Headlines

খুন, ডাকাতি ও ছিনতাইঃ নিরাপত্তাহীনতায় হিন্দু স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা

হত্যা

হিন্দু স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা কতটা নিরাপদ?

৫ আগস্টের পর একের পর এক খুন, ডাকাতি ও ছিনতাই; সর্বশেষ নওগাঁয় অলিফ চন্দ্র দত্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

নওগাঁর মহাদেবপুরে দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফেরার পথে স্বর্ণ ব্যবসায়ী অলিফ চন্দ্র দত্তকে কুপিয়ে হত্যা এবং তার সঙ্গে থাকা স্বর্ণ ও নগদ টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় আবারও সামনে এসেছে দেশের হিন্দু স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তার প্রশ্ন।

সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর রাতে দুলালপাড়া এলাকায় নিজ বাড়ির সামনে হামলার শিকার হন অলিফ চন্দ্র দত্ত। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে মহাদেবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও পরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। মঙ্গলবার চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র বলছে, তার কাছ থেকে প্রায় ৬ ভরি স্বর্ণালংকার ও ৭ লাখ টাকা নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। পুলিশ এখনো খতিয়ে দেখছে এটি নিছক ছিনতাই, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ ছিল।

কিন্তু অলিফ চন্দ্র দত্তের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দু স্বর্ণ ব্যবসায়ী ও স্বর্ণকাররা হত্যা, সশস্ত্র ছিনতাই, দোকান ও বাড়িতে ডাকাতির শিকার হয়েছেন।

হত্যা
ছবিতে: ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর বিভিন্ন সময়ে হামলা, হত্যা, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের শিকার হওয়া স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা— হিরালাল দেবনাথ (লক্ষ্মীপুর), পুলক দাশ (চট্টগ্রাম), দিলীপ দাস (আশুলিয়া), প্রাণতোষ কর্মকার (নরসিংদী), শিব শংকর কর্মকার (গোপালগঞ্জ), অলিফ চন্দ্র দত্ত (নওগাঁ), নারায়ণ চন্দ্র সাহা (ফরিদপুর), শুভ দাস (মানিকগঞ্জ), অমল বণিক (টাঙ্গাইল), রতন কর্মকার (পাবনা) ও শম্ভু কর্মকার (পাবনা)। বিভিন্ন ঘটনায় কেউ নিহত, কেউ হামলার শিকার এবং কেউ ডাকাতি-ছিনতাইয়ের কবলে পড়েছেন।

লক্ষ্মীপুর: হিরালাল দেবনাথকে রাস্তায় থামিয়ে হত্যা

৮ নভেম্বর ২০২৪ রাতে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার তেঁতুলগাছতলা এলাকায় সাইকেলে বাড়ি ফেরার পথে স্বর্ণ ব্যবসায়ী হিরালাল দেবনাথকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। তিনি কাজিরদীঘির পাড় এলাকার ‘মাতৃ জুয়েলার্স’-এর স্বত্বাধিকারী ছিলেন।

ঘটনার পর বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের লক্ষ্মীপুর জেলা শাখা দ্রুত হত্যাকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের দাবি জানায়। স্থানীয় স্বর্ণ ব্যবসায়ীরাও নিরাপত্তাহীনতার কথা বলেন। পরবর্তী সময়ে এ মামলায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ এবং আসামিদের জবানবন্দির খবরও প্রকাশিত হয়।

চট্টগ্রাম: ডিবি পরিচয়ে পুলক দাশকে তুলে নিয়ে কোটি টাকার স্বর্ণ লুট

২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪ রাতে চট্টগ্রামের স্বর্ণ ব্যবসায়ী পুলক দাশকে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে তুলে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। তাঁর কাছ থেকে প্রায় ৭৭ ভরি ১৫ আনা ২ রতি স্বর্ণালংকার এবং ১৭ লাখ ৯০ হাজার ৫২০ টাকা লুটের অভিযোগ করা হয়।

পুলক দাশ নগরের হাজারী লেইনের ‘নবরূপা শিল্পালয়’-এর মালিক। দুর্বৃত্তরা তাকে হাতকড়া পরিয়ে ও চোখ বেঁধে গাড়িতে তুলে নেয় এবং পরে সীতাকুণ্ড এলাকায় ফেলে যায়। দুই বছর পর ২০২৬ সালে পিবিআই এই মামলায় একজনকে গ্রেপ্তার করে এবং আদালতে তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির খবর প্রকাশিত হয়।

খুলনা: দত্ত জুয়েলার্সে দিনের বেলায় বোমা-গুলি

২৮ অক্টোবর ২০২৪ খুলনার দৌলতপুরের কালীবাড়ি বাজারে ‘দত্ত জুয়েলার্স’-এ দিনদুপুরে সশস্ত্র ডাকাতি হয়। একটি প্রাইভেটকারে এসে ডাকাতরা অস্ত্রের মুখে দোকানে ঢোকে এবং পরে গুলি ও বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পালিয়ে যায়।

বিভিন্ন প্রতিবেদনে লুটের পরিমাণে পার্থক্য রয়েছে— কোথাও ৫ ভরি, কোথাও ৮–১০ ভরি, আবার স্থানীয় ব্যবসায়ীদের হিসাবে আরও বেশি স্বর্ণ লুটের কথা এসেছে। নগদ টাকাও নেওয়া হয়। ঘটনায় ব্যবহৃত গাড়িসহ একজনকে আটক করার খবরও প্রকাশিত হয়েছিল।

আশুলিয়া: স্ত্রীর সামনে দিলীপ দাসকে কুপিয়ে হত্যা

৯ মার্চ ২০২৫ রাতে আশুলিয়ার নয়ারহাট বাজারে ‘দিলীপ স্বর্ণালয়’-এর মালিক দিলীপ দাসকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তার স্ত্রী সরস্বতী দাসের সামনে কয়েকজন অস্ত্রধারী তার হাতে থাকা স্বর্ণের ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে।

দিলীপ বাধা দিলে তাকে চাপাতি দিয়ে গালে, বুকে ও পিঠে কুপিয়ে আহত করা হয়। এরপর ডাকাতরা ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পালিয়ে যায়। তার সঙ্গে থাকা প্রায় ২০ ভরি স্বর্ণ লুট হয়েছে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়। হাসপাতালে নেওয়ার পর তার মৃত্যু হয়। পরে এ ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেপ্তার এবং লুট হওয়া স্বর্ণের একটি অংশ উদ্ধারের খবরও প্রকাশিত হয়।

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদও ঘটনাটিকে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার তালিকায় উল্লেখ করে এবং ঘটনাস্থল পরিদর্শনের কথা জানায়।

পঞ্চগড়: গিনি হাউজ জুয়েলার্সে ৫০ ভরি স্বর্ণ চুরি

২১ এপ্রিল ২০২৫ পঞ্চগড় শহরের স্বর্ণকারপট্টিতে ‘গিনি হাউজ জুয়েলার্স’-এ চুরির ঘটনা ঘটে। দোকান মালিক লব বণিকের দাবি অনুযায়ী প্রায় ৫০ ভরি স্বর্ণালংকার নিয়ে যায় চোরেরা।

ঘটনার পর পঞ্চগড়ের সব জুয়েলারি দোকান বন্ধ রেখে প্রতিবাদ করেন ব্যবসায়ীরা। সিসিটিভি ফুটেজে ভোরে ১১–১২ জনের একটি দল দোকানের তালা কাটার দৃশ্য দেখা যায় বলে ব্যবসায়ীরা জানান।

টাঙ্গাইল: স্বর্ণকার অমল বণিকের বাড়িতে ডাকাতি

২০২৫ সালের আগস্টে টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে স্বর্ণকার অমল বণিকের বাড়িতে সশস্ত্র ডাকাতির ঘটনা ঘটে। ডাকাতরা বাড়িতে ঢুকে স্বর্ণ ও রুপার অলংকারসহ মূল্যবান সামগ্রী লুট করে। বাধা দেওয়ার সময় অমল বণিকের হাতে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়।

পরে তদন্তে আন্তঃজেলা ডাকাত দলের সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হয় এবং লুট হওয়া স্বর্ণ-রুপার অংশ উদ্ধারের কথা জানায় পুলিশ। প্রতিবেদনে বাড়িটিকে হিন্দু বাড়ি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম: ১৭৫ ভরি স্বর্ণ নিয়ে যাওয়ার পথে ডিবি পরিচয়ে ডাকাতি

১৯ আগস্ট ২০২৫ উত্তরা থেকে তাতীবাজারে যাওয়ার পথে স্বর্ণ ব্যবসায়ী মনিরের পাঁচ কর্মচারীকে তেজগাঁও এলাকায় ডিবি পুলিশ পরিচয়ে আটকে প্রায় ১৭৫ ভরি স্বর্ণ লুটের অভিযোগ ওঠে।

পরে এ মামলায় একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার এবং প্রায় ৪০ ভরি স্বর্ণ ও নগদ ১৫ লাখ টাকা উদ্ধারের খবর প্রকাশিত হয়। উদ্ধার হওয়া স্বর্ণের একটি অংশ সাভারের স্বর্ণ ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব সাহার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে পাওয়া যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

ফরিদপুর: হিন্দু ব্যবসায়ী নারায়ণ চন্দ্র সাহার বাড়িতে প্রায় কোটি টাকার ডাকাতি

৩০ অক্টোবর ২০২৫ ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে হিন্দু ব্যবসায়ী নারায়ণ চন্দ্র সাহার বাড়িতে অস্ত্রের মুখে ডাকাতির অভিযোগ ওঠে। ডাকাতরা স্বর্ণালংকার, নগদ অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রীসহ প্রায় ১ কোটি টাকার মালামাল লুট করে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।

মানিকগঞ্জ: শুভ দাসের দোকানে ডাকাতি ও ছুরিকাঘাত

৪ অক্টোবর ২০২৫ রাতে মানিকগঞ্জ শহরের স্বর্ণকারপট্টিতে ‘অভি অলংকার’-এ ডাকাতির ঘটনা ঘটে। দোকানের মালিক শুভ দাসকে ছুরিকাঘাত করে প্রায় ২০–২২ ভরি স্বর্ণালংকার নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।

পরদিন পুলিশ জানায়, পরে ঘটনাটি নিয়ে তদন্তে দোকানের মালিকের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও সামনে আসে এবং তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ফলে ঘটনাটি সরাসরি সাম্প্রদায়িক হামলা হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই; এটি দেখায় স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের ঝুঁকির আরেকটি দিক—ব্যবসার ভেতরকার প্রতারণা ও অপরাধও।

পাবনা: এক রাতে পাঁচ স্বর্ণের দোকানে ডাকাতি

৩ ডিসেম্বর ২০২৫ রাতে পাবনার ভাঙ্গুড়ার অষ্টমণিষা বাজারে একই রাতে পাঁচটি স্বর্ণের দোকানে সংঘবদ্ধ ডাকাতি হয়। রতন কর্মকার, তপন কর্মকার, উত্তম কর্মকারসহ একাধিক স্বর্ণ ব্যবসায়ীর দোকানে তালা ভেঙে লুটপাট চালানো হয়।

বিভিন্ন প্রতিবেদনে লুটের পরিমাণে পার্থক্য থাকলেও ব্যবসায়ীরা কোটি টাকার কাছাকাছি স্বর্ণ, রুপা ও নগদ টাকা লুটের দাবি করেন। কয়েকটি প্রতিবেদনে রতন কর্মকারের বাড়িতেও পরিবারের সদস্যদের মারধর করে স্বর্ণ ও নগদ টাকা নেওয়ার কথা এসেছে।

নরসিংদী: প্রাণতোষ কর্মকারকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে গুলি করে হত্যা

২ ডিসেম্বর ২০২৫ রাতে নরসিংদীর রায়পুরায় জুয়েলারি ব্যবসায়ী প্রাণতোষ কর্মকারকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়।

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, মুখোশধারী ব্যক্তিরা ব্যবসার কথা বলে তাকে বাড়ি থেকে বের করে নিয়ে যায়। পরে দিঘলিয়াকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে তার বুকে গুলি করা হয়। প্রাণতোষের বয়স ছিল ৪২ বছর। তিনি বাঁশগাড়ি বাজারে জুয়েলারি ব্যবসা করতেন।

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদও ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের সংখ্যালঘু হত্যার তালিকায় প্রাণতোষ কর্মকারের হত্যাকাণ্ডকে অন্তর্ভুক্ত করেছে।

২০২৬: চট্টগ্রামে ৪২ ভরি স্বর্ণ ছিনতাই

৪ জানুয়ারি ২০২৬ চট্টগ্রামের পাঁচলাইশের হামজারবাগ লিংক রোড এলাকায় অস্ত্রের মুখে এক স্বর্ণ ব্যবসায়ীর কারিগরদের জিম্মি করে প্রায় ৪২ ভরি স্বর্ণ ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় থানায় মামলা হয়।

২০২৬: গোপালগঞ্জে দুই স্বর্ণ ব্যবসায়ীকে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায় ডাকাতরা

২৩ এপ্রিল রাতে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফেরার পথে দুই ভাই— স্বর্ণ ব্যবসায়ী শিব শংকর কর্মকার ও কৃষ্ণ কর্মকার— অস্ত্রের মুখে ডাকাতদের কবলে পড়েন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৭–৮ জনের একটি দল তাদের মাইক্রোবাসে তুলে নেয়। পরে কৃষ্ণ কর্মকারকে মারধর করে ফেলে রেখে শিব শংকর কর্মকারকে স্বর্ণালংকারসহ নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়। স্থানীয়রা প্রতিরোধ গড়ে তুললে চারজনকে ধরে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়।

আর সর্বশেষ নওগাঁয় অলিফ চন্দ্র দত্ত

৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ রাত। মহাদেবপুর বাজারের ‘দত্ত জুয়েলার্স’ বন্ধ করে বাড়ি ফিরছিলেন অলিফ চন্দ্র দত্ত। নিজের বাড়ির সামনে পৌঁছানোর পরই পেছন থেকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার মাথায় আঘাত করা হয়। সঙ্গে থাকা ব্যাগে ছিল স্বর্ণ ও নগদ টাকা।

দুর্বৃত্তরা প্রায় ৬ ভরি স্বর্ণ ও ৭ লাখ টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়। গুরুতর আহত অলিফকে হাসপাতালে নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো যায়নি। পুলিশ বলছে, ছিনতাইয়ের পাশাপাশি পূর্বশত্রুতার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

প্রশ্নটা এখন শুধু ডাকাতির নয়

৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর থেকে প্রকাশিত ঘটনাগুলো পাশাপাশি রাখলে একটি বিষয় স্পষ্ট— স্বর্ণ ব্যবসা বাংলাদেশে ক্রমেই উচ্চঝুঁকির পেশায় পরিণত হচ্ছে। কিন্তু হিন্দু স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে প্রশ্নটি আরও গভীর।

কারণ এই সময়ের মধ্যে লক্ষ্মীপুরের হিরালাল দেবনাথ, চট্টগ্রামের পুলক দাশ, আশুলিয়ার দিলীপ দাস, নরসিংদীর প্রাণতোষ কর্মকার এবং সর্বশেষ নওগাঁর অলিফ চন্দ্র দত্তের মতো হিন্দু ব্যবসায়ীরা সরাসরি হামলা, লুট কিংবা হত্যার শিকার হয়েছেন। পাশাপাশি অমল বণিক, রতন কর্মকার, তপন কর্মকার, শুভ দাসসহ আরও অনেক স্বর্ণ ব্যবসায়ীর দোকান বা বাড়িতে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে।

তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে— এসব ঘটনার কতটি নিছক অর্থনৈতিক অপরাধ, আর কতটির সঙ্গে ভুক্তভোগীর ধর্মীয় পরিচয় কোনো ভূমিকা রেখেছে?

এ প্রশ্নের উত্তর তদন্ত ছাড়া দেওয়া যাবে না। বরং প্রতিটি ঘটনায় মামলার এজাহার, তদন্তের অগ্রগতি, গ্রেপ্তারদের জবানবন্দি, পুলিশের চার্জশিট এবং আদালতের নথি বিশ্লেষণ করা জরুরি।

কারণ ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কেউ লক্ষ্যবস্তু হয়ে থাকলে সেটি সাম্প্রদায়িক নিরাপত্তার বড় সংকেত। আর যদি মূল কারণ হয় স্বর্ণের ব্যবসা ও সহজে বহনযোগ্য বিপুল মূল্যবান সম্পদ— তাহলেও প্রশ্ন থেকে যায়, স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তায় রাষ্ট্রের বিশেষ ব্যবস্থা কোথায়?

একজন স্বর্ণ ব্যবসায়ী প্রতিদিন দোকান বন্ধ করে বিপুল মূল্যের স্বর্ণ নিয়ে বাড়ি ফেরেন। এই যাতায়াতের তথ্য অপরাধীদের কাছে পৌঁছাচ্ছে কীভাবে? কোথায় পুলিশের টহল থাকে? জুয়েলারি মার্কেটগুলোতে অস্ত্রধারী নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? সিসিটিভি, অ্যালার্ম, নিরাপদ পরিবহন ও থানাভিত্তিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ কতটা আছে?

নওগাঁর অলিফ চন্দ্র দত্ত হত্যাকাণ্ড তাই কেবল একটি হত্যার ঘটনা নয়। এটি দেশের স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি বড় পরীক্ষাও।

প্রশ্ন একটাই— স্বর্ণের নিরাপত্তা নয়, স্বর্ণ ব্যবসায়ীর জীবন রক্ষায় রাষ্ট্রের প্রস্তুতি কতটা?