সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে একটি অদ্ভুত ও আত্মঘাতী প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির দেয়ালে বা দেশের কোনো সাংস্কৃতিক মঞ্চে যখন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, সত্যজিৎ রায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কিংবা এরকম কারো ছবি বা ম্যুরাল আঁকা হয়, তখন সমাজের একটি নির্দিষ্ট অংশ একে “ভারতীয় আধিপত্যবাদ” বা “আগ্রাসনের প্রতীক” হিসেবে প্রচার করার চেষ্টা করে। যে কোনো আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সচেতনতা থাকা প্রশংসনীয়, কিন্তু শিল্প, সাহিত্য এবং সমাজসংস্কারের বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক আইকনদের স্রেফ একটি রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সীমানা দিয়ে বিচার করা গভীর ঐতিহাসিক অজ্ঞতা এবং শেকড়হীনতারই বহিঃপ্রকাশ।
দীর্ঘদিনে অনলাইনে এ ধরনের ভ্রান্ত চিন্তা এবং সাম্প্রদায়িকতা প্রচার করছে জনৈক এই ব্যক্তি।
জ্ঞানালোক ও শিল্পের কোনো কাঁটাতার হয় না
যারা বিদ্যাসাগর কিংবা সত্যজিৎ রায়কে “ভারতীয়” আখ্যা দিয়ে বর্জন করতে চান, তারা একটি প্রাথমিক ঐতিহাসিক সত্য ভুলে যান— আজকের “ভারত প্রজাতন্ত্র” (Republic of India) নামক রাষ্ট্রটির জন্ম ১৯৪৭ সালে। কিন্তু বিদ্যাসাগরের জন্ম ১৮২০ সালে এবং তিনি কাজ করেছেন অবিভক্ত বাংলায়, যার কেন্দ্র ছিল কলকাতা। আজকের বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের মানুষের যৌথ পূর্বপুরুষদের সমাজকে কুসংস্কার, বাল্যবিয়ে এবং শিক্ষার অন্ধকার থেকে মুক্ত করার প্রধান কারিগর ছিলেন বিদ্যাসাগর। তিনি কোনো নির্দিষ্ট আধুনিক রাষ্ট্রের সম্পত্তি নন; তিনি বাংলা ভাষা, বর্ণমালা এবং বাঙালি নবজাগরণের (Bengal Renaissance) জনক।
একই কথা খাটে সত্যজিৎ রায়ের ক্ষেত্রেও। সত্যজিৎ রায় বিশ্বচলচ্চিত্রের এমন এক মহীরুহ, যার পৈতৃক শেকড় বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জের মসূয়া গ্রামে। তার ‘পথের পাঁচালী’ কিংবা ‘অপু ট্রিলজি’ কোনো ভারতীয় রাষ্ট্রীয় প্রচারণামূলক চলচ্চিত্র ছিল না; তা ছিল এই গাঙ্গেয় বদ্বীপের মানুষের অতি সাধারণ, চিরন্তন জীবন সংগ্রামের নিখুঁত দৃশ্যকাব্য। তাকে ‘ভারতীয়’ বলে বর্জন করার অর্থ হলো নিজের সংস্কৃতির একটি উজ্জ্বলতম অংশকে স্বেচ্ছায় কেটে ফেলা।
মধ্য এশিয়ার মুসলিম দেশ বনাম ভারতীয় উপমহাদেশের মনস্তত্ত্ব
রাশিয়া ভেঙে যে মধ্য এশিয়ার মুসলিম দেশগুলো (যেমন কাজাখস্তান, উজবেকিস্তান, কিরগিজস্তান) তৈরি হয়েছে, তাদের ইতিহাস এবং আমাদের ইতিহাসের দিকে তাকালে এই অজ্ঞতার গভীরতা স্পষ্ট হয়। উজবেকিস্তানের মানুষ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও তারা তাদের প্রাক-ইসলামিক তুর্কি ও যাযাবর (Nomadic) ঐতিহ্যকে পরম যত্নে ধরে রেখেছে। তারা তাদের আদি কবি বা বীরদের (যারা হয়তো আধুনিক ভৌগোলিক সীমানার বাইরে জন্মেছিলেন) নিজেদের শেকড় মনে করে গর্ব করে। তারা ঐতিহ্যকে ধর্মের চশমা দিয়ে দেখে না।
এর বিপরীতে, ভারতীয় উপমহাদেশের (বিশেষ করে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের একটি অংশের) মুসলিমদের মধ্যে একটি তীব্র পরিচয়-সংকট বা ‘আইডেন্টিটি ক্রাইসিস’ কাজ করে। এই মনস্তত্ত্বের মূল কথা হলো— “আমি যেহেতু মুসলিম, তাই অমুসলিম বা হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতের অবদানের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে না।” এই হীনম্মন্যতা থেকেই তারা নিজেদের হাজার বছরের আদি বাঙালি বা দেশীয় শেকড়কে “হিন্দুয়ানি” বা “ভারতীয় আধিপত্যবাদ” বলে ভুল করতে শুরু করে এবং এর বিপরীতে একটি কৃত্রিম আরবীয় বা মধ্যপ্রাচ্যের সংস্কৃতিকে নিজেদের খাঁটি পরিচয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
আধিপত্যবাদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংজ্ঞার বিভ্রান্তি
একটি দেশের অর্থনৈতিক, সীমান্ত বা রাজনৈতিক নীতিতে আধিপত্যবাদ থাকতে পারে, এবং স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের নাগরিকরা তার তীব্র বিরোধিতা করার পূর্ণ অধিকার রাখেন। কিন্তু রাজনৈতিক আধিপত্যবাদের বিরোধিতাকে যখন অন্ধভাবে সংস্কৃতির ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন তা ‘অজ্ঞতা’য় রূপ নেয়।
উইলিয়াম শেকসপিয়রকে সম্মান জানালে কেউ ব্রিটিশ উপনিবেশবাদকে সমর্থন করে না; কার্ল মার্ক্সকে পড়লে কেউ জার্মানির আধিপত্য মেনে নেয় না। ঠিক তেমনি, শিল্পকলা একাডেমির দেয়ালে বিদ্যাসাগর বা সত্যজিৎ রায়ের ছবি থাকা মানে ভারতের দিল্লির রাজনৈতিক আধিপত্য মেনে নেওয়া নয়। বরং এর মানে হলো— বাঙালি জাতি হিসেবে আমরা আমাদের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছি, যারা এই অঞ্চলের মানুষের চিন্তার জগতকে আধুনিক ও সমৃদ্ধ করেছিলেন।
সাবেক প্রেস সচিবও তার মনস্তত্ত্ব গোপন রাখা আর জরুরী মনে করেননি।
বিদ্যাসাগর বা সত্যজিৎ রায়কে ‘ভারতীয়’ বলে গালি দেওয়া কিংবা মুছে ফেলার চেষ্টা আসলে এক ধরনের সাংস্কৃতিক আত্মহনন। এটি করার মাধ্যমে আমরা ভারতকে প্রতিরোধ করছি না, বরং নিজেদের ইতিহাসকে ছোট করছি এবং এক ধরনের কৃত্রিম, শেকড়হীন পরিচয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছি। একটি আত্মমর্যাদাশীল জাতি কখনো তার ইতিহাসের আলো কাড়নেওয়ালা মানুষদের বর্জন করে না। শিল্পকলা একাডেমির দেয়ালগুলো কোনো সংকীর্ণ রাজনৈতিক সীমানার দাস নয়; তা হওয়া উচিত মুক্তচিন্তা, ধ্রুপদী শিল্প এবং আমাদের যৌথ ইতিহাসের স্মারক।।