Headlines

আমদানি প্রাপ্যতার অতিরিক্ত কাঁচামাল, বন্ডে ছাড়ের অনুমতি

সামুদা কেমিক্যালে আমদানি-রপ্তানির হিসাবেও প্রশ্ন; এক বছরে আমদানি রেকর্ড প্রায় আড়াই গুণ


ফলোআপ অনুসন্ধান

চট্টগ্রাম বন্ড কমিশনারেটের বন্ড ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত নথিতে Samuda Chemical Complex Limited-এর আমদানি প্রাপ্যতার অতিরিক্ত কাঁচামাল ইন-টু-বন্ডে ছাড় দেওয়ার জন্য অনাপত্তি পত্র দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। ২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত এই নথি থেকেই প্রশ্ন উঠেছে— প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদিত আমদানি প্রাপ্যতা কত ছিল এবং বাস্তবে কত কাঁচামাল আমদানি হয়েছিল?

এই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে প্রতিষ্ঠানটির সাম্প্রতিক আমদানি-রপ্তানি তথ্য বিশ্লেষণ করলে।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য-ডেটাবেস NBD-এর তথ্য অনুযায়ী, Samuda Chemical Complex-এর নামে ২০২২ সালে ১,২৬৫টি আমদানি-রপ্তানি রেকর্ডের মধ্যে আমদানি রেকর্ড ছিল ৩৮৮টি। ২০২৩ সালে মোট রেকর্ড দাঁড়ায় ১,১১০টি, যার মধ্যে আমদানি রেকর্ড ৩৭২টি। ২০২৪ সালে আমদানি রেকর্ড আবার কমে ২১৪টি এবং ২০২৫ সালে ২১৪টি। একই ডেটাসেটে ২০২৫ সালে ৬৮২টি মোট রেকর্ডের মধ্যে ২৫৩টি রপ্তানি রেকর্ডও দেখানো হয়েছে।

চট্টগ্রাম
সামুদা কেমিক্যালের চট্টগ্রামের একটি প্লান্ট।

অন্য একটি Samuda Chemical Complex Ltd প্রোফাইলে আরও ভিন্ন ডেটা পাওয়া যায়। সেখানে ২০২৩ সালে আমদানি রেকর্ড ১৮০টি, ২০২৪ সালে ৪২টি এবং ২০২৫ সালে ৩৮টি দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ একই প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যবহৃত বিভিন্ন ডেটাসেটে সংখ্যাগত পার্থক্য রয়েছে।

তবে দুই ডেটাসেটেই একটি বিষয় পরিষ্কার— ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠানটির আমদানি কার্যক্রম উল্লেখযোগ্য ছিল এবং পরবর্তী সময়ে তা কমেছে।

২০২৬ সালে নতুন প্রশ্ন

চট্টগ্রাম বন্ড কমিশনারেটের নথিতে ২০২৬ সালের জুনে Samuda Chemical Complex-এর “আমদানি প্রাপ্যতার অতিরিক্ত কাঁচামাল” ইন-টু-বন্ডে ছাড়ের লক্ষ্যে NOC দেওয়ার তথ্য রয়েছে।

এখানেই ফলোআপ নিউজের মূল প্রশ্ন।

একটি বন্ডেড প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট অনুমোদিত প্রাপ্যতার আওতায় কাঁচামাল আমদানি করে। সেখানে যদি আমদানিকৃত কাঁচামাল প্রাপ্যতার চেয়ে বেশি হয়ে থাকে, তাহলে—

প্রাপ্যতা কত ছিল?

বাস্তবে কত আমদানি হয়েছে?

কতটুকু অতিরিক্ত হয়েছে?

অতিরিক্ত অংশের মূল্য কত?

কোন কোন Bill of Entry-এর মাধ্যমে এসব পণ্য এসেছে?

আর অতিরিক্ত কাঁচামাল ইন-টু-বন্ডে নেওয়ার জন্য কত টাকার ব্যাংক গ্যারান্টি দেওয়া হয়েছে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো প্রকাশ্য বাণিজ্য-ডেটা থেকে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বন্ড কমিশনারেটের মূল নথিই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।

আমদানি কী ধরনের?

বাণিজ্য-ডেটায় Samuda Chemical Complex-এর আমদানিতে বিভিন্ন শিল্প-রাসায়নিক ও শিল্প-উপকরণের তথ্য পাওয়া যায়। একটি সাম্প্রতিক রেকর্ডে ২ লাখ ৬০ হাজার কেজি Coated Calcium Carbonate Powder আমদানির তথ্য রয়েছে। পণ্যটির HS Code 382499 এবং চালানটি চট্টগ্রাম বন্দরে এসেছে।

অন্য একটি বাণিজ্য রেকর্ডে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে চীন থেকে ৮,১০০ কেজি Tetra Butyl Urea আমদানির তথ্য পাওয়া যায়; চালানটির ঘোষিত মূল্য ছিল প্রায় ৪০,৩৩৮ মার্কিন ডলার

অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটির আমদানি শুধু একটি নির্দিষ্ট কাঁচামালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

রপ্তানিও কম নয়

Samuda Chemical Complex রপ্তানিকারক হিসেবেও নিবন্ধিত। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (EPB) ডাটাবেজে প্রতিষ্ঠানটির রপ্তানি পণ্য হিসেবে Hydrogen Peroxide, HS Code 2847, উল্লেখ রয়েছে। কারখানার ঠিকানা হিসেবে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ার সিকিরগাঁও দেওয়া হয়েছে। EPB-এর তথ্য ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত আপডেট করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য-ডেটা অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির রপ্তানি বাজারের মধ্যে ভারত, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম, শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশ রয়েছে। ২০২৫ সালে ভিয়েতনামে রপ্তানির মূল্য প্রায় ১১.৪৫ মিলিয়ন ডলার এবং পাকিস্তানে প্রায় ৮.৩৫ মিলিয়ন ডলার হিসেবে একটি বাণিজ্য-ডেটাসেটে দেখানো হয়েছে।

সামুদা কেমিক্যাল কমপ্লেক্স লিমিটেড (SCCL) ২০০৬ সালে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত একটি বেসরকারি রাসায়নিক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। কোম্পানির প্রকাশ্য করপোরেট তথ্য অনুযায়ী, এর মালিকানায় রয়েছেন মোহাম্মদ আবুল কালাম, ফারজানা আফরোজ, মোহাম্মদ মোস্তফা হায়দার ও রিজওয়ানা আফরোজ। প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদিত মূলধন ৫০০ কোটি টাকা।

তাহলে সমস্যা কোথায়?

এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য নিজে কোনো কর ফাঁকি বা বন্ড সুবিধার অপব্যবহার প্রমাণ করে না

বরং ফলোআপ নিউজের বিষয় হলো— একদিকে প্রতিষ্ঠানটির বড় আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম, অন্যদিকে চট্টগ্রাম বন্ড কমিশনারেটের নথিতে আমদানি প্রাপ্যতার অতিরিক্ত কাঁচামাল ইন-টু-বন্ডে নেওয়ার অনুমতি।

এই দুই তথ্যের মধ্যে সম্পর্ক পরিষ্কার করতে হলে প্রতিষ্ঠানের বন্ড entitlement এবং actual import-এর হিসাব পাশাপাশি বসাতে হবে।

চারটি হিসাব মিললেই আসল চিত্র

১. Annual Import Entitlement
প্রতিষ্ঠানটি বছরে কত টাকার/পরিমাণ কাঁচামাল আমদানির অনুমতি পেয়েছিল?

২. Actual Import
Bill of Entry অনুযায়ী বাস্তবে কত আমদানি করেছে?

৩. Production/Consumption
আমদানিকৃত কাঁচামালের কতটুকু উৎপাদনে ব্যবহার হয়েছে?

৪. Export
সেই কাঁচামাল ব্যবহার করে উৎপাদিত পণ্যের কতটুকু রপ্তানি হয়েছে?

এই চারটি হিসাব মেলানো ছাড়া বন্ড সুবিধার প্রকৃত ব্যবহার সম্পর্কে সিদ্ধান্তে যাওয়া কঠিন।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

Samuda Chemical Complex-এর বাণিজ্য তথ্য নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ডেটাবেসে রেকর্ডের সংখ্যায় বড় পার্থক্য রয়েছে। ফলে অনলাইন ট্রেড ডেটাকে চূড়ান্ত সরকারি হিসাব হিসেবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। এগুলো অনুসন্ধানের দিক নির্দেশনা দিতে পারে; চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরির আগে কাস্টমসের Bill of Entry, Bill of Export, LC এবং বন্ড কমিশনারেটের রেকর্ড দিয়ে যাচাই প্রয়োজন।

এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নথি

Samuda Chemical Complex-এর বিষয়ে প্রকৃত চিত্র বের করতে প্রয়োজন—

  • ২০২৫–২৬ ও ২০২৬–২৭ সালের Import Entitlement
  • জুন ২০২৬-এর NOC-এর পূর্ণ কপি
  • সংশ্লিষ্ট Bill of Entry
  • পণ্যের HS Code, পরিমাণ ও মূল্য
  • ব্যাংক গ্যারান্টির পরিমাণ
  • সর্বশেষ Bond Audit Report
  • Demand/assessment-এর তথ্য
  • Bond licence-এর বর্তমান অবস্থা
  • সংশ্লিষ্ট সময়ে উৎপাদন ও রপ্তানির হিসাব

মূল প্রশ্ন একটাই—

অনুমোদিত আমদানি প্রাপ্যতার বাইরে কাঁচামাল এল কীভাবে, আর সেই অতিরিক্ত কাঁচামাল আবার বন্ড সুবিধার আওতায় নেওয়ার অনুমতি পেল কীভাবে?

এই প্রশ্নের উত্তরেই পরিষ্কার হবে— এটি কি নিয়মের আওতায় করা একটি বৈধ সমন্বয়, নাকি বন্ড ব্যবস্থাপনার কোথাও বড় ধরনের দুর্বলতা রয়েছে।