বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এমন কিছু গণহত্যা রয়েছে, যেগুলো স্থানীয় মানুষের স্মৃতিতে আজও জীবন্ত থাকলেও জাতীয় পর্যায়ে তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত। নীলফামারীর সৈয়দপুরের গোলাহাট গণহত্যা তেমনই একটি মর্মান্তিক অধ্যায়। ১৯৭১ সালের ১৩ জুন সংঘটিত এই হত্যাযজ্ঞ শুধু একটি গণহত্যাই নয়, এটি ছিলো প্রতারণা, বিশ্বাসঘাতকতা এবং মানবসভ্যতার বিরুদ্ধে সংঘটিত এক ভয়াবহ অপরাধ।
আজ ১৩ জুন। গোলাহাট গণহত্যা দিবস। ৫৫ বছর আগে এই দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের স্থানীয় দোসররা “নিরাপদে ভারতে পৌঁছে দেওয়ার” মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে শত শত নিরীহ মারোয়াড়ি নারী, পুরুষ ও শিশুকে ট্রেনে তুলে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। ইতিহাসে এই নৃশংস ঘটনাটি “অপারেশন খরচাখাতা” নামেও পরিচিত।

সৈয়দপুরের মারোয়াড়ি সম্প্রদায়: এক সমৃদ্ধ বাণিজ্যিক জনগোষ্ঠী
সৈয়দপুর ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রেলওয়ে ও বাণিজ্যিক শহর। ব্রিটিশ আমল থেকেই ভারতের রাজস্থান, বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত বহু মারোয়াড়ি ব্যবসায়ী এখানে বসতি গড়ে তোলেন। তারা শহরের অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
১৯৪৭ সালের দেশভাগের বহু আগেই সৈয়দপুরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করা এই পরিবারগুলো নিজেদের এই অঞ্চলেরই মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। কিন্তু ১৯৭১ সালে যুদ্ধ শুরু হলে তাদের ধর্মীয় পরিচয়ই হয়ে ওঠে মৃত্যুর কারণ।
মার্চ থেকে শুরু হয় আতঙ্ক
১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ রাত থেকেই সৈয়দপুরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের সহযোগী বিহারিরা বাঙালিদের ওপর দমন-পীড়ন শুরু করে। শহরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে বহু নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয়। ফলে সমগ্র অঞ্চলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
মারোয়াড়ি সম্প্রদায়ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে শুরু করে। ১২ এপ্রিল রংপুর সেনানিবাস সংলগ্ন নিসবেতগঞ্জ বধ্যভূমিতে সৈয়দপুরের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও মারোয়াড়ি নেতৃবৃন্দ—তুলসীরাম আগরওয়ালা, যমুনাপ্রসাদ কেডিয়া এবং রামেশ্বর লাল আগরওয়ালাসহ অনেককে হত্যা করা হলে আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়। একইসঙ্গে বিহারিদের একটি অংশ মারোয়াড়িদের বাড়িঘরে লুটপাটও চালাতে থাকে।
মিথ্যা আশ্বাসের ফাঁদ
জুন মাসের শুরুতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী মাইকে ঘোষণা দিতে শুরু করে যে, সৈয়দপুরের হিন্দু মারোয়াড়িদের নিরাপদে ভারতের সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া হবে। তাদের জন্য বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থাও করা হয়েছে বলে জানানো হয়।
প্রায় পাঁচ দিন ধরে এই ঘোষণা চলতে থাকে।
ভীত-সন্ত্রস্ত মারোয়াড়ি পরিবারগুলো এটিকে মুক্তির পথ বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে। তারা মনে করেছিলো, হয়তো যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ভারতে আশ্রয় নিতে পারলেই জীবন বাঁচবে।
১৩ জুন ভোর থেকেই শত শত নারী, পুরুষ ও শিশু সৈয়দপুর রেলওয়ে স্টেশনে জড়ো হতে শুরু করেন। ট্রেনে জায়গা না পাওয়ার আশঙ্কায় অনেকে আগের রাত থেকেই স্টেশনে অবস্থান করছিলেন।
মৃত্যুর ট্রেন
ভোরের দিকে ট্রেনটি স্টেশনে পৌঁছালে প্রায় ৪৩৭ জন মারোয়াড়ি যাত্রী চারটি বগিতে গাদাগাদি করে উঠে বসেন। সঙ্গে ছিলো তাদের সামান্য কিছু মালপত্র এবং বেঁচে থাকার শেষ আশা।
সকাল ১০টার দিকে ট্রেনটি স্টেশন ছেড়ে ধীরে ধীরে যাত্রা শুরু করে। কিছু দূর যাওয়ার পর যাত্রীদের অজান্তেই বগির দরজা-জানালা বন্ধ করে দেওয়া হয়।
মাত্র দুই মাইল পথ অতিক্রম করে ট্রেনটি সৈয়দপুর শহরের উপকণ্ঠে গোলাহাট এলাকায় এসে থেমে যায়।
ট্রেনের ভেতরে তখনো কেউ বুঝতে পারেনি, তাদের জন্য অপেক্ষা করছে মৃত্যুর ফাঁদ।
গোলাহাটে শুরু হয় হত্যাযজ্ঞ
ট্রেন থামার আগেই গোলাহাট এলাকায় অবস্থান নিয়েছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনী, রাজাকার এবং বিপুলসংখ্যক সশস্ত্র বিহারি। পুরো এলাকা ঘিরে রাখা হয় যাতে কেউ পালাতে না পারে।
এরপর বগির দরজা খুলে হাতে ধারালো রামদা ও অন্যান্য অস্ত্র নিয়ে বিহারিরা ভেতরে প্রবেশ করে। পাকিস্তানি সৈন্যরা অস্ত্র তাক করে দাঁড়িয়ে ছিলো বাইরে।
শুরু হয় এক বিভীষিকাময় হত্যাযজ্ঞ।
যাত্রীদের একে একে ট্রেন থেকে নামিয়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। নারী, পুরুষ, বৃদ্ধ, শিশু—কেউ রেহাই পায়নি। অনেকের দেহ টুকরো টুকরো করে রেললাইনের আশপাশে ছড়িয়ে ফেলা হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই রেললাইন, কালভার্ট ও আশপাশের এলাকা রক্তে ভেসে যায়।
মানবতার ইতিহাসে এটি ছিলো এক জঘন্যতম গণহত্যা।
বেঁচে যাওয়া মানুষের বর্ণনা
সেদিনের হত্যাযজ্ঞ থেকে অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে যান মাত্র দশজন যুবক। তাদের একজন তপন কুমার দাস পরবর্তীকালে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জানান, ট্রেন থামার পর চারপাশে পাকিস্তানি সেনা ও বিহারিদের অবস্থান দেখে তারা বুঝতে পারেন যে তাদের হত্যা করা হবে।
তিনি বলেন, কিছু যুবক ট্রেনের বিপরীত পাশ দিয়ে নিচে লাফিয়ে পড়ে প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করেন। বৃষ্টিভেজা মাঠের মধ্য দিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে তারা কোনোমতে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। পেছন থেকে পাকিস্তানি সৈন্যরা গুলি ছুড়লেও ভাগ্যক্রমে কয়েকজন প্রাণে বেঁচে যান।
আরেক প্রত্যক্ষদর্শী গোবিন্দ চন্দ্র দাস জানান, ট্রেনের বগিতে ঢুকেই পাকিস্তানি সেনারা উর্দুতে ঘোষণা করেছিলে—তাদের হত্যা করা হবে, কিন্তু গুলি খরচ করা হবে না। এরপর শুরু হয় নির্মম হত্যাকাণ্ড।
ইতিহাসের এক বিস্মৃত গণহত্যা
গোলাহাট গণহত্যায় শহীদ হন ৪৩৭ জন নিরীহ মানুষ। তাদের অধিকাংশই ছিলেন ব্যবসায়ী, নারী, শিশু এবং সাধারণ নাগরিক, যাদের কোনো রাজনৈতিক বা সামরিক সম্পৃক্ততা ছিলো না।
তবুও এই গণহত্যা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অনেকাংশে আড়ালেই থেকে গেছে। অথচ এটি ছিলো ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে সংঘটিত পরিকল্পিত জাতিগত নিধনের একটি জ্বলন্ত উদাহরণ।
আজও গোলাহাটের সেই কালভার্ট, রেললাইন এবং আশপাশের এলাকা ১৩ জুন ১৯৭১ সালের সেই রক্তাক্ত সকালটির সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
শ্রদ্ধাঞ্জলি
আজ গোলাহাট গণহত্যা দিবসে আমরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি সেই ৪৩৭ জন নিরীহ শহীদকে, যাদের জীবন কেড়ে নেওয়া হয়েছিলো প্রতারণা ও বর্বরতার মাধ্যমে।
তাদের আত্মত্যাগ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইতিহাসের এই নির্মম অধ্যায় নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
বিনম্র শ্রদ্ধা সকল শহীদের প্রতি।
