মায়ামি, নূরজাহান, জায়তুন—দাম বেশি, খাবারের মান নিয়ে পুরনো অভিযোগ; অভিযানের পরও বদলায়নি চিত্র?
নিজস্ব প্রতিবেদক, কুমিল্লা
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশে দূরপাল্লার বাসযাত্রীদের বড় একটি অংশের যাত্রাবিরতি হয় নির্দিষ্ট কয়েকটি হাইওয়ে রেস্তোরাঁয়। বিশাল পরিসর, একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক যাত্রী সামলানোর সক্ষমতা এবং বাস থামার কারণে এসব রেস্তোরাঁর ব্যবসা জমজমাট। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—যাত্রী যত বেশি, খাবারের মান ও ভোক্তা অধিকার নিশ্চিত করার দায় কি ততটাই কম?
মায়ামি, নূরজাহান, জায়তুনসহ কুমিল্লার কয়েকটি পরিচিত হাইওয়ে রেস্তোরাঁ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই খাবারের মান, সংরক্ষণ, মূল্যতালিকা ও অতিরিক্ত দামের অভিযোগ রয়েছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো—অন্তত নূরজাহানের ক্ষেত্রে এসব অভিযোগের কিছু অংশ শুধু ভোক্তার মুখের কথা নয়; অতীতে সরকারি অভিযানে অনিয়ম ধরা পড়ার রেকর্ডও রয়েছে।
নূরজাহানে পচা মাংস, বাসি খাবার—অভিযোগের রেকর্ড
২০২০ সালের অক্টোবরে কুমিল্লার বিশ্বরোডে হোটেল নূরজাহানকে পচা মাংস সংরক্ষণের দায়ে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেছিল ভ্রাম্যমাণ আদালত। একই অভিযানে অন্য একটি হোটেলকে নোংরা পরিবেশে রান্নার জন্য জরিমানা করা হয়।
এরও আগে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের অভিযানে নূরজাহানের রান্নাঘরে অত্যন্ত নোংরা পরিবেশ এবং রেফ্রিজারেটরে কাঁচা মাছ-মাংস ও রান্না করা খাবার একসঙ্গে খোলা অবস্থায় রাখার কথা জানানো হয়। ওই ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটিকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছিল।
অর্থাৎ প্রশ্নটি শুধু ‘খাবার সুস্বাদু কি না’—এমন সাধারণ প্রশ্ন নয়।
প্রশ্ন হলো, খাবারটি নিরাপদ কিনা।

২০২৩ সালেও একই ধরনের অভিযোগ
২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানে কুমিল্লার হাইওয়ে হোটেলগুলোতে তদারকি করা হয়। ওই অভিযানে নূরজাহানকে বাসি খাবার বিক্রির উদ্দেশ্যে ফ্রিজে সংরক্ষণ, অননুমোদিত উপাদান দিয়ে খাদ্য প্রস্তুত এবং অবৈধভাবে খাবার সংরক্ষণের অভিযোগে ৮০ হাজার টাকা জরিমানা করার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
একই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে খাদ্য সংরক্ষণ, রান্নাঘরের পরিচ্ছন্নতা এবং খাদ্যের নিরাপত্তা নিয়ে একাধিক অভিযান ও জরিমানার তথ্য পাওয়া গেলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—
জরিমানা কি সমস্যার স্থায়ী সমাধান করেছে, নাকি জরিমানা দিয়ে আবার আগের ব্যবসায়িক পদ্ধতিতেই ফিরে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে?

জায়তুন ও মায়ামি-৩: ২০২৬ সালেও জরিমানা
চলতি ২০২৬ সালের ৩০ আগস্টের একটি স্থানীয় প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশে অভিযান চালিয়ে জাইতুন ও মায়ামি-৩ রেস্তোরাঁকে মোট ৭০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। প্রতিবেদনে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার সংরক্ষণ ও বিক্রি এবং মূল্যতালিকা প্রদর্শন না করার অনিয়মের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এ তথ্যটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ এখানে প্রশ্নটি পুরনো কোনো ঘটনার নয়। ২০২৬ সালেও একই মহাসড়কের বড় রেস্তোরাঁয় খাদ্য সংরক্ষণ ও মূল্য প্রদর্শন নিয়ে অভিযান এবং জরিমানার তথ্য সামনে এসেছে।
দাম বেশি হওয়ার অভিযোগও পুরনো
২০২০ সালে প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে কুমিল্লার মহাসড়কের হোটেল-রেস্তোরাঁগুলোতে যাত্রীদের কাছ থেকে চড়া দাম নেওয়ার অভিযোগ উঠে আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়, কিছু রেস্তোরাঁয় বাসের চালক, সুপারভাইজার ও হেলপারের খাবার বিনামূল্যে দেওয়ার পাশাপাশি কমিশনের ব্যবস্থাও থাকে—আর সেই ব্যয় শেষ পর্যন্ত যাত্রীদের কাছ থেকে বেশি দাম নিয়ে তোলা হয় বলে অভিযোগ ছিল।
একই প্রতিবেদনে মায়ামি ও নূরজাহানসহ কুমিল্লার একাধিক হাইওয়ে রেস্তোরাঁকে অতীতে বেশি দামে খাবার বিক্রি ও নোংরা পরিবেশের কারণে জরিমানার তালিকায় রাখা হয়েছিল।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে—
যাত্রী আসলে স্বাধীন ভোক্তা নন
ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার বা আরও দূরের গন্তব্যে যাওয়া একজন যাত্রী যখন একটি নির্দিষ্ট রেস্তোরাঁয় বাস থেকে নামেন, তখন তার হাতে সময় থাকে অল্প।
বাস চলে যাওয়ার ভয় থাকে।
অপরিচিত জায়গা হওয়ায় বিকল্প রেস্তোরাঁও তিনি জানেন না। কাছাকাছি দূরত্বে কোনো রেস্তোরাঁ থাকেও না।
ফলে খাবারের দাম বেশি মনে হলেও কিংবা খাবারের মান পছন্দ না হলেও খাবার না খেয়ে চলে যাওয়াটা অনেক সময় বাস্তবসম্মত বিকল্প নয়।
এই পরিস্থিতি একজন সাধারণ ভোক্তার বাজারে থাকা দর-কষাকষির ক্ষমতাকে কার্যত কমিয়ে দেয়।
তাই হাইওয়ে রেস্তোরাঁয় ভোক্তা অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব সাধারণ দোকানের চেয়ে বরং বেশি হওয়া উচিৎ।
নূরজাহান ও জায়তুনের পরিচালক একই ব্যক্তি
প্রকাশ্য সংবাদসূত্রে নূরজাহান ও জায়তুনের সঙ্গে এ কে এম লুৎফুর রহমান রিপনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়। ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে তাকে জায়তুনের পরিচালক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে; একই বছর বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির কুমিল্লা জেলা শাখার কমিটিতেও তাকে সহসভাপতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
তবে মায়ামি, নূরজাহান ও জায়তুনকে একই মালিকানার প্রতিষ্ঠান হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করার মতো কোম্পানি/ট্রেড লাইসেন্স/ভ্যাট নথি এখনো প্রকাশ্য উৎসে পাওয়া যায়নি। কিছু কাগজপত্র দোকানে ঝুলানোর নিয়ম থাকলেও তারা ঝুলিয়ে রাখেনি।
তাই একই মালিকানার দাবি নয়, বরং মালিকানা কাঠামো অনুসন্ধান করাই এখন গুরুত্বপূর্ণ।

তাহলে তদারকি কোথায়?
একটি রেস্তোরাঁকে একবার জরিমানা করা হলে সেটি ব্যবসার খরচের মতো হয়ে যেতে পারে—যদি পরবর্তী সময়ে নিয়মিত পরিদর্শন, খাদ্য নমুনা পরীক্ষা এবং ভোক্তা অধিকার নিশ্চিত করা না হয়।
নূরজাহানের ক্ষেত্রে ২০২০ সালে নোংরা রান্নাঘর ও খাদ্য সংরক্ষণের অনিয়ম, একই বছরে পচা মাংস এবং ২০২৩ সালে বাসি খাবার ও অননুমোদিত উপাদান ব্যবহারের অভিযোগে জরিমানার তথ্য রয়েছে।
অন্যদিকে ২০২৬ সালেও জায়তুন ও মায়ামি-৩–কে খাদ্য সংরক্ষণ/বিক্রি ও মূল্যতালিকা সংক্রান্ত অনিয়মে জরিমানার খবর পাওয়া যাচ্ছে।
তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—
জরিমানা হচ্ছে, কিন্তু খাবারের মান কি সত্যিই বদলাচ্ছে?
ভোক্তার জন্য সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন
এই রেস্তোরাঁগুলোতে—
- প্রতিদিনের খাবারের নমুনা কতবার পরীক্ষা করা হয়?
- মাংস, মাছ ও রান্না করা খাবার কীভাবে সংরক্ষণ করা হয়?
- ফ্রিজে কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখা হয় কিনা?
- মিষ্টির মান ও উপাদান পরীক্ষা করা হয়েছে কি?
- বোতলজাত ও অন্যান্য পানীয়ের প্রয়োজনীয় অনুমোদন আছে কি?
- প্রতিটি খাবারের মূল্যতালিকা দৃশ্যমানভাবে টাঙানো আছে কি?
- মূল্যতালিকার বাইরে কোনো অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয় কি?
- বাস কোম্পানির সঙ্গে যাত্রাবিরতি বা কমিশনের কোনো চুক্তি আছে কি?
এসব প্রশ্নের উত্তর শুধু রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে নয়— সরকারি নথি, খাদ্য পরীক্ষার রিপোর্ট, অভিযান প্রতিবেদন এবং ভ্যাট-বাণিজ্যিক নথি দিয়ে যাচাই করা দরকার।
কারণ মহাসড়কের রেস্তোরাঁয় একজন যাত্রী শুধু খাবার কিনছেন না; তিনি নির্ভর করছেন একটি নির্দিষ্ট ব্যবস্থার ওপর, এবং যেখানে কোনো বিকল্প নেই।
বাস থামবে, যাত্রী নামবে, খাবার কিনবে—কিন্তু সেই যাত্রী যদি খাবারের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগই না পান, তাহলে তার নিরাপদ খাবারের অধিকার নিশ্চিত করবে কে?
