চট্টগ্রাম | নিজস্ব প্রতিবেদক
বন্ড সুবিধায় আমদানিকৃত কাঁচামাল ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত প্রাপ্যতা বা Entitlement একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানের আমদানি করা কাঁচামাল তার অনুমোদিত প্রাপ্যতার সঙ্গে কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ— এ প্রশ্নের উত্তর না মিললে বন্ড ব্যবস্থাপনা ও রাজস্ব সুরক্ষা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে।
চট্টগ্রামের Namirah Manufacturing Industries-এর ক্ষেত্রেও এখন সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে।
কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, চট্টগ্রামের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি নথিতে দেখা যায়, ৪ জুন ২০২৫ তারিখে প্রতিষ্ঠানটির আমদানিকৃত কাঁচামাল নিঃশর্ত ও অব্যাহত ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে ছাড় দেওয়ার লক্ষ্যে প্রত্যয়নপত্র দেওয়ার তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। একই নথিতে আমদানিকৃত কাঁচামাল ছাড়ের লক্ষ্যে অনাপত্তি প্রদানের কথা উল্লেখ রয়েছে।
এখানেই প্রশ্ন— কী কারণে কাঁচামাল ছাড়ের জন্য ব্যাংক গ্যারান্টির প্রয়োজন হলো? ওই কাঁচামালের পরিমাণ কত ছিল? এবং আমদানিকৃত কাঁচামাল প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত Entitlement-এর মধ্যে ছিল, নাকি কোনো অংশ অতিরিক্ত ছিল?
সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত নথিটি নিজে থেকে ‘অতিরিক্ত কাঁচামাল’ প্রমাণ করে না। ফলে বিষয়টি নিশ্চিত করতে প্রয়োজন হবে প্রতিষ্ঠানটির Entitlement অনুমোদন, সংশ্লিষ্ট Bill of Entry, LC, কাঁচামালের পরিমাণ, ব্যাংক গ্যারান্টির অঙ্ক এবং পরবর্তী সমন্বয়ের নথি পরীক্ষা করা।

বন্ড সুবিধার মূল প্রশ্ন Entitlement
বন্ড সুবিধা মূলত রপ্তানিমুখী শিল্পকে শুল্ক-কর পরিশোধ ছাড়াই নির্দিষ্ট শর্তে উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয়। ফলে কোন প্রতিষ্ঠান কত পরিমাণ এবং কী ধরনের কাঁচামাল বন্ড সুবিধায় আনতে পারবে— তার হিসাব গুরুত্বপূর্ণ।
কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের ওয়েবসাইটেও Entitlement-এর জন্য পৃথক ব্যবস্থা এবং ‘Issued Entitlement’ সংক্রান্ত তথ্যের ব্যবস্থা রয়েছে।
অর্থাৎ কোনো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে আমদানি করা কাঁচামালের পরিমাণ ও অনুমোদিত Entitlement-এর মধ্যে মিল আছে কিনা— এটি যাচাই করা সম্ভব হওয়ার কথা।
নামিরাহর ক্ষেত্রে সেই তুলনাটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যাংক গ্যারান্টি কেন?
৪ জুন ২০২৫-এর সরকারি নথিতে ‘নিঃশর্ত ও অব্যাহত ব্যাংক গ্যারান্টি’র বিপরীতে আমদানিকৃত কাঁচামাল ছাড়ের কথা বলা হয়েছে।
সাধারণভাবে এমন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো— কোন দায় বা শর্তের নিরাপত্তা হিসেবে ব্যাংক গ্যারান্টি নেওয়া হয়েছিল?
ব্যাংক গ্যারান্টির অঙ্ক কত ছিল, কোন ব্যাংক এটি দিয়েছে এবং পরবর্তীতে সেটি অবমুক্ত করা হয়েছে কিনা— এসব তথ্য বিশ্লেষণ করলে পুরো ঘটনাটি পরিষ্কার হতে পারে।
যদি দেখা যায়, আমদানিকৃত কাঁচামালের কোনো অংশ প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত Entitlement-এর বাইরে ছিল, তাহলে পরবর্তী প্রশ্ন হবে— সেই অতিরিক্ত অংশ কীভাবে বন্ড ব্যবস্থার আওতায় এলো এবং তার ওপর প্রযোজ্য শুল্ক-কর কীভাবে সুরক্ষিত করা হয়েছিল?
আদালতেও ছিল নামিরাহর মামলা
নামিরাহ ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্ডাস্ট্রিজের নাম শুধু বন্ড কমিশনারেটের নথিতেই নয়, সুপ্রিম কোর্টের কার্যতালিকাতেও পাওয়া যায়।
Writ Petition No. 15073/2024-এ ‘M/S Namirah Manufacturing Industries vs NBR and others’ নামে মামলাটি ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত একাধিক কার্যতালিকায় ছিল।
তবে কার্যতালিকায় মামলার নাম থাকার অর্থ এই নয় যে প্রতিষ্ঠানটি কোনো অনিয়মে দোষী সাব্যস্ত হয়েছে। মামলাটির প্রকৃত বিষয়, আদালতের আদেশ এবং পরবর্তী অবস্থান আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
২০২৩ সালেও সরকারি গেজেটে Public Notice
আরও একটি বিষয় অনুসন্ধানের দাবি রাখে। সরকারি মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের Extraordinary Gazette-এর তালিকায় ২৩ মে ২০২৩ তারিখে ‘PUBLIC NOTICE IN THE MATTER OF M/S. NAMIRAH MANUFACTURING INDUSTRIES’ প্রকাশের তথ্য রয়েছে। গেজেটের তালিকায় এর ডকুমেন্ট নম্বর ৫৯৯৯ দেখানো হয়েছে।
এই Public Notice-এর পূর্ণাঙ্গ বিষয়বস্তু খতিয়ে দেখা জরুরি। কারণ ২০২৩ সালের ওই নোটিশ, ২০২৪ সালের আদালতের মামলা এবং ২০২৫ সালের ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে কাঁচামাল ছাড়— তিনটি ঘটনাকে পাশাপাশি রাখলে প্রতিষ্ঠানের বন্ড-সংক্রান্ত ইতিহাস সম্পর্কে একটি ধারাবাহিক চিত্র পাওয়া যেতে পারে।
মালিকানা ও ব্যবসার ধরন
বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিজ অ্যান্ড প্যাকেজিং ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (BGAPMEA) সদস্য তালিকায় Namirah Manufacturing Industries-এর সদস্য নম্বর ১৭৫৬ এবং চট্টগ্রামের পাহাড়তলী এলাকার ঠিকানা দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির Managing Partner হিসেবে Kamrun Nahar Lipi-এর নামও সংগঠনটির সদস্য প্রোফাইলে উল্লেখ রয়েছে।
অর্থাৎ এটি গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিজ ও প্যাকেজিং খাতের একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে সংশ্লিষ্ট সংগঠনের তালিকাভুক্ত।
এখন যে তথ্যগুলো দরকার
নামিরাহর বিষয়ে চূড়ান্ত অনুসন্ধানের জন্য কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট থেকে অন্তত নিম্নোক্ত নথিগুলো সংগ্রহ করা প্রয়োজন—
১. প্রতিষ্ঠানের বর্তমান ও সংশ্লিষ্ট সময়ের Bond Licence
২. ২০২৩–২০২৬ সময়ের Entitlement Approval
৩. ৪ জুন ২০২৫-এর ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে কাঁচামাল ছাড়ের সম্পূর্ণ নথি
৪. সংশ্লিষ্ট Bill of Entry
৫. LC ও আমদানিকৃত কাঁচামালের পরিমাণ
৬. ব্যাংক গ্যারান্টির অঙ্ক ও অবমুক্তির নথি
৭. প্রতিষ্ঠানের Audit Report/অডিট আপত্তি
৮. ২০২৩ সালের Public Notice-এর পূর্ণাঙ্গ কপি
৯. Writ Petition No. 15073/2024-এর সম্পূর্ণ আদেশ ও মামলার বিষয়বস্তু
১০. কোনো Demand, Adjudication বা রাজস্ব দাবির নথি আছে কি না
প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে
সরকারি নথিতে এখন পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে যা পাওয়া যাচ্ছে, তা হলো— নামিরাহর আমদানিকৃত কাঁচামাল ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে ছাড়ের জন্য কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট প্রত্যয়নপত্র/অনাপত্তি দিয়েছে।
কিন্তু কেন ব্যাংক গ্যারান্টির প্রয়োজন হয়েছিল, গ্যারান্টির অঙ্ক কত, আমদানিকৃত কাঁচামাল প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত Entitlement-এর কত অংশ এবং কোনো অতিরিক্ত কাঁচামাল ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর সরকারি প্রকাশিত সংক্ষিপ্ত নথিতে নেই।
তাই ‘প্রাপ্যতার অতিরিক্ত কাঁচামাল’ বিষয়টি নিশ্চিত করতে Entitlement এবং Bill of Entry-এর হিসাব পাশাপাশি দেখা জরুরি।
আর সেখানেই আসল প্রশ্ন— নামিরাহ কতটুকু কাঁচামাল আমদানির অনুমতি পেয়েছিল, বাস্তবে কতটুকু এনেছিল এবং বন্ড সুবিধার আওতায় ঠিক কতটুকু ঢুকেছিল?
