Headlines

কক্সবাজারের সরকারি জমিঃ দখল, লিজ, জাল খতিয়ান ও বহুতল ভবনের অদৃশ্য সাম্রাজ্য

অবৈধ দখল

সৈকতের জমি থেকে হোটেল-মোটেল জোন— নথিতে উঠে আসছে সরকারি সম্পদ বেহাতের দীর্ঘ ইতিহাস


নিজস্ব প্রতিবেদক, কক্সবাজার

সমুদ্রের শহর কক্সবাজারে জমির দাম যত বেড়েছে, সরকারি জমি নিয়ে টানাপোড়েনও তত বেড়েছে। কোথাও রাতের আঁধারে সরকারি জমি ঘিরে ফেলা হয়েছে, কোথাও খাসজমিতে দোকানপাট ও রেস্তোরাঁ গড়ে উঠেছে, কোথাও সরকারি জমির ওপর বহুতল ভবন নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। আবার কোথাও লিজ দেওয়া সরকারি জমির শর্ত ভেঙে বাণিজ্যিক স্থাপনা তৈরি, এমনকি জমির মালিকানা নিজেদের নামে নেওয়ার চেষ্টার তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে।

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। কয়েক দশকের নথি ও আদালতের রায় ঘেঁটে দেখা যায়, কক্সবাজারে সরকারি জমি নিয়ে সমস্যাটির শিকড় অনেক গভীরে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নথি পাওয়া যায় হোটেল-মোটেল জোনের জমি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে।

অবৈধ দখল
কক্সবাজারে সরকারি জমি দখলের নথিভিত্তিক হটস্পট—লিজের শর্ত ভঙ্গ, অবৈধ স্থাপনা ও দখলচেষ্টায় ঝুঁকিতে রাষ্ট্রীয় সম্পদ।

১৩০ একর সরকারি জমি, ৮৭ প্লট

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতসংলগ্ন এলাকায় প্রায় ১৩০ একর সরকারি খাসজমিতে হোটেল-মোটেল জোন গড়ে তোলা হয়েছিল। ওই জমিকে ৮৭টি প্লটে ভাগ করে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে দীর্ঘমেয়াদি, কোথাও ৯৯ বছরের জন্য, ইজারা দেওয়া হয়।

কিন্তু শুরু থেকেই সেই জমির ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

সুপ্রিম কোর্টের নথিতে দেখা যায়, লিজগ্রহীতাদের বিরুদ্ধে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্মাণকাজ না করার অভিযোগ ছিল। আবার কিছু ক্ষেত্রে হোটেল-মোটেল নির্মাণের পরিবর্তে বহুতল ভবন নির্মাণ এবং সেই ভবনের ফ্ল্যাট অন্য ব্যক্তিদের কাছে বিক্রি করার অভিযোগও নথিতে এসেছে।

অর্থাৎ সরকারি জমি প্রথমে দীর্ঘমেয়াদি লিজে গেলেও সেটি সবসময় নির্ধারিত পর্যটন অবকাঠামোর মধ্যে থাকেনি।

বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারি জমি ব্যবহার করে ব্যক্তিগত সম্পদ তৈরির চেষ্টা হয়েছে— আদালতের নথিই যার সাক্ষ্য দিচ্ছে।

লিজ মানেই কি জমির মালিকানা?

এখানেই রয়েছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

সুপ্রিম কোর্টের নথিতে লিজগ্রহীতাদের বক্তব্য হিসেবে উল্লেখ আছে, তারা লিজের অর্থ পরিশোধ করে জমির দখল পেয়েছিলেন এবং নিজেদের নামে জমি মিউটেশনও করেছিলেন

অর্থাৎ সরকারি জমি লিজ দেওয়ার পর সেটিকে ঘিরে ব্যক্তিগত মালিকানার মতো একটি বাস্তব অবস্থা তৈরি হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল।

আইন ও ভূমি ব্যবস্থাপনার সরকারি নির্দেশনায় অবশ্য খাসজমির বন্দোবস্ত একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হওয়ার কথা। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বন্দোবস্ত অনুমোদনের পর কবুলিয়ত সম্পাদন, প্রয়োজনীয় রেজিস্ট্রেশন এবং পরবর্তী নামজারির মাধ্যমে রেকর্ড সংশোধনের ব্যবস্থা রয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি খাসজমি ও সরকারি দপ্তরের জমিতে বেআইনি দখলদারের নাম রেকর্ডে তোলার সুযোগ নেই।

তাই প্রশ্ন হচ্ছে— কক্সবাজারে কোন জমি প্রকৃতপক্ষে লিজ, কোনটি খাস, কোনটি বাতিল লিজ এবং কোন জমি কোনোভাবে ব্যক্তির নামে রেকর্ড বা রেজিস্ট্রি হয়েছে— এই পুরো হিসাব কি এক জায়গায় পরিষ্কার আছে?

অবৈধ দখল
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের সংরক্ষিত এলাকায় পরিবেশ আইন বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এবং সরকারি খাসজমি দখল করে অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে হোটেল সী গাল, হোটেল সাইমন, হোটেল সী প্রিন্সেস ও ওশেন প্যারাডাইসের মতো বড় বড় বাণিজ্যিক স্থাপনা। চিরচেনা সৈকত আজ কতিপয় প্রভাবশালীদের পকেটে।

৫৯টি প্লট বাতিল, ৫৭টি নিয়ে আদালতের লড়াই

হোটেল-মোটেল জোনের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মোড় আসে ২০১০ সালে।

লিজের শর্ত ভঙ্গের অভিযোগে জেলা প্রশাসন ৫৯টি প্লটের ইজারা বাতিল করে। সে সময় প্রায় ৬০ একর জমি নিয়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।

এরপর শুরু হয় দীর্ঘ আইনি লড়াই।

সুপ্রিম কোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট লিজগুলো বাতিলের পেছনে মূল কারণ ছিল লিজের শর্ত ভঙ্গ এবং নির্ধারিত সময়ে নির্মাণ না করা। সুপ্রিম কোর্ট শুধু লিজের শর্ত ভঙ্গের বিষয়টি দেখেনি; ঝিলংজা মৌজার পরিবেশগত গুরুত্ব এবং সেখানে সরকারি জমি কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে— সেটিও বিবেচনায় নিয়েছে।

২০১৯ সালের পূর্ণাঙ্গ রায়ে সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দেয়, ১৯৯৯ সালের পর ঝিলংজা মৌজায় দেওয়া লিজ বাতিল করতে হবে এবং সেখানে নির্মিত স্থাপনা অপসারণ করতে হবে। একই সঙ্গে ওই এলাকায় নতুন করে লিজ না দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়।

অর্থাৎ আদালতের দৃষ্টিতে বিষয়টি শুধু লিজের শর্ত ভঙ্গ নয়; এর সঙ্গে সরকারি জমি, পরিবেশ এবং জনস্বার্থও জড়িয়ে ছিল।

বাতিল জমিতেও বাণিজ্য থামেনি

কিন্তু আদালতের রায় এবং সরকারি নিয়ন্ত্রণে ফিরে আসার পরও সব জমি বাস্তবে দখলমুক্ত থাকেনি।

বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাতিল প্লটের কোনো কোনো অংশে দোকান, মার্কেট, রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে উঠেছে। এমনকি এসব জমি আবার দখলের চেষ্টা হয়েছে।

২০২৫ সালে সুগন্ধা পয়েন্ট এলাকায় প্রায় ২ দশমিক ৩০ একর সরকারি খাসজমি নিয়ে বড় ধরনের ঘটনা সামনে আসে।

দুদকের অভিযানে সরকারি জমি দখল করে স্থাপনা নির্মাণের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা জানানো হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, একটি চক্র জাল দলিল ও খতিয়ান তৈরি করে সেখানে শতাধিক দোকান নির্মাণ করে ভাড়া দিচ্ছিল।

আরও গুরুতর বিষয় হলো, সংশ্লিষ্ট জমির মালিকানা দাবি করার জন্য যে কাগজপত্র ব্যবহার করা হয়েছিল, তার মধ্যে একটি বিএস খতিয়ান জাল বলে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসন ও ভূমি অফিসকে জানানো হয়েছিল।

প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়, ৭৯০০ নম্বর বিএস খতিয়ান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে এবং ভূমি অফিসের রেকর্ডে ওই খতিয়ানের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

এ ঘটনায় দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করার কথাও জানায় প্রশাসন।

এটি দেখিয়ে দেয়, সরকারি জমি দখলের কৌশল কেবল বাঁশ-টিনের বেড়া পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়। কোথাও কোথাও জমির কাগজপত্রের ওপরই একটি বিকল্প মালিকানা তৈরির চেষ্টা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

৩৯.৭৮ একর সরকারি জমিও ঝুঁকিতে

কক্সবাজার শহরের কলাতলী থেকে লাবণী পয়েন্ট পর্যন্ত এলাকায় ৩৯ দশমিক ৭৮ একর জমি ২০১৮ সালে সরকারি খাস হিসেবে ঘোষণার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে।

বণিক বার্তার প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই জমি দখল ঠেকাতে প্রশাসন ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নেওয়ার কথা জানিয়েছিল। তারপরও রাতের আঁধারে জমি দখল করে স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ ওঠে।

এখানে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে আসে—

সরকারি খাস হিসেবে চিহ্নিত জমি যদি প্রশাসনের জানা থাকে, তাহলে সেই জমিতে নতুন করে দখলদারিত্ব তৈরি হয় কীভাবে?

আর দখলদারিত্ব তৈরি হওয়ার পর কেন বারবার উচ্ছেদ করতে হয়?

২০২৬ সালেও একই চিত্র

সরকারি জমি দখলের ঘটনা থামেনি।

২০২৬ সালের আগস্টে সুগন্ধা পয়েন্টে রাতের আঁধারে টিন ও বাঁশের ঘের দিয়ে কয়েক একর সরকারি জমি দখলের চেষ্টা হয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে জমির পরিমাণ প্রায় পাঁচ থেকে ১০ একর পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে— অর্থাৎ সঠিক পরিমাণটি সরকারি জরিপের মাধ্যমে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রশাসন পরে অভিযান চালিয়ে দখলমুক্ত করে।

এই ঘটনাটিও ছিল বাতিল হয়ে যাওয়া হোটেল-মোটেল জোনের জমিকে ঘিরে।

অর্থাৎ যে জমি আদালতের রায় এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় সরকারের নিয়ন্ত্রণে ফিরে এসেছে, বহু বছর পরও সেই জমি আবার দখলের লক্ষ্য হচ্ছে।

দখলের আরেক রূপ— সরকারি জমিতে স্থায়ী ভবন

কক্সবাজারের সমস্যা শুধু সৈকতের জমিতে সীমাবদ্ধ নয়।

উখিয়ায় সরকারি খাসজমি দখল করে বহুতল ভবন নির্মাণের অভিযোগ, ঈদগাঁও বাজারে খাসজমিতে বহুতল স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ এবং চকরিয়ায় সরকারি সংস্থার জমি দখলের অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সংবাদে এসেছে।

এসব ঘটনার ধরনও প্রায় একই—

প্রথমে জমি চিহ্নিত করা, এরপর দখল, তারপর স্থাপনা নির্মাণ এবং শেষ পর্যন্ত দখলকে স্থায়ী করার চেষ্টা।

কারও ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়, কারও ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাব, আবার কারও ক্ষেত্রে কাগজপত্র তৈরির অভিযোগ সামনে এসেছে।

সরকারি জমি ব্যক্তির নামে রেজিস্ট্রি— সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখানেই

কক্সবাজারের ভূমি নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধান এখন হওয়া দরকার রেজিস্ট্রি ও নামজারি রেকর্ড ধরে

কারণ শুধু সরকারি জমি দখল হয়েছে কি না, সেটি জানা যথেষ্ট নয়।

খুঁজতে হবে—

  • কোন দাগে সরকারি ১ নম্বর খতিয়ান ছিল;
  • কোন দাগ পরে ব্যক্তির নামে রেকর্ড হয়েছে;
  • কোন জমির ওপর লিজ দেওয়া হয়েছিল;
  • কোন লিজ পরে বাতিল হয়েছে;
  • বাতিলের পরও কার নামে নামজারি রয়ে গেছে;
  • বাতিল প্লটের জমি কেউ বিক্রি বা হস্তান্তর করেছে কি না;
  • কোনো সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সরকারি জমি ব্যক্তিগত মালিকানা দেখিয়ে দলিল সম্পাদন হয়েছে কি না;
  • জাল খতিয়ান বা দলিল ব্যবহার করে নামজারি হয়েছে কি না;
  • আর এসব পরিবর্তনের পেছনে ভূমি অফিস, রেজিস্ট্রি অফিস বা অন্য কোনো সরকারি দপ্তরের কারও ভূমিকা ছিল কিনা।

কারণ একটি সরকারি জমি দখল করা আর একটি সরকারি জমিকে কাগজে ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত করার চেষ্টা—দু’টির মধ্যে পার্থক্য অনেক।

দ্বিতীয়টি সফল হলে রাষ্ট্র শুধু জমির দখল হারায় না; হারায় জমির ওপর তার আইনি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়াও।

আদালতের নথিই বলছে, ঝুঁকি ছিল

এখানে সুপ্রিম কোর্টের নথির একটি অংশ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

লিজগ্রহীতাদের পক্ষ থেকে আদালতে বলা হয়েছিল, তারা লিজের জমি নিজেদের নামে মিউটেশন করেছেন। একই নথিতে সরকারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, কিছু লিজগ্রহীতা চুক্তির শর্ত ভেঙে বহুতল ভবন নির্মাণ করে ফ্ল্যাট বিক্রি করেছেন।

অর্থাৎ সরকারি জমি লিজ দেওয়ার পর সেটিকে ব্যক্তিগত বাণিজ্যিক সম্পদে রূপান্তরের ঝুঁকি যে বাস্তব ছিল, তার প্রমাণ আদালতের নথিতেই রয়েছে।

আর সুপ্রিম কোর্ট শেষ পর্যন্ত বলেছে— ঝিলংজা মৌজায় সংশ্লিষ্ট লিজ বাতিল করতে হবে, নির্মিত স্থাপনা অপসারণ করতে হবে এবং ভবিষ্যতে সেখানে নতুন লিজ দেওয়া যাবে না।

তাহলে এত বছরেও প্রশ্নের শেষ নেই কেন?

কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের নিজস্ব ওয়েবসাইটেই রাজস্ব শাখার দায়িত্বের মধ্যে খাস জমি বন্দোবস্ত এবং সরকারি ভূ-সম্পত্তি জবরদখলের অভিযোগ নিষ্পত্তির বিষয়টি রয়েছে।

অর্থাৎ সরকারি জমি রক্ষা করার জন্য প্রশাসনিক কাঠামো আছে।

আইন আছে।

ভূমি রেকর্ড আছে।

লিজ চুক্তি আছে।

আদালতের রায়ও আছে।

তারপরও যদি একই জমি বারবার দখল হয়, তাহলে প্রশ্নটা শুধু দখলদারের নয়।

প্রশ্ন উঠবে নজরদারি কোথায় ছিল?

আর যদি সরকারি জমি কোনো পর্যায়ে ব্যক্তির নামে রেকর্ড, নামজারি বা রেজিস্ট্রি হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন আরও গুরুতর—

সেই কাগজ তৈরি হলো কীভাবে?

এখন প্রয়োজন ‘দখলদার তালিকা’ নয় শুধু, ‘জমির ইতিহাস’

কক্সবাজারের সরকারি জমি উদ্ধারে শুধু অভিযান চালিয়ে টিনের বেড়া সরিয়ে দেওয়া যথেষ্ট নয়।

প্রয়োজন প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি জমির দাগভিত্তিক ভূমি-ইতিহাস প্রকাশ করা।

একটি দাগের ক্ষেত্রে—

পুরোনো খতিয়ান → বর্তমান খতিয়ান → মালিকানা → লিজ → লিজের মেয়াদ → লিজ বাতিলের আদেশ → নামজারি → দলিল → বর্তমান দখল → বর্তমান স্থাপনা

এই ধারাবাহিকতা বের করলেই বোঝা যাবে কোথায় সরকারি জমি বেহাত হয়েছে এবং কোথায় শুধু দখলের চেষ্টা হয়েছে।

বিশেষ করে কক্সবাজারের হোটেল-মোটেল জোন, কলাতলী, সুগন্ধা পয়েন্ট, ঝিলংজা এবং মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন সরকারি জমিগুলো নিয়ে এই যাচাই জরুরি।

কারণ সৈকতের জমি শুধু জমি নয়।

এটি রাষ্ট্রের সম্পদ, পর্যটনের সম্পদ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্পদ।

আর সেই সম্পদ যদি একবার কাগজে-কলমে ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে রূপ নেওয়ার সুযোগ পায়, পরে সেটি উদ্ধার করা অনেক কঠিন।

কক্সবাজারে তাই প্রশ্ন এখন শুধু— কে সরকারি জমি দখল করেছে?

প্রশ্ন হওয়া উচিৎ—

কারা সরকারি জমিকে দখলযোগ্য করে তুলেছে, কারা কাগজ তৈরি করেছে, কারা সেই কাগজকে রেকর্ডে জায়গা দিয়েছে এবং কারা বছরের পর বছর চোখের সামনে এই প্রক্রিয়াকে চলতে দিয়েছে?

কক্সবাজারের গত ১০ বছরের জেলা প্রশাসক (ডিসি)

ক্রম জেলা প্রশাসক দায়িত্বকাল
মোঃ আলী হোসেন ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ – ৭ মার্চ ২০১৮
মোঃ কামাল হোসেন ৬ মার্চ ২০১৮ – ৬ জানুয়ারি ২০২১
মোঃ মামুনুর রশীদ ৬ জানুয়ারি ২০২১ – ১১ ডিসেম্বর ২০২২
মুহম্মদ শাহীন ইমরান ১১ ডিসেম্বর ২০২২ – ২২ আগস্ট ২০২৪
মোহাম্মদ সালাহ্উদ্দিন ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৪ – ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫
নিজাম উদ্দিন আহমেদ ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ – ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ (ভারপ্রাপ্ত)
মোঃ আঃ মান্নান ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ – বর্তমান

নোট: ২০১৮ সালের মার্চে আলী হোসেন ও কামাল হোসেনের দায়িত্ব হস্তান্তরের তারিখ নিয়ে সরকারি ও বিভিন্ন প্রকাশিত নথিতে সামান্য তারতম্য রয়েছে।

কক্সবাজারের গত ১০ বছরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)

সময়কাল অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)
২০১৬–২০১৭ জাফর আলম
২০১৭–২০২০ মোহাম্মদ আশরাফুল আফসার
২০২১–২০২২ আমিন আল পারভেজ
২০২২–২০২৪ জাহিদ ইকবাল
২০২৪ জাহিদ ইকবাল
২৫ নভেম্বর ২০২৪–২০২৫ ইমরান হোসাইন সজীব
২০২৫–২০২৬ নিজাম উদ্দিন আহমেদ
২০২৬ বর্তমান দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তার তথ্য আলাদাভাবে যাচাইযোগ্য

অনুসন্ধানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ: সরকারি জমি, লিজ, খাসজমি, নামজারি ও ভূমি রাজস্ব-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে এডিসি (রাজস্ব) পদটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

বিগত ১০ জেলা প্রশাসক কে কোথায়?

ক্রম নাম কক্সবাজারে দায়িত্বকাল বর্তমানে দায়িত্ব/অবস্থা
মোঃ মনজুর আলম ভুইয়া ২৮ আগস্ট ২০০৮ – ২০ এপ্রিল ২০০৯ বর্তমান দায়িত্ব নিশ্চিত করা যায়নি
মোঃ গিয়াসউদ্দিন আহমেদ ২০ এপ্রিল ২০০৯ – ১০ জুলাই ২০১১ বর্তমান দায়িত্ব নিশ্চিত করা যায়নি
মোহাম্মদ জয়নুল বারী ১৪ জুলাই ২০১১ – ১ অক্টোবর ২০১২ সাধারণ বীমা করপোরেশনের চেয়ারম্যান পদ থেকে ২০২৬ সালে অব্যাহতি
মোঃ রুহুল আমিন ২৩ অক্টোবর ২০১২ – ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ বর্তমান সরকারি দায়িত্ব নিশ্চিত করা যায়নি
মোঃ আলী হোসেন ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ – ৭ মার্চ ২০১৮ ২০২৪ সালে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব; বর্তমান দায়িত্ব নিশ্চিত করা যায়নি
মোঃ কামাল হোসেন ৪ মার্চ ২০১৮ – ৬ জানুয়ারি ২০২১ স্থানীয় সরকার বিভাগে যুগ্মসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের তথ্য পাওয়া যায়; বর্তমান পদ পুনরায় যাচাই প্রয়োজন
মোঃ মামুনুর রশীদ ৬ জানুয়ারি ২০২১ – ১১ ডিসেম্বর ২০২২ স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের যুগ্মসচিব (বিশ্বস্বাস্থ্য অধিশাখা)
মুহম্মদ শাহীন ইমরান ১১ ডিসেম্বর ২০২২ – ২২ আগস্ট ২০২৪ নিয়ন্ত্রক, সার্টিফাইং অথরিটিজ (CCA)-এর উপ-নিয়ন্ত্রক
মোহাম্মদ সালাহ্উদ্দিন ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৪ – ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ জাতীয় বেতন কমিশন–২০২৫-এর চেয়ারম্যানের একান্ত সচিব
১০ মোঃ আঃ মান্নান ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ – বর্তমান জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, কক্সবাজার
নাম সময়কাল
মোহাম্মদ নূর হোসেন ২০১৬–২০১৭/পরবর্তী সময় কক্সবাজার সদর উপজেলার সাবেক সহকারী কমিশনার (ভূমি)
রাশেদুল ইসলাম পরবর্তী সময় কক্সবাজার সদর উপজেলার সাবেক সহকারী কমিশনার (ভূমি)
নাজিম উদ্দিন ২০১৮–২০২০ কক্সবাজার সদর উপজেলার সাবেক সহকারী কমিশনার (ভূমি)
মুহাম্মদ শাহরিয়ার মুক্তার ২০১৯–২০২০ কক্সবাজার সদর উপজেলার সাবেক সহকারী কমিশনার (ভূমি)
আমিন আল পারভেজ ২০২০–২০২১ সময়কালে কক্সবাজার সদর উপজেলার সাবেক সহকারী কমিশনার (ভূমি)
আরিফ উল্লাহ নিজামী ২০২৩–২০২৪ কক্সবাজার সদর উপজেলার সাবেক সহকারী কমিশনার (ভূমি)
শারমিন সুলতানা বর্তমান কক্সবাজার সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি)

বিশেষ নোট: অনলাইনে পাওয়া সংবাদ/নথিতে প্রত্যেক কর্মকর্তার সুনির্দিষ্ট যোগদান ও বদলির তারিখ এক জায়গায় ধারাবাহিকভাবে পাওয়া যাচ্ছে না। তাই অনুমান করে তারিখ বসানো হয়নি। নূর হোসেন, রাশেদুল ইসলাম, নাজিম উদ্দিন ও শাহরিয়ার মুক্তারের সাবেক এসিল্যান্ড পরিচয় একাধিক অনুসন্ধান/দুদক-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে এসেছে।

আরিফ উল্লাহ নিজামী: ২০২৪ সালের মার্চে কক্সবাজার সদর উপজেলার এসিল্যান্ড হিসেবে তাঁর নেতৃত্বে সরকারি/সংরক্ষিত বনভূমি উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার সংবাদ রয়েছে। পরবর্তীতে সুগন্ধা পয়েন্টের সরকারি জমির জাল খতিয়ান-সংক্রান্ত ঘটনায় তার নাম আসে; তিনি দাবি করেন, তার স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে।

কক্সবাজারের হোটেল-মোটেল জোনে শত শত কোটি টাকার সরকারি সম্পদ বেহাত হওয়া এবং বারবার উচ্ছেদের পরও পুনরায় দখলের ঘটনা একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনে দাঁড় করায়: কক্সবাজার প্রশাসন কি আসলেই এই প্রভাবশালী ভূমিদস্যুদের কাছে অসহায়, নাকি ভেতরে-ভেতরে কোনো গোপন সমঝোতা কাজ করে?
অবৈধ দখল
সৈকত গ্রাস: আইনি মারপ্যাঁচে প্রশাসনের ‘অসহায়ত্ব’ নাকি প্রভাবশালী চক্রের সাথে গোপন সমঝোতা?

প্রধান প্রধান উচ্ছেদ অভিযানের সময়রেখা:

সময়কাল অভিযানের বিবরণ ও উদ্ধারকৃত সম্পত্তি
অক্টোবর ২০২১ সুগন্ধা পয়েন্ট ও লাবণী পয়েন্ট সংলগ্ন সৈকতের একদম কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা ৫ শতাধিক অবৈধ ঝুপড়ি দোকান, রেস্তোরাঁ ও বাণিজ্যিক স্থাপনা জেলা প্রশাসনের যৌথ অভিযানে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
ফেব্রুয়ারি ২০২৩ হোটেল-মোটেল জোনের বাতিলকৃত ২৭টি সরকারি প্লটের মধ্যে সুগন্ধা পয়েন্টের প্রধান সড়ক লাগোয়া ২১টি বড় অবৈধ পাকা বাণিজ্যিক স্থাপনা ও সীমানা প্রাচীর বুলডোজার দিয়ে উচ্ছেদ করা হয়।
মে ২০২৫ কলাতলী হোটেল-মোটেল জোনের সুগন্ধা পয়েন্টে প্রায় ২০০ কোটি টাকা মূল্যের ২ একর ৩০ শতক খাসজমি অবৈধভাবে দখল করে রাতারাতি দোকানঘর নির্মাণের ঘটনার সত্যতা পেয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সেখানে অভিযান চালায়।
আগস্ট ২০২৬ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে ভূমিদস্যুদের পুনরায় দখল করা সুগন্ধা পয়েন্টের মূল সড়কের পাশের প্রায় ৫ থেকে ১০ একর খাস জমি জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেল বিশেষ অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করে। অবৈধ দখল ঠেকাতে সেখানে সরকারি মালিকানার কাঁটাতার ও বড় সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়।