পানি উন্নয়ন বোর্ডের ১০ বছরের প্রকল্পের হিসাব: সৈকত থেকে নাফ নদী, শাহপরীর দ্বীপ থেকে কুতুবদিয়া–মহেশখালী; বারবার মেরামত, নতুন প্রকল্প ও ব্যয়ের পরও কেন কাটছে না ঝুঁকি?
নিজস্ব প্রতিবেদক, কক্সবাজার
কক্সবাজারকে ঘিরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কাজের পরিধি শুধু সমুদ্রসৈকতে সীমাবদ্ধ নয়। নাফ নদীর তীরের পোল্ডার, টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ, উখিয়া, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, চকরিয়া, বাখখালী নদী থেকে কক্সবাজার শহরের সৈকত— পুরো জেলাজুড়েই বছরের পর বছর চলছে বাঁধ নির্মাণ, পুনর্বাসন, নদী-খাল খনন, তীর সংরক্ষণ ও জরুরি প্রতিরক্ষা কাজ।
সরকারি নথি বলছে, কক্সবাজারে আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে ২২টি পোল্ডার, প্রায় ৫৫৫ কিলোমিটার বাঁধ এবং ২৪১টি পানি নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছিল। পাউবোর নিজস্ব মূল্যায়নেই বলা হয়েছে, এসব অবকাঠামোর অধিকাংশের নকশাগত মেয়াদ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে এবং অধিকাংশের পুনর্বাসন প্রয়োজন।
অর্থাৎ, কক্সবাজারের উপকূল রক্ষার সংকট নতুন নয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে— গত এক দশকে একের পর এক প্রকল্প, শত শত কোটি টাকার বরাদ্দ ও পুনর্বাসন কাজের পরও কেন প্রায় প্রতিবছর একই বাঁধ, একই পোল্ডার ও একই উপকূলীয় এলাকা আবার ঝুঁকিতে পড়ে?
নাফ নদীর পোল্ডারেই ৪১৫ কোটি টাকার চলমান প্রকল্প
কক্সবাজারের সবচেয়ে বড় চলমান কাজগুলোর একটি উখিয়া ও টেকনাফের নাফ নদীঘেঁষা পোল্ডার ৬৭/এ, ৬৭, ৬৭/বি ও ৬৮ পুনর্বাসন প্রকল্প।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বর্তমান প্রকল্পতালিকায় এ প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয় ৪১৫ কোটি ৫৮ লাখ ৫ হাজার টাকা এবং এ পর্যন্ত ক্রমপুঞ্জিত ব্যয় ২২২ কোটি ৫৭ লাখ ২ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে। প্রকল্পটির মেয়াদ জুন ২০২৭ পর্যন্ত।
পরিকল্পনা কমিশনের নথিতে এর প্রথম সংশোধিত ব্যয় ছিল প্রায় ৩৬৮ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। প্রকল্পটির আওতায় সীমান্তবর্তী এলাকায় বাঁধ, পানি নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো, খাল খনন ও অন্যান্য কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এই একটি প্রকল্পের মধ্যেই রয়েছে অসংখ্য প্যাকেজ। ২০২৩ সালের একটি প্যাকেজে পোল্ডার ৬৭/এ ও ৬৭/এ এক্সটেনশনের পালংখালী ও বালুখালী খালের দুই তীরে ১০ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণের দরপত্র আহ্বান করা হয়। প্যাকেজ নম্বর COX-MP-W-07 এবং প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল প্রায় ১৩ কোটি ৫ লাখ ৫৮ হাজার টাকা।
একই প্রকল্পের আওতায় পোল্ডার ৬৮-তে দক্ষিণ কোনারপাড়ায় রেগুলেটর নির্মাণ, পোল্ডার ৬৭/এ এক্সটেনশনে সেতু নির্মাণ এবং পোল্ডার ৬৭, ৬৭/বি ও ৬৮-তে একাধিক রেগুলেটর নির্মাণের দরপত্র হয়েছে। এসব কাজের অনেকগুলোই ওপেন টেন্ডারিং মেথডে নেওয়া হয়েছে।
কিন্তু ঠিকাদার কারা?
পাউবোর প্রকাশিত টেন্ডার নোটিশে প্যাকেজ, কাজের পরিমাণ, প্রাক্কলিত ব্যয় ও দরপত্রের তারিখ পাওয়া গেলেও সব প্যাকেজের Notification of Award (NOA), চুক্তিপত্র ও কার্যাদেশপ্রাপ্ত ঠিকাদারের নাম একই জায়গায় প্রকাশিত নেই।
অর্থাৎ, COX-MP-W-07, COX-MP-W-21/L-01, COX-MP-W-21/L-02, COX-MP-W-21/L-03, COX-MP-W-22/L-01, COX-MP-W-22/L-02সহ প্রতিটি প্যাকেজের NOA ও Contract Agreement সংগ্রহ করে ঠিকাদার, চুক্তিমূল্য, কাজ শুরুর তারিখ, শেষ করার সময় এবং বাস্তব অগ্রগতি মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
শাহপরীর দ্বীপে ১০৬ কোটি, এরপরও ভাঙন
টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের পোল্ডার ৬৮-ও দীর্ঘদিন ধরে পাউবোর বড় ব্যয়ের কেন্দ্র।
সমসাময়িক সরকারি/সংবাদ নথিতে শাহপরীর দ্বীপের সী-ডাইক পুনর্নির্মাণ ও প্রতিরক্ষা কাজের ব্যয় ১০৬ কোটি ১৬ লাখ টাকা বলা হয়েছিল। প্রকল্পটির লক্ষ্য ছিল জোয়ার-জলোচ্ছ্বাস থেকে দ্বীপের জনবসতি, কৃষিজমি ও অবকাঠামো রক্ষা করা।
পাউবোর নিজস্ব প্রকল্প আর্কাইভেও শাহপরীর দ্বীপ পোল্ডার ৬৮-এর সী-ডাইক অংশে বাঁধ পুনর্নির্মাণ ও প্রতিরক্ষা কাজের প্রকল্প রয়েছে।
কিন্তু বড় প্রশ্ন হলো— প্রকল্প শেষ হওয়ার পরও কেন একই বাঁধের বিভিন্ন অংশে নতুন করে জিওব্যাগ, সিসি ব্লক ও প্রতিরক্ষা কাজ করতে হচ্ছে?
২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে শাহপরীর দ্বীপের সিসি ব্লক খুলে পড়া এবং জোয়ারের পানি বাঁধ উপচে লোকালয়ে ঢোকার তথ্য উঠে আসে। তখন পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে আসিফ আহমেদ ক্ষতিগ্রস্ত অংশে পুনরায় কাজের কথা জানিয়েছিলেন।
আর ২০২৫ সালে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে শাহপরীর দ্বীপের বাঁধে জিওব্যাগ বসানোর প্রায় ১ কোটি ৫২ লাখ টাকার দুটি প্যাকেজ নিয়ে ঠিকাদার ও প্রকৌশলীর সম্পর্কের অভিযোগ তোলা হয়। প্রতিবেদনে ঠিকাদার হিসেবে আলমগীর হোসাইন এবং তার প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড ব্রাদার্স-এর নাম এসেছে। অভিযোগ ছিল, নির্ধারিত সময়ে কাজ শুরু হলেও মাঠে ঠিকাদারের উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন ছিল।
কুতুবদিয়ায় পুরোনো বাঁধ, নতুন করে ৮০০ কোটি
কক্সবাজারের কুতুবদিয়াতেও একই ধরনের চিত্র।
দ্বীপটির বাঁধের বিভিন্ন অংশ দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ। পাউবোর নথিতে পোল্ডার ৭১-সহ কুতুবদিয়ার বাঁধ পুনর্বাসনের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে পাউবোর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় জলবায়ু-সহনশীল সুপার ডাইক নির্মাণের বিষয়টি রয়েছে।
আর ২০২৫–২৬ অর্থবছরের আরএডিপিতে কুতুবদিয়ার পোল্ডার ২৯১-এ সুপার ডাইক নির্মাণসহ টেকসই পানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনা প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে। এর প্রাক্কলিত ব্যয় ৮০০ কোটি টাকা এবং বাস্তবায়নকাল নভেম্বর ২০২৫ থেকে জুন ২০২৯।
অর্থাৎ পুরোনো বাঁধের সংস্কার, জরুরি প্রতিরক্ষা ও নতুন সুপার ডাইক— সব মিলিয়ে কুতুবদিয়া আগামী কয়েক বছরও বড় অঙ্কের পানি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় থাকবে।
মহেশখালীতেও শত শত কোটি টাকার নতুন পরিকল্পনা
মহেশখালীর মিঠি এলাকায় পোল্ডার ২৭-এ সুপার ডাইক নির্মাণ ও পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনার টেকসই উন্নয়ন প্রকল্পও নেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের বৈদেশিক অর্থায়নসংক্রান্ত নথিতে প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ৩৮২ কোটি ২৯ লাখ ৮০ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে। একই নথিতে সংশোধিত/বৈদেশিক অর্থায়নভিত্তিক ব্যয়ের অঙ্ক ৫৭০ কোটি ৩৮ লাখ টাকার বেশি দেখানো হয়েছে। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল জুলাই ২০২৫ থেকে জুন ২০২৯।
কিন্তু মাঠের বাস্তবতা আবারও প্রশ্ন তুলছে।
২০২৫ সালের জুনে গভীর নিম্নচাপের জলোচ্ছ্বাসে মহেশখালী, কুতুবদিয়া ও চকরিয়ার ভারুয়াখালী এলাকায় মোট ১ হাজার ৭০০ মিটার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা জানায় পাউবো। এর মধ্যে মহেশখালীতে ৯০৫ মিটার, কুতুবদিয়ায় ৬৯৫ মিটার এবং ভারুয়াখালীতে ১০০ মিটার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
২০২৬ সালেও মহেশখালীর মাতারবাড়ির পশ্চিম উপকূলীয় বাঁধের বড় অংশকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে স্থানীয় ও সংবাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম জানিয়েছেন, মাতারবাড়ি ও ধলঘাটার মোট ৩২ কিলোমিটার বাঁধের প্রায় ৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার চরম ঝুঁকিতে রয়েছে।
সৈকতের জন্য এবার ৬২৪ কোটি ৬৬ লাখ
কক্সবাজার শহর ও সমুদ্রসৈকত রক্ষায় সবচেয়ে আলোচিত নতুন প্রকল্পটি হলো— ‘কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের ভাঙন হতে কক্সবাজার শহর রক্ষা প্রকল্প’।
পরিকল্পনা কমিশনের নথি অনুযায়ী, নাজিরারটেক থেকে লাবণী পয়েন্ট পর্যন্ত ৬ কিলোমিটার উপকূলীয় প্রতিরক্ষা কাজ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ডিপিপি ২০২৫ সালের ১১ আগস্ট পাউবোতে দাখিল করা হয়। লক্ষ্য হলো সৈকত, কক্সবাজার শহরের উত্তর-পশ্চিম অংশ, বিমানবাহিনীর ঘাঁটি, সরকারি মোটেল, শেখ কামাল স্টেডিয়াম, টুরিস্ট পুলিশ কার্যালয়সহ বিভিন্ন স্থাপনা রক্ষা করা।
প্রস্তাবিত ব্যয় ৬২৪ কোটি ৬৬ লাখ ২৬ হাজার টাকা। পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম এ প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন।
প্রশ্ন হলো— সৈকতের ভাঙন ঠেকাতে এর আগে যেসব জরুরি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, সেগুলো কতটা কার্যকর ছিল?
২০২২ সালে লাবণী থেকে সামিতিপাড়া পর্যন্ত ভাঙন মোকাবেলায় জিওব্যাগ/জিওটিউব বসানো হয়েছিল। ব্যয়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ৬৮ লাখ টাকা। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এসব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত বা বিলীন হয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। ২০২৪–২৫ সালেও লাবণী, সুগন্ধা, কলাতলীসহ বিভিন্ন অংশে ভাঙন অব্যাহত থাকার খবর প্রকাশিত হয়েছে।
অর্থাৎ ৬৮ লাখ টাকার জরুরি প্রতিরক্ষা থেকে এখন ৬২৪ কোটি টাকার স্থায়ী প্রতিরক্ষা প্রকল্পের প্রস্তাব— এই দুই পর্যায়ের নকশা, ব্যয়, কার্যকারিতা ও ব্যর্থতার কারণও অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বাখখালী নদী ও শহরের নতুন প্রতিরক্ষা
কক্সবাজার শহরের পানি নিষ্কাশন ও বাখখালী নদীও পাউবোর কাজের বড় ক্ষেত্র।
পাউবোর প্রকল্প তালিকায় বাখখালী নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি নিষ্কাশন ও ড্রেজিংয়ের কাজ রয়েছে। ২০২৬ সালের নতুন টেন্ডারে বাখখালী নদীর বাম তীরে রুমালিয়ারছড়ায় ২২০ মিটার তীর সংরক্ষণ কাজের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
অর্থাৎ একদিকে শহর রক্ষায় ৬২৪ কোটি টাকার নতুন প্রকল্প প্রস্তাব, অন্যদিকে নদীতীর রক্ষায় আলাদা প্যাকেজ—কক্সবাজার শহরের পানি ব্যবস্থাপনা এখন একাধিক প্রকল্পের ওপর নির্ভরশীল।
চকরিয়াতেও নদীভাঙন ও জলাবদ্ধতা
চকরিয়ার মাতামুহুরী নদী ও খুতাখালী এলাকার জলাবদ্ধতা নিয়েও পাউবোর প্রকল্প রয়েছে।
এলাকাটিতে নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস ও জলাবদ্ধতার কারণে বারবার প্রতিরক্ষা কাজের প্রয়োজন হচ্ছে। ২০২৫ সালের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে সাহারবিলে মাতামুহুরী নদীর ডান তীর সংরক্ষণের ৪০ লাখ ৩৮ হাজার টাকার ৮০ মিটার কাজের কথাও উঠে আসে। একই প্রতিবেদনে ঠিকাদারি কাজ বণ্টন নিয়ে অভিযোগ করা হয়।
কর্মকর্তা বদলেছেন, প্রকল্প রয়ে গেছে
কক্সবাজার পাউবোর প্রকল্পগুলোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো— একই প্রকল্পের দীর্ঘ বাস্তবায়ন সময়ে একাধিক নির্বাহী প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক দায়িত্ব পালন করেন।
প্রকাশ্য নথি ও সংবাদ প্রতিবেদনে বিভিন্ন সময়ে যাদের দায়িত্বে থাকার তথ্য পাওয়া যায়, তাদের মধ্যে রয়েছেন—
| সময়/পর্যায় | কর্মকর্তা | যে দায়িত্বের প্রমাণ পাওয়া গেছে |
|---|---|---|
| পুরোনো সময় | মো. মঈন উদ্দিন | কক্সবাজার পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে পুরোনো দাপ্তরিক তথ্য |
| ২০২০–২০২১ | প্রবীর কুমার গোস্বামী | কক্সবাজার পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী |
| ২০২৪ পর্যায় | আসিফ আহমেদ | কক্সবাজার পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী |
| ২০২৫ পর্যায় | মো. আবু রায়হান | কক্সবাজার সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী; একটি পর্যায়ে প্রকল্প পরিচালক |
| ২০২৫–২০২৬ | মো. নুরুল ইসলাম | কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী |
২০২৩ সালের সরকারি ই-জিপি নথিতে আসিফ আহমেদকে কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে পাওয়া যায়।
বর্তমানে সরকারি ই-জিপি নথিতে মো. নুরুল ইসলামকে কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দেখানো হচ্ছে। ২০২৬ সালের একাধিক টেন্ডারেও তার নাম অনুমোদনকারী কর্মকর্তা হিসেবে রয়েছে।
২০২০–২১ সময়েও প্রবীর কুমার গোস্বামী কক্সবাজার পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন।
ঠিকাদারদের নিয়েও উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন
২০২৫ সালের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে কক্সবাজার পাউবোর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আবু রায়হানের বিরুদ্ধে পছন্দের ঠিকাদার ও আত্মীয়স্বজনকে কাজ দেওয়ার অভিযোগ প্রকাশিত হয়।
প্রতিবেদনে মোহাম্মদ তুহিন নামে এক ঠিকাদারের কথা বলা হয়েছে, যিনি নাফ প্রকল্পের একটি খাল খননের কাজের অংশ হিসেবে প্রায় ৭২ লাখ ৯০ হাজার টাকার কাজ পেয়েছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়। একই প্রতিবেদনে চকরিয়ার সাহারবিলে মাতামুহুরী নদীর তীর সংরক্ষণের ৪০ লাখ ৩৮ হাজার টাকার কাজের কথাও বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আলমগীর হোসাইন নামের ঠিকাদার ইউনাইটেড ব্রাদার্স-এর নামে শাহপরীর দ্বীপে দুটি প্যাকেজে প্রায় ১ কোটি ৫২ লাখ টাকার জিওব্যাগের কাজ পেয়েছিলেন।
এসব অভিযোগ অবশ্য সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী অস্বীকার করেছেন। তার বক্তব্য ছিল, তার কোনো ভাগনে বা নিকটাত্মীয় ঠিকাদারিতে যুক্ত নন এবং তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর কেউ দরপত্রে অংশ নিলে তা ঠেকানোর সুযোগ তার নেই।
সুতরাং অভিযোগগুলোকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে নয়, বরং টেন্ডার ও চুক্তিপত্র দিয়ে যাচাইযোগ্য অনুসন্ধানের সূত্র হিসেবে দেখা প্রয়োজন।
আসল অনুসন্ধান এখন কোথায়?
কক্সবাজারের পাউবো প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে শুধু কত টাকা বরাদ্দ হয়েছে— এটি জানলেই তদন্ত শেষ হয় না।
প্রতিটি বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে অন্তত নিচের নথিগুলো পাশাপাশি বসানো প্রয়োজন—
১. মূল DPP
প্রকল্পটি প্রথমে কত টাকায় অনুমোদিত হয়েছিল?
২. সংশোধিত DPP/RDPP
ব্যয় কতবার বেড়েছে? কেন বেড়েছে?
৩. টেন্ডার প্যাকেজ
একটি প্রকল্পে কয়টি প্যাকেজ হয়েছে?
৪. NOA ও Contract Agreement
প্রতিটি প্যাকেজে প্রকৃত ঠিকাদার কে?
৫. চুক্তিমূল্য বনাম চূড়ান্ত বিল
কাজের শেষে ঠিকাদারকে কত টাকা দেওয়া হয়েছে?
৬. Variation Order
কাজের পরিমাণ বাড়ানো বা কমানো হয়েছে কি না?
৭. Time Extension
কাজ শেষ করতে কতবার সময় বাড়ানো হয়েছে?
৮. Liquidated Damages বা জরিমানা
ঠিকাদার সময়মতো কাজ না করলে কোনো জরিমানা আদায় হয়েছে কি না?
৯. Measurement Book বা MB
কাগজে যত কিলোমিটার বাঁধ হয়েছে, মাঠে আসলে ততটুকু হয়েছে কি না?
১০. Defect Liability Period
কাজ শেষ হওয়ার এক-দুই বছরের মধ্যে বাঁধ ভেঙে গেলে ঠিকাদারের দায় নেওয়া হয়েছে কি না?
একই জায়গায় বারবার কাজ— এটাই বড় প্রশ্ন
কক্সবাজারের প্রকল্পগুলোর দিকে একসঙ্গে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট— অনেক এলাকায় সমস্যা স্থায়ীভাবে শেষ না হয়ে প্রকল্পের ধরন বদলে ফিরে আসছে।
শাহপরীর দ্বীপে বড় প্রকল্পের পরও সিসি ব্লক ও জিওব্যাগের কাজ হচ্ছে।
কুতুবদিয়ায় বহু বছরের বাঁধ পুনর্বাসনের পাশাপাশি এখন ৮০০ কোটি টাকার সুপার ডাইক প্রকল্প।
মহেশখালীতে পুরোনো বাঁধের ক্ষতি সামলাতে জরুরি কাজের পাশাপাশি ৩৮২ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের নতুন প্রকল্প।
নাফ নদীর পোল্ডারে ৩৬৮ কোটি টাকার প্রকল্প সংশোধিত হয়ে বর্তমান সরকারি তালিকায় ৪১৫ কোটির বেশি হয়েছে।
আর কক্সবাজার সৈকতের জরুরি জিওব্যাগের পর এখন প্রস্তাব করা হয়েছে ৬২৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকার ৬ কিলোমিটার প্রতিরক্ষা প্রকল্প।
এগুলো নিজে থেকে দুর্নীতির প্রমাণ নয়। কিন্তু প্রকল্পের স্থায়িত্ব, নকশা, ব্যয় বৃদ্ধি, ঠিকাদার নির্বাচন এবং কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট কারণ তৈরি করে।
পাউবোর নিজের নথিতেই ভবিষ্যৎ ঝুঁকির স্বীকারোক্তি
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— এই ঝুঁকির কথা শুধু স্থানীয় মানুষ বা সংবাদমাধ্যম বলছে না। পাউবোর নিজস্ব জেলা/সার্কেল কর্মসম্পাদন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কক্সবাজারে আশির দশকে নির্মিত অধিকাংশ পোল্ডারের অবকাঠামোর মেয়াদ শেষ হয়েছে এবং পুনর্বাসন প্রয়োজন। একই প্রতিবেদনে কুতুবদিয়া, মহেশখালী, পোল্ডার ৬৮, ৬৫, ৭০ ও ৭১ এবং কক্সবাজার শহর-সৈকত রক্ষায় ভবিষ্যৎ প্রকল্পের কথা বলা হয়েছে।
অর্থাৎ আগামী দিনেও কক্সবাজারে পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্প কমছে না; বরং নতুন নতুন প্রকল্প যুক্ত হচ্ছে।
প্রশ্নের জায়গাটা তাই টাকার অঙ্কে নয়
কক্সবাজারের জন্য বাঁধ দরকার— এ নিয়ে প্রশ্ন নেই। উপকূলীয় জেলা হিসেবে জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন ও সমুদ্রের ক্ষয় থেকে মানুষ ও অবকাঠামো রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাজ অপরিহার্য।
প্রশ্ন হলো—
একই এলাকায় বারবার কাজের প্রয়োজন হচ্ছে কেন?
কাজের নকশা কি জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
প্রকল্প শেষ হওয়ার কয়েক বছরের মধ্যে আবার কেন একই বাঁধে কাজ করতে হচ্ছে?
প্রকল্প ব্যয় সংশোধনের কারণ কী?
কোন ঠিকাদার কতগুলো প্যাকেজ পেয়েছে?
একই ঠিকাদার বারবার কাজ পেলে তার প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের ইতিহাস কী?
কাজের মান যাচাইয়ের দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলীরা কোন সময়ে দায়িত্বে ছিলেন?
কোন প্রকল্পে সময় বাড়ানো হয়েছে, কতবার এবং কেন?
বাঁধ ভেঙে গেলে দায় কার— প্রকৃতি, নকশা, নির্মাণমান নাকি রক্ষণাবেক্ষণের ব্যর্থতা?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া যাবে প্রকল্পের মাঠপর্যায়ের ছবি বা সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নয়; পাওয়া যাবে DPP, RDPP, e-GP tender, NOA, contract agreement, MB, বিল, completion certificate, audit report এবং প্রকল্প পরিচালকের নথিতে।
কক্সবাজারের পানি উন্নয়ন বোর্ডের গত এক দশকের কাজের প্রকৃত চিত্র বের করতে তাই এখন প্রয়োজন প্রকল্পভিত্তিক টাকা–ঠিকাদার–কর্মকর্তা–কাজের পরিমাণ–সময়–চূড়ান্ত বিল–মাঠের বাস্তবতা— এই সাতটি তথ্যকে এক টেবিলে বসানো।
তাহলেই বোঝা যাবে— কক্সবাজারে বাঁধ নির্মাণের টাকা শুধু ভাঙন ঠেকাতে যাচ্ছে, নাকি একই ভাঙনের পেছনে বারবার নতুন প্রকল্প তৈরির একটি স্থায়ী চক্রও তৈরি হয়েছে।
