Headlines

সরকারি অফিসে ‘অনানুষ্ঠানিক প্রশাসন’-এর নেপথ্যে কারা? // পর্ব-১

সরকারি অফিস

বদলি-পদায়নের নিয়মিত কাঠামোর বাইরে বা দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকা কিছু কর্মচারী কি কর্মকর্তাদের ‘অনানুষ্ঠানিক হাত’ হিসেবে কাজ করছেন?

অনুসন্ধান | FollowUpNews

সরকারি অফিসে দুর্নীতি বা অনিয়মের গল্প সাধারণত কর্মকর্তা-কেন্দ্রিক। সিদ্ধান্ত নেন কে, ঘুষ নেন কে, ফাইলে স্বাক্ষর করেন কে— সাধারণত অনুসন্ধানের কেন্দ্রবিন্দুতেও থাকেন সেই কর্মকর্তাই। কিন্তু সরকারি দপ্তরের ভেতরের ক্ষমতার কাঠামো আরও জটিল। অনেক ক্ষেত্রে দৃশ্যমান ক্ষমতা থাকে কর্মকর্তার হাতে, অথচ অফিসের দৈনন্দিন অনানুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণের বড় অংশ চলে এমন কিছু কর্মচারীর মাধ্যমে, যারা বছরের পর বছর একই দপ্তরে থেকে যান।

কাস্টমস, কর, ভূমি, প্রকৌশলসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তর নিয়ে কাজ করতে গিয়ে এমন একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে— বদলি-পদায়নের নিয়মিত কাঠামোর বাইরে বা দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকা কিছু কর্মচারী কি কর্মকর্তাদের ‘অনানুষ্ঠানিক হাত’ হিসেবে কাজ করছেন?

এটি কোনো নির্দিষ্ট দপ্তর বা ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করার প্রশ্ন নয়। বরং সরকারি প্রশাসনের একটি কাঠামোগত দুর্বলতা অনুসন্ধানের বিষয়।

কর্মকর্তার বদলি হয়, কর্মীর থেকে যাওয়া

সরকারি প্রশাসনে বদলি-পদায়ন একটি স্বাভাবিক ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়া। কাস্টমস ও ভ্যাট প্রশাসনের ক্ষেত্রেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রকাশিত তথ্য দেখায় যে কমিশনার, অতিরিক্ত কমিশনার, যুগ্ম কমিশনার, উপকমিশনার, সহকারী কমিশনার, রাজস্ব কর্মকর্তা ও সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তাদের নিয়মিত বদলি-পদায়নের আদেশ জারি হয়। ২০২৬ সালেও এমন একাধিক বদলি-পদায়নের আদেশ প্রকাশ হয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে— একই অফিসের সব স্তরের কর্মীদের কি একই ধরনের রোটেশনের আওতায় আনা হয়?

যদি কোনো কর্মকর্তা কয়েক মাস বা কয়েক বছর পর বদলি হয়ে যান, অথচ তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা কোনো নিম্নপদস্থ কর্মচারী বছরের পর বছর একই ডেস্ক, একই শাখা, একই ব্যবসায়ী গোষ্ঠী বা একই স্থানীয় নেটওয়ার্কের সঙ্গে থেকে যান, তাহলে সেখানে একটি ভিন্ন ধরনের ক্ষমতার কাঠামো তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

এই ঝুঁকিটিই অনুসন্ধানের বিষয়।

‘অফিসের লোক’ থেকে ‘অফিসের ক্ষমতা’

সরকারি অফিসে দীর্ঘদিন কর্মরত একজন কর্মচারী স্বাভাবিকভাবেই অফিসের প্রক্রিয়া, ফাইলের গতিপথ, কর্মকর্তাদের কাজের ধরন এবং সংশ্লিষ্ট সেবাগ্রহীতাদের সম্পর্কে বেশি জানেন।

এই অভিজ্ঞতা প্রশাসনের জন্য সম্পদ হতে পারে।

কিন্তু একই অভিজ্ঞতা যদি যথাযথ জবাবদিহি ছাড়া দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন সেটি ক্ষমতার বিকল্প উৎসেও পরিণত হতে পারে।

তখন নতুন কর্মকর্তা অফিসে যোগ দিয়ে দেখেন— কে কোন ফাইল কোথায় যায় জানে, কোন ব্যবসায়ী কার সঙ্গে যোগাযোগ করে জানে, কোন কাজ দ্রুত হয় এবং কোন কাজ আটকে থাকে জানে, এমনকি অফিসের ভেতরে কার সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ করতে হবে তাও জানে একজন নিম্নপদস্থ কর্মচারী।

কর্তা বদলি হন, কিন্তু ‘সিস্টেমের মানুষ’ থেকে যান।

এখানেই তৈরি হতে পারে অনানুষ্ঠানিক ক্ষমতার একটি স্তর।

কাস্টমসে ইন্সপেক্টর বা সেপাই— কেন গুরুত্বপূর্ণ?

কাস্টমসের মতো দপ্তরে মাঠপর্যায়ের কাজের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কর্মীদের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নিজস্ব নথিতেও কাস্টমস কর্মকর্তাদের কাজের মধ্যে পণ্য পরিদর্শন, মূল্যায়ন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও কাস্টমস প্রক্রিয়ার মতো বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ফলে একজন নিম্নপদস্থ কর্মচারীকে কেবল ‘ছোট কর্মচারী’ হিসেবে দেখলে বাস্তব প্রশাসনিক ক্ষমতার চিত্রটি ধরা পড়ে না।

যদি কোনো ইন্সপেক্টর, সেপাই বা অনুরূপ কর্মী দীর্ঘদিন একই স্থানে থেকে যান, তাহলে অনুসন্ধানের প্রশ্ন হওয়া উচিৎ—

  • তিনি কত বছর ধরে একই কর্মস্থলে আছেন?
  • এর মধ্যে কতবার বদলি হয়েছেন?
  • তার বদলি হলে কোন দপ্তরে যাওয়ার কথা?
  • বাস্তবে তিনি কোন কর্মকর্তা বা কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত কাজ করেন?
  • তার দায়িত্ব লিখিতভাবে কী?
  • বাস্তবে তিনি কী কী কাজ করেন?
  • তার সঙ্গে সিএন্ডএফ এজেন্ট, আমদানিকারক, ঠিকাদার বা স্থানীয় দালালদের যোগাযোগের ধরন কী?
  • তার বিরুদ্ধে কখনো অভিযোগ উঠেছে কি না?
  • অভিযোগ উঠলে তদন্ত হয়েছে কি না?
  • একই কর্মকর্তার বদলির পরও তিনি কীভাবে একই নেটওয়ার্কের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যান?

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: নির্দেশটি আসে কোথা থেকে?

অনুসন্ধানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা এখানেই।

কোনো অনিয়মের ঘটনায় শুধু ‘কে টাকা নিল’ প্রশ্ন করলে পুরো চিত্র পাওয়া যায় না।

প্রশ্ন করতে হবে—

কে নির্দেশ দিলেন?
কে নির্দেশটি বাস্তবায়ন করলেন?
কে সুবিধা পেলেন?
আর কে সামনে থেকে কাজটি করলেন?

যদি কোনো কর্মকর্তা সরাসরি কোনো অনিয়মে যুক্ত না থেকে একজন নিম্নপদস্থ কর্মচারীর মাধ্যমে কাজ করান, তাহলে তদন্তে শুধু অর্থের লেনদেন নয়, যোগাযোগের চেইন বের করা জরুরি।

কারণ একজন কর্মকর্তা বদলি হয়ে গেলে তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীটি যদি একই জায়গায় থেকে যান, তাহলে পুরোনো যোগাযোগের নেটওয়ার্ক নতুন কর্মকর্তার সময়েও সক্রিয় থাকার সম্ভাবনা তৈরি হয়।

এটি প্রমাণিত দুর্নীতির অভিযোগ নয়; বরং প্রশাসনিক ঝুঁকির একটি সম্ভাব্য কাঠামো, যা তথ্য দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।

‘বদলি-ভয়’ কি জবাবদিহির বিকল্প হতে পারে?

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে।

সরকারি চাকরিতে আচরণবিধি এবং শৃঙ্খলা ও আপিলের বিধান প্রযোজ্য। অসদাচরণের জন্য শাস্তির ব্যবস্থাও রয়েছে। অর্থাৎ কোনো সরকারি কর্মচারীকে আইনগতভাবে ‘জবাবদিহির বাইরে’ বলা যাবে না।

কিন্তু বাস্তব অনুসন্ধানের প্রশ্ন হলো— আইনগত জবাবদিহি থাকা আর কার্যকর জবাবদিহি থাকা কি একই বিষয়?

একজন কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগের পর তদন্ত, বিভাগীয় ব্যবস্থা, বদলি বা শাস্তির প্রক্রিয়া বাস্তবে কতটা কার্যকর— সেটিই পরিমাপের বিষয়।

বিশেষ করে যারা দীর্ঘদিন একই জায়গায় কর্মরত, তাদের ক্ষেত্রে নিয়মিত রোটেশন, দায়িত্বের পরিবর্তন, সম্পদ ও জীবনযাপনের সামঞ্জস্য পরীক্ষা এবং অভিযোগের ইতিহাস পর্যালোচনা করা হচ্ছে কি না— এগুলো গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

‘অফিসের লোক’ দিয়ে অফিস চালানোর অভিযোগ

এই অনুসন্ধানে আরও একটি অভিযোগ যাচাই করা প্রয়োজন— কিছু ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিজেদের সরাসরি যোগাযোগ কমিয়ে একজন বিশ্বস্ত নিম্নপদস্থ কর্মচারীকে ‘যোগাযোগের মাধ্যম’ হিসেবে ব্যবহার করেন।

ফলে বাইরে থেকে মনে হয়, কর্মকর্তার সঙ্গে অনিয়মের কোনো সম্পর্ক নেই।

কিন্তু অফিসের ভেতরে সবাই জানে— কোন নির্দেশ কোথা থেকে এসেছে।

যদি এমন কোনো ব্যবস্থা সত্যিই কোথাও প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে, তাহলে সেটি ব্যক্তিগত দুর্নীতির চেয়েও বড় সমস্যা। কারণ এখানে তৈরি হয় একটি প্রক্সি প্রশাসন— যেখানে সিদ্ধান্তের দৃশ্যমান স্বাক্ষর থাকে এক ব্যক্তির, বাস্তবায়নের ক্ষমতা থাকে অন্যের হাতে, আর সুবিধা যায় তৃতীয় পক্ষের কাছে।

অনুসন্ধানে যে তথ্যগুলো বের করা দরকার

এই প্রতিবেদনের পরবর্তী ধাপে কয়েকটি দপ্তরের গত ৫-১০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করা হবে।

প্রথমত: নির্দিষ্ট পদে কর্মরত কর্মচারীদের নাম, যোগদানের তারিখ ও বর্তমান কর্মস্থল।

দ্বিতীয়ত: গত কয়েক বছরে তাদের বদলি-পদায়নের ইতিহাস।

তৃতীয়ত: একই কর্মস্থলে অস্বাভাবিক দীর্ঘ সময় অবস্থানকারী কর্মীদের তালিকা।

চতুর্থত: তাদের দায়িত্ব ও বাস্তব কাজের মধ্যে কোনো পার্থক্য আছে কি না।

পঞ্চমত: অভিযোগ, বিভাগীয় মামলা, তদন্ত, শাস্তি কিংবা অভিযোগ নিষ্পত্তির তথ্য।

ষষ্ঠত: সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বদলি হওয়ার পরও একই কর্মচারী একই জায়গায় থেকে গেলে তার সঙ্গে আগের কর্মকর্তার যোগাযোগ অব্যাহত ছিল কি না।

সপ্তমত: সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের সম্পদ বিবরণী, জীবনযাত্রা ও আয়ের সঙ্গে দৃশ্যমান সম্পদের সামঞ্জস্য— আইনসম্মত উপায়ে যতটুকু যাচাই করা যায়।

কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ?

সরকারি দুর্নীতিকে শুধু ‘দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা বনাম সাধারণ মানুষ’ হিসেবে দেখলে প্রশাসনের ভেতরের প্রকৃত নেটওয়ার্কটি অদৃশ্য থেকে যায়।

একটি অফিসে কর্মকর্তা বদলি হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু যদি অফিসের অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক একই থেকে যায়, তাহলে শুধু কর্মকর্তাকে বদলি করে কাঙ্ক্ষিত ফল নাও আসতে পারে।

তাই প্রশ্নটি হওয়া উচিৎ—

আমরা কি শুধু কর্মকর্তাদের বদলি করছি, নাকি অফিসের ক্ষমতার নেটওয়ার্কও বদলাচ্ছি?

কারণ দুর্নীতি যদি ব্যক্তির চেয়ে বেশি করে একটি নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে একজন কর্মকর্তাকে সরিয়ে আরেকজন কর্মকর্তাকে বসানো সমস্যার সমাধান করবে না।

অনুসন্ধানের পরবর্তী ধাপ

FollowUpNews-এর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তর— কাস্টমস, আয়কর, ভূমি এবং প্রকৌশল দপ্তর—নিয়ে তুলনামূলক কেস স্টাডি করা হচ্ছে।

প্রতিটি দপ্তরে নির্দিষ্ট সংখ্যক কর্মচারীর—

পদ → যোগদানের তারিখ → বর্তমান কর্মস্থল → বদলির ইতিহাস → দায়িত্ব → অভিযোগ → বিভাগীয় ব্যবস্থা → সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা → সম্ভাব্য বেসরকারি যোগাযোগ

এই তথ্যগুলো পাশাপাশি রেখে একটি ‘প্রশাসনিক নেটওয়ার্ক ম্যাপ’ তৈরি করা হলে দেখা যেতে পারে, কোথাও দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের অনানুষ্ঠানিক ক্ষমতার কাঠামো গড়ে উঠেছে কি না।

এটি কোনো ব্যক্তিবিশেষকে অপরাধী প্রমাণের অনুসন্ধান নয়।

বরং প্রশ্নটি আরও বড়—

সরকারি অফিসে সিদ্ধান্তের ক্ষমতা কি শুধু নথিতে থাকে, নাকি নথির আড়ালে আরও একটি অদৃশ্য প্রশাসন কাজ করে?

এই প্রশ্নের উত্তর বের করতে হলে কর্মকর্তাদের পাশাপাশি সেই কর্মচারীদের দিকেও তাকাতে হবে, যারা বদলি হওয়া কর্মকর্তাদের পরেও একই জায়গায় থেকে যান এবং অফিসের স্মৃতি, যোগাযোগ ও অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক ধরে রাখেন।

কারণ অনেক সময় দুর্নীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্রটি ফাইলের স্বাক্ষরে নয়— ফাইলটি কে চালায়, কার মাধ্যমে চালায় এবং কে বছরের পর বছর একই জায়গায় থেকে সেই পথটি চেনে— সেখানে লুকিয়ে থাকে।