বাংলাদেশের উন্নয়নের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আমরা প্রায়ই শিল্প, বিদ্যুৎ, অবকাঠামো, তথ্যপ্রযুক্তি কিংবা বৈদেশিক বিনিয়োগের কথা বলি। কিন্তু এমন একটি সম্পদ রয়েছে, যা প্রকৃতি নিজেই বাংলাদেশকে উপহার দিয়েছে, অথচ আমরা তার প্রকৃত অর্থনৈতিক মূল্য এখনও পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারিনি। সেই সম্পদ হলো আমাদের নদী। পৃথিবীর বৃহত্তম বদ্বীপের ওপর গড়ে ওঠা বাংলাদেশে প্রায় ৭০০টি নদী রয়েছে। খাল, বিল ও জলপথ মিলিয়ে দেশের নদী নেটওয়ার্কের দৈর্ঘ্য প্রায় ২৪ হাজার কিলোমিটার। বর্ষা মৌসুমে প্রায় ৬ হাজার কিলোমিটার এবং শুষ্ক মৌসুমেও প্রায় ৩ হাজার ৯০০ কিলোমিটার নৌপথ সচল থাকে। এত বিস্তৃত অভ্যন্তরীণ নৌপথ পৃথিবীর খুব কম দেশেরই রয়েছে। অথচ এই বিশাল প্রাকৃতিক অবকাঠামোকে আমরা এখনও জাতীয় অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তিতে রূপান্তর করতে পারিনি।
বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ১৯৪ মিলিয়ন টন পণ্য অভ্যন্তরীণ নৌপথে পরিবহন হয় এবং দেশের মোট যাত্রী পরিবহনের প্রায় এক-চতুর্থাংশ নদীপথ ব্যবহার করে। এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে, সীমিত বিনিয়োগেও নদী আজও দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। প্রশ্ন হলো, যদি আধুনিক নৌবন্দর, পরিকল্পিত নদী ব্যবস্থাপনা, কনটেইনার টার্মিনাল, কোল্ড চেইন, ডিজিটাল লজিস্টিকস এবং সারা বছর সচল নাব্যতা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে এই অবদান কত গুণ বাড়তে পারে?
বিশ্বব্যাপী পরিবহন অর্থনীতির গবেষণায় বারবার প্রমাণিত হয়েছে যে, অভ্যন্তরীণ নৌপথে পণ্য পরিবহন সড়কপথের তুলনায় অনেক বেশি সাশ্রয়ী। একই পরিমাণ পণ্য পরিবহনে কম জ্বালানি লাগে, কম কার্বন নিঃসরণ হয় এবং একসঙ্গে শত শত ট্রাকের সমপরিমাণ মালামাল একটি মাত্র বার্জ বহন করতে পারে। এর ফলে সড়কের ওপর চাপ কমে, যানজট কমে, দুর্ঘটনা কমে এবং দেশের জ্বালানি ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে পরিবেশবান্ধব পরিবহনব্যবস্থা হিসেবে নদীপথের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলো বহু আগেই এই বাস্তবতা উপলব্ধি করেছে। নেদারল্যান্ডস তার অন্যতম সেরা উদাহরণ। দেশটির একটি বড় অংশ সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে অবস্থিত। তবুও তারা নদীকে দুর্যোগ নয়, উন্নয়নের অবকাঠামোতে রূপান্তর করেছে। রাইন, মিউস ও স্কেল্ড নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ইউরোপের সবচেয়ে কার্যকর লজিস্টিকস নেটওয়ার্ক। রটারডাম বন্দর শুধু নেদারল্যান্ডসের নয়, সমগ্র ইউরোপের বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার। নদী, সমুদ্রবন্দর, রেলপথ এবং সড়কপথকে একীভূত করে তারা এমন একটি পরিবহনব্যবস্থা তৈরি করেছে, যা ইউরোপীয় শিল্প ও বাণিজ্যের মেরুদণ্ডে পরিণত হয়েছে।
চীনের অর্থনৈতিক উত্থানেও নদীর ভূমিকা অসাধারণ। ইয়াংজি নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ইয়াংজি ইকোনমিক বেল্ট চীনের মোট জিডিপির প্রায় ৪৫ শতাংশেরও বেশি উৎপাদন করে। সাংহাই, নানজিং, উহান এবং চংকিংয়ের মতো শিল্পনগরীগুলো নদীপথের সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে বিশ্ববাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ভারী শিল্প, ইস্পাত, অটোমোবাইল, ইলেকট্রনিক্স এবং কনটেইনার পরিবহনের বিশাল অংশ এখনও নদীপথের ওপর নির্ভরশীল।
যুক্তরাষ্ট্রে মিসিসিপি নদী এবং তার উপনদীগুলো কৃষি অর্থনীতির প্রাণ। ভুট্টা, সয়াবিন, গম ও অন্যান্য কৃষিপণ্য লাখ লাখ টন পরিমাণে বার্জের মাধ্যমে বন্দরে পৌঁছে যায়। এর ফলে কৃষিপণ্যের পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এবং যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়। একইভাবে জার্মানির রাইন নদী শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইউরোপের শিল্পবিপ্লবের অন্যতম ভিত্তি। রাসায়নিক শিল্প, ইস্পাত শিল্প এবং ভারী যন্ত্রপাতি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় অংশ এখনও রাইন নদীকেন্দ্রিক।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভিয়েতনামও বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। মেকং ডেল্টাকে কেন্দ্র করে তারা কৃষি, মৎস্য, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলেছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ চাল রপ্তানিকারক দেশ হওয়ার পেছনে নদীকেন্দ্রিক অবকাঠামোর বড় ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশের পদ্মা-মেঘনা-যমুনা অববাহিকার সম্ভাবনা অনেক ক্ষেত্রে মেকং ডেল্টার চেয়েও বেশি।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানও আমাদের একটি অতিরিক্ত সুবিধা দিয়েছে। ভারত, নেপাল ও ভুটানের জন্য বাংলাদেশ হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর নদীভিত্তিক ট্রানজিট করিডোর। আশুগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, চাঁদপুর, খুলনা, মোংলা, বরিশাল, পায়রা এবং চট্টগ্রামকে আধুনিক নদীবন্দর হিসেবে উন্নীত করা গেলে শুধু অভ্যন্তরীণ নয়, আঞ্চলিক বাণিজ্যেও বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার লজিস্টিকস হাব হওয়ার সম্ভাবনা বাংলাদেশের সামনে বাস্তব সুযোগ হিসেবে উপস্থিত।
বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতিতেও নদীর গুরুত্ব অপরিসীম। উত্তরাঞ্চলের ধান, ভুট্টা ও সবজি, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের চা, দক্ষিণাঞ্চলের মাছ ও চিংড়ি, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শিল্পপণ্য—সবকিছু যদি আধুনিক নদীপথে দ্রুত বন্দরে পৌঁছানো যায়, তাহলে উৎপাদন ব্যয় কমবে, পণ্যের অপচয় কমবে এবং কৃষক ও উদ্যোক্তা উভয়েই বেশি লাভবান হবেন। নদীকেন্দ্রিক কোল্ড স্টোরেজ, খাদ্য গুদাম, কৃষিপণ্য সংগ্রহকেন্দ্র এবং কনটেইনার টার্মিনাল গড়ে তুললে বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
শুধু পরিবহন নয়, নদীকে ঘিরে আরও বহু অর্থনৈতিক খাত গড়ে তোলা সম্ভব। জাহাজ নির্মাণ শিল্প, নৌযান মেরামত, নদী পর্যটন, জলক্রীড়া, ক্রুজ শিল্প, নদীতীরভিত্তিক নগর উন্নয়ন, মৎস্যসম্পদ, জলজ কৃষি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং নদীকেন্দ্রিক শিল্পপার্ক —সব মিলিয়ে লাখ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব। বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্প ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করেছে; পরিকল্পিত বিনিয়োগ হলে এই শিল্প নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
তবে এই সম্ভাবনা বাস্তবায়নের জন্য কেবল ড্রেজিং করলেই হবে না। প্রয়োজন সমন্বিত নদী নীতি। নদী দখলমুক্ত করতে হবে, দূষণ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, বৈজ্ঞানিকভাবে ড্রেজিং পরিচালনা করতে হবে, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে, নদীতীর পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন করতে হবে এবং নদীপথকে রেল ও মহাসড়কের সঙ্গে সমন্বিত করে একটি মাল্টিমোডাল পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। নদীকে আলাদা একটি খাত হিসেবে নয়, জাতীয় অর্থনীতির কেন্দ্রীয় অবকাঠামো হিসেবে দেখতে হবে।
বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথে পরিকল্পিত বিনিয়োগ দেশের লজিস্টিকস ব্যয় কমাতে, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা বাড়াতে এবং পরিবেশবান্ধব প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে ঢাকা–চট্টগ্রাম–আশুগঞ্জ করিডোরে নদীপথের ব্যবহার বাড়ানো গেলে সড়কের ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
বাংলাদেশের উন্নয়নের পরবর্তী অধ্যায় লিখতে হলে আমাদের একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে হবে। এতদিন আমরা মহাসড়ক নির্মাণকে উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে দেখেছি। এখন সময় এসেছে নদীকেও সমান গুরুত্ব দেওয়ার। কারণ প্রকৃতি ইতোমধ্যেই আমাদের জন্য হাজার হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ একটি প্রাকৃতিক মহাসড়ক নির্মাণ করে দিয়েছে। আমরা শুধু সেটিকে পরিকল্পনা, প্রযুক্তি এবং সুশাসনের মাধ্যমে কার্যকর অর্থনৈতিক করিডোরে রূপান্তর করতে পারিনি।
একবিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশ যদি সত্যিই উন্নত, সমৃদ্ধ এবং টেকসই রাষ্ট্রে পরিণত হতে চায়, তাহলে নদীকে আর কেবল পানি বা বন্যার উৎস হিসেবে দেখলে চলবে না। নদীকে দেখতে হবে অর্থনীতি, শিল্প, কৃষি, বাণিজ্য, কর্মসংস্থান এবং আঞ্চলিক সংযোগের মহাসড়ক হিসেবে। যে দিন বাংলাদেশ এই সত্যটি উপলব্ধি করবে, সেদিনই দেশের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক সম্পদ তার সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হবে।
