুই ডেটাবেইসের হিসাব যোগ করা বা একই পদ্ধতির পরিসংখ্যান হিসেবে তুলনা করা যাবে না।
এগুলো বাণিজ্যিক তথ্যভান্ডারের সংকলিত হিসাব; কাস্টমসের চূড়ান্ত ও নিরীক্ষিত আমদানি–রপ্তানি বিবরণী নয়।
Apparel-21-এর বন্ড লাইসেন্সে Direct ও Deemed— দুই সুবিধা
কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, ঢাকা উত্তরের সক্রিয় বন্ড লাইসেন্স তালিকায় Apparel-21 Limited-এর নাম পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স নম্বর 1146/CUS-SBW-PBW/2009। তালিকায় Direct ও Deemed— উভয় ধরনের বন্ড সুবিধার উল্লেখ রয়েছে।
Direct Exporter সরাসরি বিদেশে পণ্য রপ্তানি করে। অন্যদিকে Deemed Exporter সাধারণত স্থানীয় ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির আওতায় অন্য রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানে পণ্য বা উপকরণ সরবরাহ করে। উভয় ধরনের প্রতিষ্ঠানই প্রযোজ্য শর্ত পূরণ সাপেক্ষে বন্ড সুবিধা পেতে পারে।
একটি বন্ড লাইসেন্সের অধীনে Direct ও Deemed— দুই ধরনের সুবিধার উল্লেখ থাকা মানেই দুটি পৃথক লাইসেন্স রয়েছে, এমন নয়। Apparel-21-এর ক্ষেত্রে একই লাইসেন্স নম্বরের বিপরীতে দুই ধরনের সুবিধার উল্লেখ পাওয়া গেছে।
বাকি চারটি কারখানার বর্তমান ও অতীত বন্ড লাইসেন্সের অবস্থা পূর্ণাঙ্গভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। সক্রিয় তালিকায় নাম না পাওয়া মানেই কোনো প্রতিষ্ঠানের অতীতে বন্ড লাইসেন্স ছিল না— এমন সিদ্ধান্তও দেওয়া যায় না। এ জন্য বন্ড কমিশনারেটের লাইসেন্স রেকর্ড প্রয়োজন।
বন্ড সুবিধার আওতায় শুল্ক ও কর পরিশোধ ছাড়াই আমদানি করা কাঁচামাল নির্ধারিত রপ্তানিমুখী উৎপাদনে ব্যবহার করতে হয়। এ ক্ষেত্রে আমদানির পরিমাণ, উৎপাদন সক্ষমতা, অনুমোদিত ইনপুট-আউটপুট অনুপাত, UD/UP এবং প্রযোজ্য বন্ড রেজিস্টারের হিসাব গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় বন্ডেড সরবরাহকারীর মাধ্যমে কাঁচামাল সংগ্রহের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি ও সরবরাহের নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
গ্রুপের সমন্বিত উৎপাদনব্যবস্থা কি হিসাবের ব্যবধান ব্যাখ্যা করতে পারে?
লিথি গ্রুপের নিজস্ব ওয়েবসাইটে Apparel-21, Famkam Fashion, Famkam Dyeing ও Famkam Printing-সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে গ্রুপের উৎপাদনব্যবস্থার অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ওয়েবসাইটে Apparel-21-এর ৬৪টি উৎপাদন লাইন এবং দৈনিক ১ লাখ ৩৫ হাজার পিস উৎপাদন সক্ষমতার দাবি করা হয়েছে। Famkam Fashion-এর ক্ষেত্রে দৈনিক ২০ টন কাপড় উৎপাদন সক্ষমতার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
এগুলো প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য; স্বাধীনভাবে নিরীক্ষিত উৎপাদন হিসাব নয়। তবে একই গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কাপড়, ডাইং, প্রিন্টিং ও তৈরি পোশাক উৎপাদনের কাজ ভাগ হয়ে থাকলে একটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব আমদানি–রপ্তানির হিসাব দিয়ে পুরো উৎপাদনব্যবস্থা বোঝা সম্ভব নয়।
তাই Apparel-21-এর বন্ড সুবিধায় আমদানি করা কাঁচামাল অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করা হয়েছে কিনা, স্থানীয় ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির মাধ্যমে কাঁচামাল এসেছে কিনা এবং গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কী পরিমাণ আন্তঃপ্রতিষ্ঠান লেনদেন হয়েছে— তা যাচাই করা জরুরি।
এ ক্ষেত্রে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন: গ্রুপের অন্য প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেই Apparel-21-এর নামে রপ্তানি হওয়া পণ্য সেসব প্রতিষ্ঠানে উৎপাদিত হয়েছে— এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না। প্রকৃত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান শনাক্ত করতে উৎপাদন রেজিস্টার, কাঁচামাল ইস্যু রেকর্ড, সাবকন্ট্রাক্টিং অনুমোদন এবং রপ্তানি নথি মিলিয়ে দেখতে হবে। শ্রমিকদের দিয়ে পণ্য উৎপাদন শেষে পুরাতন অর্ডার এবং নতুন অর্ডারের মধ্যবর্তী সময়ে কৌশলে কারখানা বন্ধ রাখা আইনত দণ্ডনীয় হওয়া উচিৎ বলে মনে করে সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষ। একইসাথে শ্রমআইন অনুযায়ী কারখানার শ্রমিকেরা লভ্যাংশ পাচ্ছে কিনা— সেটিও একটি বড় প্রশ্ন।

নতুন অর্ডার না থাকলে শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের কী হলো?
কারখানা বন্ধের নোটিশে ব্যবস্থাপনা ভবিষ্যৎ ক্রয়াদেশের অনিশ্চয়তা ও ব্যাংক অর্থায়নের সংকটের কথা উল্লেখ করে। ব্যবসা পরিচালনার অনুকূল পরিবেশ তৈরি হলে পুরোনো দক্ষ কর্মীদের অগ্রাধিকার দিয়ে পুনর্নিয়োগের কথাও জানানো হয়েছিল।
অন্যদিকে, বন্ধের পরও Apparel-21-এর নামে আগস্টে রপ্তানি চালানের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। তবে এসব পণ্য পুরোনো অর্ডারের বিপরীতে উৎপাদিত হয়েছিল কিনা, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তাই এ তথ্য দিয়ে নতুন অর্ডার ছিল কিংবা বন্ধের পর উৎপাদন চলছিল— কোনোটিই নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
তবে প্রশ্ন থেকে যায়— পুরোনো অর্ডারের পণ্য রপ্তানি চললেও নতুন অর্ডারের অনিশ্চয়তার কারণে কি শ্রমিকদের কর্মসংস্থান বজায় না রেখে কারখানা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল? পুরোনো অর্ডারের উৎপাদন শেষ হওয়ার পর শ্রমিকদের কী অবস্থায় রাখা হয়েছিল? কারখানা বন্ধের সময় তাদের বেতন ও অন্যান্য আইনগত পাওনার কী অবস্থা ছিল?
The Financial Express-এর ৬ জুলাইয়ের প্রতিবেদনে পাঁচ কারখানার শ্রমিকদের বকেয়া বেতন ও আইনগত পাওনা দাবিতে বিক্ষোভের কথা উঠে আসে। প্রতিবেদনে শ্রমিকদের অভিযোগ, কারখানাগুলো পর্যায়ক্রমে বন্ধ করা হলেও পাওনা পরিশোধ করা হয়নি। অন্যদিকে Daily Sun-এর প্রতিবেদনে মে ও জুন মাসের বেতন বকেয়া থাকার কথা একজন কর্মকর্তার বক্তব্য হিসেবে প্রকাশিত হয়। এসব পাওনার চূড়ান্ত পরিমাণ শ্রম অধিদপ্তর, DIFE এবং প্রতিষ্ঠানের বেতন রেজিস্টার দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।
যেসব নথি প্রকাশ করা জরুরি
| অনুসন্ধানের বিষয় | প্রয়োজনীয় নথি |
|---|---|
| আগস্টের রপ্তানি পণ্যের উৎপাদনকাল | উৎপাদন রেজিস্টার, স্টক রেজিস্টার, Bill of Export |
| প্রকৃত উৎপাদনকারী কারখানা | উৎপাদন রেকর্ড, সাবকন্ট্রাক্টিং অনুমোদন, ইনভয়েস |
| বন্ধের আগে ও পরে পাওয়া অর্ডার | Master LC, Purchase Order, ক্রেতার সঙ্গে চুক্তি |
| আমদানি ও স্থানীয় কাঁচামালের উৎস | Bill of Entry, স্থানীয় ক্রয় চালান, ব্যাক-টু-ব্যাক LC |
| বন্ড সুবিধার ব্যবহার | বন্ড লাইসেন্স, UD/UP, বন্ড রেজিস্টার, নিরীক্ষা প্রতিবেদন |
| গ্রুপের অভ্যন্তরীণ লেনদেন | আন্তঃপ্রতিষ্ঠান চালান, পণ্য হস্তান্তর ও সাবকন্ট্রাক্টিং নথি |
| শ্রমিকদের পাওনা | বেতন রেজিস্টার, ব্যাংক পেমেন্ট, DIFE-এর নথি |
রপ্তানির রেকর্ড আছে, কিন্তু উৎপাদনের প্রকৃত হিসাব কোথায়?
লিথি গ্রুপের পাঁচটি কারখানা বন্ধের ঘোষিত কারণ ছিল আর্থিক সংকট, গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন, ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া এবং ভবিষ্যৎ অর্ডারের অনিশ্চয়তা। অথচ বন্ধের ৫১ থেকে ৬১ দিন পরও Apparel-21-এর নামে প্রায় ২০৮ কোটি টাকার রপ্তানি-সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক রেকর্ড পাওয়া যাচ্ছে।
এ তথ্য একা প্রমাণ করে না যে বন্ধের পরও কারখানায় উৎপাদন চলেছে কিংবা শ্রমিকদের বাদ দিয়ে অন্য কোথাও উৎপাদন করা হয়েছে। কিন্তু পুরোনো অর্ডারের পণ্য, প্রকৃত উৎপাদনকারী কারখানা, গ্রুপের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ এবং শ্রমিকদের পাওনা— এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যার প্রয়োজন তৈরি হয়েছে।
যে প্রতিষ্ঠানের নামে এত বড় অঙ্কের রপ্তানি চালানের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, সেই প্রতিষ্ঠানের কারখানা কেন বন্ধ হলো, রপ্তানি হওয়া পণ্য কোথায় ও কখন উৎপাদিত হয়েছিল এবং শ্রমিকদের পাওনা কীভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে— এসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।
কাস্টমস, বন্ড কমিশনারেট, ব্যাংক, DIFE এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নথি একসঙ্গে যাচাই করলেই লিথি গ্রুপের কারখানা বন্ধের প্রকৃত আর্থিক ও উৎপাদন পরিস্থিতি স্পষ্ট হতে পারে।
