Headlines

মাদার কালার লিমিটেডের বন্ড সুবিধায় ১,৫৫৯ টন আমদানি প্রাপ্যতা, নিরীক্ষার হিসাব ও রাজস্ব তদারকি নিয়ে প্রশ্ন

দক্ষিণ বন্ড কমিশনারেট

নিজস্ব প্রতিবেদক | FollowUpNews

ঢাকা দক্ষিণ বন্ড কমিশনারেটের আওতাধীন মাদার কালার লিমিটেডের বন্ড সুবিধা, আমদানি–রপ্তানির পরিমাণ, নিরীক্ষা এবং রাজস্ব তদারকি নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সরকারি নথিতে প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক আমদানি প্রাপ্যতা ১,৫৫৯ মেট্রিক টন উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে, একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য-তথ্যভান্ডারে প্রতিষ্ঠানটির কয়েক বছরে কয়েক কোটি মার্কিন ডলারের আমদানি–রপ্তানির তথ্য দেখা যায়। এসব তথ্যের সঙ্গে বন্ডের কাঁচামাল ব্যবহার, উৎপাদন, রপ্তানি ও রাজস্ব নিষ্পত্তির হিসাব মিলিয়ে দেখা জরুরি।

প্রাথমিক অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির বাণিজ্যিক কার্যক্রমের ব্যাপ্তি এবং সরকারি বন্ড সুবিধার হিসাব একই সময়সীমায় যাচাই করা প্রয়োজন। তবে এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে রাজস্ব ফাঁকি বা বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের অভিযোগ নিশ্চিত করা যায়নি।

দক্ষিণ বন্ড কমিশনারেট
ফাইলের কাল্পনিক ছবি।

আমদানি–রপ্তানিতে কয়েক কোটি ডলারের বাণিজ্য

Trademo-এর বাণিজ্যিক তথ্যভান্ডারে মাদার কালার লিমিটেডের জানুয়ারি ২০২২ থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত আমদানি–রপ্তানির তথ্য পাওয়া যায়। সেখানে আমদানি ও রপ্তানি চালান এবং সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যমূল্যের যে হিসাব দেখানো হয়েছে, তা নিচের টেবিলে তুলে ধরা হলো।

টেবিল–১: মাদার কালার লিমিটেডের আমদানি–রপ্তানির তথ্য

সূচক ডেটাবেসে প্রদর্শিত তথ্য
তথ্যের সময়কাল জানুয়ারি ২০২২–সেপ্টেম্বর ২০২৫
আমদানি চালান ১,৩৪৬টি
আমদানির বাণিজ্যমূল্য ৩৬.০৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার
রপ্তানি চালান ৯৫২টি
রপ্তানির বাণিজ্যমূল্য ২৮.৩১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার

সূত্র: Trademo-এর বাণিজ্যিক ডেটাবেস। <Cite refs={[“turn984319search2”]}/>

ডেটাবেসের হিসাবে, আলোচিত সময়ে আমদানির বাণিজ্যমূল্য রপ্তানির বাণিজ্যমূল্যের চেয়ে বেশি। তবে এ ব্যবধানকে সরাসরি রাজস্ব ক্ষতি বা অনিয়মের প্রমাণ হিসেবে দেখা যাবে না। আমদানি করা কাঁচামাল পরবর্তী সময়ে উৎপাদনে ব্যবহৃত হতে পারে, মজুত থাকতে পারে কিংবা বিভিন্ন উৎপাদনচক্রে রপ্তানিযোগ্য পণ্যে রূপান্তরিত হতে পারে। প্রকৃত চিত্র জানতে কাস্টমসের মূল ঘোষণা, বন্ড স্টক রেজিস্টার এবং রপ্তানি নথি যাচাই করতে হবে।

এ ছাড়া বাণিজ্যিক ডেটাবেসের চালানসংখ্যা ও মূল্য সরকারি নিরীক্ষিত হিসাব নয়। তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি, চালানের শ্রেণিবিন্যাস এবং মূল্য নির্ধারণের ভিত্তিও যাচাই করা প্রয়োজন।

কী ধরনের পণ্য আমদানি ও রপ্তানি হয়?

প্রাথমিক বাণিজ্যিক তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির আমদানির সঙ্গে সুতা, তুলার সুতা, জিপার, রং ও টেক্সটাইল-সংশ্লিষ্ট উপকরণের নাম পাওয়া যায়। রপ্তানির ক্ষেত্রে নিট টি-শার্ট, তুলার পোশাক ও অন্যান্য নিট পোশাকের উল্লেখ রয়েছে। রপ্তানি বাজার হিসেবে ফ্রান্স, জার্মানি, স্লোভেনিয়া, নেদারল্যান্ডস ও স্পেনের নামও পাওয়া যায়। <Cite refs={[“turn984319search2”]}/>

টেবিল–২: অনুসন্ধানে পাওয়া পণ্য ও বাণিজ্য-সংক্রান্ত তথ্য

বিষয় প্রাথমিকভাবে পাওয়া তথ্য
আমদানির পণ্য সুতা, তুলার সুতা, জিপার, রং ও টেক্সটাইল উপকরণ
রপ্তানির পণ্য নিট টি-শার্ট, তুলার পোশাক ও অন্যান্য নিট পোশাক
উল্লেখযোগ্য রপ্তানি কোড HS 610910—তুলার নিট টি-শার্ট
HS 610910-এর প্রদর্শিত বাণিজ্যমূল্য ১৬.০৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার
উল্লেখিত রপ্তানি বাজার ফ্রান্স, জার্মানি, স্লোভেনিয়া, নেদারল্যান্ডস ও স্পেন

সূত্র: Trademo-এর বাণিজ্যিক ডেটাবেস। <Cite refs={[“turn984319search2”]}/>

HS 610910 কোডের অধীনে ১৬.০৪ মিলিয়ন ডলারের তথ্যটি নির্দিষ্ট পণ্যশ্রেণির বাণিজ্যমূল্য হিসেবে দেখানো হয়েছে। এটিকে প্রতিষ্ঠানের সব রপ্তানি পণ্যের মোট মূল্য হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। একইভাবে, দেশভিত্তিক বাজারের তথ্য থেকে সংশ্লিষ্ট দেশে মোট রপ্তানির সুনির্দিষ্ট পরিমাণ নির্ধারণ করতে মূল চালানভিত্তিক তথ্য প্রয়োজন।

বন্ড সুবিধায় ১,৫৫৯ মেট্রিক টন আমদানি প্রাপ্যতা

কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, ঢাকা (দক্ষিণ)-এর ২৭ জুলাই ২০২৬ তারিখের একটি নথিতে মাদার কালার লিমিটেডের বার্ষিক আমদানি প্রাপ্যতার পরিমাণ ১,৫৫৯ মেট্রিক টন উল্লেখ রয়েছে। একই নথিতে নিরীক্ষা অনুমোদন ও লাইসেন্সের বৈধতা-সংক্রান্ত তথ্যও রয়েছে। <Cite refs={[“turn222362search8”]}/>

এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ১,৫৫৯ মেট্রিক টনের প্রাপ্যতা কোন কোন কাঁচামালের জন্য নির্ধারিত এবং বাস্তবে কতটুকু আমদানি করা হয়েছে। এর বিপরীতে কত পণ্য উৎপাদিত হয়েছে, কতটুকু রপ্তানি হয়েছে এবং কত কাঁচামাল অবশিষ্ট রয়েছে— এসব হিসাব একসঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

আমদানি প্রাপ্যতা ও প্রকৃত আমদানির পরিমাণ এক নয়। তাই শুধু ১,৫৫৯ মেট্রিক টনের তথ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত উৎপাদন বা রাজস্ব ঝুঁকি নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

নথিতে লাইসেন্সের বৈধতা ১ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত উল্লেখ থাকায় পরবর্তী নবায়ন, বর্তমান লাইসেন্সের অবস্থা এবং বন্ড নিষ্পত্তির অগ্রগতিও যাচাই করা দরকার।

নিরীক্ষা ও রাজস্ব আদায়ের হিসাব কী বলছে?

বন্ড সুবিধার আওতায় আমদানি করা কাঁচামাল নির্ধারিত শর্তে ব্যবহৃত হয়েছে কিনা, তা নির্ধারণের জন্য আমদানি, উৎপাদন, রপ্তানি, মজুত ও অবশিষ্ট কাঁচামালের হিসাব মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। কোনো ঘাটতি বা শর্তভঙ্গ পাওয়া গেলে তার ভিত্তিতে রাজস্ব দাবি করা হয়েছে কিনা, দাবি করা হলে কত টাকা আদায় হয়েছে এবং কোনো নিরীক্ষা আপত্তি এখনো অনিষ্পন্ন রয়েছে কি না— এসব তথ্য অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

 

রাজস্ব কর্মকর্তা মোঃ আফজাল হোসেনের দায়িত্ব যাচাই প্রয়োজন

প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান তদারকির সঙ্গে রাজস্ব কর্মকর্তা মোঃ আফজাল হোসেনের সংশ্লিষ্টতার তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন। প্রাথমিকভাবে পাওয়া প্রকাশ্য নথি থেকে তাকে বর্তমানে মাদার কালার লিমিটেডের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে নিশ্চিত করা হয়েছে।

২৭ জুলাই ২০২৬ তারিখের একটি নথিতে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে মোঃ জাহিদুল ইসলামের নাম পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, ২৮ নভেম্বর ২০২৫ তারিখের একটি পৃথক নথিতে মোঃ আফজাল হোসেনের নাম রয়েছে। নথি দুটির তারিখ ও উদ্দেশ্য আলাদা হওয়ায় শুধু এগুলোর ভিত্তিতে বর্তমান দায়িত্ব বণ্টন নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তবে আফজাল হোসেনকে আবার নতুন করে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কিনা প্রশ্ন। <Cite refs={[“turn222362search8″,”turn222362search5”]}/>

এ কারণে দায়িত্ব বণ্টন আদেশ, সংশ্লিষ্ট বন্ড ফাইলের নথি এবং নিরীক্ষা কার্যক্রমে কর্মকর্তাদের ভূমিকা যাচাই করা দরকার। কোনো কর্মকর্তা নির্দিষ্ট সময়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন কিনা, তার দায়িত্বের আওতায় কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল এবং কোনো নিরীক্ষা আপত্তি নিষ্পত্তিতে তার ভূমিকা কী ছিল— এসব প্রশ্নের উত্তর নথিভিত্তিক হওয়া প্রয়োজন।

কমিশনারেটের কাছে যেসব তথ্য চাওয়া প্রয়োজন

মাদার কালার লিমিটেডের বন্ড সুবিধা ও রাজস্ব তদারকির পূর্ণাঙ্গ চিত্র পেতে ঢাকা দক্ষিণ বন্ড কমিশনারেটের কাছে নিচের তথ্যগুলো চাওয়া যেতে পারে:

১. ২০২২–২৩ থেকে ২০২৫–২৬ অর্থবছর পর্যন্ত বছরভিত্তিক প্রকৃত আমদানি ও রপ্তানির পরিমাণ এবং মূল্য।

২. ১,৫৫৯ মেট্রিক টন আমদানি প্রাপ্যতার পণ্যভিত্তিক বিবরণ এবং বাস্তবে কতটুকু আমদানি হয়েছে।

৩. সংশ্লিষ্ট সময়ের বন্ড স্টক, কাঁচামাল ব্যবহার, উৎপাদন ও রপ্তানির হিসাব।

৪. নিরীক্ষা প্রতিবেদন, আপত্তি, রাজস্ব দাবি, আদায় এবং অনিষ্পন্ন পাওনার বিবরণ।

৫. লাইসেন্সের বর্তমান অবস্থা, নবায়নের তথ্য এবং বন্ড নিষ্পত্তির অগ্রগতি।

৬. মোঃ আফজাল হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্ব বণ্টন এবং প্রতিষ্ঠানটির ফাইল তদারকিতে তাদের ভূমিকা।

নথির হিসাবেই নির্ধারিত হোক জবাবদিহি

বন্ড সুবিধা রপ্তানিমুখী শিল্পের উৎপাদন ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা। একই সঙ্গে এই সুবিধার আওতায় আমদানি করা কাঁচামালের ব্যবহার, রপ্তানি এবং শুল্ক-কর নিষ্পত্তির হিসাব স্বচ্ছ রাখা রাজস্ব প্রশাসনের দায়িত্ব।

মাদার কালার লিমিটেডের ক্ষেত্রে ১,৩৪৬টি আমদানি চালান, ৯৫২টি রপ্তানি চালান, কয়েক কোটি ডলারের বাণিজ্যমূল্য এবং ১,৫৫৯ মেট্রিক টন আমদানি প্রাপ্যতার তথ্যকে একই সময়সীমায় মিলিয়ে দেখা জরুরি।

সরকারি আমদানি–রপ্তানি ঘোষণা, নিরীক্ষা প্রতিবেদন, বন্ড নিষ্পত্তির হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য যাচাইয়ের পরই বোঝা যাবে, এখানে নিয়মিত বন্ড ব্যবস্থাপনার বিষয় রয়েছে, নাকি আরও অনুসন্ধানযোগ্য কোনো রাজস্ব-সংক্রান্ত অসংগতি আছে।

FollowUpNews-এর অনুসন্ধান অব্যাহত থাকবে।