নেত্রকোনায় আলিফ ফকির খুন: এর আগেও হামলার শিকার হয়েছিলেন, সীমান্তে মাদক চোরাচালান নিয়ে লিখতেন
নিজস্ব প্রতিবেদক | FollowUpNews
নেত্রকোনার দুর্গাপুরে বাজারের একটি দোকানে বসে থাকা অবস্থায় লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির নামে এক সাংবাদিককে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাত আনুমানিক সোয়া ৮টার দিকে শ্যামগঞ্জ–বিরিশিরি সড়কের উতরাইল বাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। মোটরসাইকেলে আসা দুই যুবক তাঁকে লক্ষ্য করে একাধিক গুলি ছুড়ে দ্রুত পালিয়ে যায়। স্থানীয়দের সামনে সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ডে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
নিহত আলিফ বেসরকারি আইপি টেলিভিশন চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোনা প্রতিনিধি ছিলেন। পাশাপাশি তিনি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সীমান্তে মাদক চোরাচালান, দুর্নীতি, অনিয়ম ও অপরাধ নিয়ে তিনি লেখালেখি করতেন।
একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এটি শুধু একজন সাংবাদিকের হত্যাকাণ্ড নয়; এর আগে তাঁর ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছিল। ফলে হত্যার পেছনের কারণ অনুসন্ধানে পূর্ববর্তী হামলা, তাঁর প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং স্থানীয় অপরাধসংক্রান্ত বিরোধগুলো খতিয়ে দেখা জরুরি। তবে এসবের কোনোটি হত্যার নিশ্চিত কারণ কি না, তা এখনো তদন্তসাপেক্ষ।

দোকানে চা খেয়ে ফেরার পথে গুলিবর্ষণ
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে হত্যাকাণ্ডের আগের মুহূর্ত সম্পর্কে কিছু বিবরণ পাওয়া গেছে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আলিফ তাঁর শ্বশুরবাড়ির সামনের একটি দোকানে গিয়েছিলেন। দোকান থেকে বের হওয়ার পর মোবাইল ফোন নিতে আবার ফিরে আসেন। এরপর তিনি চলে যাওয়ার সময় দুই ব্যক্তি তাঁর পেছনে যান। কিছুক্ষণ পর গুলির শব্দ শোনেন দোকানি রবীন রাংসা।
বাংলা ট্রিবিউন ও অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলাকারীরা মোটরসাইকেলে এসেছিল এবং গুলি চালানোর পর একই মোটরসাইকেলে পালিয়ে যায়। তবে হামলাকারীদের পরিচয়, ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্র এবং হত্যার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা সম্পর্কে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত কোনো তথ্য জানায়নি।

মাথা, গলা ও বুকে গুলির চিহ্ন
দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমদ খানের বরাতে আজকের পত্রিকা জানিয়েছে, আলিফের মাথা, গলা, বুকসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে পাঁচটি গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে। অন্য কয়েকটি প্রতিবেদনে অন্তত তিনটি গুলির ক্ষতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে গুলির ক্ষতের সংখ্যা নিয়ে সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্যে পার্থক্য রয়েছে।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আলিফকে দুর্গাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পর চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনাস্থল থেকে গুলির খোসাও উদ্ধার করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। হত্যাকাণ্ডের তদন্ত চলছে।

এর আগেও হামলার শিকার হয়েছিলেন আলিফ
দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর দুর্গাপুরের সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাট এলাকায় আলিফের ওপর হামলা হয়েছিল। ওই ঘটনায় তাঁকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে আহত করা হয়। তাঁর সঙ্গে থাকা এক সহকর্মী বাধা দিতে গেলে তাঁকেও অস্ত্র দেখিয়ে হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ঢাকা টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের ১০ অক্টোবর সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাট এলাকায় দুর্বৃত্তদের ধাওয়ার মুখে পড়েছিলেন আলিফ। এই ঘটনার প্রকৃতি ও আগের হামলার সঙ্গে এর সম্পর্ক স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
আগের হামলার ঘটনায় কোনো মামলা হয়েছিল কি না, সন্দেহভাজন কেউ শনাক্ত বা গ্রেপ্তার হয়েছিল কি না এবং আলিফ নিরাপত্তা চেয়ে পুলিশের কাছে কোনো অভিযোগ করেছিলেন কি না—এসব তথ্য এখনো স্পষ্ট নয়। তাঁর হত্যার তদন্তে এসব প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ।

মাদক চোরাচালান নিয়ে লেখালেখি, কিন্তু হত্যার কারণ অজানা
আলিফ ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামের ফেসবুক পেজে বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও অপরাধ নিয়ে লেখালেখি করতেন। দ্য ডেইলি স্টার ও অবজারভার অনলাইনের প্রতিবেদনে সীমান্তে মাদক চোরাচালান নিয়ে তাঁর লেখালেখির বিষয়টি উঠে এসেছে।
তবে তিনি যেসব অপরাধ নিয়ে লিখতেন, সেগুলোর কোনোটি তাঁর হত্যার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কি না, তা এখনো প্রমাণিত নয়। তাঁর প্রকাশিত প্রতিবেদন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট, পূর্ববর্তী হামলার নথি এবং সম্ভাব্য হুমকির তথ্য পর্যালোচনা করলে তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া যেতে পারে।
হামলাকারীদের শনাক্ত করতে পুলিশের অভিযান
দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুর্গাপুর থানার ওসি জানিয়েছেন, হত্যাকাণ্ডের তদন্ত চলছে এবং জড়িতদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা করা হচ্ছে। নেত্রকোনার পুলিশ সুপার মো. তারিকুল ইসলামও ঘটনাস্থলে যাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন বলে ঢাকা টাইমসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত হত্যার উদ্দেশ্য, হামলাকারীদের পরিচয় কিংবা গ্রেপ্তারের বিষয়ে নিশ্চিত কোনো অগ্রগতির তথ্য পাওয়া যায়নি।

সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিয়ে আবারও প্রশ্ন
একজন সাংবাদিকের ওপর আগেও হামলা হয়ে থাকলে সেই ঘটনার তদন্ত, অপরাধীদের শনাক্তকরণ এবং সম্ভাব্য নিরাপত্তাঝুঁকি মূল্যায়ন কতটা কার্যকর হয়েছিল—আলিফের হত্যাকাণ্ডের পর এসব প্রশ্ন সামনে এসেছে।
সীমান্তে মাদক চোরাচালান ও স্থানীয় অপরাধ নিয়ে অনুসন্ধানী লেখালেখি করা সাংবাদিকের হত্যার ঘটনা হওয়ায় তদন্তে তাঁর সাংবাদিকতার কাজের সঙ্গে সম্ভাব্য যোগসূত্র খতিয়ে দেখা জরুরি। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত, ব্যবসায়িক বা অন্য কোনো বিরোধ ছিল কি না, সেটিও নিরপেক্ষভাবে অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।
আলিফের হত্যার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন, আগের হামলাগুলোর তদন্তের অগ্রগতি প্রকাশ এবং জড়িতদের বিচারের আওতায় আনা এখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
তথ্যসূত্র: দ্য ডেইলি স্টার, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, আজকের পত্রিকা, ঢাকা টাইমস, বাংলা ট্রিবিউন, যুগান্তর, এনটিভি অনলাইন ও অবজারভার অনলাইন, ফেসবুক পেজ এবং ফেসবুকের আলোচনা।
সম্পাদনা-নোট: বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ঘটনাস্থলের নাম কখনো ‘উতরাইল বাজার’, কখনো ‘তেলনজিয়া’ বা ‘তেলুঞ্জিয়া’ গ্রাম হিসেবে এসেছে। সময় নিয়েও রাত সাড়ে ৭টা থেকে সোয়া ৮টার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তবে পেজে সর্বশেষ কনটেন্টটি প্রকাশিত হয়েছে রাত ৮টার সামান্য আগে। নিজ হাতে পোস্ট করলে নিচের পোস্টটি দেওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যে তিনি খুন হয়েছেন।

প্রাসঙ্গিক প্রতিবেদন:
- দ্য ডেইলি স্টার: https://www.thedailystar.net/news/crime-justice/news/journalist-shot-dead-netrokona-nearly-year-after-surviving-earlier-attack-4299706
- বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম: https://bangla.bdnews24.com/samagrabangladesh/tqk2bgdi4w
- আজকের পত্রিকা: https://www.ajkerpatrika.com/bangladesh/netrakona/ajpbcolbk4wrs
- যুগান্তর: https://www.jugantor.com/country-news/1169516
