সাংবাদিকতা কি শুধু কারও অপরাধ, অনিয়ম কিংবা দুর্নীতি খুঁজে বের করার নাম? নাকি সাংবাদিকতার আরও বড় একটি দায়িত্ব রয়েছে— সত্য প্রকাশের পাশাপাশি সেই সত্য প্রকাশের কারণে অপ্রয়োজনীয় ক্ষতি যেন না হয়, সেটিও বিবেচনায় রাখা?
আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতার নৈতিক আলোচনায় বিষয়টি বেশ স্পষ্ট। বহুল ব্যবহৃত Society of Professional Journalists (SPJ)-এর Code of Ethics-এর চারটি মৌলিক নীতির একটি হলো—“Minimize Harm” বা “ক্ষতি কমানো”। অর্থাৎ সাংবাদিকের দায়িত্ব শুধু সত্য অনুসন্ধান ও প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সেই তথ্য প্রকাশে ব্যক্তি, পরিবার কিংবা সমাজের ওপর অপ্রয়োজনীয় ক্ষতি হচ্ছে কি না, সেটিও বিবেচনা করতে হবে।
এর অর্থ অবশ্যই এই নয় যে সাংবাদিকতা দুর্নীতি, অনিয়ম কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন করবে না। বরং জনস্বার্থে এসব অনুসন্ধান সাংবাদিকতার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কিন্তু অনুসন্ধানের লক্ষ্য কাউকে আগে থেকেই অপরাধী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা নয়; লক্ষ্য হলো তথ্য, নথি, প্রমাণ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতে সত্যের কাছে পৌঁছানো।
এখানেই ‘জবাবদিহি চাওয়া’ এবং ‘অপরাধী বানানোর চেষ্টা’-র মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়।
একজন সরকারি কর্মকর্তাকে জিজ্ঞেস করা— কোনো সিদ্ধান্তের আইনি ভিত্তি কী, সরকারি অর্থ কীভাবে ব্যয় হয়েছে, কোনো অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য কী, কিংবা কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ফলে জনগণের কী প্রভাব পড়েছে— এসব প্রশ্ন করা সাংবাদিকের স্বাভাবিক দায়িত্ব।
কিন্তু প্রশ্ন করার আগেই যদি সাংবাদিকের মনে সিদ্ধান্ত তৈরি হয়ে যায় যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি দুর্নীতিবাজ, তাহলে অনুসন্ধান আর নিরপেক্ষ অনুসন্ধান থাকে না।
‘ক্ষতি কমানো’র নীতিটি এখানেই গুরুত্বপূর্ণ।
একটি সংবাদ সত্য হতে পারে, কিন্তু সেটি কীভাবে লেখা হচ্ছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। একটি অভিযোগকে যদি শিরোনামেই প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, অথচ তদন্ত বা বিচার শেষ হয়নি, তাহলে পাঠকের কাছে অভিযোগ ও প্রমাণিত অপরাধের পার্থক্যটি হারিয়ে যেতে পারে।
একইভাবে কারও ব্যক্তিগত তথ্য, পারিবারিক পরিচয়, ছবি কিংবা এমন কোনো তথ্য প্রকাশ করা যার সঙ্গে জনস্বার্থের সরাসরি সম্পর্ক নেই— তা আইনগতভাবে প্রকাশযোগ্য হলেও সবসময় নৈতিকভাবে প্রয়োজনীয় নাও হতে পারে।
সাংবাদিকতার স্বাধীনতা তাই সীমাহীন ক্ষমতা নয়। স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বও আছে।
সত্য প্রকাশ করতে হবে, কিন্তু অপ্রয়োজনীয় ক্ষতি না করে।
কঠিন প্রশ্ন করতে হবে, কিন্তু অপমান করার জন্য নয়।
অভিযোগ প্রকাশ করতে হবে, কিন্তু অভিযোগকে রায় হিসেবে নয়।
ক্ষমতাবানকে জবাবদিহির মধ্যে আনতে হবে, কিন্তু প্রমাণের আগে তাকে অপরাধী বানানো যাবে না।
এই পার্থক্যটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠান নিয়ে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে। একজন কর্মকর্তা কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে অস্বস্তি বোধ করলেই তিনি দুর্নীতিবাজ— এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। আবার কোনো কর্মকর্তা ক্যামেরার সামনে কথা বলতে না চাইলে সেটিও একা তার বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ নয়।
সাংবাদিকের কাজ হলো— প্রশ্ন করা, নথি সংগ্রহ করা, তথ্য যাচাই করা, একাধিক উৎসের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা।
তারপর যা প্রমাণিত হয়, সেটিই প্রকাশ করা।
কারণ সাংবাদিকতা অভিযোগের আদালত নয়; সাংবাদিকতা জনস্বার্থে তথ্য যাচাইয়ের একটি প্রক্রিয়া।
আর ‘ক্ষতি কমানো’ মানে সাংবাদিককে নরম হয়ে যেতে বলা নয়। বরং এর অর্থ হলো— যতটা প্রয়োজন ততটাই কঠোর হওয়া, কিন্তু যতটা সম্ভব ন্যায্য থাকা।
একজন দুর্নীতিবাজকে রক্ষা করা সাংবাদিকতার দায়িত্ব নয়। একইভাবে নির্দোষ একজন মানুষকে শুধুমাত্র একটি অভিযোগের ভিত্তিতে জনসমক্ষে অপরাধী বানানোও সাংবাদিকতার দায়িত্ব নয়।
সাংবাদিকতার শক্তি এখানেই —সে প্রশ্ন করতে পারে, ক্ষমতাকে অস্বস্তিতে ফেলতে পারে, নথি চাইতে পারে, অসঙ্গতি তুলে ধরতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে নিজের প্রতিবেদনকেও একই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করাতে হয়:
এই প্রতিবেদন কি সত্যকে সামনে আনছে, নাকি অপ্রয়োজনীয় ক্ষতি তৈরি করছে?
আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতার নৈতিক মানদণ্ডের আলোকে এই আত্মজিজ্ঞাসাটিই গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ সাংবাদিকতার উদ্দেশ্য শুধু কারও অপরাধ খুঁজে বের করা নয়; সত্যকে জনস্বার্থে দায়িত্বশীলভাবে প্রকাশ করা।
