Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman with former Indian prime minister Indira Gandhi.
সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রধানমন্ত্রী অ্যালেক্স কোসিগিনের সাথে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক বৈঠকের মূল প্রেক্ষাপট ছিল ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের অসামান্য অবদান, যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বাধীন বাংলাদেশের পুনর্গঠন এবং নতুন রাষ্ট্রের জন্য আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করা। এই প্রেক্ষাপটের অধীনে ১৯৭২ সালের ১ থেকে ৫ মার্চ বঙ্গবন্ধু সোভিয়েত ইউনিয়নে তার প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর করেন।লিওনিদ ব্রেজনেভ সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন না, তিনি ছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক (General Secretary) এবং দেশটির সর্বোচ্চ নেতা। ১৯৭২ সালের ১ থেকে ৫ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক মস্কো সফরের সময়েই ব্রেজনেভের সাথে তাঁর এই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।১৯৭২ সালের মার্চ মাসে সোভিয়েত ইউনিয়ন (তৎকালীন ইউএসএসআর) সফরের সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মস্কোর ক্রেমলিনে বক্তব্য দিয়েছিলেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রধানমন্ত্রী অ্যালেক্স কোসিগিন মস্কোর ক্রেমলিনে মস্কো-ঢাকা একটি চুক্তি স্বাক্ষরের পর। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনে সোভিয়েত ইউনিয়ন ব্যাপক অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার অঙ্গীকার করে। এর মধ্যে অন্যতম ছিল:বিদ্যুৎ উৎপাদন: ঘোড়াশাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র পুনর্গঠন ও সম্প্রসারণ।শিল্প কারখানা: চট্টগ্রামে জেনারেল ইলেকট্রিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারিং (GEM) প্ল্যান্ট স্থাপন।যোগাযোগ ও তথ্য: বাংলাদেশে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন রেডিও ট্রান্সমিটার স্থাপন।প্রাকৃতিক সম্পদ: বাংলাদেশে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের কাজে সোভিয়েত প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করা। ২. চট্টগ্রাম বন্দর সচল করা (মাইন অপসারণ)মুক্তিযুদ্ধের সময় চট্টগ্রাম বন্দরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পুঁতে রাখা মাইন এবং ডুবে যাওয়া জাহাজ দ্রুত অপসারণের চুক্তি হয়। এই চুক্তির অধীনে সোভিয়েত নৌবাহিনীর একটি বিশেষ দল এসে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ মাইন অপসারণ কার্যক্রম পরিচালনা করে বন্দরটিকে আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচলের জন্য সচল করে তোলে। ৩. নিয়মিত কূটনৈতিক পরামর্শদুই দেশের সরকার সব গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে বিভিন্ন স্তরে নিয়মিত আনুষ্ঠানিক আলোচনা ও পরামর্শ চালিয়ে যেতে একমত হয়। সমাজতান্ত্রিক ও পুঁজিবাদী—ভিন্ন সামাজিক ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও দুই দেশের সার্বভৌমত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে বন্ধুত্বের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার করা হয়। ৪. বাণিজ্য ও অন্যান্য দ্বিপাক্ষিক চুক্তিএই সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিমান চলাচল (Air services), এবং সাংস্কৃতিক ও বৈজ্ঞানিক সহযোগিতার বিষয়েও বেশ কিছু মৌলিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্কের ভিত্তি গড়ে তোলে। ৫. পাকিস্তানি বাঙালিদের প্রত্যাবাসনবাংলাদেশি নাগরিকদের পুনর্বাসন ও আন্তর্জাতিক কূটনীতি নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি, পাকিস্তানে আটকে পড়া বাঙালিদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার (প্রত্যাবাসন) ব্যাপারে সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের আন্তর্জাতিক প্রভাব খাটিয়ে মধ্যস্থতা করার আশ্বাস দেয়।সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে এই চুক্তিগুলো সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি দাঁড় করাতে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের মর্যাদা বৃদ্ধিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
১৯৭৪, পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং আলজেরিয়ার প্রধানমন্ত্রী হাউয়ারি বুমিদিয়েনার সাথে পাকিস্তানের লাহোরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
বঙ্গবন্ধূ শেখ মুজিবুর রহমান এবং ব্রিটেনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ।
বঙ্গবন্ধূ শেখ মুজিবুর রহমান এবং সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী অ্যালেক্স কোসিগিন একং ডকুমেন্ট সই করার কর্মসূচিতে।
ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
১৯৭৩, বঙ্গবন্ধূ এবং জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব কুর্ট ওয়েল্ডহেইম।
১৯৭৪, বঙ্গবন্ধূ এবং যুগস্লাভিকিয়ার প্রেসিডেন্ট মার্শাল টিটো।
বার্কিংহাম প্যালেসে রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
১৯৭৩, জাপানের প্রধানমন্ত্রী কাকুই তানাকার সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
সৌদি আরবের বাদশাহ কিং ফয়সালের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
বঙ্গবন্ধু এবং জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব কুর্ট ওয়াল্ডহেইম।
১৯৫৬, চীনের প্রেসিডেন্ট চৌন এই লাইয়ের ঢাকা সফরকালে বঙ্গবন্ধু তাকে স্বাগত জানিয়ে পাঠ করছেন।
বঙ্গবন্ধুর সাথে কিউবার প্রেসিডেন্ট ফিদেল কাস্ট্রো।
1974 হোয়াইট হাউস, ১৯৭৪, বঙ্গবন্ধুর সাথে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড।
বঙ্গবন্ধুর সাথে ইরাকের প্রেসিডেন্ট আহমেদ হাসান আল বকর।
বঙ্গবন্ধু তার ধারণাগুলি নিয়ে মিশরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতের সঙ্গে আলোচনা করছেন।
বঙ্গবন্ধুর আমন্ত্রণে ফ্রান্তের খ্যাতিমান লেখক এবং কূটনীতিক আন্দ্রে মার্লে ঢাকা সফর করেন।
বঙ্গবন্ধুর সাথে জাম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট কেনেথ কাউন্ডা।
বঙ্গবন্ধুর সাথে মালয়শিয়ার রাজা আব্দুল হালিম।
বঙ্গবন্ধু এবং যুগাস্লাভিকিয়ার মার্শাল জোসেফ ব্রুজ।
১৯৭৪ সালের নভেম্বর মাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবারের মতো কুয়েত সফর করেন এবং কুয়েতের তৎকালীন আমির শেখ সাবাহ আল-সালেম আল-সালেম-এর সাথে ঐতিহাসিক শীর্ষ বৈঠকে মিলিত হন।বঙ্গবন্ধুর কুয়েত আমিরের সাথে দেখা করার এবং এই রাষ্ট্রীয় সফরের প্রধান কারণগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:১. মুসলিম বিশ্বে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি জোরদার করা১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক তৈরি করা ছিল অত্যন্ত চ্যলেঞ্জিং। কুয়েত ছিল প্রথম উপসাগরীয় (Gulf) দেশ, যারা ১৯৭৪ সালে ওআইসি (OIC) সম্মেলনের আগে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়। এই স্বীকৃতি ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় ও স্থায়ী রূপ দিতে বঙ্গবন্ধু কুয়েত সফর করেন।২. যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্গঠনে অর্থনৈতিক সহায়তা ও তহবিল সংগ্রহসদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ তখন তীব্র অর্থনৈতিক সংকট এবং ১৯৭৪ সালের ভয়াবহ বন্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন ও পুনর্বাসনের জন্য বঙ্গবন্ধু কুয়েত আমিরের কাছে বিশেষ অর্থনৈতিক ও আর্থিক সহযোগিতার আহ্বান জানান। এই বৈঠকের পর দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক সহযোগিতার জন্য সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তৈরি করতে বিশেষ কমিটি গঠিত হয়।৩. বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য প্রথম শ্রমবাজার উন্মুক্ত করাবাংলাদেশি জনশক্তির জন্য মধ্যপ্রাচ্যের বিশাল শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার মূল ভিত্তি স্থাপন করেছিল বঙ্গবন্ধুর এই সফর। কুয়েত আমিরের সাথে সফল আলোচনার সূত্র ধরেই ১৯৭৬ সাল থেকে কুয়েতে প্রথম সরকারিভাবে বাংলাদেশি দক্ষ ও অদক্ষ জনবল বা শ্রমিক রপ্তানি শুরু হয়, যা আজ বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের অন্যতম প্রধান উৎস।৪. ওআইসি (OIC) সম্মেলনে কুয়েতের মধ্যস্থতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পাকিস্তানের লাহোরে অনুষ্ঠিত ওআইসি সম্মেলনে বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করার পেছনে কুয়েতের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী (যিনি পরবর্তীতে কুয়েতের আমির হন) শেখ সাবাহ আল-আহমদ আল-জাবের আল-সাবাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনি নিজে ঢাকায় এসে বঙ্গবন্ধুকে সম্মেলনে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানান। এই আন্তরিক কূটনৈতিক সহযোগিতার জন্য কুয়েতকে সরাসরি ধন্যবাদ জানানো ছিল বঙ্গবন্ধুর অন্যতম উদ্দেশ্য।বঙ্গবন্ধুর এই সফরে কুয়েত আমিরের সাথে এক চমৎকার ব্যক্তিগত ও আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। বৈঠক শেষে আমির শেখ সাবাহ বঙ্গবন্ধুকে অত্যন্ত পরম মমতায় “আঙ্কেল শেখ মুজিব” বলে সম্বোধন করেছিলেন এবং দুই দেশের সম্পর্ক চিরস্থায়ী করার আশ্বাস দিয়েছিলেন।