Headlines

শিশু অধিকারের চরম লঙ্ঘনঃ রাষ্ট্র নির্বিকার, জনগণ যার যার

শিশু অধিকার
কুর্মিটলা ফ্লাইওভারের নিচে ঘুমিয়ে থাকা তিন ভাই যেন বাংলাদেশের এক নির্মম প্রতিচ্ছবি

ঢাকার কুর্মিটলা ফ্লাইওভারের ওপর। নিচে ছুটে চলেছে গাড়ি, মানুষ, নগরের ব্যস্ত জীবন। আর সেই ব্যস্ততার মাঝেই ময়লা একটি চটের ওপর গাদাগাদি করে ঘুমিয়ে আছে তিন শিশু। তাদের একজনের একটি হাত নেই। কথা বলতে গিয়ে সে জানায়, তারা তিন ভাই।

এই একটি দৃশ্যই যেন বাংলাদেশের হাজারো অবহেলিত শিশুর জীবনের প্রতিচ্ছবি—যাদের জন্য সংবিধান, আইন, নীতি ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার আছে; কিন্তু বাস্তব জীবনে নেই নিরাপত্তা, আশ্রয়, শিক্ষা বা মর্যাদা।

শিশু অধিকার
কুর্মিটোলা ফ্লাইওভার থেকে তোলা ছবি। ফলোআপ নিউজ।

পথে পথে অবহেলিত শৈশব

বাংলাদেশে পথশিশুর সঠিক সংখ্যা নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার তথ্য ভিন্ন হলেও সমস্যা যে ভয়াবহ, সে বিষয়ে দ্বিমত নেই। সমাজসেবা অধিদপ্তর, ইউনিসেফ ও বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের হিসাব অনুযায়ী দেশে কয়েক লাখ শিশু নিয়মিতভাবে রাস্তায় বসবাস করে বা জীবিকার জন্য রাস্তায় সময় কাটায়।

এই শিশুদের একটি বড় অংশ—

  • ভিক্ষাবৃত্তিতে জড়িত;

  • ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিয়োজিত;

  • আবর্জনা সংগ্রহ করে;

  • স্টেশন, ফ্লাইওভার, বাজার ও ফুটপাতে রাত কাটায়;

  • মাদক, নির্যাতন ও মানবপাচারের ঝুঁকিতে থাকে।

নবজাতক কোলে ভিক্ষাঃ দারিদ্র্য নাকি সংগঠিত শোষণ?

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় প্রায়ই দেখা যায়, নবজাতক বা ছোট শিশু কোলে নিয়ে নারী বা শিশু ভিক্ষা করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও মানবাধিকারকর্মীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, এর একটি অংশ সঙ্ঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।

শিশুদের ইচ্ছাকৃতভাবে অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় রাখা, ঘুমের ওষুধ খাইয়ে দীর্ঘ সময় কোলে রাখা, কিংবা প্রতিবন্ধী শিশুদের ব্যবহার করে সহানুভূতি আদায়ের অভিযোগ বহুবার উঠেছে। যদিও প্রতিটি ঘটনায় প্রমাণ পাওয়া যায় না, তবুও বিষয়টি নিয়ে ধারাবাহিক নজরদারির দাবি রয়েছে।

ঝুঁকিপূর্ণ কাজে হাজারো শিশু

বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশু নিয়োগ নিষিদ্ধ। কিন্তু বাস্তবে ওয়ার্কশপ, গ্যারেজ, প্লাস্টিক কারখানা, হোটেল-রেস্তোরাঁ, ইটভাটা, বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণসহ নানা খাতে শিশুশ্রম এখনও দৃশ্যমান।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, দেশে লাখ লাখ শিশু শ্রমে নিয়োজিত, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করে।

“দেখেও দেখে না” নগরের মানুষ

কুর্মিটলা ফ্লাইওভারের সেই তিন শিশুর পাশ দিয়েও অসংখ্য মানুষ হেঁটে গেছে। কেউ থামেনি, কেউ জানতে চায়নি তারা কোথায় থাকে, কী খেয়েছে, কেন রাস্তায়।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, নগর জীবনে দারিদ্র্যের দৃশ্যের প্রতি মানুষের সংবেদনশীলতা কমে যাচ্ছে। প্রতিদিন একই দৃশ্য দেখতে দেখতে অনেকেই এটিকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিচ্ছে। এই উদাসীনতা শুধু সামাজিক ব্যর্থতা নয়, মানবিক ব্যর্থতাও।

রাষ্ট্রের দায় কোথায়?

বাংলাদেশ সংবিধানের ১৫, ১৭ ও ১৮ অনুচ্ছেদে শিশুদের মৌলিক চাহিদা, শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্যের বিষয়ে রাষ্ট্রের দায়িত্বের কথা বলা হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ (UNCRC)-এরও স্বাক্ষরকারী।

তবুও প্রশ্ন থেকে যায়—

  • কেন এত শিশু রাস্তায় রাত কাটায়?

  • কেন ভিক্ষাবৃত্তিতে শিশুদের ব্যবহার বন্ধ করা যাচ্ছে না?

  • কেন উদ্ধার হওয়া শিশুরা আবার রাস্তায় ফিরে আসে?

  • কেন পুনর্বাসন ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা দুর্বল?

শুধু উদ্ধার নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন

শিশু অধিকারকর্মীরা বলছেন, মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে শিশুদের তুলে নেওয়া সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। প্রয়োজন—

  • পরিবারভিত্তিক সহায়তা;

  • নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র;

  • স্বাস্থ্য ও মানসিক সহায়তা;

  • স্কুলে ফেরানোর ব্যবস্থা;

  • শিশু ভিক্ষাবৃত্তি নিয়ন্ত্রণে বিশেষ টাস্কফোর্স;

  • সংগঠিত চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর তদন্ত ও বিচার।

কুর্মিটলার তিন ভাইঃ একটি ছবির বাইরে

ছবির হাতকাটা শিশুটি যখন বলে, “আমরা তিন ভাই”, তখন সেটি শুধু একটি ব্যক্তিগত পরিচয় নয়; এটি রাষ্ট্রের কাছে এক নীরব প্রশ্ন।

তাদের কি জন্মনিবন্ধন আছে? তারা কি কখনও স্কুলে গেছে? তাদের মা-বাবা কোথায়? তারা কি ভিক্ষা করে, নাকি কেউ তাদের দিয়ে করায়? প্রতিবন্ধী এই শিশুটির চিকিৎসা হয়েছে কখনও?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর অজানা। কিন্তু অজানা বলে দায় শেষ হয়ে যায় না।

বাংলাদেশ উন্নয়নের গল্প বলছে— মেট্রোরেল, ফ্লাইওভার, এক্সপ্রেসওয়ে, ডিজিটাল সেবা। কিন্তু সেই উন্নয়নের ছায়াতেই যদি শিশুরা ফুটপাতে ঘুমায়, ভিক্ষার পাত্র হয়ে ওঠে, ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে হারিয়ে যায়, তবে উন্নয়নের নৈতিক ভিত্তি প্রশ্নের মুখে পড়ে।

কুর্মিটলা ফ্লাইওভারের ওপর ঘুমিয়ে থাকা তিন ভাই আমাদের মনে করিয়ে দেয়: শিশু অধিকার কেবল আইন বা দিবসের বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের বিবেক, সমাজের মানবিকতা এবং নাগরিকের দায়িত্বের পরীক্ষা।

আর সেই পরীক্ষায় আমরা কি সত্যিই পাশ করছি?