বাংলাদেশে স্বর্ণ শুধু অলংকার নয়, এটি ধীরে ধীরে এক ধরনের সমান্তরাল অর্থনীতি এবং অনেক ক্ষেত্রে বিকল্প ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভূমিকা পালন করছে। আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে বিপুল পরিমাণ সম্পদ স্বর্ণের মাধ্যমে সংরক্ষিত ও লেনদেন হওয়ায় অর্থনীতির একটি বড় অংশ কার্যত অদৃশ্য থেকে যায়। বাস্তবে দেখা যায়, দেশে অসংখ্য পরিবার ব্যাংকে টাকা জমা রাখার পাশাপাশি স্বর্ণ কিনে সঞ্চয় করে। মুদ্রাস্ফীতি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন কিংবা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়ে মানুষ স্বর্ণকে নিরাপদ সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে। কারণ স্বর্ণের একটি বড় সুবিধা হলো এটি দীর্ঘমেয়াদে মূল্য ধরে রাখে এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত নগদ অর্থে রূপান্তর করা যায়। ফলে অনেক পরিবারের কাছে স্বর্ণ এক ধরনের ব্যক্তিগত সঞ্চয় তহবিলে পরিণত হয়েছে, যা অনেক সময় ব্যাংকের বিকল্প হিসেবে কাজ করে।
বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় স্বর্ণের অর্থনৈতিক গুরুত্ব আরো গভীর। বিয়ের সময় স্বর্ণ দেওয়া, পারিবারিক সম্পদ হিসেবে স্বর্ণ সংরক্ষণ করা কিংবা জরুরি প্রয়োজনে তা বিক্রি করা— এসব প্রথা বহু পুরোনো। বিশেষ করে গ্রামীণ সমাজে অনেক সময় স্বর্ণই হয়ে ওঠে পরিবারের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সম্পদ। কোনো আর্থিক সংকট দেখা দিলে মানুষ ব্যাংকের দ্বারস্থ হওয়ার আগেই স্বর্ণ বিক্রি করে বা বন্ধক রেখে অর্থ সংগ্রহ করে। এই প্রক্রিয়াটি ধীরে ধীরে একটি অনানুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থায় রূপ নিয়েছে, যেখানে ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থেকেই অর্থ লেনদেন ও ঋণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে একটি সামাজিক অর্থনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে— স্বর্ণ বন্ধক রেখে সুদে টাকা নেওয়া। অনেক পরিবার বা ছোট ব্যবসায়ী হঠাৎ অর্থের প্রয়োজন হলে জুয়েলারি দোকান, মহাজন বা স্থানীয় অর্থদাতার কাছে স্বর্ণ বন্ধক রাখে এবং তার বিপরীতে নগদ টাকা গ্রহণ করে। পরে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সুদসহ টাকা পরিশোধ করলে স্বর্ণ ফেরত পাওয়া যায়। কিন্তু সময়মতো ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে অনেক ক্ষেত্রে সেই স্বর্ণ বিক্রি হয়ে যায় বা স্থায়ীভাবে হারিয়ে যায়। এই ব্যবস্থা অনেকটা অনানুষ্ঠানিক বন্ধকি ব্যাংকের মতো কাজ করে। শহরের অনেক জুয়েলারি দোকান কিংবা স্থানীয় অর্থদাতারা বছরের পর বছর এই ধরনের লেনদেন পরিচালনা করে আসছেন। ফলে স্বর্ণকে ঘিরে একটি বিকল্প ঋণ বাজার গড়ে উঠেছে, যা পুরোপুরি ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে পরিচালিত হয়।
স্বর্ণ অর্থনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কালো টাকা বা অঘোষিত সম্পদের আশ্রয়স্থল হিসেবে এর ব্যবহার। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, বিপুল অঘোষিত অর্থ নগদে ধরে রাখা ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় তা স্বর্ণে রূপান্তর করা হয়। অভিযোগ রয়েছে যে কিছু সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী বা প্রভাবশালী ব্যক্তি তাদের অপ্রদর্শিত সম্পদ স্বর্ণ কিনে সংরক্ষণ করেন। স্বর্ণের মালিকানা সহজে শনাক্ত করা যায় না এবং ব্যাংকিং নথিতে সব সময় তা প্রতিফলিত হয় না— এই কারণে এটি অঘোষিত সম্পদ রাখার জন্য তুলনামূলক নিরাপদ মাধ্যম হয়ে ওঠে। অনেক ক্ষেত্রে মানুষ বিনিয়োগ হিসেবেও স্বর্ণ কিনে রাখে, কারণ স্বর্ণের দাম বাড়ার প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরেই লক্ষ্য করা যায়।
কিন্তু এই প্রবণতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রভাবও রয়েছে। যখন বিপুল পরিমাণ কালো টাকা স্বর্ণের বাজারে প্রবেশ করে, তখন বাজারে চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় এবং স্বর্ণের দাম দ্রুত বাড়তে থাকে। অনেক সময় দেখা যায়, কয়েক বছরের ব্যবধানে (গত ২ বছরে) স্বর্ণের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। এর ফলে যাদের কাছে অঘোষিত বিপুল অর্থ রয়েছে, তারা আরো লাভবান হয়। অর্থাৎ কালো টাকার শক্তি উল্টো আরো বৃদ্ধি পায়। কিন্তু এর বিপরীতে নিম্ন ও মধ্যআয়ের সাধারণ মানুষ ক্রমশ স্বর্ণের বাজার থেকে ছিটকে পড়ে।
বিশেষ করে যারা শুধুমাত্র গয়না হিসেবে স্বর্ণ কিনতে চান— যেমন, বিয়ের জন্য স্বর্ণ সংগ্রহ করা। তাদের ওপর এর প্রভাব বেশি পড়ে। স্বর্ণের দাম দ্রুত বাড়ার ফলে অনেক পরিবারের পক্ষে আগের মতো স্বর্ণ কেনা সম্ভব হয় না। অর্থাৎ স্বর্ণ ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেতে থাকে।
আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো, স্বর্ণ কেনা ও বিক্রির মধ্যে একটি বড় মূল্য পার্থক্য থাকে। একজন ক্রেতা যখন গয়না কিনেন, তখন তাকে শ্রমমূল্য, মেকিং চার্জ এবং অন্যান্য খরচসহ উচ্চমূল্য দিতে হয়। কিন্তু সেই গয়না বিক্রি করতে গেলে অনেক ক্ষেত্রে বাজারদরের তুলনায় প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কম দাম পাওয়া যায়। ফলে যারা বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে নয়, বরং গয়না হিসেবে স্বর্ণ কিনে রাখেন, তারা প্রকৃত অর্থে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন।
এছাড়া বাজারে প্রায়ই ক্যারেট বা বিশুদ্ধতার ক্ষেত্রে প্রতারণার অভিযোগ ওঠে। অনেক সময় ক্রেতাকে যে মানের স্বর্ণ বলা হয়, বাস্তবে তার বিশুদ্ধতা কম হতে পারে। সাধারণ ক্রেতাদের পক্ষে এই বিষয়টি যাচাই করা কঠিন। ফলে তারা অর্থনৈতিকভাবে আরো ক্ষতির মুখে পড়েন। বিক্রি করতে গেলে এই ক্ষতিটা ধরা পড়ে।
বাংলাদেশে স্বর্ণের বাজার সংগঠিতভাবে পরিচালনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে Bangladesh Jewellers Association। এই সংগঠনটি নিয়মিত স্বর্ণের দাম ঘোষণা করে এবং দেশের অধিকাংশ জুয়েলারি দোকান সেই দাম অনুসরণ করে থাকে। অন্যদিকে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান Bangladesh Bank মূলত ব্যাংকিং খাত তদারকি করে, কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে মানুষের কাছে থাকা বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ এই আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে থেকেই যায়। ফলে অর্থনীতির একটি বড় অংশ রাষ্ট্রীয় হিসাবের বাইরে অবস্থান করে।
সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশে স্বর্ণ শুধু অলংকারের বাজার নয়; এটি ধীরে ধীরে একটি সমান্তরাল আর্থিক ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করছে। সঞ্চয়, ঋণ, কালো টাকার আশ্রয়, অনানুষ্ঠানিক বিনিয়োগ এবং সামাজিক নিরাপত্তা— সব মিলিয়ে স্বর্ণ অর্থনীতির একটি আলাদা জগৎ তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় চাপ পড়ে নিম্ন ও মধ্যআয়ের মানুষের ওপর, যারা শেষ পর্যন্ত স্বর্ণের বাজারে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি বহন করে। তাই স্বর্ণ বাজারকে আরো স্বচ্ছ, নীতিনির্ভর এবং আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করা সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি হয়ে উঠেছে।
অবৈধ স্বর্ণ ও হারিয়ে যাওয়া রাজস্ব
স্বর্ণের এই সমান্তরাল অর্থনীতির সঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জড়িয়ে আছে— রাজস্ব হারানো। বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ বৈধ আমদানি ব্যবস্থার বাইরে অবৈধ পথে দেশে প্রবেশ করে বলে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে সরকার আমদানি শুল্ক, ভ্যাট ও অন্যান্য কর থেকে সম্ভাব্য বিপুল রাজস্ব হারায়। অর্থাৎ স্বর্ণের বাজার যত বড়ই হোক, সেই অর্থনীতির বড় অংশ রাষ্ট্রীয় কর ব্যবস্থার বাইরে থেকে যায়। এতে একদিকে কালো টাকার প্রবাহ শক্তিশালী হয়, অন্যদিকে সরকার রাজস্ব আয়ের মাধ্যমে জনগণের জন্য অবকাঠামো, শিক্ষা, চিকিৎসা বা সামাজিক নিরাপত্তা খাতে যে অতিরিক্ত ব্যয় করতে পারতো, সেই সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ে।
স্বর্ণের এই সমান্তরাল অর্থনীতিকে পুরোপুরি অস্বীকার করা সম্ভব নয়, তবে এটিকে আরো স্বচ্ছ ও নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে আনা জরুরি। বৈধ আমদানি ব্যবস্থা সহজ করা, স্বর্ণের বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করতে মান নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করা, ক্রয়-বিক্রয়ে স্বচ্ছ মূল্যব্যবস্থা চালু করা এবং বন্ধকি স্বর্ণ লেনদেনকে নীতিমালার আওতায় আনা গেলে সাধারণ মানুষের ঝুঁকি কমবে। এতে নিম্ন ও মধ্যআয়ের মানুষ প্রতারণা, অতিরিক্ত মূল্য এবং অস্বচ্ছ বাজারের ক্ষতি থেকে কিছুটা সুরক্ষা পেতে পারে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রও রাজস্ব আয় বাড়াতে পারবে এবং স্বর্ণ বাজারকে ধীরে ধীরে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব হবে।
