Headlines

দানের টাকা কার জন্য— দুঃস্থ মানুষের জন্য, নাকি প্রশাসনিক ব্যয়ের জন্য?

ফাঁকি

আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর ব্যয় কাঠামো নিয়ে জনমনে বাড়ছে প্রশ্ন

ফাঁকি
:দারিদ্র্য বিমোচন ও মানবিক সহায়তার নামে আসা আন্তর্জাতিক অনুদানের কতটা প্রকৃত উপকারভোগীর কাছে পৌঁছায়—আর কতটা প্রশাসনিক ব্যয়, বেতন-ভাতা ও ব্যবস্থাপনায় খরচ হয়, সে প্রশ্নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দাবি জোরালো হচ্ছে।

ফলোআপ নিউজ ডেস্ক: দেশেবিদেশে মানুষের সহানুভূতি, করদাতাদের অর্থ এবং উন্নয়ন সহযোগীদের অনুদানে পরিচালিত আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর (INGO) ব্যয় কাঠামো নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং বিভিন্ন উন্নয়নকর্মীর আলোচনায় একটি বিষয় বারবার সামনে আসছে— দানের অর্থের কত অংশ প্রকৃত উপকারভোগীর কাছে পৌঁছায়, আর কত অংশ প্রশাসনিক ব্যয়, বেতন-ভাতা ও ভ্রমণে ব্যয় হয়?

বাংলাদেশে কাজ করা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা— যেমন ওয়াটারএইড, প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল, ইউনিসেফসহ অন্যান্য উন্নয়ন অংশীদারদের কার্যক্রম নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে কৌতূহল ও প্রশ্ন বাড়ছে। যদিও এসব সংস্থা নিয়মিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে, তবুও অনেক নাগরিকের অভিযোগ, প্রকল্প ব্যয়ের বড় অংশ মাঠপর্যায়ের মানুষের পরিবর্তে ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক খাতে চলে যায়।

“গরিব মানুষের নামে টাকা আসে, কিন্তু তারা কত পায়?”

রাজধানীর এক সমাজকর্মী বলেন,

“আমরা দেখতে চাই, বিদেশি অনুদানের কত শতাংশ সরাসরি দরিদ্র মানুষের জন্য ব্যয় হয়। প্রকল্পের গাড়ি, অফিস, বিদেশ ভ্রমণ, কর্মশালা আর উচ্চ বেতনের পেছনে কত যায়— সেটাও জনগণের জানার অধিকার আছে।”

অনেকের মতে, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো স্থানীয় অংশীদার এনজিওদের মাধ্যমে কাজ করলেও সেই অর্থের একটি বড় অংশ আবার প্রশাসনিক ব্যয়েই ব্যয় হয়। ফলে কেন্দ্রীয় সংস্থা, জাতীয় অফিস এবং অংশীদার সংস্থা— তিন স্তরে ব্যয় হওয়ার কারণে প্রকৃত সুবিধাভোগীর কাছে অর্থের পরিমাণ কমে যেতে পারে বলে সমালোচকদের আশঙ্কা।

উন্নয়ন খাতে কি অতিরিক্ত প্রশাসনিক ব্যয় হচ্ছে?

উন্নয়ন অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, যেকোনো প্রকল্প পরিচালনায় কিছু প্রশাসনিক ব্যয় থাকবেই। দক্ষ জনবল, পর্যবেক্ষণ, হিসাবরক্ষণ, নিরাপত্তা, প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়নের জন্য অর্থ প্রয়োজন। তবে প্রশ্ন হলো, সেই ব্যয়ের পরিমাণ কত হওয়া উচিৎ এবং তা কতটা স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী কেবল মোট প্রশাসনিক ব্যয়ের শতাংশ দেখানো যথেষ্ট নয়; বরং নিচের তথ্যগুলোও প্রকাশ করা উচিত—

  • প্রকল্পভিত্তিক সরাসরি উপকারভোগীর ব্যয়;

  • বেতন ও ভাতার মোট অনুপাত;

  • বিদেশ ভ্রমণ ও পরামর্শক ব্যয়;

  • অংশীদার এনজিওর প্রশাসনিক ব্যয়;

  • মাঠপর্যায়ে পৌঁছানো প্রকৃত অর্থের হিসাব।

স্বচ্ছতা থাকলে সন্দেহ কমবে

নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, বড় উন্নয়ন সংস্থাগুলোর উচিত সহজ ভাষায় “একশ টাকা কোথায় গেল” ধরনের হিসাব প্রকাশ করা। অর্থাৎ ১০০ টাকা অনুদান এলে তার কত টাকা সরাসরি মানুষের জন্য, কত টাকা কর্মসূচি পরিচালনায় এবং কত টাকা প্রশাসনিক খাতে ব্যয় হয়েছে— এ তথ্য সাধারণ মানুষের বোধগম্যভাবে প্রকাশ করা।

সংস্থাগুলোর অবস্থান কী?

আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলো সাধারণত বলে থাকে যে, তারা আন্তর্জাতিক অডিট, দাতা সংস্থার তদারকি, ফলাফলভিত্তিক মূল্যায়ন এবং কঠোর আর্থিক নীতিমালার অধীনে পরিচালিত হয়। তাদের মতে, দক্ষ জনবল ও ব্যবস্থাপনা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।

তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, যদি দারিদ্র্য বিমোচনই মূল লক্ষ্য হয়, তাহলে প্রশাসনিক ব্যয়ের সীমা কত হওয়া উচিত?

মানুষের দাবিঃ দয়া নয়, জবাবদিহি

বাংলাদেশের দরিদ্র, প্রান্তিক ও দুর্যোগকবলিত মানুষের নামে যে অর্থ আসে, তা যেন সর্বোচ্চ অংশে তাদের জীবনমান উন্নয়নে ব্যবহৃত হয়— এটাই এখন সাধারণ মানুষের প্রধান দাবি। নাগরিকদের ভাষায়,

“দানের টাকার সবচেয়ে বড় মালিক দাতা নন, অফিসও নয়—যার জন্য টাকা এসেছে, সেই মানুষ।”

উন্নয়ন খাতের প্রতি জনআস্থা ধরে রাখতে হলে শুধু ভালো কাজ করাই যথেষ্ট নয়; সেই কাজের প্রতিটি টাকার স্বচ্ছ, সহজবোধ্য ও জনসম্মুখে জবাবদিহিমূলক হিসাব তুলে ধরাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।