বাংলাদেশের মানুষ প্রায় সবাই আজ দেশ ছাড়তে চায়। কেউ ইউরোপে, কেউ আমেরিকায়, কেউ কানাডা বা অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ী হওয়ার স্বপ্ন দেখে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিদিনই দেখা যায়—বিদেশে পড়াশোনা, চাকরি কিংবা অভিবাসনের অসংখ্য আলোচনা। কিন্তু এই বাস্তবতার ভেতরে একটি গভীর সাংঘর্ষিক দিকও আছে, যা নিয়ে আমরা খুব কমই কথা বলি।
আমাদের সমাজের বড় একটি অংশ দেশে এমন এক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ তৈরি করতে চায়, যেখানে ভিন্নমত, ব্যক্তিস্বাধীনতা বা মুক্তচিন্তার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হয়। ধর্মীয় পরিচয়কে নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়, সামাজিক জীবনে অসহিষ্ণুতা বাড়ে, নারীর স্বাধীনতা নিয়ে নিয়ন্ত্রণমূলক মনোভাব তৈরি হয়, এবং সমালোচনাকে সহজেই “ধর্মবিরোধিতা” বা “অশ্রদ্ধা” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই প্রবণতা সমাজকে ধীরে ধীরে কঠোর, ভীত এবং বিষাক্ত করে তোলে।
কিন্তু একই মানুষদের অনেকেই আবার এমন দেশে যেতে চান, যেখানে আইনের শাসন শক্তিশালী, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত, নাগরিক অধিকার রক্ষিত, এবং সামাজিক সহনশীলতা তুলনামূলকভাবে বেশি। অর্থাৎ তারা সেই সমাজের সুবিধা নিতে চান, যেসব মূল্যবোধ নিজেদের দেশে প্রতিষ্ঠিত হতে দিতে চান না। এখানেই তৈরি হয় বড় প্রশ্ন: আমরা আসলে কোন ধরনের সমাজ চাই?
এটি কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের বিরুদ্ধে প্রশ্ন নয়। বরং এটি এই অঞ্চলের মানুষের সামাজিক আচরণ ও মানসিকতার প্রশ্ন। ধর্ম ব্যক্তিগত বিশ্বাস হতে পারে, কিন্তু যখন সেটি সামাজিক আধিপত্যের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন তা সমাজে বিভাজন ও ভয় তৈরি করে। আর ভয় ও অসহিষ্ণুতার সমাজে সৃজনশীলতা, বিজ্ঞান, গবেষণা, সংস্কৃতি কিংবা সুস্থ অর্থনীতি—কোনোটিই দীর্ঘমেয়াদে বিকশিত হতে পারে না।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, আমরা অনেক সময় পশ্চিমা বিশ্বের প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও জীবনমান চাই, কিন্তু সেই উন্নতির পেছনের মূল্যবোধ—যেমন জবাবদিহি, নাগরিক স্বাধীনতা, আইনের সমতা ও সহনশীলতা—সেগুলো গ্রহণ করতে চাই না। ফলে একধরনের সামাজিক দ্বিচারিতা তৈরি হয়।
একটি দেশ কেবল অর্থনীতি দিয়ে উন্নত হয় না; মানুষের মানসিকতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং ভিন্নতাকে গ্রহণ করার ক্ষমতাও একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। যদি আমরা সত্যিই একটি সুন্দর সমাজ চাই, তাহলে কেবল বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখলেই হবে না; নিজেদের সমাজটিকেও বাসযোগ্য করে তোলার দায় নিতে হবে।
