আজ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৫১তম মৃত্যুবার্ষিকী

ঢাকা, ১৫ আগস্ট ২০২৬:
আজ ১৫ আগস্ট। ১৯৭৫ সালের এই দিনে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে মর্মান্তিক ও বিভৎস অধ্যায়গুলোর একটি হয়ে থাকা সেই হত্যাকাণ্ডের ৫১ বছর পূর্ণ হলো আজ।
তবে ২০২৬ সালের ১৫ আগস্টের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় প্রেক্ষাপট অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে আলাদা। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুবার্ষিকীকে ঘিরে এবার রাষ্ট্রীয়ভাবে জাতীয় শোক দিবস পালনের কোনো কর্মসূচি নেই। ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকার ১৫ আগস্টের সরকারি ছুটি বাতিল করে এবং পরবর্তীতে জাতীয় দিবসের তালিকা থেকেও ১৫ আগস্ট বাদ দেওয়া হয়। ২০২৬ সালের মার্চে জারি করা নতুন পরিপত্রেও বঙ্গবন্ধুর জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীসহ তার পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি দিবস রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন না করার সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়েছে।
এ পরিবর্তন শুধু একটি দিবসের আনুষ্ঠানিকতা বাতিলের বিষয় নয়; এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসচর্চা ও রাজনৈতিক বয়ানে একটি বড় পরিবর্তনও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ক্ষমতার পালাবদলে বদলে গেছে ১৫ আগস্টের রাষ্ট্রীয় ভাষ্য
দীর্ঘ সময় ধরে আওয়ামী লীগ সরকার ১৫ আগস্টকে ‘জাতীয় শোক দিবস’ হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করেছে। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা, বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন এবং বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিনটি পালিত হতো।
কিন্তু ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সেই রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা বন্ধ হয়ে যায়। ২০২৬ সালেও তা পুনর্বহাল হয়নি।
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক যেমন তীব্র হয়েছে, তেমনি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের বিভিন্ন চরিত্র ও রাজনৈতিক শক্তির ভূমিকা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে— কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু বা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে কতটা এক করে দেখা হবে, আর রাষ্ট্রের ইতিহাস হিসেবে ১৯৭১ ও ১৯৭৫-এর ঘটনাগুলোকে কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে?
বঙ্গবন্ধুকে মূল্যায়ন আর আওয়ামী লীগকে মূল্যায়ন কি একই বিষয়?
রাজনৈতিক বিতর্কের অন্যতম কেন্দ্র এখানেই।
বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের মূল্যায়ন করতে গেলে তার নেতৃত্বে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন, ছয় দফা, ১৯৭০ সালের নির্বাচন এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট সামনে আসে। একই সঙ্গে স্বাধীনতার পর তার সরকারের শাসনব্যবস্থা, অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও ১৯৭৫ সালের একদলীয় ব্যবস্থা নিয়েও আলোচনার জায়গা রয়েছে।
অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ইতিহাসচর্চা তার রাজনৈতিক অবদানকে স্বীকার করার পাশাপাশি তার শাসনামলের বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলোকেও আলোচনার বাইরে রাখে না।
কিন্তু তার রাজনৈতিক ভুল বা আওয়ামী লীগের শাসনের সমালোচনা এবং ১৯৭৫ সালের হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়া—দু’টি বিষয় এক নয়।
১৯৭৫-এর হত্যাকাণ্ডের প্রশ্নটি কোথায়?
১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডে বঙ্গবন্ধুর পাশাপাশি তার পরিবারের অধিকাংশ সদস্য নিহত হন। ঘটনাটি সামরিক অভ্যুত্থানের সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় সামরিক শাসনের অধ্যায় শুরু হয়।
এই হত্যাকাণ্ডকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কীভাবে দেখা হবে— সেটি রাজনৈতিক মতভেদের ঊর্ধ্বে একটি ঐতিহাসিক প্রশ্ন।
কারণ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনো রাজনৈতিক নেতা জনপ্রিয় বা অজনপ্রিয়— সেটি হত্যার মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়ার কথা নয়। একইভাবে কোনো রাজনৈতিক নেতার সমালোচনা বা তার সরকারের ব্যর্থতার বিচারও হওয়া উচিত সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়।
আজকের বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ইতিহাসের
আজকের বাংলাদেশে রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে। একসময় যারা রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে ছিল, তাদের একটি অংশ এখন রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে একসময় রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ এখন রাজনৈতিকভাবে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি।
এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় ১৫ আগস্টের মূল্যায়নও নতুন রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যে পড়েছে।
তবে ইতিহাসকে কেবল ক্ষমতাসীনদের দৃষ্টিকোণ থেকে লিখলে ইতিহাস আর ইতিহাস থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে রাজনৈতিক বয়ান।
১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ যেমন কোনো একক রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়, তেমনি ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডও কেবল কোনো একটি দলের দলীয় শোকের বিষয় হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকার কথা নয়। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত রাষ্ট্রের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র পরিচালনার সাফল্য-ব্যর্থতা নিয়েও নির্মোহ আলোচনা প্রয়োজন।
‘বঙ্গবন্ধু’ প্রশ্নের বাইরে বাংলাদেশের প্রশ্ন
সময়ের সঙ্গে রাজনৈতিক মতাদর্শ বদলাবে, সরকার বদলাবে, দল ক্ষমতায় আসবে-যাবে। কিন্তু ১৯৭১ ও ১৯৭৫ বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে মুছে যাবে না।
বরং বর্তমান প্রজন্মের জন্য প্রয়োজন এমন একটি ইতিহাসচর্চা, যেখানে বঙ্গবন্ধুকে অন্ধভাবে শুধু একক চরিত্র হিসেবে মহিমান্বিতও করা হবে না, আবার রাজনৈতিক বিরোধিতার কারণে তার ঐতিহাসিক ভূমিকাও অস্বীকার করা হবে না।
একইভাবে আওয়ামী লীগের সমালোচনা করা যাবে, কিন্তু সেই সমালোচনার নামে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করা যাবে না। আবার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলেও কোনো রাজনৈতিক দলের অন্যায়, দুর্নীতি বা কর্তৃত্ববাদী আচরণকে আড়াল করা উচিৎ নয়।
আজকের ১৫ আগস্ট তাই শুধু শোকের দিন নয়; এটি বাংলাদেশের ইতিহাসকে দলীয় রাজনীতির বাইরে দাঁড়িয়ে নতুন করে পড়ারও একটি সুযোগ।
৫১ বছর পর প্রশ্নটি শুধু ‘বঙ্গবন্ধুকে কীভাবে স্মরণ করা হবে’—এমন নয়।
আরও বড় প্রশ্ন হলো— বাংলাদেশ তার ইতিহাসকে কতটা নির্মোহভাবে ধারণ করতে পারবে?
রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি থাকুক বা না থাকুক, রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল ঘটুক বা না ঘটুক— ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের ইতিহাসে ঘটে যাওয়া একটি নির্মম হত্যাকাণ্ড হিসেবেই থেকে যাবে। সেই ইতিহাসের বিচার, মূল্যায়ন ও স্মরণ —সবকিছুর ক্ষেত্রেই প্রয়োজন রাজনৈতিক প্রতিহিংসার পরিবর্তে সত্য, তথ্য ও যুক্তির প্রতি দায়বদ্ধতা।
