Headlines

মাঠপর্যায়ের ভ্যাট থেকে বন্ড কমপ্লায়েন্স: রাজস্ব কর্মকর্তা পপি রাণী সাহার পেশাগত যাত্রা ও সম্পদ ঘিরে বিতর্ক

পপি রাণী সহাবিশেষ প্রতিবেদক • ঢাকা


দেশের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি সচল রাখতে রাজস্ব আহরণের ভূমিকা অপরিসীম। আর এই রাজস্ব আদায়ের অগ্রভাগে থেকে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট অনুবিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা। তেমনই একজন কর্মকর্তা পপি রাণী সাহা। বর্তমানে তিনি ঢাকা উত্তর কাস্টমস্ বন্ড কমিশনারেটে রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও দায়িত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। মাঠপর্যায়ের জটিল ভ্যাট আদায় থেকে শুরু করে করপোরেট বন্ড কমপ্লায়েন্স এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় তার কর্মজীবনের যেমন নানা বাঁক রয়েছে, ঠিক তেমনি ভ্যাট ও বন্ড দপ্তরে দায়িত্ব পালনকালে বিপুল অর্থ-সম্পদ অর্জনের অভিযোগ এবং ২৪-এর আগস্টে তার বিদেশ সফর ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা নেতিবাচক আলোচনা।
২০১৪ সালের মে মাসে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট বিভাগে যোগদানের মাধ্যমে পপি রাণী সাহার পেশাগত যাত্রা শুরু হয়। কর্মজীবনের শুরুর দিকে তিনি কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, ঢাকা (দক্ষিণ)-এর অধীনে অত্যন্ত ব্যস্ত ও বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সার্কেলগুলোতে দায়িত্ব পালন করেন।
তিনি চকবাজার সার্কেল (সেগুনবাগিচা বিভাগ), ফার্মগেট সার্কেল (তেজগাঁও বিভাগ) এবং রামপুরা সার্কেলে (মতিঝিল বিভাগ) মাঠপর্যায়ে সরাসরি ভ্যাট আদায়ের কাজ করেন। চকবাজারের মতো ঐতিহ্যবাহী ও জটিল বাণিজ্যিক এলাকায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ভ্যাট আদায় এবং ফার্মগেটের মতো করপোরেট হাবগুলোতে দায়িত্ব পালন তার পেশাগত ভিতকে মজবুত করে। মাঠপর্যায়ের এই চ্যালেঞ্জগুলো তাকে সরাসরি ব্যবসায়ী ও অংশীজনদের মনস্তত্ত্ব বুঝতে এবং রাজস্ব আইন প্রয়োগের ব্যবহারিক দিকগুলো শিখতে সাহায্য করেছে।

বদলি আদেশ
পপি রাণী সাহার নিমিত্তে একটি বদলি আদেশ।
মাঠপর্যায়ের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার পর পপি রাণী সাহার কর্মজীবনে একটি বড় পরিবর্তন আসে, যখন তিনি কাস্টমস রিস্ক ম্যানেজমেন্ট কমিশনারেট, ঢাকা-এ স্থানান্তরিত হন। এটি প্রথাগত মাঠপর্যায়ের কাজের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং আধুনিক ডাটা-চালিত ও কৌশলগত একটি দপ্তর।
এখানে কর্মরত থাকাকালীন তিনি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সচল রাখা, আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে ঝুঁকি নিরূপণ এবং শুল্ক ফাঁকি রোধে আধুনিক অডিট ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কৌশলের সঙ্গে যুক্ত হন। মাঠপর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে এই প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমন্বয় তাকে একজন পরিপক্ক রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে গড়ে তোলে। পরবর্তীতে কাস্টমস ও ভ্যাট অনুবিভাগের দাপ্তরিক গেজেট অনুযায়ী তিনি পদোন্নতি লাভ করে গ্রেড-৯ ভুক্ত রাজস্ব কর্মকর্তা পদে উন্নীত হন।
উত্তরা
কাস্টমস্ বন্ড কমিশনারেট, ঢাকা (উত্তর), কর্মবণ্টন আদেশ।

👁️ বন্ড কমিশনারেটের দায়িত্ব, আকস্মিক সফর ও নেতিবাচক আলোচনা
বর্তমানে পপি রাণী সাহা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, ঢাকা (উত্তর)-এ রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত আছেন। দেশের রপ্তানিমুখী শিল্প, বিশেষ করে তৈরি পোশাক (RMG) খাতের জন্য বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। তবে বন্ড ও ভ্যাটের মতো উচ্চ রাজস্ব ও সংবেদনশীল দপ্তরে দীর্ঘ সময় কাটানোর কারণে তার পেশাগত জীবনের সমান্তরালে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের বিতর্ক।
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র ও অভ্যন্তরীণ পরিমণ্ডলে অভিযোগ রয়েছে, চকবাজার ও ফার্মগেটের মতো গুরুত্বপূর্ণ ভ্যাট সার্কেল এবং বন্ড কমিশনারেটে দায়িত্ব পালনকালে নিয়মের মারপ্যাঁচে তিনি বিপুল পরিমাণ অর্থ ও অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন। বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধে কঠোর ভূমিকার আড়ালে ব্যবসায়ীদের ওপর প্রচ্ছন্ন চাপ সৃষ্টি এবং অডিট কার্যক্রমে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার মতো নেতিবাচক গুঞ্জনও তার কর্মজীবনকে বিতর্কিত করেছে।
এই নেতিবাচক আলোচনার মধ্যেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাস্টমস অনুবিভাগ থেকে জারিকৃত একটি প্রজ্ঞাপন তার এই সম্পদ ও গতিবিধি নিয়ে সন্দেহ আরও বাড়িয়ে তোলে। ২০ আগস্ট ২০২৪ তারিখে (স্মারক/আদেশ নং: ৭৯৫) কাস্টমস রিস্ক ম্যানেজমেন্ট কমিশনারেটে কর্মরত থাকাকালীন তাঁর অনুকূলে একটি ‘বহিঃবাংলাদেশ ছুটি’ (Ex-Bangladesh Leave) মঞ্জুর করা হয়। দেশের এক সংবেদনশীল রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ঠিক পরমুহূর্তে তড়িঘড়ি করে নেওয়া এই বিদেশ সফরের গন্তব্য ও উদ্দেশ্য দাপ্তরিকভাবে আড়ালে রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে, এই ছুটির আড়ালে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার বা সম্পদ স্থানান্তরের (Money Laundering) কোনো গোপন যোগসূত্র রয়েছে কি না।
রাজস্ব প্রশাসনের মতো একটি জটিল ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জিং পরিমণ্ডলে পপি রাণী সাহার মাঠপর্যায়ের কঠোর পরিশ্রম থেকে শুরু করে বর্তমানের পলিসি ও কমপ্লায়েন্স-ভিত্তিক ডেস্কে তার সফল রূপান্তর তখনই অর্থবহ হবে, যখন তিনি তার বিরুদ্ধে ওঠা এই নেতিবাচক আলোচনা এবং ২০ আগস্টের রহস্যময় ছুটির সপক্ষে শতভাগ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রমাণ করতে পারবেন। অন্যথায়, কাস্টমস ও বন্ডের মতো স্পর্শকাতর বিভাগে তার এই দ্রুত উত্থান ও বিপুল সম্পদ অর্জন রাজস্ব বিভাগের সামগ্রিক স্বচ্ছতাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাবে।