Headlines

বামপন্থার ব্যর্থতাতেই শ্রমজীবী অশিক্ষিত দরিদ্র মানুষেরা উগ্র ডানপন্থার নিচে আশ্রয় নিয়েছে

ডানপন্থা

একটি সমাজে ক্ষুধার্ত মানুষের প্রথম প্রশ্ন দর্শন নয়, নিরাপত্তা। তার দ্বিতীয় প্রশ্ন স্বাধীনতা নয়, পরিচয়। আর তৃতীয় প্রশ্ন বিপ্লব নয়, আগামীকালের রুটি। এই সহজ সত্যটি যারা বুঝতে পারেনি, তারাই ধীরে ধীরে নিজেদের রাজনৈতিক ভিত্তি হারিয়েছে।

বাংলাদেশ ও ভারতের গত কয়েক দশকের রাজনীতি দেখলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে— যে শ্রমজীবী, নিম্নআয়ের, অশিক্ষিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী একসময় বামপন্থী রাজনীতির সামাজিক ভিত্তি ছিলো, সেই জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ আজ ধর্মাশ্রয়ী বা উগ্র ডানপন্থী রাজনীতির অন্যতম শক্তিতে পরিণত হয়েছে।

প্রশ্ন হলো, তারা কি হঠাৎ করেই ধর্মীয় উগ্রবাদে বিশ্বাসী হয়ে গেছে? সম্ভবত না। বরং আরও কঠিন প্রশ্ন হলো— তাদের জন্য জায়গাটি ফাঁকা করে দিয়েছে কে?

শ্রেণি থেকে পরিচয়ে যাত্রা

কার্ল মার্কস মনে করেছিলেন, মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থানই তার রাজনৈতিক চেতনার প্রধান ভিত্তি হবে। শিল্পায়নের সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিক শ্রেণি নিজেদের স্বার্থ সম্পর্কে সচেতন হবে এবং শেষ পর্যন্ত শ্রেণিগত ঐক্যের ভিত্তিতে সমাজ পরিবর্তনের শক্তি হয়ে উঠবে।

কিন্তু সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার দেখিয়েছেন, মানুষের পরিচয় কেবল অর্থনৈতিক শ্রেণি দিয়ে নির্ধারিত হয় না। ধর্ম, মর্যাদা, সংস্কৃতি ও সামাজিক সম্মানও রাজনৈতিক আচরণকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। আজকের বাংলাদেশ ও ভারতের বাস্তবতা যেন ওয়েবারের পর্যবেক্ষণকেই আরও স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।

যেখানে বামপন্থীরা শ্রমিককে দেখেছে “শ্রমশক্তি” হিসেবে, সেখানে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি তাকে দেখেছে “মুসলিম”, “হিন্দু”, “বিশ্বাসী”, “উম্মাহর সদস্য” কিংবা “ধর্মরক্ষক” হিসেবে। একটি পরিচয় অর্থনীতির ভাষায় কথা বলেছে, অন্যটি আবেগের ভাষায়। রাজনীতিতে শেষ পর্যন্ত আবেগই অনেক সময় জিতে যায়।

বামপন্থার সবচেয়ে বড় ভুল

বাংলাদেশে বামপন্থী রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, মজুরি, ভূমি সংস্কার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক ন্যায়বিচারের কথা বলেছে। এই অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু একই সঙ্গে একটি বাস্তবতাও আছে।

বামপন্থীরা বহু ক্ষেত্রে ধরে নিয়েছে যে অর্থনৈতিক বঞ্চনাই মানুষের একমাত্র রাজনৈতিক চালিকাশক্তি। তারা ভেবেছে, শ্রেণি-সচেতনতা তৈরি হলেই মানুষ সাম্প্রদায়িকতা বা ধর্মীয় উগ্রবাদকে প্রত্যাখ্যান করবে। কিন্তু বাস্তব সমাজ এত সরল নয়।

অশিক্ষিত, অনিশ্চিত, দরিদ্র একজন মানুষ প্রতিদিন যে ভয়, অপমান, একাকিত্ব ও সামাজিক অনিরাপত্তার মধ্যে বাস করে, সেই শূন্যস্থান কেবল অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ দিয়ে পূরণ করা যায় না।

সেখানে প্রয়োজন সম্পর্ক, পরিচয়, আবেগ, আশ্রয় এবং মর্যাদা। এই জায়গাটিতেই বামপন্থা দুর্বল হয়ে পড়ে।

ডানপন্থার কৌশল

ধর্মাশ্রয়ী উগ্র ডানপন্থা এই শূন্যস্থান খুব দক্ষতার সঙ্গে পূরণ করেছে। তারা দরিদ্র মানুষের কাছে জটিল অর্থনীতি নিয়ে যায়নি। তারা একটি শত্রু নির্ধারণ করেছে। বলেছে— তোমার দুর্দশার জন্য অমুক সম্প্রদায় দায়ী, অমুক মতবাদ দায়ী, অমুক রাষ্ট্র দায়ী, অমুক সংস্কৃতি দায়ী।

শত্রু নির্ধারণ করা সবসময় সমস্যার সমাধান নয়, কিন্তু রাজনৈতিক সংগঠনের জন্য এটি অত্যন্ত কার্যকর অস্ত্র। সমাজবিজ্ঞানীরা একে “Scapegoating” বা বলির পাঁঠা তৈরির রাজনীতি হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।

মানুষ যখন নিজের বাস্তব সমস্যার সমাধান খুঁজে পায় না, তখন অনেক সময় সে একটি দৃশ্যমান শত্রুর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে চায়। উগ্র ডানপন্থা ঠিক এই মনস্তত্ত্বকেই ব্যবহার করে।

ভারত: শ্রেণির বদলে ধর্ম

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ একসময় ছিল বামপন্থার সবচেয়ে শক্তিশালী দুর্গ। কিন্তু কয়েক দশকের মধ্যেই সেই অঞ্চলের বহু শ্রমজীবী ও নিম্নআয়ের মানুষ ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়ে।

কেন? শুধু প্রচারণার কারণে? না। বহু গবেষক দেখিয়েছেন, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কাঠামো মানুষের জীবনে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হলে তারা বিকল্প পরিচয়ের রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়ে।

অর্থনৈতিক হতাশা যখন জমা হয়, তখন ধর্মীয় পরিচয় অনেকের কাছে মানসিক নিরাপত্তা হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশ: একই প্রবণতার অন্য রূপ

বাংলাদেশেও একই ধরনের পরিবর্তন ধীরে ধীরে দৃশ্যমান। গার্মেন্টস শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক, নিম্নআয়ের যুবক— যারা একসময় শ্রমিক রাজনীতির সম্ভাব্য ভিত্তি ছিলো, তাদের একটি বড় অংশ এখন ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।

এর অর্থ এই নয় যে তারা সবাই উগ্রবাদী। বরং তারা এমন একটি সামাজিক আশ্রয় খুঁজছে, যেখানে তারা সম্মান, সম্পর্ক, সহযোগিতা ও পরিচয় পায়।

যেখানে বাম সংগঠনের সভা বছরে কয়েকবার হয়, সেখানে অনেক ধর্মীয় সংগঠন প্রতিদিন মানুষের পাশে থাকে— মসজিদে, মাদ্রাসায়, স্থানীয় দাতব্য কার্যক্রমে, কিংবা সামাজিক নেটওয়ার্কে।

রাজনীতি শুধু মতাদর্শ দিয়ে হয় না। রাজনীতি সম্পর্ক দিয়েও হয়।

অ্যান্টোনিও গ্রামশির শিক্ষা

মার্কসবাদী চিন্তাবিদ অ্যান্টোনিও গ্রামশি বলেছিলেন, রাষ্ট্র কেবল আইন ও পুলিশের মাধ্যমে শাসন করে না; সংস্কৃতি, শিক্ষা, ধর্ম, পরিবার এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠান দিয়েও মানুষের সম্মতি অর্জন করে। তিনি একে “Cultural Hegemony” নামে ব্যাখ্যা করেছিলেন।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বোঝা যায়, বামপন্থা অর্থনৈতিক সংগ্রামে যতটা মনোযোগ দিয়েছে, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রকে ততটা গুরুত্ব দিতে পারেনি।

অন্যদিকে ধর্মভিত্তিক ডানপন্থা মানুষের প্রতিদিনের জীবনের ভেতর প্রবেশ করেছে— বিশ্বাস, আচার, উৎসব, সামাজিক সহায়তা ও পরিচয়ের মাধ্যমে।

ব্যবহার, উন্নয়ন নয়

বামপন্থার ঐতিহাসিক আদর্শ অন্তত নীতিগতভাবে বলেছে— শ্রমজীবী মানুষকে সংগঠিত করতে হবে, শিক্ষা দিতে হবে, অধিকার সম্পর্কে সচেতন করতে হবে, যাতে সে নিজেই নিজের মুক্তির শক্তি হয়ে ওঠে।

উগ্র ডানপন্থার বহু ধারায় লক্ষ্য ভিন্ন। সেখানে অনেক সময় দরিদ্র মানুষকে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়; কিন্তু তাকে সমালোচনামূলক চিন্তার চর্চায় উৎসাহিত করা হয় না।

কারণ প্রশ্ন করতে শেখা মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। শত্রুকে ঘৃণা করা সহজ, কিন্তু নিজের অবস্থার কারণ বিশ্লেষণ করা কঠিন।

তাহলে সমাধান কোথায়?

বাংলাদেশ কিংবা ভারতের ভবিষ্যৎ কেবল বাম বা ডানের বিজয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আসল প্রশ্ন হলো— কে দরিদ্র মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখবে? কে তাকে শুধু ভোটার, মিছিলের কর্মী, ধর্মযোদ্ধা বা বিপ্লবের সৈনিক হিসেবে নয়; বরং একজন মর্যাদাসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে চাইবে?

যে রাজনীতি দরিদ্র মানুষকে শিক্ষিত করে, যুক্তিবাদী করে, দক্ষ করে এবং আত্মমর্যাদাবোধ গড়ে তোলে, দীর্ঘমেয়াদে সেই রাজনীতিই টিকে থাকে। আর যে রাজনীতি কেবল ক্ষোভকে সংগঠিত করে, শত্রু তৈরি করে এবং আবেগকে অস্ত্র বানায়, সে রাজনীতি সাময়িক শক্তি অর্জন করতে পারে; কিন্তু সমাজকে স্থায়ীভাবে বিভক্ত করে।

আজ বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়তো বামপন্থার পুনর্জন্ম নয়, কিংবা ডানপন্থার পরাজয়ও নয়। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো— দারিদ্র্যকে ঘৃণার জ্বালানি না বানিয়ে, তাকে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সামাজিক মর্যাদা এবং সমালোচনামূলক নাগরিক চেতনায় রূপান্তর করা।

কারণ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এটিই— যেখানে ন্যায়বিচারের রাজনীতি মানুষের কাছে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়, সেখানে পরিচয়ের রাজনীতি পৌঁছে যায়। আর যখন পরিচয়ের রাজনীতি ক্ষুধার চেয়েও শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তখন গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় মূল্য দেয় সেই শ্রমজীবী মানুষটিই, যার মুক্তির কথা বলে সব মতবাদ জন্ম নিয়েছিলোু।