Headlines

কাস্টমসের অদৃশ্য প্রভাববলয়: সিএন্ডএফ, ফ্রেইট ফরোয়ার্ডিং ও আমদানি বাণিজ্যে স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ

কাস্টমস্, এক্সাইজ ও ভ্যাট

বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে কাস্টমস, সিএন্ডএফ (Clearing and Forwarding) এজেন্ট এবং ফ্রেইট ফরোয়ার্ডিং প্রতিষ্ঠান— এই তিনটি খাত পরস্পরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। আইন অনুযায়ী এদের প্রত্যেকের ভূমিকা পৃথক এবং একে অপরের ওপর প্রয়োজনীয় নজরদারি থাকার কথা। কিন্তু সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী, আমদানিকারক ও খাতসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের অভিযোগ— বাস্তবে এই বিভাজন অনেক ক্ষেত্রেই অস্পষ্ট হয়ে পড়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, কাস্টমস বিভাগের কিছু প্রভাবশালী কর্মকর্তা সরাসরি নিজেদের নামে নয়, বরং আত্মীয়স্বজন, ঘনিষ্ঠ বন্ধু বা বিশ্বস্ত সহযোগীদের মাধ্যমে সিএন্ডএফ ও ফ্রেইট ফরোয়ার্ডিং ব্যবসায় প্রভাব বিস্তার করেন। অনেক ক্ষেত্রে একই নেটওয়ার্কের সঙ্গে বড় আমদানিকারকদেরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এসব অভিযোগ সত্য হলে তা কেবল স্বার্থের সংঘাত (Conflict of Interest) নয়, বরং রাজস্ব প্রশাসনের নিরপেক্ষতার ওপরও গুরুতর প্রশ্ন তোলে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কাস্টমস কর্মকর্তার প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে আইন অনুযায়ী পণ্যের শ্রেণিকরণ, মূল্য নির্ধারণ, শুল্ক ও কর আদায় এবং চোরাচালান প্রতিরোধ। কিন্তু যদি কোনো কর্মকর্তা বা তার নিকটাত্মীয় একইসঙ্গে কাস্টমস-নির্ভর ব্যবসায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ স্বার্থ রাখেন, তাহলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের নিরপেক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এতে সৎ ব্যবসায়ীরা বৈষম্যের শিকার হতে পারেন, আবার অসাধু ব্যবসায়ীরা বিশেষ সুবিধা পাওয়ার সুযোগও তৈরি হতে পারে।

অভিযোগ আরও রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সিএন্ডএফ প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার, মূল্যায়নে নমনীয়তা, অপ্রয়োজনীয় হয়রানি থেকে অব্যাহতি কিংবা দ্রুত ছাড়পত্র দেওয়ার মতো সুবিধা দেওয়া হয়। অন্যদিকে একই ধরনের পণ্যের ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানগুলোকে দীর্ঘসূত্রতা, অতিরিক্ত যাচাই কিংবা প্রশাসনিক জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়। এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত না হলে বাস্তব চিত্র স্পষ্ট হওয়া কঠিন।

এ কারণে সুশাসন বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই কাস্টমস কর্মকর্তাদের সম্পদ, আত্মীয়স্বজনের ব্যবসায়িক স্বার্থ, বেনিফিশিয়াল ওনারশিপ (Beneficial Ownership) এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মালিকানা কাঠামো নিয়মিত যাচাইয়ের সুপারিশ করে আসছেন। তাদের মতে, কেবল ঘুষের অভিযোগ তদন্ত করলেই হবে না; বরং কাস্টমস প্রশাসন, সিএন্ডএফ ব্যবসা, ফ্রেইট ফরোয়ার্ডিং এবং বড় আমদানিকারকদের মধ্যে বিদ্যমান আর্থিক ও ব্যবসায়িক সম্পর্কও খতিয়ে দেখা জরুরি।

কারণ, যদি রাজস্ব আদায়ের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরাই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সেই ব্যবসার নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠেন, তাহলে বাজারে প্রতিযোগিতা, সুশাসন এবং রাষ্ট্রের রাজস্ব— সবকিছুই ঝুঁকির মুখে পড়ে। তাই প্রশ্নটি শুধু দুর্নীতির নয়; এটি রাষ্ট্রের রাজস্ব ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করারও।