Headlines

স্টার কাবাব: ছয় দশকের স্বাদ, আস্থার উত্তরাধিকার— বাংলাদেশের প্রথম বৈশ্বিক বাংলা খাবারের ব্র্যান্ড হওয়ার পথে?

স্টার কাবাব হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট

ঢাকায় দুপুর মানেই অনেকের কাছে স্টার কাবাব। অফিসপাড়া, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, চিকিৎসক, পর্যটক— সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে এই নামটি শুধু একটি রেস্টুরেন্ট নয়, বরং একটি নির্ভরতার প্রতীক। রাজধানীর একাধিক শাখায় দুপুরের ব্যস্ত সময়ে গেলে প্রায়ই দেখা যায়, বসার জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে। টেবিল খালি হওয়ার আগেই নতুন গ্রাহকের সারি। এত বড় ডাইনিং স্পেস, নিজস্ব ভবন এবং একাধিক শাখা থাকার পরও ভিড় যেন কমে না।

প্রতিষ্ঠানটির দাবি অনুযায়ী, প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ হাজার মানুষ তাদের বিভিন্ন শাখায় খাবার গ্রহণ করেন। সরকারি কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও, প্রতিদিনের এই বিপুল গ্রাহকসমাগমই বলে দেয়— বাংলাদেশের দেশীয় রেস্টুরেন্ট শিল্পে স্টার কাবাব একটি ব্যতিক্রমী অবস্থান তৈরি করেছে।

স্টার কাবাবের যাত্রা শুরু ১৯৬৫ সালে পুরান ঢাকার ঠাটারীবাজারে। অল্প পরিসরের একটি খাবারের দোকান থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে এটি রাজধানীর অন্যতম বৃহৎ বাংলা খাবারের চেইন রেস্টুরেন্টে পরিণত হয়েছে। আজ নেহারি, কালাভুনা, ভুনা খিচুড়ি, কাবাব, পরোটা, ভর্তা, মাছ ও খাসির বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী পদ —সব মিলিয়ে স্টার কাবাব দেশীয় রন্ধনশৈলীর একটি পরিচিত নাম। ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠানটি The Daily Star Foodiez Choice Awards-এ সেরা বাংলাদেশি রেস্টুরেন্টের স্বীকৃতিও অর্জন করে।

একটি ব্র্যান্ডের সবচেয়ে বড় সম্পদ—বিশ্বাস

রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় সুস্বাদু খাবার তৈরি করা যতটা কঠিন, কয়েক দশক ধরে সেই স্বাদ ও মান ধরে রাখা তার চেয়েও কঠিন। স্টার কাবাবের সবচেয়ে বড় শক্তি এখানেই। অনেক গ্রাহক বলেন, বহু বছর আগের যে স্বাদের জন্য তারা স্টার কাবাবে যেতেন, আজও সেই স্বাদের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার চেষ্টা প্রতিষ্ঠানটি করে যাচ্ছে। এ কারণেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম একই পরিবারের মানুষ এই রেস্টুরেন্টে আসেন।

ব্যবসা বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে একটি খাদ্য ব্র্যান্ডের মূল সম্পদ ভবন, আসবাব বা রান্নাঘর নয়; বরং গ্রাহকের আস্থা। সেই আস্থা একদিনে তৈরি হয় না, আবার সামান্য কোনো সমস্যায় একদিনে হারিয়েও যেতে পারে না। ছয় দশকের বেশি সময় ধরে সেই আস্থা ধরে রাখা স্টার কাবাবের অন্যতম সাফল্য।

অটিজম কর্নার থেকে জানা গেল অন্য এক গল্প

সম্প্রতি ফলোআপ নিউজ স্টার কাবাব হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের ধানমন্ডি শাখায় একটি অটিজম কর্নার স্থাপনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করতে যায়। এ সময় প্রতিষ্ঠানটির ধানমন্ডি শাখার জেনারেল ম্যানেজার মনিরুল ইসলাম ফলোআপ নিউজের প্রতিনিধিদের সামনে প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।

তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে নিজস্ব সক্ষমতায় ব্যবসা পরিচালনা করছে এবং কোনো ব্যাংক ঋণ ছাড়াই তাদের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। একই সঙ্গে নিয়মিতভাবে সরকারকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব প্রদান করা হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। ফলোআপ নিউজের সম্পাদককে ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ পরিকল্পনা সম্পর্কেও অবহিত করা হয়েছে।

বাংলাদেশের ব্যবসায়িক বাস্তবতায় যেখানে অনেক প্রতিষ্ঠান ঋণনির্ভর সম্প্রসারণে এগোয়, সেখানে দীর্ঘদিন ধরে ঋণমুক্ত থেকে একটি বৃহৎ ব্র্যান্ড পরিচালনা করা নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।

ঢাকার বাইরে কেন নয়?

স্টার কাবাবের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হয়তো এর সবচেয়ে বড় সম্ভাবনাও। এখনও প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক। অথচ কক্সবাজার, সিলেট, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, কুয়াকাটা কিংবা পদ্মা সেতুকেন্দ্রিক নতুন অর্থনৈতিক করিডোরে প্রতিদিন লাখো মানুষ যাতায়াত করেন।

ভোজনরসিকদের অনেকেরই মত, এসব এলাকায় স্টার কাবাবের শাখা থাকলে দেশীয় খাবারের মানসম্পন্ন একটি ব্র্যান্ড সহজেই সারা দেশে বিস্তার লাভ করতে পারে। বিদেশি পর্যটকদের কাছেও বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী খাবার পরিচিত করার এটি হতে পারে কার্যকর উদ্যোগ।

বাংলাদেশেরও কি একটি বৈশ্বিক ফুড ব্র্যান্ড হতে পারে না?

বিশ্বে McDonald’s যুক্তরাষ্ট্রের, KFC যুক্তরাষ্ট্রের, Jollibee ফিলিপাইনের, Nando’s দক্ষিণ আফ্রিকার এবং Tim Hortons কানাডার খাদ্যসংস্কৃতিকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছে। অথচ বাংলাদেশের বিরিয়ানি, কালাভুনা, নেহারি, ভর্তা, খিচুড়ি কিংবা কাবাবের জনপ্রিয়তা কম নয়, পৃথিবীর অনেক দেশে এসব খাবার জনপ্রিয় হতে পারে।

প্রশ্ন হলো— বাংলাদেশের কোনো দেশীয় ব্র্যান্ড কি এই খাবারগুলোকে বিশ্ববাজারে নিয়ে যেতে পারে?

স্টার কাবাবের মতো দীর্ঘ ইতিহাস, প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ড, বিপুল গ্রাহকভিত্তি এবং ব্যবসায়িক স্থিতিশীলতা থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো সেই সম্ভাবনার দাবিদার বলেই মনে করেন অনেক ব্যবসা বিশ্লেষক।

সরকারি সহযোগিতা কেন জরুরি

বাংলাদেশ এখন রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণের কথা বলছে। পোশাকের পাশাপাশি পর্যটন, সংস্কৃতি ও খাদ্যশিল্পকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিষ্ঠা করার কথাও বিভিন্ন নীতিপত্রে গুরুত্ব পাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে স্টার কাবাবের মতো দেশীয় ব্র্যান্ডগুলোকে আন্তর্জাতিক মান অর্জন, খাদ্য নিরাপত্তা সনদ, ফ্র্যাঞ্চাইজি উন্নয়ন, বিদেশে শাখা স্থাপন এবং ব্র্যান্ডিংয়ে নীতিগত সহায়তা দেওয়া হলে দেশের জন্য নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

কারণ একটি সফল আন্তর্জাতিক রেস্টুরেন্ট শুধু খাবার বিক্রি করে না; এটি দেশের সংস্কৃতি, কৃষি, পর্যটন, কর্মসংস্থান এবং সফট পাওয়ারকেও বিশ্বের সামনে তুলে ধরে।

একটি প্রতিষ্ঠানের গল্প, একটি দেশের সম্ভাবনা

স্টার কাবাবের গল্প কেবল একটি রেস্টুরেন্টের ব্যবসায়িক সাফল্যের গল্প নয়। এটি অধ্যবসায়, মান ধরে রাখা, গ্রাহকের আস্থা অর্জন এবং দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোক্তা দৃষ্টিভঙ্গির গল্প। ছয় দশকের পথচলায় প্রতিষ্ঠানটি হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে, দেশীয় খাদ্যসংস্কৃতিকে জনপ্রিয় করেছে এবং নিয়মিত রাজস্ব প্রদানের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতেও অবদান রাখছে।

এখন সময় এসেছে আরও বড় স্বপ্ন দেখার। যদি সরকার, বেসরকারি খাত এবং উদ্যোক্তারা সমন্বিতভাবে কাজ করেন, তাহলে স্টার কাবাবের মতো দেশীয় প্রতিষ্ঠান একদিন বিশ্বের বড় শহরগুলোতে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে বলতে পারবে— “বাংলাদেশের স্বাদ, খোদাদাদ।”