Headlines

লামিনে ইয়ামালের গল্পঃ বাংলাদেশের ফুটবলের জন্য এক আয়না

বিশ্ব ফুটবলের নতুন বিস্ময়ের নাম লামিনে ইয়ামাল। মাত্র কৈশোরেই তিনি এমন এক উচ্চতায় পৌঁছেছেন, যেখানে পৌঁছাতে অনেক ফুটবলারের পুরো ক্যারিয়ার লেগে যায়। কিন্তু ইয়ামালের গল্পটি কোনো রূপকথা নয়। এটি প্রতিভা, পরিকল্পনা, পরিবার, প্রশিক্ষণ এবং একটি উন্নত ক্রীড়া-ব্যবস্থার যৌথ সাফল্যের গল্প। আর ঠিক এই কারণেই ইয়ামালের গল্প বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

২০০৭ সালের ১৩ জুলাই স্পেনে জন্ম নেওয়া লামিনে ইয়ামালের বাবা মরক্কোর এবং মা ইকুয়েটোরিয়াল গিনির নাগরিক। অভিবাসী পরিবারের সন্তান হওয়ায় জীবনের শুরুটা খুব বিলাসী ছিলো না। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই তার অসাধারণ ফুটবল প্রতিভা নজর কেড়েছিলো। পাঁচ-ছয় বছর বয়সেই বল পায়ে তার নিয়ন্ত্রণ, খেলার বুদ্ধিমত্তা এবং আত্মবিশ্বাস অন্য শিশুদের থেকে আলাদা ছিলো। এই প্রতিভাই তাকে খুব অল্প বয়সে বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবল একাডেমি বার্সেলোনার লা মাসিয়ায় নিয়ে যায়।

লা মাসিয়া শুধু একটি একাডেমি নয়; এটি একটি দর্শন। এখানে শুধু ফুটবল শেখানো হয় না, একজন শিশুকে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা হয়। খেলার পাশাপাশি শিক্ষা, শৃঙ্খলা, পুষ্টি, মানসিক বিকাশ এবং চরিত্র গঠনের ওপর সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রতিভাকে তাৎক্ষণিক ফলের জন্য ব্যবহার না করে ধীরে ধীরে বিকশিত করা হয়। এই কারণেই বার্সেলোনা একের পর এক বিশ্বমানের ফুটবলার তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।

মাত্র ১৫ বছর বয়সে ইয়ামাল বার্সেলোনার মূল দলে অভিষেক করেন। এরপর তিনি একের পর এক রেকর্ড ভাঙতে শুরু করেন। স্পেন জাতীয় দলের হয়ে সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা হওয়া, ইউরোপের সর্বোচ্চ পর্যায়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স এবং বিশ্বের সেরা ডিফেন্ডারদের বিপক্ষে নির্ভীক ফুটবল— সবকিছুই প্রমাণ করে, বড় মঞ্চে সফল হতে হলে প্রতিভার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির কোনো বিকল্প নেই।

বাংলাদেশের জন্য এখানেই সবচেয়ে বড় শিক্ষা রয়েছে।

আমরা প্রায়ই বলি, বাংলাদেশে প্রতিভার অভাব নেই। কথাটি সত্য। দেশের প্রত্যন্ত গ্রামের মাঠে, শহরের গলিতে কিংবা স্কুলের টিফিনে অসাধারণ দক্ষতার অসংখ্য শিশু ফুটবল খেলে। কিন্তু তাদের খুব কমজনই পেশাদার পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। কারণ প্রতিভা জন্ম নিলেই যথেষ্ট নয়; প্রতিভাকে লালন করতে হয়।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট হয়তো অর্থের নয়, দৃষ্টিভঙ্গির। আমরা এখনো প্রতিভা বিকাশকে একটি পরিকল্পিত জাতীয় কর্মসূচি হিসেবে গ্রহণ করতে পারিনি। একটি শিশু আট বছর বয়সে ভালো খেলতে শুরু করলে, দশ বছর পর সে জাতীয় দলের খেলোয়াড় হবে— এমন কোনো সুসংগঠিত রোডম্যাপ আমাদের নেই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভালো কোচের অভাব, আধুনিক প্রশিক্ষণের অভাব, পর্যাপ্ত পুষ্টির সংকট, মানসিক সহায়তার অভাব এবং পারিবারিক আর্থিক চাপ একটি সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ারকে মাঝপথেই থামিয়ে দেয়।

আরও একটি বড় সমস্যা হলো আমাদের সামাজিক মানসিকতা। এখনো অনেক পরিবার খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে নিরাপদ মনে করে না। শিশুরা যখন খেলার জন্য সময় চায়, তখন তাদের বলা হয় পরীক্ষায় ভালো ফল করাই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। আবার কেউ ভালো খেলতে শুরু করলে অল্প বয়সেই তার ওপর অতিরিক্ত প্রত্যাশার চাপ সৃষ্টি করা হয়। ফলে অনেক প্রতিভা বিকশিত হওয়ার আগেই হারিয়ে যায়।

অথচ বিশ্বের সফল দেশগুলো ভিন্নভাবে চিন্তা করে। তারা জানে, প্রতিভা একটি জাতীয় সম্পদ। তাই শিশুদের ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞানভিত্তিক প্রশিক্ষণ, দক্ষ কোচ, মানসম্মত পুষ্টি, আধুনিক চিকিৎসা, মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা এবং শিক্ষার সমন্বিত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়। একজন খেলোয়াড়ের পেছনে শুধু পরিবার নয়, ক্লাব, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসক, পুষ্টিবিদ, ক্রীড়া বিজ্ঞানী এবং রাষ্ট্র একসঙ্গে কাজ করে।

বাংলাদেশেও এই পরিবর্তন সম্ভব। প্রয়োজন একটি জাতীয় প্রতিভা অনুসন্ধান কর্মসূচি, যেখানে দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় নিয়মিতভাবে সম্ভাবনাময় শিশুদের খুঁজে বের করা হবে। তাদের জন্য বয়সভিত্তিক একাডেমি গড়ে তুলতে হবে। দক্ষ কোচ তৈরির পাশাপাশি স্পোর্টস সায়েন্স, পুষ্টি এবং মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রশিক্ষণের অবিচ্ছেদ্য অংশ করতে হবে। স্কুল, পরিবার এবং ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানকে একই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করতে হবে। শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক সুযোগ নয়, প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশুরাও যেন সমান সুযোগ পায়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।

এই শিক্ষা শুধু ফুটবলের জন্য নয়। বিজ্ঞান, সাহিত্য, সংগীত, শিল্পকলা কিংবা গবেষণা— সব ক্ষেত্রেই একই নীতি প্রযোজ্য। একজন বিশ্বমানের মানুষ হঠাৎ তৈরি হয় না; তাকে দীর্ঘ সময় ধরে পরিচর্যা করতে হয়।

লামিনে ইয়ামালের গল্প তাই কেবল একজন ফুটবলারের জীবনী নয়। এটি আমাদের দেখিয়ে দেয়, একটি দেশ যদি তার শিশুদের ওপর বিনিয়োগ করে, তাদের প্রতিভাকে সম্মান করে এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোয়, তাহলে বিশ্বমানের সাফল্য অর্জন অসম্ভব নয়।

হয়তো বাংলাদেশের কোনো গ্রামে এই মুহূর্তে খালি পায়ে ফুটবল খেলছে ভবিষ্যতের লামিনে ইয়ামাল। প্রশ্ন হলো, আমরা কি তাকে খুঁজে বের করার, গড়ে তোলার এবং বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দেওয়ার মতো প্রস্তুতি নিয়েছি? যদি না নিয়ে থাকি, তাহলে এখনই সেই প্রস্তুতি শুরু করার সময়।