Headlines

সওজের কোটি টাকার জমি দখলে দোকান–বাণিজ্য: মহাসড়কের পাশে গড়ে উঠেছে প্রভাবশালী চক্রের অর্থনীতি


দেশের বিভিন্ন মহাসড়ক, আঞ্চলিক সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ সংযোগপথের পাশে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) বিপুল পরিমাণ সরকারি জমি দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে দখল হয়ে আছে। কোথাও পাকা দোকান, কোথাও টিনশেড মার্কেট, আবার কোথাও অস্থায়ী স্থাপনার আড়ালে চলছে কোটি টাকার বাণিজ্য। কোথাও কোথাও বহুতল ভবনও আছে। সড়কের নিরাপত্তা ও জনস্বার্থের জন্য সংরক্ষিত এই জায়গাগুলো এখন অনেক এলাকায় পরিণত হয়েছে প্রভাবশালী মহলের নিয়ন্ত্রিত আয়ের উৎসে।

সরেজমিন অভিজ্ঞতা ও সাম্প্রতিক উচ্ছেদ অভিযানের তথ্য বলছে, দেশের প্রধান মহাসড়কের পাশে অবস্থিত হওয়ায় এসব জমির বাণিজ্যিক মূল্য অত্যন্ত বেশি। ঢাকা–চট্টগ্রাম, ঢাকা–আরিচা, বগুড়া–জয়পুরহাটসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কের পাশে অবৈধ দোকানঘর থেকে নিয়মিত ভাড়া ও চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। এক্ষেত্রে খুলনার অভিজ্ঞতা নিয়েছে ফলোআপ নিউজ। স্থানীয়ভাবে অনেকেই বলছেন, সরকারি জমি দখল করে তৈরি দোকানগুলো মাসিক ভাড়ায় চালানো হচ্ছে, কিন্তু সেই অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা না হয়ে যাচ্ছে ব্যক্তিবিশেষ বা সংঘবদ্ধ চক্রের হাতে। আসলে মহাসড়কের পাশে এভাবে ভবন তোলার কোনো সুযোগই নেই। খুলনা যশোর রোড থেকে শুরু করে পশ্চিম দিকে অথবা জিরো পয়েন্ট হয়ে পূর্ব দিকে— আসলে দেশের সব সড়কগুলোই জবরদখল এবং সমঝোতা দখলের এক মহোৎসব।

মহাসড়কের পাশে ‘সোনার খনি’

সওজের জমি সাধারণত সড়কের নিরাপত্তা, ভবিষ্যৎ প্রশস্তকরণ, ইউটিলিটি স্থাপন, ড্রেনেজ ও জনসাধারণের চলাচলের জন্য সংরক্ষিত থাকে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, বাজারসংলগ্ন বা বাসস্ট্যান্ডকেন্দ্রিক অংশগুলোতে দ্রুত গড়ে ওঠে দোকানপাট। একবার বিদ্যুৎ সংযোগ, পানি বা অন্য সুবিধা চলে এলে সেগুলো ধীরে ধীরে স্থায়ী রূপ নেয়।

সড়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, মহাসড়কের পাশে ১০০–২০০ বর্গফুটের একটি দোকানেরও বাজারমূল্য কয়েক লাখ টাকা হতে পারে, কোথাও কোথাও কোটি টাকা। ফলে সরকারি জমি দখল করে দোকান নির্মাণ একটি লাভজনক অনিয়ন্ত্রিত ব্যবসায় পরিণয় শতাধিক স্থাপনা উচ্ছেদ

চলতি বছর কুমিল্লার সুয়াগাজী বাজার এলাকায় ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে সওজের জমি দখল করে নির্মিত শতাধিক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব দোকান ও ফুটপাত দখলের কারণে মহাসড়কে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছিল এবং ঈদে যানজটের ঝুঁকি বাড়ছিল। সওজ কর্মকর্তারা জানান, একাধিক নোটিশ দেওয়ার পরও দখলদাররা স্থাপনা সরাননি।

বগুড়ায় ভাড়া আদায়ের অভিযোগ

বগুড়ার শিবগঞ্জ এলাকায় সওজের জমি দখল করে দীর্ঘদিন ধরে দোকান নির্মাণ ও ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠে এসেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রভাবশালী ব্যক্তিরা সরকারি জমি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে দোকান বসিয়ে মাসিক ভাড়া তুলছেন। দোকানিরা অভিযোগ করেছেন, জায়গা পেতে অগ্রিম টাকা এবং পরে নিয়মিত ভাড়া দিতে হয়।

সাভারে মহাসড়কের জমিতে দোকান

সাভারের ঢাকা–আরিচা মহাসড়কের পাশে অবৈধ দোকান উচ্ছেদ অভিযানে প্রশাসন জানায়, মহাসড়ক ও সরকারি খাসজমি দখল করে দোকান নির্মাণ করে ভাড়া দেওয়া হচ্ছিল। স্থানীয় অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে অর্ধশতাধিক স্থাপনা অপসারণ করা হয়।

আইনে কী আছে?

মহাসড়ক আইন, ২০২১ অনুযায়ী মহাসড়ক, সড়কের সীমারেখা, সংরক্ষিত এলাকা বা সংশ্লিষ্ট সরকারি জমিতে অবৈধ দখল, স্থাপনা নির্মাণ বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি আইনত দণ্ডনীয়। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে পারে।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরও তাদের সরকারি তথ্যপোর্টালে সড়ক সংরক্ষণ ও অবৈধ দখল প্রতিরোধকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করেছে।

কেন বারবার ফিরে আসে দখল?

উচ্ছেদের পরও অনেক জায়গায় কয়েক মাসের মধ্যে আবার দোকান গড়ে ওঠে। অনুসন্ধানে স্থানীয়ভাবে যেসব কারণ উঠে এসেছে—

  • নিয়মিত নজরদারির অভাব;

  • রাজনৈতিক বা স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়া;

  • দীর্ঘদিনের অনানুষ্ঠানিক ভাড়াব্যবস্থা;

  • ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বিকল্প জায়গার অভাব;

  • সওজ, স্থানীয় প্রশাসন ও পৌর/ইউনিয়ন কর্তৃপক্ষের সমন্বয়হীনতা।

নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে

সড়কের পাশে দোকান বাড়লে শুধু জায়গা দখলই হয় না, আরও কয়েকটি ঝুঁকি তৈরি হয়—

  • যান চলাচলের পথ সংকুচিত হয়;

  • বাস ও ট্রাক অনিয়ন্ত্রিতভাবে দাঁড়ায়;

  • পথচারীরা সড়কে নেমে হাঁটতে বাধ্য হন;

  • দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে;

  • জরুরি সেবা ব্যাহত হয়।

বিশেষ করে স্কুল, হাসপাতাল বা বাজারসংলগ্ন মহাসড়কে এর প্রভাব বেশি দেখা যায়।

প্রশ্ন উঠছে রাজস্ব নিয়েও

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো— যদি এসব দোকান থেকে নিয়মিত ভাড়া আদায় হয়ে থাকে, সেই অর্থ কোথায় যাচ্ছে? সরকারি জমি ব্যবহার করে গড়ে ওঠা বাণিজ্যিক কার্যক্রম থেকে রাষ্ট্র কোনো রাজস্ব পাচ্ছে কি না, তা নিয়েও স্বচ্ছ তথ্য মিলছে না। স্থানীয়দের ভাষায়, “সরকারের জমিতে ব্যক্তির ব্যবসা চলছে।”

বিশেষজ্ঞদের মত

নগর ও পরিবহন পরিকল্পনাবিদদের মতে, শুধু উচ্ছেদ করে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। প্রয়োজন—

  • সওজের জমির ডিজিটাল ম্যাপিং;

  • জিও-ট্যাগিং ও অনলাইন মনিটরিং;

  • অবৈধ দখলদারদের তথ্যভান্ডার;

  • ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য পরিকল্পিত পুনর্বাসন;

  • উচ্ছেদের পর নিয়মিত তদারকি।

ফলোআপ নিউজের প্রশ্ন

দেশের মহাসড়কের পাশে সওজের জমিতে গড়ে ওঠা লক্ষ লক্ষ  দোকানের প্রকৃত সংখ্যা কত? কত জমি বর্তমানে অবৈধ দখলে? কারা এসব দোকান ভাড়া দেয়? আর কোটি টাকার এই অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি থেকে রাষ্ট্র বঞ্চিত হচ্ছে কত রাজস্ব?

সরকারি জমি কি জনস্বার্থে ব্যবহৃত হবে, নাকি প্রভাবশালী চক্রের নিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যিক সম্পদে পরিণত হবে— এ প্রশ্ন এখন আরও জোরালো হয়ে উঠছে।