Headlines

রেস্তোরাঁর VAT ফাঁকি, নাকি অফিসারের সঙ্গে সমঝোতা— কক্সবাজারে কোনটি আসল সমস্যা?

হোটেল রেস্তোরাঁ

দুদকের অনুসন্ধানে উঠেছিল মাসোহারা, ‘দুই রেজিস্টার’ ও প্রকৃত বিক্রি গোপনের অভিযোগ; হাইকোর্টে গড়ায় ‘হাজার কোটি টাকা’ VAT লোপাটের অভিযোগ। কয়েক বছর পরও কি বদলেছে কক্সবাজারের চিত্র?


FollowUpNews অনুসন্ধান

কক্সবাজারে পর্যটক বাড়লে শুধু হোটেলের ব্যবসা বাড়ে না, বাড়ে রেস্তোরাঁর বিক্রিও। সমুদ্রসৈকত, কলাতলী, সুগন্ধা, লাবণীসহ পর্যটন এলাকার শত শত রেস্তোরাঁয় প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ খাবার বিক্রি হয়। সেই বিক্রির সঙ্গে জড়িত থাকে রাষ্ট্রের রাজস্বও। ক্রেতারা উচ্চমূল্যে খাবার খেতে বাধ্য হয়।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে— ক্রেতার কাছ থেকে যে VAT আদায় করা হচ্ছে, তার প্রকৃত হিসাব কি সরকারের কাছে যাচ্ছে?

আরও বড় প্রশ্ন— যদি কোনো ব্যবসায়ী প্রকৃত বিক্রি গোপন করে VAT কম দেন, তাহলে সেটি কি শুধু ব্যবসায়ীর কর ফাঁকি, নাকি এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট VAT কর্মকর্তাদের কোনো সমঝোতাও কাজ করছে?

কক্সবাজারের হোটেল-রেস্তোরাঁ খাত নিয়ে কয়েক বছর আগের দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান, জেলা প্রশাসনের তদন্ত এবং পরবর্তী আদালত-কার্যক্রমে এমন প্রশ্নই সামনে এসেছিল। বিষয়টি এতটাই গুরুতর পর্যায়ে গিয়েছিল যে হাইকোর্ট জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR), দুদক ও কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের কাছে তদন্তের অগ্রগতি জানতে চেয়েছিল।

এখন ২০২৬ সালে এসে FollowUpNews-এর অনুসন্ধানের প্রশ্ন— তখন যে অভিযোগ উঠেছিল, তার পর কক্সবাজারের VAT ব্যবস্থায় আসলে কতটা পরিবর্তন এসেছে?

কক্সবাজার
কক্সবাজারের পর্যটন খাতে ভ্যাট ফাঁকি: নজরদারিতে শীর্ষ হোটেল-রেস্তোরাঁ।

অভিযোগ ছিল— VAT-এর চেয়ে ‘মাসোহারা’ বেশি গুরুত্বপূর্ণ

২০২১ সালে দুদকের চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-২-এর এনফোর্সমেন্ট অনুসন্ধানে কক্সবাজারের হোটেল-রেস্তোরাঁ খাতে VAT অনিয়মের অভিযোগ উঠে আসে।

প্রকাশিত দুদক-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, অভিযোগ ছিল— কক্সবাজারের অনেক হোটেল-রেস্তোরাঁ প্রকৃত বিক্রি না দেখিয়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ VAT দিচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট VAT কর্মকর্তাদের মাসিক অবৈধ সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসা করা হচ্ছে।

অভিযোগের আরেকটি অংশ ছিল আরও গুরুতর। সেখানে বলা হয়, কিছু হোটেলে প্রকৃত আয় ও বিক্রির তথ্য আড়াল করতে দুটি রেজিস্টার রাখা হতো— একটি বাহ্যিকভাবে দেখানোর জন্য, অন্যটি ব্যবস্থাপনার প্রকৃত হিসাবের জন্য। যদিও সারা বাংলাদেশের চিত্রও এর চেয়ে খুব বেশী আলাদা কিছু নয়।

দুদকের অভিযানের বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, কিছু প্রতিষ্ঠানে অতিথির এন্ট্রি রেজিস্টার ও রুম ভাড়ার তালিকাও যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছিল না। রেস্তোরাঁয় VAT-সংক্রান্ত ফরম ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ ছিল।

অর্থাৎ অভিযোগের কাঠামোটি ছিল—

প্রকৃত বিক্রি → কম দেখানো → কম VAT → কর্মকর্তাকে অবৈধ সুবিধা → ব্যবসায়ীর বাড়তি সাশ্রয়।

এটি প্রমাণিত কোনো সর্বজনীন ব্যবস্থা— এমন দাবি করা যাবে না। কিন্তু বিষয়টি এতটাই গুরুতর ছিল যে দুদকের অনুসন্ধান ও পরবর্তী আদালত-কার্যক্রমে তা উঠে আসে।

দুদকের অনুসন্ধানের প্রকাশিত বিবরণে বলা হয়, কিছু হোটেলে একটি ‘ওপেন’ রেজিস্টারে কম আয় দেখানো হতো এবং আরেকটি ‘হাইড’ রেজিস্টারে ব্যবস্থাপনার প্রকৃত হিসাব রাখা হতো।

অভিযোগ অনুযায়ী, VAT কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশের মাধ্যমে প্রথম রেজিস্টারের তথ্যের ভিত্তিতে রাজস্ব নির্ধারণ করা হতো।

এর ফলে সরকারের কাছে যে বিক্রির হিসাব যেত, তা প্রকৃত বিক্রির চেয়ে কম হওয়ার সুযোগ তৈরি হতো।

২০২৩ সালে প্রকাশিত আদালত-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, জেলা প্রশাসক ও NBR-এর প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে পরিচালিত অনুসন্ধানেও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের VAT হিসাব নিয়ে অসঙ্গতি পাওয়া যায়।

এখানেই FollowUpNews-এর অনুসন্ধানের মূল প্রশ্ন:

ডিজিটাল EFD, VAT return ও অন্যান্য নথি চালু থাকার পর এখন কি একই ধরনের কারসাজির সুযোগ রয়েছে?

পুরোনো অভিযোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর একটি শালিক রেস্টুরেন্ট

২০২২ সালে প্রকাশিত অভিযোগের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, শালিক রেস্টুরেন্টে মাসিক বিক্রি প্রায় ২ কোটি টাকা এবং সেই বিক্রির ওপর তৎকালীন প্রতিবেদনে প্রচলিত হিসাব অনুযায়ী VAT হওয়ার কথা ছিল প্রায় ২০.৫ লাখ টাকা

কিন্তু অভিযোগ ছিল, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ঘুষের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠানটি মাসে মাত্র ১ থেকে দেড় লাখ টাকা VAT দিত।

এই অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে চূড়ান্ত বিচারিক সিদ্ধান্ত হিসেবে এটিকে উপস্থাপন করা যাবে না। তবে অভিযোগটি এতটাই গুরুতর ছিল যে এটি হাইকোর্টে উপস্থাপিত রিটের অন্যতম ভিত্তি হয়।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে—

২০২২ সালের সেই অভিযোগের পর শালিকের VAT হিসাব কোথায় দাঁড়িয়েছে?

২০২৬ সালে তার BIN কী অবস্থায়?

বর্তমান VAT return-এ turnover কত?

EFD-তে মাসিক বিক্রি কত?

এবং সরকারি কোষাগারে VAT হিসেবে কত টাকা জমা পড়ছে?

আরেকটি আলোচিত নাম আল গণি

প্রকাশিত অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির দুটি শাখায় মাসে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা বিক্রি হলেও মাত্র ৫০ হাজার টাকা VAT দেওয়ার অভিযোগ ছিল।

প্রতিবেদনে তৎকালীন হিসাব অনুযায়ী সম্ভাব্য VAT প্রায় ২৬.৫ লাখ টাকা হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।

অর্থাৎ অভিযোগটি যদি সত্য হতো, তাহলে প্রশ্ন শুধু VAT ফাঁকির নয়— এত বড় পার্থক্য কীভাবে নিয়মিত হিসাবের মধ্যে টিকে থাকল?

আর সেই প্রশ্নের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই আসে VAT প্রশাসনের প্রশ্ন:

একজন VAT কর্মকর্তা কোনো প্রতিষ্ঠানের বিক্রির প্রকৃত পরিমাণ কীভাবে যাচাই করেন?

কীভাবে assessment করেন?

কেন audit হয় না?

কেন একই ধরনের অস্বাভাবিক turnover বছরের পর বছর নজর এড়িয়ে যায়?

আর যদি কোনো কর্মকর্তা ইচ্ছাকৃতভাবে বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে থাকেন— তাহলে সেটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা, নাকি যোগসাজশ?

শুধু অভিযোগ নয়— জেলা প্রশাসনের অনুসন্ধানেও মিলেছিল অসঙ্গতি

এখানেই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

২০২৩ সালের প্রকাশিত জেলা প্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, আল গণি গ্রাহকের কাছ থেকে বিক্রয়মূল্য নেওয়ার ক্ষেত্রে EFD মেশিনের পাশাপাশি সাধারণ বিক্রয় স্লিপও ব্যবহার করছিল।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে ৭২ হাজার ৯৩৮ টাকা এবং অক্টোবরে ৭৪ হাজার ১১২ টাকা VAT প্রদান করা হয়নি বলে তদন্তে প্রতীয়মান হয়।

দুই মাসে এই অঙ্ক দাঁড়ায় ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫০ টাকা

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— এটি কোনো অনুমান নয়; প্রকাশিত জেলা প্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছিল।

শালিকের হিসাবেও EFD বনাম বিক্রয় স্লিপ

জেলা প্রশাসনের তদন্তে শালিক রেস্টুরেন্ট এবং শালিক রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড কনভেনশন হল-এর হিসাব নিয়েও প্রশ্ন উঠে আসে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠান দুটি আলাদা নামে VAT চালান দেখালেও দৈনিক বিক্রয় রেজিস্টার, বিক্রয় রসিদ ও রোজনামা খাতায় তাদের একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখানোর বিষয়টি পাওয়া যায়।

তদন্তে আরও বলা হয়, EFD-এর মাধ্যমে প্রদর্শিত বিক্রির ওপর VAT দেওয়া হলেও সাধারণ বিক্রয় স্লিপের মাধ্যমে হওয়া বিক্রির ওপর VAT দেওয়া হয়নি।

ফলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিক্রয় VAT-এর হিসাবের বাইরে থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয় বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

দুদকের অভিযানে আরও যেসব নাম

২০২১ সালের দুদকের এনফোর্সমেন্ট অনুসন্ধানে দৈবচয়নের ভিত্তিতে কক্সবাজারের কয়েকটি হোটেল ও রেস্তোরাঁয় অভিযান পরিচালনার কথা প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়।

সেখানে নাম আসে—

  • তারমত রেস্টুরেন্ট
  • জাফরান রেস্টুরেন্ট
  • অস্টার ইকো
  • ইউনি রিসোর্ট হোটেল
  • উইভে/উইন্ডে টেরিস
  • আমি দরিয়া
  • হোটেল সি উত্তরা

প্রকাশিত দুদক-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, এসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে VAT পরিশোধ, অতিথি রেজিস্টার, রুম ভাড়ার হিসাব এবং VAT ফরম ব্যবহারে অনিয়ম পাওয়া যায়।

আবার ২০২৩ সালের জেলা প্রশাসনের অনুসন্ধানে পউষী রেস্টুরেন্টের তিনটি শাখা, ঝাউবন রেস্তোরাঁ, কড়াই রেস্টুরেন্ট, রূপসী বাংলা রেস্টুরেন্ট ও হোটেল অভিসার-এর নামও আসে। এসব প্রতিষ্ঠানের কয়েকটি পরিদর্শনের সময় বন্ধ থাকায় তদন্ত সম্পূর্ণ করা সম্ভব হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

অর্থাৎ এসব নামকে ২০২৬ সালের অনিয়মকারী হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই; বরং বর্তমান VAT compliance পুনরায় যাচাইয়ের জন্য এগুলো গুরুত্বপূর্ণ follow-up sample

কিন্তু সবাই কি অনিয়ম করেছে?

না।

এখানেই পুরোনো তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে।

জেলা প্রশাসনের তদন্তের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, মারমেইড ক্যাফে এবং সল্ট বিস্ট্রো ক্যাফে VAT যথাযথভাবে সরকারি কোষাগারে জমা দিয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়েছে।

এই তথ্যটি অনুসন্ধানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ এতে বোঝা যায়— পুরো কক্সবাজারের রেস্তোরাঁ খাতকে একসঙ্গে অভিযুক্ত করার কোনো যুক্তি নেই।

বরং অনুসন্ধানের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রশ্ন হবে—

যেখানে অনিয়মের পুরোনো অভিযোগ আছে + যেখানে compliance ভালো পাওয়া গিয়েছিল— দুই ধরনের প্রতিষ্ঠানকে পাশাপাশি রেখে বর্তমান হিসাব পরীক্ষা করা।

তাহলে আসল সমস্যা ব্যবসায়ী, নাকি VAT অফিসার?

এই প্রশ্নের উত্তর আগে থেকেই ধরে নেওয়া যাবে না।

কারণ VAT ফাঁকির ক্ষেত্রে অন্তত তিনটি সম্ভাবনা থাকতে পারে।

প্রথম সম্ভাবনা: ব্যবসায়ী নিজেই বিক্রি গোপন করছেন

EFD-এর বাইরে বিক্রি, কম turnover দেখানো, VAT না দেওয়া— এসব হলে ব্যবসায়ী দায়ী।

দ্বিতীয় সম্ভাবনা: দুর্বল নজরদারি

ব্যবসায়ী অনিয়ম করছেন, কিন্তু VAT কর্মকর্তার পর্যাপ্ত audit বা enforcement নেই।

তৃতীয় সম্ভাবনা: যোগসাজশ

ব্যবসায়ী ও VAT কর্মকর্তার মধ্যে অবৈধ সমঝোতা থাকলে বিষয়টি শুধু tax evasion নয়; এটি দুর্নীতির প্রশ্নও।

পুরোনো দুদক অনুসন্ধানের অভিযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল এই তৃতীয় সম্ভাবনাটিই।

প্রকাশিত প্রতিবেদনে এমন অভিযোগও ছিল যে কিছু ব্যবসায়ী VAT-এর চেয়ে বেশি অর্থ ঘুষ হিসেবে দিয়ে কম VAT-এর দায় থেকে বাঁচার সুযোগ পাচ্ছেন। একটি হোটেলের হিসাবরক্ষকের বরাত দিয়ে এমনও বলা হয়েছিল যে বছরে কয়েক লাখ টাকা VAT দেওয়ার বিপরীতে আরও বেশি অর্থ ঘুষ দিতে হতো— তারপরও ব্যবসায়ীর আর্থিক সাশ্রয় হতো।

এই অভিযোগ প্রমাণিত সত্য হিসেবে নয়, তদন্তে উঠে আসা অভিযোগ হিসে

কক্সবাজারের VAT অনিয়ম নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের শিরোনামেই ‘হাজার কোটি টাকা লোপাট’ কথাটি উঠে আসে। বিষয়টি পরবর্তীতে হাইকোর্টের নজরেও আসে।

কিন্তু এখানে সাংবাদিকতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা হলো—

“হাজার কোটি টাকা লোপাট”কে প্রমাণিত আর্থিক ক্ষতি হিসেবে লেখা যাবে না, যতক্ষণ না সরকারি চূড়ান্ত হিসাব বা আদালতের সিদ্ধান্তে সেই অঙ্ক প্রতিষ্ঠিত হয়।

বরং FollowUpNews-এর মূল প্রশ্ন:

কক্সবাজারের হোটেল-রেস্তোরাঁ খাত থেকে প্রকৃতপক্ষে বছরে কত VAT আদায় হওয়ার কথা এবং বাস্তবে কত আদায় হচ্ছে?

এই দুটি সংখ্যা পাওয়া গেলে ‘হাজার কোটি’ প্রশ্নের উত্তরও অনেক পরিষ্কার হবে।

৪ শতাধিক হোটেল, শত শত রেস্তোরাঁ— নিবন্ধিত কত?

কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের বর্তমান সরকারি পোর্টালে হোটেল-মোটেল-গেস্টহাউসের একটি তালিকা রয়েছে; ২০২৬ সালের জুনে হালনাগাদ করা তালিকায় ৩৮টি এন্ট্রি দেখা যায়।

কক্সবাজার সদর উপজেলার সরকারি তালিকাতেও Hotel Ocean Paradise, Hotel Kallol, Hotel Shaibal, Long Beach, Sea Crown, Hotel The Cox Today, Mohammadia Guest House, Hotel Sea Worldসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের তথ্য রয়েছে।

জেলার অন্যান্য উপজেলাতেও সরকারি তালিকায় হোটেল-রিসোর্টের তথ্য রয়েছে। যেমন টেকনাফের সরকারি তালিকায় ২০টি এন্ট্রি রয়েছে, যার মধ্যে Central Resort, Milky Resort, Alo Resort এবং Roof Top Café & Restaurant-এর মতো প্রতিষ্ঠান আছে।

অর্থাৎ FollowUpNews-এর সামনে এখন একটি বড় ডেটা-অনুসন্ধানের সুযোগ রয়েছে।

প্রশ্নটি শুধু—

“কে VAT দেয়?”

তা নয়।

প্রশ্নটা হচ্ছে—

কক্সবাজারে মোট কতটি হোটেল-রেস্তোরাঁ ব্যবসা করছে?

তার মধ্যে কতটির BIN আছে?

কতটি VAT return দিচ্ছে?

কতটি EFD ব্যবহার করছে?

কতটি audit হয়েছে?

কতটির বিরুদ্ধে VAT assessment হয়েছে?

কত টাকা বকেয়া?

কত টাকা আদায় হয়েছে?

FollowUpNews-এর পরবর্তী অনুসন্ধান

পুরোনো অভিযোগের ভিত্তিতে এখন ২০২৬ সালের তথ্য দিয়ে যাচাই করা দরকার।

প্রথম পর্যায়ে অন্তত ৫০টি হোটেল-রেস্তোরাঁকে sample হিসেবে নিয়ে পাঁচটি তথ্য পাশাপাশি বসানো যেতে পারে—

১. প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত ব্যবসার আকার

২. BIN ও VAT registration status

৩. EFD/চালানে প্রদর্শিত বিক্রি

৪. VAT return-এ ঘোষিত turnover

৫. সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া VAT

এর সঙ্গে আরও একটি তথ্য যোগ করতে হবে—

গত তিন বছরে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে VAT audit/assessment হয়েছে কি না।

একজন ব্যবসায়ী যদি বিক্রি গোপন করেন, সেটি VAT আইনের লঙ্ঘন হতে পারে।

কিন্তু একজন VAT কর্মকর্তা যদি সেই অনিয়ম শনাক্ত করার দায়িত্বে থেকেও বছরের পর বছর কোনো ব্যবস্থা না নেন, তাহলে প্রশ্ন উঠবে তার দায়িত্ব পালনের বিষয়ে।

আর যদি প্রমাণ পাওয়া যায় যে কোনো কর্মকর্তা ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যবসায়ীকে কম VAT দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন এবং বিনিময়ে অবৈধ সুবিধা নিয়েছেন, তাহলে সেটি আরও গুরুতর দুর্নীতির বিষয়।

পুরোনো দুদক অনুসন্ধানে ঠিক এই ধরনের অভিযোগই আলোচনায় এসেছিল। এমনকি প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মাসিক অবৈধ সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ তদন্তের বিষয় হয়েছিল।

তবে ২০২৬ সালের কোনো কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানকে এই পুরোনো অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযুক্ত করা যাবে না।

বরং অনুসন্ধানের প্রশ্ন হচ্ছে—

পুরোনো অভিযোগের পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা হয়েছিল?

কোন কর্মকর্তার আমলে কোন প্রতিষ্ঠান audit হয়েছিল?

কত টাকা অতিরিক্ত VAT নির্ধারণ হয়েছিল?

কত টাকা আদায় হয়েছে?

কোনো মামলা বা বিভাগীয় ব্যবস্থা হয়েছিল কি না?

কয়েক বছর পর একই প্রশ্ন কেন?

২০২১ সালের দুদক অভিযান।

২০২২ সালের সংবাদ ও হাইকোর্টের হস্তক্ষেপ।

২০২৩ সালের তদন্ত প্রতিবেদন।

এরপর কয়েক বছর পেরিয়ে গেছে।

কক্সবাজারের পর্যটন ব্যবসাও থেমে থাকেনি।

নতুন হোটেল এসেছে, নতুন রেস্তোরাঁ এসেছে, ব্যবসার পরিমাণ বেড়েছে। সরকারি পোর্টালেও ২০২৫–২৬ সালে হোটেল-রিসোর্টের তথ্য হালনাগাদ হয়েছে।

কিন্তু সেই সঙ্গে VAT ব্যবস্থাও কি একই গতিতে আধুনিক হয়েছে?

EFD কি প্রকৃত বিক্রি ধরতে পারছে?

ক্রেতার হাতে দেওয়া বিল ও সরকারের কাছে জমা দেওয়া VAT-এর মধ্যে কি মিল রয়েছে?

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—

ব্যবসায়ী ও VAT কর্মকর্তার মধ্যে পুরোনো সেই কথিত ‘সমঝোতা’ কি শেষ হয়েছে, নাকি কেবল পদ্ধতি বদলেছে?

এই প্রশ্নের উত্তর কোনো অভিযোগ বা গুজব দিয়ে নয়— BIN, EFD, VAT return, audit report, assessment order এবং সরকারি কোষাগারে জমার তথ্য দিয়ে বের করা সম্ভব।

FollowUpNews-এর অনুসন্ধানের কেন্দ্রবিন্দু

কক্সবাজারের রেস্তোরাঁ খাতে VAT ফাঁকি থাকলে তার দায় ব্যবসায়ীর।

VAT কর্মকর্তা দায়িত্বে গাফিলতি করলে তার দায় কর্মকর্তার।

আর ব্যবসায়ী ও কর্মকর্তার যোগসাজশের প্রমাণ মিললে দায় হবে উভয়ের।

কিন্তু কোনটি আসল সমস্যা— সেটি এখনই বলে দেওয়া সম্ভব নয়।

নথি দিয়ে উত্তর বের করাটাই জবে FollowUpNews-এর কাজ।

আর সেই অনুসন্ধানের প্রথম প্রশ্নটি তাই খুব সরল—

রেস্তোরাঁর VAT ফাঁকি, নাকি অফিসারের সঙ্গে সমঝোতা— কক্সবাজারে কোনটি আসল সমস্যা?

FollowUpNews অনুসন্ধান চলবে।