১৮৫ একর সম্পদের হিসাব কোথায়?
নিজস্ব প্রতিবেদক, কক্সবাজার
কক্সবাজারের পর্যটন করপোরেশনের হোটেল শৈবাল যেন সরকারি সম্পদের এক দীর্ঘ অমীমাংসিত হিসাব। একদিকে ১৮৫ একর জমির দীর্ঘমেয়াদি বন্দোবস্ত, অন্যদিকে সেই জমির মূল নকশা বা স্কেচম্যাপই খুঁজে পাচ্ছে না সরকারি তদন্ত কমিটি। জমির একটি বড় অংশ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবহারে চলে গেছে। আর এখন সেই শৈবালেই আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন কমপ্লেক্স গড়তে হাজার কোটি টাকার নতুন বিনিয়োগের প্রস্তুতি চলছে।
প্রশ্ন উঠছে— পুরোনো সম্পদের সঠিক হিসাব ও সীমানাই যেখানে নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, সেখানে নতুন করে হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের আগে জবাবদিহির জায়গাগুলো কতটা পরিষ্কার?
প্রথম আলোর নথিভিত্তিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হোটেল শৈবালের জমির পরিমাণ ১৮৫ একর এবং কক্সবাজারের ভূমি কার্যালয়ের হিসাব অনুযায়ী মৌজা মূল্যে ওই জমির মূল্য চার হাজার কোটি টাকার বেশি। প্রতিষ্ঠার সময় জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে প্রায় ৭৪ লাখ টাকা সালামি দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি বন্দোবস্ত নেওয়া হয়েছিল এবং এরপর থেকে পর্যটন করপোরেশন ভূমি কর দিয়ে আসছে।

১৮৫ একর জমির মূল নকশাই নেই
সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এখানেই।
হোটেল শৈবালের জমি বেদখল হয়েছে কি না, তা যাচাই করতে সরকার একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কিন্তু তদন্তে গিয়ে কমিটি জানতে পারে, হোটেল শৈবালের মূল নকশা বা স্কেচম্যাপ পাওয়া যাচ্ছে না।
নকশাটি কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের কার্যালয় এবং বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের ঢাকার সদর দপ্তরে থাকার কথা থাকলেও দুই জায়গাতেই তা পাওয়া যায়নি। নকশা না থাকায় জমির সীমানা নির্ধারণ এবং কোন অংশ কার দখলে বা ব্যবহারে রয়েছে, তা নিয়ে তদন্তও বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
সরকারি তদন্ত কমিটির প্রধান কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)ও বলেছেন, নকশা না পাওয়ায় তদন্ত এগোয়নি।
শৈবালের জমি: নথিতে যা পাওয়া যাচ্ছে
| বিষয় | নথি/প্রকাশ্য তথ্য |
|---|---|
| মোট জমি | ১৮৫ একর |
| প্রাথমিক বন্দোবস্তের সালামি | প্রায় ৭৪ লাখ টাকা |
| বর্তমান মৌজা মূল্যে জমির মূল্য | ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি |
| ক্রিকেট স্টেডিয়ামের জন্য | প্রায় ৫০ একর |
| অন্যান্য সরকারি সংস্থার ব্যবহার | প্রায় ১৯ একর |
| হোটেল শৈবালের পুরোনো কক্ষ | ২৪টি—২০২৩ সালের প্রতিবেদনে |
| নতুন PPP প্রকল্পের জমি | প্রায় ১৩০–১৩২ একর |
| নতুন প্রকল্পের প্রস্তাবিত বিনিয়োগ | বিভিন্ন সরকারি/সংবাদসূত্রে ১,১০০–৩,০০০ কোটি টাকা |
জমির মোট পরিমাণ ও নতুন প্রকল্পের আওতাভুক্ত জমির পরিমাণের মধ্যেও পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। ২০২৬ সালের PPP Authority-এর প্রকল্প প্রোফাইলে প্রায় ১৩০–১৩২ একর সরকারি জমির ওপর প্রকল্পের কথা বলা হয়েছে।
এখানেই পর্যটন করপোরেশনের কাছে সরাসরি প্রশ্ন:
১৮৫ একরের মধ্যে ঠিক কত একর বর্তমানে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণে? কত একর অন্য সংস্থার ব্যবহারে? আর PPP প্রকল্পে ঠিক কত একর যাচ্ছে?
সরকারি আন্তমন্ত্রণালয় সভার কার্যবিবরণী উদ্ধৃত করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ সালে হোটেল শৈবালের জমি থেকে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়কে প্রায় ৫০ একর দেওয়া হয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের জন্য। আরও প্রায় ১৯ একর বিভিন্ন সরকারি সংস্থার দখলে রয়েছে। এর মধ্যে কক্সবাজার জেলা পরিষদের ব্যবহৃত জমিও রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জেলা পরিষদ সেখানে রিসোর্ট, দোকান ও রেস্তোরাঁ করেছে এবং এসব স্থাপনার জন্য পর্যটন করপোরেশনের অনুমতি নেওয়া হয়নি।
জমির হিসাব বোঝার সহজ চিত্র
১৮৫ একর শৈবাল সম্পত্তি
↓
৫০ একর → ক্রিকেট স্টেডিয়াম
↓
প্রায় ১৯ একর → অন্যান্য সরকারি সংস্থার ব্যবহার
↓
বাকি জমি → বর্তমান ব্যবহার/দখল/ভবিষ্যৎ PPP-এর আওতায় কত?
↓
মূল নকশা না থাকায় পূর্ণাঙ্গ সীমানা যাচাইয়ে সমস্যা
এই শেষ প্রশ্নটির উত্তরই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
বর্থিক হিসাবও শৈবাল নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
২০২৬ সালের প্রকাশিত আর্থিক তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭২–৭৩ থেকে ২০২৩–২৪ অর্থবছর পর্যন্ত করপোরেশনের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট আয় ছিল ২,৩০১.৮৪ কোটি টাকা, বিপরীতে মোট ব্যয় ২,২৬৫.৮০ কোটি টাকা। অর্থাৎ পাঁচ দশকের বেশি সময়ে কর-পূর্ব পরিচালন উদ্বৃত্ত মাত্র ৩৬.০৫ কোটি টাকা।
আরও সাম্প্রতিক তিন অর্থবছরের চিত্র:
| অর্থবছর | বাণিজ্যিক কার্যক্রমের কর-পূর্ব পরিচালন উদ্বৃত্ত |
|---|---|
| ২০২১–২২ | ৯.৯৫ লাখ টাকা |
| ২০২২–২৩ | ২০.২৫ লাখ টাকা |
| ২০২৩–২৪ | ২৪.০৪ লাখ টাকা |
অন্যদিকে কোভিডের ২০১৯–২০ অর্থবছরে পরিচালন ক্ষতি হয়েছিল ১,৯৬১.৫২ লাখ টাকা।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: এগুলো হোটেল শৈবালের একক হিসাব নয়; এগুলো বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিত হিসাব। তাই শৈবালের প্রকৃত আয়-ব্যয় জানতে আলাদা financial statement প্রকাশ করা জরুরি।
এখানেই ম্যানেজমেন্টের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
প্রকাশ্য ওয়েবসাইটে হোটেল শৈবালের বুকিং ও যোগাযোগের তথ্য রয়েছে, কিন্তু বছরভিত্তিক মোট কক্ষভাড়া, রেস্টুরেন্ট আয়, অন্যান্য আয়, পরিচালন ব্যয়, কর্মচারী ব্যয়, সংস্কার ব্যয় ও নিট লাভ/লোকসানের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ্যে পাওয়া যাচ্ছে না।
অথচ এই সম্পত্তিকে ঘিরে এখন হাজার কোটি টাকার নতুন প্রকল্পের পরিকল্পনা চলছে।
তাই প্রশ্ন:
২০২১–২২ → আয় কত?
↓
২০২২–২৩ → আয় কত?
↓
২০২৩–২৪ → আয় কত?
↓
২০২৪–২৫ → আয় কত?
↓
২০২৫–২৬ → আয় কত?
↓
একই সময়ে ব্যয় কত?
↓
নিট লাভ/লোকসান কত?
এই হিসাব ছাড়া “শৈবাল অলাভজনক” বা “শৈবালকে PPP-তে দেওয়া দরকার”— কোনো সিদ্ধান্তই পাঠকের কাছে পূর্ণাঙ্গভাবে যাচাইযোগ্য নয়।
১,১০০ কোটি নাকি ৩,০০০ কোটি?
নতুন প্রকল্প নিয়েও রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
PPP Authority-এর প্রকল্প প্রোফাইলে “Construction of International Standard Tourism Facilities at Hotel Shaibal Compound in Cox’s Bazar” প্রকল্পের আনুমানিক মূলধনী ব্যয় ১,১০০ কোটি টাকা বলা হয়েছে। প্রকল্পটির ইন-প্রিন্সিপল অনুমোদন ২৬ এপ্রিল ২০২৬ দেখানো হয়েছে।
অন্যদিকে The Business Standard-এর ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে প্রকল্পে প্রায় ৩,০০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের কথা বলা হয়েছে।
অর্থাৎ—
| উৎস | প্রকল্পের আর্থিক পরিমাণ |
|---|---|
| PPP Authority project profile | প্রায় ১,১০০ কোটি টাকা |
| ২০২৬ সালের সংবাদ প্রতিবেদন | প্রায় ৩,০০০ কোটি টাকা |
এটি অবশ্যই দুটি ভিন্ন পর্যায়ের cost estimate হতে পারে। কিন্তু জনগণের সামনে পরিষ্কার হওয়া দরকার— বর্তমান অনুমোদিত প্রকল্প ব্যয় কত এবং ৩,০০০ কোটি টাকার হিসাবটি কোন পর্যায়ের বিনিয়োগ অনুমান?
নতুন প্রকল্পের আগে ৪ কোটি টাকার বেশি পরামর্শক ব্যয়
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে।
বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির তথ্য অনুযায়ী, হোটেল শৈবাল এলাকায় আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন সুবিধা PPP মডেলে গড়ে তোলার feasibility study, financial modelling, Value for Money analysis, legal due diligence, environmental/social impact assessment এবং পরবর্তী procurement সহায়তার জন্য একটি international consulting firm নির্বাচিত হয়েছে।
চুক্তির মূল্য ৪ কোটি ১৯ লাখ ৫২ হাজার ৪২ টাকা।
চুক্তি স্বাক্ষর: ১৬ আগস্ট ২০২৬
সমাপ্তির প্রস্তাবিত তারিখ: ১৫ নভেম্বর ২০২৭।
প্রকল্পের অর্থনৈতিক কাঠামো
সরকারি সম্পদ
১৮৫ একর ঐতিহাসিক জমি
↓
বর্তমান সমস্যা
নকশা অনুপস্থিত + জমি ব্যবহারে বিরোধ
↓
PPP পরিকল্পনা
প্রায় ১৩০–১৩২ একর
↓
Feasibility + Financial Model + VfM
পরামর্শক চুক্তি: ৪.১৯ কোটি টাকা
↓
প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক পর্যটন কমপ্লেক্স
↓
প্রকল্প ব্যয় নিয়ে প্রকাশ্য তথ্য: ১,১০০–৩,০০০ কোটি টাকা
য়ে মৌলিক প্রশ্ন আসে।
করপোরেশনের পাঁচ দশকের বেশি সময়ের সম্মিলিত বাণিজ্যিক হিসাব যদি হয়—
আয়: ২,৩০১.৮৪ কোটি টাকা
ব্যয়: ২,২৬৫.৮০ কোটি টাকা
উদ্বৃত্ত: মাত্র ৩৬.০৫ কোটি টাকা
তাহলে প্রশ্ন শুধু “হোটেল শৈবাল লাভ করছে কিনা” নয়।
প্রশ্ন হচ্ছে—
রাষ্ট্রের সেরা পর্যটন গন্তব্যগুলোর একটিতে বিপুল সম্পদ থাকার পরও বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো পাঁচ দশকে এত কম পরিচালন উদ্বৃত্ত তৈরি করল কেন?
২০২৬ সালে সরকার এখন সেই দুর্বল আর্থিক পারফরম্যান্সের কারণ দেখিয়ে ৫৩টি পর্যটন স্থাপনা PPP-তে নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
শৈবাল নিয়ে প্রশ্নের তালিকা
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের কাছে FollowUpNews-এর প্রশ্ন
১. হোটেল শৈবালের ১৮৫ একরের সর্বশেষ ডিজিটাল/সার্ভে ম্যাপ কোথায়?
২. মূল স্কেচম্যাপ হারিয়েছে— এ বিষয়ে কোনো বিভাগীয় তদন্ত হয়েছে কি?
৩. নকশা হারানোর ঘটনায় কোনো জিডি, মামলা বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি?
৪. ১৮৫ একরের মধ্যে বর্তমানে কত একর পর্যটন করপোরেশনের দখলে?
৫. ৫০ একর স্টেডিয়ামের জন্য কোন আদেশে দেওয়া হয়েছিল?
৬. প্রায় ১৯ একর অন্যান্য সরকারি সংস্থা কীভাবে ব্যবহার করছে?
৭. জেলা পরিষদের রিসোর্ট, দোকান ও রেস্তোরাঁর জন্য পর্যটন করপোরেশনের লিখিত অনুমতি ছিল কি?
৮. এসব ব্যবহারের বিপরীতে পর্যটন করপোরেশন কোনো রাজস্ব পায় কি না?
৯. ২০১৬–১৭ থেকে ২০২৫–২৬ পর্যন্ত শৈবালের বছরভিত্তিক মোট আয় কত?
১০. একই সময়ে পরিচালন ব্যয় কত?
১১. বছরভিত্তিক নিট লাভ/লোকসান কত?
১২. বছরভিত্তিক কক্ষ Occupancy Rate কত?
১৩. রেস্টুরেন্ট থেকে বছরভিত্তিক আয় কত?
১৪. গত ১০ বছরে শৈবালের সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণে কত টাকা ব্যয় হয়েছে?
১৫. বড় সংস্কারকাজগুলো কোন ঠিকাদার করেছে?
১৬. বর্তমানে ১৮৫ একরের মধ্যে PPP প্রকল্পে কত একর দেওয়া হচ্ছে?
১৭. ১,১০০ কোটি টাকার সরকারি project profile এবং সংবাদে উল্লেখিত ৩,০০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ— দুটির পার্থক্যের কারণ কী?
১৮. PPP-এর মেয়াদ কত হবে?
১৯. সরকারের আয়/রাজস্ব ভাগাভাগির কাঠামো কী?
২০. PPP হলে ১৮৫ একর সম্পদের মূল্যায়ন কীভাবে করা হবে?
হোটেল শৈবালকে ঘিরে মূল প্রশ্ন “হোটেলটি ভালো চলছে কি না”— এত ছোট নয়।
এটি প্রশ্ন রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা নিয়ে।
১৮৫ একর জমি, যার মৌজা মূল্যই চার হাজার কোটি টাকার বেশি বলে সরকারি সূত্রভিত্তিক প্রতিবেদনে এসেছে; সেই সম্পত্তির মূল নকশা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। একই সম্পত্তির অংশ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবহারে গেছে। আবার সেই সম্পত্তির একটি বড় অংশে হাজার কোটি টাকার PPP প্রকল্পের প্রস্তুতি চলছে। এর feasibility, financial modelling ও PPP transaction প্রস্তুতির জন্যই ইতোমধ্যে ৪ কোটি ১৯ লাখ ৫২ হাজার ৪২ টাকার পরামর্শক চুক্তি হয়েছে।
তাই এখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন:
নতুন করে হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের আগে পুরোনো ১৮৫ একর সম্পদের পূর্ণ হিসাব কি রাষ্ট্র নিয়েছে?
হোটেল শৈবালের ম্যানেজমেন্ট ও বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনকে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।
