ঢাকার ফুটপাতে ১০০ টাকায় ভাত-গোস্ত বিক্রি করে “গরীবের বুফে” স্লোগানে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনায় আসা ভাইরাল মিজানের বিদ্যুতের লাইন বিচ্ছিন্ন এবং পরে তাকে গ্রেফতারের ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে— আইন কি সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ হচ্ছে, নাকি অভিযানের লক্ষ্য বেছে নেওয়া হচ্ছে?

বিদ্যুৎ বিভাগের অভিযানকে অনেকেই স্বাগত জানালেও সমালোচকদের প্রশ্ন, ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বহুতল ভবন, বিপণিবিতান, বড় দোকান ও কারখানায় অননুমোদিত লোড ব্যবহার, আবাসিক সংযোগকে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার এবং সাবস্টেশন না বসিয়েও কার্যক্রম চালানোর অভিযোগ বহুদিনের। এসব বিষয়ে ডেসকো ও ডিপিডিসির বিরুদ্ধে সমঝোতা ও দুর্নীতির অভিযোগও প্রায়ই ওঠে।
ফলোআপ নিউজের অনুসন্ধানে মিরপুরে ডেসকো এবং ধানমন্ডিতে ডিপিডিসির কার্যক্রম ঘিরে একাধিক অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বড় বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ লোড ব্যবহার হলেও দৃশ্যমান ব্যবস্থা খুব কমই দেখা যায়।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে— ফুটপাতে কম দামে খাবার বিক্রি করা একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে এত দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা কেন?
সমালোচকদের মতে, ফুটপাতের অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ অবশ্যই আইনবিরোধী এবং তা বিচ্ছিন্ন করা উচিত। কিন্তু একটি বাল্ব বা ছোটখাটো ব্যবহারের অবৈধ সংযোগের বিরুদ্ধে কঠোরতা দেখানো হলেও বৃহৎ পরিসরের অবৈধ লোড ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযান না হলে সেটি বৈষম্যমূলক মনে হতে পারে।
সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই দাবি করছেন, ভাইরাল মিজান কেবল একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী নন; তিনি ১০০ টাকায় পেট ভরে ভাত-গোস্ত বিক্রি করে প্রচলিত রেস্টুরেন্ট ব্যবসার কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। কেউ কেউ মনে করছেন, তার জনপ্রিয়তা রেস্টুরেন্ট মালিকদের একটি অংশকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল। যদিও এ অভিযোগের পক্ষে এখনো কোনো প্রামাণ্য তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।
তবে পুলিশের গায়ে হাত তোলার অভিযোগকে সমর্থন করছেন না কেউই। তারা বলছেন, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনকালে পুলিশের ওপর হামলা গ্রহণযোগ্য নয় এবং এ ধরনের ঘটনার আইনি বিচার হওয়া উচিত।
কিন্তু একই সঙ্গে আরেকটি সামাজিক প্রশ্ন সামনে এসেছে—নিম্নআয়ের মানুষের একটি অংশ কেন পুলিশকে নিরপেক্ষ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং ক্ষমতাবান ও ধনীদের রক্ষক হিসেবে দেখতে শুরু করেছে?
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, যখন বড় অনিয়ম অদৃশ্য থাকে আর ছোট অনিয়ম দৃশ্যমানভাবে দমন করা হয়, তখন মানুষের মধ্যে “নির্বাচিত বিচার” বা selective enforcement-এর ধারণা জন্ম নেয়। এর ফলে আইন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ খাতে যদি সত্যিই শুদ্ধি অভিযান চালানো হয়, তবে তা ফুটপাত থেকে শুরু করে বহুতল ভবন, কারখানা, শপিং কমপ্লেক্স এবং প্রভাবশালী বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও সমানভাবে কার্যকর হতে হবে।
নইলে প্রশ্ন থেকেই যাবে—
১০০ টাকায় পেট ভরে ভাত-গোস্ত বিক্রি করা ভাইরাল মিজানের কারেন্টের লাইনই কেন কাটা হলো?
