সৈকতে পর্যটক টার্গেট করে মাদক বিক্রির অভিযোগ, অপরাধে জড়াচ্ছে উঠতি বয়সী তরুণরা; মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের হিসাবে কক্সবাজারে মাদকাসক্ত প্রায় ৮২ হাজার।
কক্সবাজার প্রতিনিধি
সমুদ্রসৈকতে পর্যটকের ভিড়। কেউ সাগরে নামছেন, কেউ ঝাউবাগানের পাশে বসে আড্ডা দিচ্ছেন, কেউবা ঘুরছেন সুগন্ধা, লাবণী কিংবা কলাতলী পয়েন্টে। এই পর্যটকদের ঘিরেই গড়ে উঠেছে কক্সবাজারের বিশাল অনানুষ্ঠানিক পর্যটন অর্থনীতি। এর একটি অংশে কাজ করেন স্থানীয় তরুণরা— কেউ পর্যটকদের ম্যাসাজ দেন, কেউ বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করেন, কেউ ছবি তোলেন, কেউ পর্যটকদের বিভিন্ন সেবা দেন। স্থানীয়ভাবে এদের অনেককেই পরিচিত করা হয় ‘বিচ বয়’ নামে।
তবে পর্যটনসেবার আড়ালে থাকা এই তরুণদের একটি অংশকে ঘিরে এখন নতুন করে উঠছে মাদক-সংযোগের প্রশ্ন। অভিযোগ রয়েছে, পর্যটকদের কাছে মাদক পৌঁছে দিতে স্থানীয় উঠতি বয়সী তরুণদের কেউ কেউ ব্যবহার হচ্ছে। আর এই কাজে যুক্ত হতে গিয়ে তাদের একটি অংশ নিজেরাও মাদকের সংস্পর্শে পড়ছে।
তবে কক্সবাজারের সব বিচ বয় মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত— এমন কোনো নির্ভরযোগ্য সরকারি পরিসংখ্যান বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং অনুসন্ধানে যে চিত্র পাওয়া যাচ্ছে, তা হলো— পর্যটনকেন্দ্রিক মাদক ব্যবসায় স্থানীয় তরুণদের একটি অংশকে ব্যবহার করার ঝুঁকি রয়েছে।

সৈকতেই মাদক বিক্রির অভিযোগ
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা মেইলের এক সরেজমিন প্রতিবেদনে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে সন্ধ্যার পর পর্যটকদের লক্ষ্য করে উঠতি বয়সী যুবকদের ইয়াবা বিক্রির অভিযোগ উঠে আসে। প্রতিবেদনে স্থানীয় একজন নিরাপত্তাকর্মীর বক্তব্যও ছিল— রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সৈকত এলাকায় মাদক বিক্রির তৎপরতা বাড়ে। একই প্রতিবেদনে কক্সবাজার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা দাবি করেন, জেলায় মাদক ব্যবসায়ীর সংখ্যা বেড়েছে এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর একটি অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।
অন্যদিকে, প্রথম আলোর একটি অনুসন্ধানে কক্সবাজার শহরের ২২টি এলাকায় ইয়াবা ও অন্যান্য মাদক বিক্রির তথ্য উঠে এসেছিল। তালিকায় ছিল সুগন্ধা পয়েন্ট, ঝাউবাগান ও হোটেল-গেস্টহাউস এলাকাও— যেগুলো সরাসরি পর্যটনকেন্দ্রিক এলাকা। ওই প্রতিবেদনে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, কক্সবাজার জেলায় মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৮২ হাজার এবং তাদের ৭০ শতাংশ ইয়াবায় আসক্ত।
এই তথ্যের সঙ্গে সৈকতকেন্দ্রিক পর্যটন এলাকার বাস্তবতা মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে— পর্যটকদের কাছে মাদক পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে কারা সবচেয়ে সহজে ব্যবহারযোগ্য?

কেন টার্গেট বিচ বয়রা?
বিচ বয়দের বড় একটি অংশ বয়সে তরুণ। তারা সারাদিন সৈকতে অবস্থান করেন এবং পর্যটকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ পান। ফলে অপরাধচক্র চাইলে তাদের ব্যবহার করে সহজেই পর্যটকের কাছে পৌঁছাতে পারে— এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
বিশেষ করে পর্যটকের সঙ্গে স্বাভাবিক কথাবার্তা, ম্যাসাজ, ছবি তোলা, ঘোড়া বা বিচবাইকসহ বিভিন্ন সেবা দেওয়ার সুযোগকে ব্যবহার করে অপরাধচক্র মাদক সরবরাহের পথ তৈরি করতে পারে।
ট্যুরিস্ট পুলিশের বক্তব্যেও সৈকতে বিচ বয়দের নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের এক সাক্ষাৎকারে কক্সবাজারের ট্যুরিস্ট পুলিশের তৎকালীন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আপেল মাহমুদ বলেন, বডি ম্যাসাজের আড়ালে বিচ বয়দের কেউ কেউ ছিনতাইসহ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকে। ট্যুরিস্ট পুলিশ এ ধরনের অসংখ্য বিচ বয়কে সৈকত থেকে সরিয়েছে বলেও তিনি জানান।
যদিও ওই বক্তব্য সরাসরি মাদক ব্যবসার প্রমাণ নয়, এটি সৈকতকেন্দ্রিক অনিয়ন্ত্রিত তরুণ গোষ্ঠীর অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকির একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
শুধু পর্যটক নয়, শিকার বিচ বয়রাও
মাদক ব্যবসায় নতুন বা নিম্নস্তরের বাহক হিসেবে তরুণদের ব্যবহার করার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো— একসময় বাহক নিজেই হয়ে উঠতে পারেন ভোক্তা।
কক্সবাজারে মাদকের বিস্তারের পরিমাণও এ ঝুঁকিকে আরও বড় করে তুলছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ২০২৩-২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ওই সময়ে বিপুলসংখ্যক মাদক মামলা হয়েছে এবং কক্সবাজার-টেকনাফ এলাকায় ইয়াবা পাচারবিরোধী টাস্কফোর্সও সক্রিয় ছিল। একই সময়ে কক্সবাজারে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা জব্দ হয়েছে।
২০২৬ সালেও পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। ৪ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারে পৃথক অভিযানে বিজিবি ২ লাখ ৯৪ হাজার ইয়াবা জব্দ করে। এসব ঘটনায় ইয়াবা পাচারে ব্যবহৃত একটি পর্যটকবাহী চাঁদের গাড়ি ও একটি নৌযানও জব্দ করা হয়।
অর্থাৎ কক্সবাজারের পর্যটন ব্যবস্থার সঙ্গে মাদকের সরবরাহব্যবস্থার সংঘাতটি এখনো অত্যন্ত বাস্তব।

পর্যটকরাও ঝুঁকিতে
পর্যটকদের লক্ষ্য করে মাদক সরবরাহের অভিযোগ কেবল সৈকতকেন্দ্রিক নয়। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে কক্সবাজারে এক ব্যক্তিকে আটকের পর বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, তিনি উঠতি বয়সী কিশোর, স্কুলছাত্র এবং পর্যটকদের কাছে ইয়াবা, মদসহ বিভিন্ন অবৈধ পণ্য পৌঁছে দিতেন।
এমনকি পর্যটকের ছদ্মবেশেও মাদক বহনের ঘটনা ঘটেছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে কক্সবাজারের হিমছড়ি এলাকা থেকে দুই নারীকে ১০ হাজার ইয়াবা ও ৫০০ গ্রাম হেরোইনসহ আটক করার কথা জানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।
ফলে পর্যটক নিজেই মাদক বহন করছে, নাকি স্থানীয় কোনো চক্র পর্যটকের হাতে মাদক তুলে দিচ্ছে— দুটি দিকই এখন তদন্তের দাবি রাখে।
মাদকের শহর থেকে মাদকমুক্ত সৈকত— কতটা সম্ভব?
কক্সবাজারের মাদক পরিস্থিতি নতুন নয়। কিন্তু পর্যটনকেন্দ্রিক এলাকায় মাদকের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের কারণ। কারণ এখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষ, বিশেষ করে তরুণ পর্যটকরা সহজেই অপরিচিত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগে আসেন।
প্রথম আলোর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কক্সবাজার শহরের বিভিন্ন এলাকায় মাদক বিক্রির পাশাপাশি পর্যটকদের কাছ থেকেও বেশি দাম নেওয়ার অভিযোগ ছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়, নিয়মিত মাদক না নেওয়া কিছু মানুষ কক্সবাজারে বেড়াতে এসে কৌতূহলবশত ইয়াবা কিনতে চান।
এই জায়গাতেই বিচ বয়দের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তারা কি শুধুই পর্যটনসেবার সঙ্গে যুক্ত তরুণ?
নাকি তাদের একটি অংশকে ব্যবহার করছে মাদকচক্র?
আর যদি ব্যবহার করেই থাকে, তাহলে তাদের নিয়ন্ত্রণ বা পুনর্বাসনের কোনো উদ্যোগ আছে কি?
প্রয়োজন বিচ বয়দের তালিকা ও পুনর্বাসন
সৈকতে কর্মরত তরুণদের একটি অংশ যদি সত্যিই মাদকচক্রের প্রলোভন বা চাপে পড়ে থাকে, তাহলে শুধু তাদের সৈকত থেকে তাড়িয়ে দেওয়া সমস্যার সমাধান করবে না। বরং তাদের পরিচয়, বয়স, পেশা, আয়, কর্মস্থল ও অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার তথ্য সংগ্রহ করে একটি নিবন্ধিত ডাটাবেস তৈরি করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে প্রয়োজন—
- সৈকতে কর্মরত বিচ বয়দের নিবন্ধন;
- পরিচয়পত্র ও নির্দিষ্ট কর্মক্ষেত্র নির্ধারণ;
- মাদক বা অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা;
- মাদকে আক্রান্ত তরুণদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন;
- পর্যটকদের মাদক অফার করা হচ্ছে কিনা— এ বিষয়ে নিয়মিত গোপন নজরদারি;
- হোটেল, ঝাউবাগান ও সৈকতসংলগ্ন এলাকায় রাতের নজরদারি বাড়ানো;
- পর্যটকদের কাছে মাদক বিক্রির অভিযোগের জন্য আলাদা অভিযোগ ব্যবস্থা।
কারণ বিচ বয়দের সবাইকে অপরাধী বানানো যেমন অন্যায়, তেমনি তাদের মধ্যে যারা মাদকচক্রের হাতে ব্যবহৃত হচ্ছে তাদের সমস্যাকে উপেক্ষা করাও বিপজ্জনক।
কক্সবাজারের সৈকতকে মাদকমুক্ত করতে হলে শুধু মাদক বিক্রেতাকে ধরলেই হবে না; মাদকচক্রের হাতে ব্যবহৃত তরুণদেরও চিহ্নিত করে তাদের ফিরিয়ে আনতে হবে স্বাভাবিক জীবনে।
পর্যটকের নিরাপত্তার প্রশ্নের সঙ্গে তাই এখন যুক্ত হয়েছে আরেকটি প্রশ্ন— সৈকতের তরুণ কর্মীদের নিরাপত্তা কে নিশ্চিত করবে?
