Headlines

ভ্যাট নাকি ভয়ের কর? ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য অমানবিক এক বাস্তবতা

পরোক্ষ কর

বাংলাদেশে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ব্যবস্থা চালুর মূল উদ্দেশ্য ছিলো রাজস্ব বৃদ্ধি, ব্যবসাকে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির আওতায় আনা এবং কর ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও আধুনিক করা। কিন্তু বাস্তবে দেশের অসংখ্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীর অভিজ্ঞতা বলছে, ভ্যাট আজ অনেক ক্ষেত্রেই রাজস্ব আদায়ের একটি নীতি নয়; বরং জটিল আইন, প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা এবং উচ্চ পরিপালন ব্যয়ের এক গোলকধাঁধা। আইন যতটা না বোঝা যায়, তার চেয়ে বেশি বোঝা যায় মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা। ফলে অনেক ব্যবসায়ীর কাছে আইনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে প্রশাসনিক ব্যাখ্যা, সমঝোতা এবং অনিশ্চয়তা এড়িয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বললে একটি প্রশ্ন বারবার উঠে আসে—”আমরা কি শুধু সরকারকে দেওয়ার জন্য ব্যবসা করি?” তাদের যুক্তি, একটি ছোট দোকান চালাতে দোকান ভাড়া, কর্মচারীর বেতন, বিদ্যুৎ বিল, ব্যাংক ঋণের সুদ, পরিবহন ব্যয়, বাজারের ঝুঁকি এবং ব্যক্তিগত শ্রম— সবকিছু বহন করার পর যদি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ ভ্যাট-সংক্রান্ত দায় ও প্রশাসনিক ব্যয়ে চলে যায়, তাহলে ব্যবসার মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়। অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, মাসে ৫০ হাজার বা এক লাখ টাকা বেতন পাওয়া একজন চাকরিজীবী যেমন সরাসরি প্রতি মাসে কয়েক হাজার টাকা কর দেন না, তাহলে সীমিত মুনাফার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর কাছ থেকে কেন এমন আর্থিক চাপ প্রত্যাশা করা হবে? যদিও ভ্যাট ও আয়কর সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের কর, তবুও এই প্রশ্নটি ব্যবসায়ীদের বাস্তব অনুভূতির প্রতিফলন হিসেবে গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে।

পরোক্ষ কর
এআই ইলাস্ট্রেশন।

তাত্ত্বিকভাবে ভ্যাট ব্যবসায়ীর কর নয়; এটি ভোক্তার কর। ব্যবসায়ী কেবল সরকারের পক্ষে কর সংগ্রহ করেন। কিন্তু বাস্তব বাজারে বিষয়টি এতটা সরল নয়। বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা প্রায়ই এমন প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে কাজ করেন, যেখানে পণ্যের দাম সামান্য বাড়ালেই ক্রেতা অন্য দোকানে চলে যেতে পারেন। ফলে অনেক ক্ষেত্রে তারা পুরো ভ্যাটের বোঝা ভোক্তার ওপর স্থানান্তর করতে পারেন না। এর একটি অংশ কার্যত তাদের মুনাফা থেকেই বহন করতে হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় হিসাবরক্ষক নিয়োগ, সফটওয়্যার ব্যবহার, রিটার্ন দাখিল, কাগজপত্র সংরক্ষণ এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার ব্যয়। অর্থনীতিতে এগুলোকে Compliance Cost বা কর পরিপালনের ব্যয় বলা হয়। অনেক সময় এই ব্যয় ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য করের চেয়েও বেশি কষ্টকর হয়ে ওঠে।

এখানেই বাংলাদেশের বাস্তবতা উন্নত ও উদীয়মান অনেক দেশের সঙ্গে ভিন্ন হয়ে যায়। যুক্তরাজ্যে একটি নির্দিষ্ট সীমার নিচে বার্ষিক টার্নওভার হলে ব্যবসাকে বাধ্যতামূলকভাবে ভ্যাট নিবন্ধন করতে হয় না। নিবন্ধনের পরও ছোট ব্যবসার জন্য Flat Rate Scheme-এর মতো সহজ ব্যবস্থা রয়েছে, যাতে হিসাবের জটিলতা কমে। অস্ট্রেলিয়ায় ছোট ব্যবসার জন্য Simplified GST Reporting চালু আছে। সিঙ্গাপুরেও একটি নির্দিষ্ট টার্নওভারের নিচে ব্যবসার জন্য নিবন্ধন বাধ্যতামূলক নয় এবং ডিজিটাল সেবার মাধ্যমে কর পরিপালন সহজ করা হয়েছে। ভারত জিএসটি চালুর পর প্রথমদিকে ব্যাপক জটিলতার মুখে পড়লেও পরে ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য Composition Scheme চালু করে, যাতে কম হারে কর দিয়ে তুলনামূলক সহজ পদ্ধতিতে ব্যবসা পরিচালনা করা যায়। অর্থাৎ অধিকাংশ দেশেই নীতিনির্ধারকেরা স্বীকার করেছেন যে, ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য বড় করপোরেশনের মতো একই প্রশাসনিক কাঠামো কার্যকর হয় না।

বাংলাদেশে বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট, ট্যাক্স কনসালট্যান্ট, আইনি পরামর্শক এবং আলাদা হিসাব বিভাগ পরিচালনা করতে সক্ষম। তাদের জন্য ভ্যাট আইন জটিল হলেও তা সামাল দেওয়ার মতো আর্থিক ও মানবসম্পদ রয়েছে। কিন্তু একজন মুদি দোকানদার, স্থানীয় রেস্টুরেন্ট মালিক, ক্ষুদ্র উৎপাদক বা খুচরা ব্যবসায়ীর পক্ষে একই ধরনের আইন ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা অত্যন্ত কঠিন। ফলে একই আইন কাগজে সবার জন্য সমান হলেও বাস্তবে তার প্রভাব সমান নয়। আইন এখানে সমতা তৈরি না করে বৈষম্য সৃষ্টি করতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর ওপর অতিরিক্ত চাপের ক্ষতি কেবল ব্যবসায়ীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ। কারণ ব্যবসায়ী টিকে থাকার জন্য হয় পণ্যের দাম বাড়ান, নয়তো পণ্যের মান কমান, অথবা ব্যবসাই বন্ধ করে দেন। তিনটি ক্ষেত্রেই ক্ষতির বোঝা বহন করেন ভোক্তা। স্থানীয় বাজারে ছোট ব্যবসা কমে গেলে প্রতিযোগিতা কমে, বড় প্রতিষ্ঠানের বাজার নিয়ন্ত্রণ বাড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি হয়। অর্থাৎ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে দুর্বল করা মানে বাজারকে দুর্বল করা; আর বাজার দুর্বল হলে শেষ পর্যন্ত জনগণেরই ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়।

অর্থনীতির ইতিহাসও একই শিক্ষা দেয়। জার্মানির Mittelstand, জাপানের ক্ষুদ্র ও পারিবারিক শিল্প কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ার এসএমই খাত— এসব দেশের অর্থনৈতিক শক্তির ভিত্তি গড়ে উঠেছে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ওপর। এসব দেশে সরকার কর আদায়কে শুধু রাজস্ব সংগ্রহের বিষয় হিসেবে দেখেনি; বরং ব্যবসা টিকিয়ে রাখা এবং উৎপাদন বাড়ানোর কৌশল হিসেবে বিবেচনা করেছে। কারণ একটি ক্ষুদ্র ব্যবসা বড় হলে ভবিষ্যতে তার কাছ থেকেই আরও বেশি কর পাওয়া সম্ভব।

বাংলাদেশেও রাজস্ব বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু রাজস্ব নীতির সাফল্য কেবল কত টাকা আদায় হলো, তা দিয়ে বিচার করা যায় না। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো— সেই রাজস্ব আদায়ের প্রক্রিয়ায় কতজন উদ্যোক্তা নিরুৎসাহিত হলেন, কতজন ব্যবসা ছোট করলেন, কতজন অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে চলে গেলেন এবং শেষ পর্যন্ত এর মূল্য কে দিল? যদি উত্তর হয় সাধারণ মানুষ, তাহলে সেই নীতির কার্যকারিতা নতুন করে মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে।

করব্যবস্থার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ব্যবসাকে শাস্তি দেওয়া নয়, ব্যবসাকে বিকশিত করা। কারণ একটি শক্তিশালী অর্থনীতিতে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় অংশীদার শুধু বড় শিল্পগোষ্ঠী নয়; বরং লাখো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, যারা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেন, স্থানীয় অর্থনীতিকে সচল রাখেন এবং প্রতিদিন কোটি মানুষের কাছে পণ্য ও সেবা পৌঁছে দেন। তাদের জন্য যদি করব্যবস্থা সহজ, স্বচ্ছ এবং ন্যায়সঙ্গত না হয়, তাহলে ক্ষতি শুধু ব্যবসায়ীর নয়, শেষ পর্যন্ত পুরো অর্থনীতির, আর সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয় সাধারণ জনগণ।